২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ইংরেজী
Clear

22°C

Chittagong

Clear

Humidity: 68%

Wind: 17.70 km/h

  • 23 Nov 2017

    Partly Cloudy 27°C 16°C

  • 24 Nov 2017

    Mostly Sunny 27°C 18°C

শনিবার, 29 নভেম্বর 2014 13:24

যুব সমাজের অবক্ষয় ও প্রতিকার

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

যুব সমাজের অবক্ষয় ও প্রতিকার

মানব জীবনে যুব সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিসীম। তাদের প্রতি শৈশব, কৈশোর থেকেই অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া জরুরী। কারণ, তারাই ভবিষ্যতের উত্তরসূরি। উত্তরসূরিদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করবে আজকের যুব সমাজ। যুব সমাজ, নিষ্ঠাবান, সৎ, চরিত্রবান ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারী হলে, তাদের দৈহিক শক্তি, উদ্ভাবনী মেধা ও চিন্তা-ভাবনা করার যোগ্যতা প্রবীণদের চেয়ে অনেক বেশি হবে। যদিও প্রবীণরা বয়সের কারণে অভিজ্ঞতা, জ্ঞানের গভীরতা ও বুদ্ধিমত্তায় যুবকদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী। কিন্তু দৈহিকভাবে দুর্বল হওয়ায় এবং সাহসের অভাব থাকার কারণে শক্তিশালী যুবকরা যে সব কাজ সহজে করতে পারে প্রবীণদের দ্বারা তা সম্ভব হয় না। বর্তমানের যুব সমাজ যখন তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে, সৎ ও ভাল কর্ম করবে, তারা তাদের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত হবে এবং তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে, তাদের কারণেই দেশ ও জাতি বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাড়াবে। যুবকদের ভাল কাজের প্রতি উৎসাহ দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বড়দের দায়িত্ব হল, যুব সমাজকে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করবে এবং বিভিন্ন সৃজনশীল, ধর্মীয় ও কল্যাণমূলক কাজের নির্দেশনা দেবে।

একজন যুবক যেহেতু মাতা-পিতার আশ্রয়ে লালিত-পালিত হয়েছে, বড় হয়েছে, শিক্ষিত হয়েছে সেহেতু তার প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব থাকবে মাতা-পিতার প্রতি। মাতা-পিতাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা, তাদের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নেয়া, তাদের চিকিৎসা, বৃদ্ধকালে তাদের সেবা করা সহ বিভিন্ন কাজে তাদের সহায়তা করা। কারণ শৈশব থেকে এই অবধি আসার পিছনে মাতা-পিতার অবদান অনস্বীকার্য। মাতা-পিতার অমানুষিক পরিশ্রমের ফলেই একটি সন্তান সুশিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠে। মাতা-পিতা থেকে যেরকম নৈতিক এবং ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করে, সে শিক্ষা নিয়েই তারা বড় হতে থাকে এবং সে শিক্ষা জীবন তাদের চলার পথের পাথেয় স্বরূপ। বর্তমান সময়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে অধিকাংশ যুবকের নৈতিক অবক্ষয় ও পতন দেখা যাচ্ছে। কারণ, তারা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে পশ্চিমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনুকরণে ব্যস্ত । পাশ্চাত্য সং®কৃতির ঘেরাটোপে যুব সমাজ এক ধরণের আসক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে পোশাক-আশাক, চলা-ফেরা সহ যাবতীয় বিষয়ে পশ্চিমাদের অনুকরণ করছে। যুব সমাজকে ধ্বংসের উপকরণ অসংখ্য ও অগণিত। যেমন, মোবাইল, কম্পিউটার, রেডিও, টেলিভিশন, নগ্ন ম্যাগাজিন ইত্যাদি। এগুলো যুব সমাজকে ধ্বংস করা ও তাদের চরিত্রকে হরণ করার জন্য খুবই ক্ষতিকর ও বিষাক্ত মাধ্যম। যদিও আমরা জানি প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় আধুনিকতার ছোয়ায় এগুলি আমাদের জন্য একদিকে আশীর্বাদ কিন্তু অন্যদিকে অভিশাপ হয়ে দাড়িয়েছে। যুবকরা নিজেদের ক্ষতিকর দিকসমূহ বুঝতে না পেরে এ সবের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। যুব সমাজ যদি এ সব ক্ষতিকর উপসর্গ থেকে নিজেকে রক্ষা করে তাহলে নিজেদের কল্যাণকে নিশ্চিত করবে। কারণ, এ সবের পরিণতি খুবই মারাত্মক ও ক্ষতিকর। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি বিদ্যমান। সংস্কৃতি মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বর্তমান সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের যুগে সুস্থ ও নির্মল সংস্কৃতি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। অপসংস্কৃতির ছোঁয়ায় সুস্থ সংস্কৃতির ধারা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। অপসংস্কৃতির কারণে জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে হাজার বছর এগিয়ে গিয়েও ধ্বংসমুখ সভ্যতায় পরিনত হতে চলেছে উন্নত দেশগুলো। ফলে খুন, ধর্ষন, আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি ও অপরাধ সংস্কৃতি তাদের জীবনকে বিষাক্ত করে তুলেছে।

