২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 20 নভেম্বর 2014 02:09

বাংলার বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি: একটি শ্রমসাধ্য গবেষণা কর্ম

লিখেছেনঃ ড. মনিরুজ্জামান

বাংলার বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি : একটি শ্রমসাধ্য গবেষণা কর্ম

চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের অবস্থান অতি প্রাচীন। এখানে স্বয়ং বুদ্ধেরও (হস্তিপৃষ্ঠে) আগমন ঘটেছিল বলে কথিত আছে। হাইদচকিয়া প্রভৃতি গ্রাম নামে তার পরিচয় আজও বর্তমান। প্রাচীন বৌদ্ধ সিদ্ধাদেরও উল্লেখ পাওয়া যায় এখানে। কিন্তু ইতিহাসের নানা ভ্রান্ত আলোচনায় যথার্থ সত্য পরিচয়টি এখন আড়ালে পড়ে গেছে। সুখের বিষয় এই যে, চট্টগ্রামী ইতিহাসের নব পাঠের ধারায় (ড. আব্দুল করিম, আব্দুল হক চৌধুরী প্রমুখ) বৌদ্ধদের ইতিহাস-সংস্কৃতির প্রতিও এখন দৃষ্টিপাত ঘটতে শুরু করেছে। এ বিষয়ে যাঁরা এগিয়ে এসেছেন তাঁদের মধ্যে তরুণ গবেষক অধ্যাপক শিমুল বড়ুয়া অন্যতম।

বর্তমান আলোচনা শিমুল বড়ুয়ার গবেষণাকে কেন্দ্র করে হলেও চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রসঙ্গই আমাদের লক্ষ্য। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে অধ্যাপক শিমুলের পরিচয় সামান্য উল্লেখ করা যেতে পারে। অধ্যাপক শিমুল রাউজানের উত্তর গুজরায় ১৯৬৬-তে নকুল মহালদারের বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৃত ভূপতিরঞ্জন বড়ুয়া, মাতা নীহার কণা বড়ুয়া। রাউজান ও চিটাগাং এ (চট্টগ্রাম কলেজ) লেখাপড়া শেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স-সহ এমএসএস পাস করেন ১৯৯২-তে। তিনি সরকারি (ব্যাংক এ) চাকুরি ত্যাগ করে অধ্যাপনা পেশা গ্রহণ করেন ও মিরসরাই কলেজে যোগদান করেন।

অধ্যাপক শিমুল বড়ুয়া মফঃস্বল কলেজে চাকুরি করলেও তাঁর গবেষণাগত মন তাঁকে কুয়োর ব্যাঙ করে রাখেনি। তাঁর কোন গ্রন্থ প্রকাশের আগেই তিনি দিল্লী, বিশ্বভারতী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধগয়ায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল বুড্ডিস্ট ব্রাদারহুড এসোসিয়েশন-টোকিও (জাপান), পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, নিখিল ভারত বাঙালি বৌদ্ধ সংগঠন (কলকাতা), চাটগাঁ ভাষা পরিষদ ইত্যাদি আয়োজিত সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বিদ্বৎজনের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি’র বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষা প্রকল্পের অধীনে গবেষক হিসেবে চাটগাঁর প্রবাদ-প্রবচন সংগ্রহের কাজ এবং উপজেলাভিত্তিক সাংস্কৃতিক সমীক্ষার কাজ সফলতার সহিত সম্পন্ন করেন। গত ৩১ ডিসেম্বর’১২ কলকাতাস্থ শতাব্দী প্রাচীন সংগঠন বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা আয়োজিত ২য় ‘ড. বি এম বড়ুয়া স্মারক বক্তৃতা’ প্রদান করেন। বৌদ্ধদের হারানো অতীত পুনরুদ্ধার, ঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়ন ও সমকালে বৌদ্ধ সমাজে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি অনেক প্রবন্ধ রচনা করেন। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র মিলনায়তনে অনোমা সংস্কৃতিক গোষ্ঠীর এক সেমিনারে উপস্থাপিত (২৪ অক্টোবর ২০১২) প্রবন্ধ ‘প্রবারণা পূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দানোৎসব উদযাপন: যুগের প্রেক্ষিতে করণীয়’ তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। তিনি প্রথম গ্রন্থ (মৌলিক) ‘বাংলার বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’ (২০১২) প্রকাশের পূর্বে একাধিক গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। যথা : অনোমা রজতজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ (২০০৮), কবিয়াল ফণী বড়ুয়া স্মারকগ্রন্থ (২০১০), ছড়াসাহিত্যিক সুকুমার বড়ুয়া সম্মাননাগ্রন্থ (২০১১), ‘করুণাঘন, ধরণীতল কর’ কলঙ্কশূন্য’ (কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবর্ষ স্মারক, ২০১১) এবং চাটগাঁ ভাষার রূপ-পরিচয় (যৌথ,২০১২) ইত্যাদি। বাংলার বৌদ্ধ ইতিহাস নিয়ে তাঁর আলোচ্য গ্রন্থটি নানা কারণে উল্লেখ্য এবং এ গ্রন্থে বৌদ্ধদের একটি সম্যক অবস্থান-চিত্র লক্ষ্য করা যায়। গ্রন্থটির অন্তর্ভুক্ত বিষয় উল্লেখ করে কয়েকটি মন্তব্য সংযোজনই এই আলোচনার উদ্দেশ্য।

(রাজ-) প্রশাসন-বৈরিতা ও ধর্মীয় বিরূপতা চরমরূপ নিলে সেই বৈরী পরিবেশ থেকে দূরযায়ী হয়ে ওঠে বিশেষত বঙ্গীয় বৌদ্ধরা। কেউ গেল উত্তরে, কেউ গেল দক্ষিণে। সাধারণের ধারণা এবং আলোচ্য গ্রন্থের মুখবন্ধ লেখক আবুল মোমেনের ভাষায়ও তাঁর সাক্ষে দেখা যায়, ‘বৌদ্ধ সভ্যতা ও সমাজ চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন [হলে] বরেন্দ্র কিংবা গাঙ্গেয় বদ্বীপসহ বঙ্গের সুগম কোন অঞ্চলেই টিকতে পারেনি বৌদ্ধ সম্প্রদায়। টিকে থাকলো অপেক্ষাকৃত দুর্গম অঞ্চলে।’ সেই অঞ্চল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, পার্বত্য ত্রিপুরা প্রভৃতি। বৌদ্ধ অধ্যুষিত সেই সব অঞ্চলের বৌদ্ধ সংস্কৃতি, জীবনাচার ও অতীত বা প্রত্নতথ্য নিয়ে অধ্যাপক শিমুল বড়ুয়া যে গ্রন্থটি রচনা করেন এরই মুখবন্ধের কথা এখানে উদ্ধৃত হয়েছে। গ্রন্থটি বৌদ্ধ সংস্কৃতির নানা পরিচয়-সন্ধানী ২৩টি গভীর অনুসন্ধানমূলক প্রবন্ধের একটি ঋদ্ধ সংকলন এবং তার শিরোনামও রেখেছেন লেখক ‘বাংলার বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।’ তারই মুখবন্ধ লিখেছেন দুজন নবীন ও প্রবীণ বোদ্ধা- কবি সাংবাদিক প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন এবং কলকাতাস্থ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের গুরু নানক অধ্যাপক, নবতি বর্ষীয়ান ইতিহাসবিদ ড. অমলেন্দু দে। প্রথম মুখবন্ধকার যথার্থই লেখেন, ‘এ বইয়ের সবকটি লেখাতেই এই তরুণ অধ্যাপকের স্বধর্মের ও নিজ সম্প্রদায়ের কল্যাণচিন্তা ফুটে ওঠে। বৌদ্ধদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথা যেমন তিনি তুলে ধরেছেন, তেমনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনায় বৌদ্ধদের অংশগ্রহণের কথা বলেছেন।’ সেই সাথে গ্রন্থকারের মানসিকতার কথাটিও উল্লেখ করে সত্যটি ধরিয়ে দিয়েছেন এভাবে, ‘বাস্তবে তাঁর সম্প্রদায়ের যে সব সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা রয়েছে সে সম্পর্কে শিমুল বেশ সচেতন। তাই নানা প্রসঙ্গেই বৌদ্ধদের করণীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।’ এবং আলোচনা শেষে পুনরুক্তি করে আবারও বলেন, ‘বৌদ্ধ গৌরব গাথা তুলে ধরার পাশাপাশি দুর্বলতা ও করণীয় সম্পর্কে বলতে ভোলেন নি [লেখক]।’ অপর মুখবন্ধকারও গ্রন্থটিকে যথার্থ আকর গ্রন্থরূপে উল্লেখ করেছেন। লেখকের বিশ্লেষণ ও বিষয় নির্বাচন এবং তথ্য ও সূত্র ব্যবহারে যে পাঠ অভিজ্ঞতা ও শৃঙ্খলা ফুটে উঠেছে, তার উল্লেখ করেই তিনি এ মন্তব্য করেছেন।