আরেকটি দিক হচ্ছে যুব সমাজ ধ্বংসের প্রধান কারিগর মাদকাসক্তি। বর্তমান বিশ্বে সমগ্র মানব জাতির জন্য অত্যন্ত বড় হুমকি হলো মাদকাসক্ত। সুন্দর পৃথিবী গড়ার কারিগর, সম্ভাবনাময় যুব সম্প্রদায়কে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছে মাদকের ভয়াবহ ছোবল। মাদকের কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে এটি এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। মাদকের কারণে মাতা-পিতার বুকফাটা কান্নায় আকাশ বাতাস ভারি হয়ে যায়, আর্ত হাহাকারে রাতের অন্ধকার আরো নিঃসঙ্গ ও বেদনার্থ হয়ে ওঠে, পরিবার গুলোতে নামে বিষাদের কালো ছায়া । কি দুঃসহ সেই জীবন। মাদকের ভয়াবহ নেশা মায়ের বুক থেকে সন্তানকে ছিনিয়ে নেয় চিরতরে। মাদকের কারণে অনেক অবুঝ সন্তানের হাতে খুন হচ্ছে নেশার টাকা যোগাতে ব্যর্থ পিতা-মাতা। আজ মাদকের কারণেই অনেক পরিবার তাদের যুবক সন্তানদের নিয়ে আতংকিত।
প্রতিকার ঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব সম্মত ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবহার খুবই জরুরী। এমন যেন না হয় ধর্ম ক্লাস আছে, করতে হবে এজন্যই ক্লাশটা করা। অর্থাৎ বর্তমানে ছাত্ররা এই বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। কোনরকমে পাশ করতে পারলেই হলো। এই মানসিকতা পরিহার পূর্বক যথাযথ ধর্মীয় শিক্ষা যাতে সকল ছাত্র-ছাত্রীরা পায় তজ্জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করে নতুনভাবে সাজাতে হবে, যাতে একজন ছাত্র-ছাত্রী ধর্মীয় ক্লাশের মাধ্যমে কল্যাণ ও অকল্যাণ কি পার্থক্য করতে সক্ষম হয়। তারা নিজেরাই নিজেদের বিবেক বুদ্ধিকে যাতে নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞানের দ্বারা বিকশিত করতে পারে। ভালো ও অভিজ্ঞ ধর্মীয় শিক্ষক নির্বাচন করতে হবে যাতে তারা ছাত্রদের মাঝে নৈতিক ও ধর্মীয় জ্ঞানের বীজ বপন করতে পারে। যে বীজ আজকে শিক্ষকরা তাদের অন্তরে সঞ্চারিত করবেন, তাহার সুফল ছাত্ররা যেন সারাজীবন প্রত্যক্ষ করে।
বিভিন্ন সভা সেমিনারে পন্ডিত এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে যুবকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরের ব্যবস্থা করা, যাতে তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও তাদের পথ চলার গতি স্পষ্ট হয়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, যুব সমাজকে সংশোধনের ক্ষেত্রে সমাজের শিক্ষিত এবং পন্ডিত ব্যক্তিদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। অপ্রিয় হলেও সত্য বর্তমানে যুব সমাজের সাথে ধর্মীয় গুরুদের সহিত বিভিন্ন বিষয়ে মানসিক দূরত্ব ও মত ভেদ দেখা যাচ্ছে। এই মতপার্থক্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় গুরুদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। যুব সমাজের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে ধর্মীয় গুরুরা যুব সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখতে পারে।

মাদক নিয়ে বর্তমান সময়ে যেভাবে আতংক দেখা যাচ্ছে সেই আতংক কমাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় গুরুরা বিশেষ অবদান রাখতে পারেন সহজেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকারা এবিষয়টি গুরুত্বের সহিত ছাত্র-ছাত্রীদের বোঝাতে পারেন। যেহেতু কোমলমতি শিশু-কিশোররা ছোটকাল থেকে অন্তরে যা ধারণ করবে তার প্রতিফলন ঘটাবে পরবর্তীতে। একইভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় গুরুরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানসমূহে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বললে তার সুফল হবে সূদুরপ্রসারী।

সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের সচেতন থাকা খুবই জরুরী। বিশেষ করে উঠতি বয়সীদের দিকে আরো বেশি সর্তক দৃষ্টি রাখতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় সঙ্গ দোষে ভালো ছেলেও খারাপ হয়ে যায়। কারণ ভালো ছেলেরা না বুঝে প্রথমে গ্রহণ করে পরবর্তীতে আসক্ত হয়ে যায়। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বন্ধুদের কারণে প্রথমবার মাদক নিয়েছিল এমন অনেকেই দ্বিতীবার মাদক নিতে চায়নি। কিন্তু বন্ধুদের সামনে ছোট হওয়ার ভয়ে কিংবা বন্ধুদের চাপে মাদকদ্রব্য নিতে বাধ্য হয়েছে। অনেকেই দু’একবার মজা করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েছে। তাই অভিভাবকদের নিজের ছেলে-মেয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। সন্তানেরা কোন ধরণের ছেলে মেয়েদের সাথে মেলামেশা করছে সেটা ও জেনে রাখা জরুরী এবং সন্তানদের সব সময় সৎসঙ্গ নিতে উৎসাহিত ও অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

মেডিটেশন ঃ যুব সমাজকে এগিয়ে নিতে মেডিটেশনের বিকল্প নেই। কারণ সময়ের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, যাপিত জীবনের নানা জটিলতায় আমাদের মন জুড়ে প্রায়ই বয়ে যায় অস্থিরতার ঝড়। কাছের মানুষের স্বার্থপরতা আর অকৃতজ্ঞতায় মনে ভর করে তীব্র ক্ষোভ আর হতাশা। কোনো কাজে মন বসে না। জগৎ সংসারের সবকিছু মনে হয় রূপহীন, বিবর্ণ আর বিরক্তিকর। অস্থির মনে প্রশান্তি এনে দেবার অনন্য উপায় হলো মেডিটেশন। চলতি জীবনের জটিলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হলে অবশ্যই মানসিক ব্যায়াম হয়ে সব মানুষের প্রতিদিনের জীবনের চর্চার অংশ হওয়া উচিত। আসলে মনের প্রশান্তির জন্য মেডিটেশন চর্চার জুড়ি নেই। আমাদের যান্ত্রিক জীবনে একটু শান্তি মতো নিশ্বাস নেওয়ারও সময় নেই। জীবনের সফলতার এই দৌড়ে কখনও কখনও হাঁপিয়ে উঠি। আবার বিভিন্ন কারণে মন অস্থির থাকে। চিন্তা না করে সিদ্ধান্ত নিলে অনেক সময় ভুল হয়। জীবনে যে কোনো বিষয়ে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন দূরদর্শীতা, ধৈর্য। আর এটা আমরা পেতে পারি ধ্যান বা মেডিটেশনের মাধ্যমে।

যে কোনো পরিস্থিতিতেই সবার আগে মেনে নিতে হবে বাস্তবতাকে। বাস্তবতা মেনে নিতে পারলে মনের মধ্যে জমাট বাঁধা অনেক বোঝা নেমে যাবে। আমাদের স্বপ্নপ্রবণ মন যে জীবনের আকাংখা করতে শেখায়, বাস্তবের সঙ্গে তার সৃষ্টি হয় আকাশ-পাতাল ব্যবধান। এই উপলব্ধিটা যখন হঠাৎ আমাদের জীবনে দুঃসহ বোঝা হয়ে নেমে আসে তখন যেন আমরা তার ভারে নুয়ে না পড়ি, এ জন্যই দরকার মনের জোর। বর্তমানে সময়ে কর্মব্যস্ততার যুগে ঘন্টার পর ঘন্টা ধ্যান করার সময় হয়তো আমাদের নেই। তবে দিনের কিছুটা সময় হোক মাত্র ১৫ মিনিট, মেডিটেশন করতে পারলে আমাদের বিক্ষুব্ধ মন শান্ত হবে। মেডিটেশন আমাদের ক্লান্তি, অবসাদ এবং খেয়ালী মনের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে। মেডিটেশন মনকে স্থির অচঞ্চল, শান্ত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই আজকের যুব সমাজের প্রত্যয় হোক কবির ভাষায়,
এমন জীবন তুমি করিবে গঠন
মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।

ইলা মুৎসুদ্দী: সুলেখক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যসেবী। 'নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশন'-এর সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক। সহযোগী সম্পাদক "নির্বাণা" (www.nirvanapeace.com).

Courtesy: Soshanvumi Meditation Practiciing Center.Karaiyanagor

Additional Info

  • Image: Image