গ্রন্থটির বিষয় যথেষ্ট ব্যাপক। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এগুলি প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রবন্ধটি (প্রথম প্রকাশিত) রচনার একটা ইতিহাসও আছে। মাস্টারদা সূর্য সেনের জন্মশতবর্ষে এটি লিখিত হয়। প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহে বৌদ্ধ বিপ্লবীরা’ (অনোমা, ১৯৯৪)। লেখক উল্লেখ করেন, ‘আমাদের প্রবহমান বৃহৎ সমাজ-সংস্কৃতিতে এ বৌদ্ধ সমাজ-সংস্কৃতির অবস্থান, বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য, রীতি-নীতি নিয়ে যৎসামান্য ধারণা বা বক্তব্য ধারণ করে বিভিন্ন সময়ে রচিত প্রবন্ধ সমন্বয়ে গ্রথিত হলো বর্তমান গ্রন্থ ‘বাংলার বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।” কয়েকটি লেখা দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন সেমিনারে বা সম্মেলনে পঠিত রূপের সংস্করণ এবং ইতোপূর্বে কয়েকটি সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও মূলত এটিই তাঁর প্রথম গ্রন্থ। গ্রন্থটি অনোমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’র উদ্যোগে অক্টোবর ২০১২তে প্রকাশিত হয়।

বৌদ্ধ সমাজে লেখালেখির অভ্যাসটা আগে খুব প্রবল ছিল বলে মনে হয় না। ‘অনোমা’ প্রকাশিত হলে (১৯৭৭) এবং অনোমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী (১৯৮২) (অরুণ বিকাশ বড়ুয়া, জগত জ্যোতি বড়ুয়া, এডভোকেট প্রেমাঙ্কুর বড়ুয়া, অধ্যাপক বাদল বরণ বড়ুয়া প্রমুখের হাতে) প্রতিষ্ঠিত হলে এক ঝাঁক মনীষা ও তারুণ্যদীপ্ত লেখক ও সংস্কৃতি কর্মীর আবির্ভাব ঘটে। শিমুল বড়ুয়া তাদের নাম অন্য সম্প্রদায়ের অনুরাগী সহযোগীদেরসহ তাঁর ‘প্রসঙ্গ কথা’য় উল্লেখ করেন। সেখানে বৌদ্ধকর্মী ও লেখকের মধ্যে রয়েছেন সুনীল কুমার বড়ুয়া, এডভোকেট দীপক কুমার বড়ুয়া, রায় মোহন বড়ুয়া, তুষার কান্তি বড়ুয়া, সুভাষ চন্দ্র রাজবংশী, আশীষ কুমার বড়ুয়া, সুজন কুমার বড়ুয়া, জ্যোতিষ বড়ুয়া, অধ্যাপক শ্যামল বড়ুয়া, বিপ্লব বড়ুয়া, সাংবাদিক ডি পি বড়ুয়া, ড. প্রণব কুমার বড়ুয়া, প্রীতিভূষণ বড়ুয়া, প্রফেসর ডাঃ প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া, অধ্যাপক অরূপ বড়ুয়া, এবং এদের পেছনে রইলেন লায়ন রূপম কিশোর বড়ুয়া, প্রকৌশলী সুভাস বড়ুয়া প্রমুখ।

গ্রন্থটির মধ্যে লেখক যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন তার একটি সংক্ষিপ্ত বিষয় পরিচয় (প্রবন্ধভিত্তিক) দেওয়া যেতে পারে। এতে গ্রন্থ সম্পর্কে পাঠকের ধারণা স্পষ্ট হবে। তা হল- প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধ শাসন, বরেন্দ্রভূমির সভ্যতা, সমতটের বৌদ্ধ সভ্যতা, প্রাচীন বৌদ্ধ শিল্পকলা, অশোকের অনুশাসন, বাংলাদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী, চট্টগ্রামের বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান-নিদর্শন, বৌদ্ধ উৎসব, বৌদ্ধ মেলা, বৌদ্ধকীর্তন ও কীর্তনীয়া, চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহে বৌদ্ধ বিপ্লবীরা, মুক্তিযুদ্ধে বৌদ্ধ সমাজ, ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় বৌদ্ধ সমাজের নবজাগরণ, ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার সমাজোন্নয়নের দিক নির্দেশনা, বৌদ্ধ পত্র পত্রিকা, ‘জগজ্জ্যোতি’ পত্রিকা প্রসঙ্গ, বৌদ্ধ সাময়িকী নিয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবনা, বাংলাদেশের বৌদ্ধ সংগঠন, বৌদ্ধ আইন প্রণয়ন, বাঙালি বৌদ্ধদের শিল্প উদ্যোগ, বৌদ্ধযুগের চিকিৎসা ব্যবস্থা, বুদ্ধের অর্থনৈতিক চিন্তা এবং পরিবেশ চিন্তায় ‘সবুজ বৌদ্ধধর্ম’-এর ধারণা।

অমলেন্দু দে তাঁর ‘মুখবন্ধে’ প্রবন্ধগুলোর একটি চুম্বক ধারণা দিয়েছেন এভাবে। তিনি বলেন, ‘তেইশটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই গ্রন্থটি পাঠ করলে বৌদ্ধধর্ম, তার ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব, বৌদ্ধদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং তার অবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা করা যায়। বাংলাদেশের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে লেখক চারটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করেছেন: (ক) সমতলীয় বাঙালি বৌদ্ধ,( বড়ুয়া) (খ) পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী বা উপজাতীয় বৌদ্ধ, (গ) সমতলীয় রাখাইন বৌদ্ধ এবং (ঘ) উত্তর বঙ্গের ওঁরাও আদিবাসী বৌদ্ধ।’ অধ্যাপক অমলেন্দু দে বৌদ্ধ জনবসতির পরিচয় প্রদান ক্ষেত্রে তার শ্রেণীগত ও স্থানগত অবস্থানও নির্দেশ করেছেন এই চতুর্বর্গীয় বিভাজনের ভিত্তিতে। যথা : ‘বাংলাদেশের কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী এবং কুমিল্লা জেলায় সমতলীয় বাঙালি বৌদ্ধরা বাস করেন। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিনটি পার্বত্য জেলা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত হয়েছে। এই তিনটি পার্বত্য জেলায় দশ ভাষাভাষী ১৩ জুম্মজাতি বাস করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী বা উপজাতীয় বৌদ্ধরা এখানেই বাস করেন। সমতল রাখাইন বৌদ্ধরা বাংলাদেশের সমতল ভূমি বৃহত্তর চট্টগ্রামের কক্সবাজার, মহেশখালী, রামু, চকোরিয়া, টেকনাফ, হারবাং, হ্নীলা, চৌফলদন্ডী, বাজালিয়া, মানিকপুর এবং পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার আমতলী, বরগুনা, গলাচিপা, কলাপাড়া ইত্যাদি উপজেলায় বসবাস করেন। তাঁরা মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীভুক্ত থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের সমর্থক। উত্তর বঙ্গের ওঁরাও আদিবাসী বৌদ্ধরা দিনাজপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, জয়পুরহাট, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, পঞ্চগড়, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, সিলেটের হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে বাস করেন। এইভাবে লেখক বাংলাদেশে বসবাসকারী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর এক সামগ্রীকরূপ এই গ্রন্থে তুলে ধরেছেন।’

শুধু জনবসতির প্রসঙ্গই নয়, তাদের জনজীবন সম্পর্কেও চৈনিক পরিব্রাজক-সহ অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত (মিলিন্দ পঞ্চহো, শিলালিপি, তাম্রলিপি) তথ্য এবং পরবর্তী ঐতিহাসিকগণের গবেষণাকে সামনে এনে তৎবিষয়ে লেখক মতামত ব্যক্ত করেছেন। চট্টলবিদ আব্দুল হক চৌধুরীর মত উল্লেখ করে লেখক এই ধারণাটির প্রতিষ্ঠা করেন যে, সমতট, হরিকেল, পাট্টিকেরা ও আরাকান ও পঁগার-এর বৌদ্ধ শাসকদের একাক্রমে দীর্ঘকাল শাসন অব্যাহত থাকায় ‘বৌদ্ধধর্মের অতীত গৌরবের ক্ষীণ ধারাটি চট্টগ্রামে বজায় ছিল।’ অন্যান্য অঞ্চলে (উত্তরবঙ্গ) বৌদ্ধ বিতাড়ন ও বিহার বিলোপন ঘটে। রমেশচন্দ্র মজুমদার এই তত্ত্বের অন্যতম প্রবর্ত্তক। লেখক এই মতকেই গ্রহণ করেন। পাল আমলের শেষে ভ্রাতৃ কলহ, প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র, বিশাল সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশেষত বহিরাগতদের (কর্ণাটকী বা দক্ষিণী সেনাদলের) প্রভাবগত কারণে শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং লোকজ ভাষার উত্থান বিরোধী সংস্কৃত ভাষার স্বপক্ষীয়দের আক্রোশ (তথা কৌলীন্যবাদের প্রতিষ্ঠা) প্রভৃতির মধ্য দিয়ে বঙ্গ বা দেশীয় শিক্ষাকেন্দ্র (স্তুপ ও বিহার) সমূহ পালদের শক্তির উৎসরূপে চিহ্নিত হয় এবং আক্রমণের লক্ষ্য হয়। কিন্তু মুসলমানদের হাতে স্থানীয় সংস্কৃতি পুনঃপৃষ্ঠপোষকতা পায়। কিন্তু ততদিনে স্থানীয় শক্তি, প্রভাব ও ঐশ্বর্য (অর্থাৎ ‘শ্রেষ্ঠী’-দের ভূমিকা) হ্রাস পায় এবং প্রতিপত্তিহীন বৌদ্ধদের বা বৌদ্ধ প্রিয় সমাজেরও হাত ছাড়া হয় সেই শক্তির উৎস। কৌলীন্য প্রথার সূত্রে সমাজ নব রাজশক্তির করায়ত্ত হয় অতি সহজে। সমাজে এবং শাসন প্রকরণে পরিবর্তন ঘটে।

পাল আমলে পূর্ববঙ্গে (রামপাল থেকে সোনারগাঁ তথা সূবর্ণবীথি) বৌদ্ধধর্মের প্রসার কতখানি ছিল তারও পুনর্বিচার আবশ্যক। গোপাল নিজেও বৌদ্ধ ছিলেন কি না সন্দেহ। সেন কিংবা মুসলমানদের আক্রমণে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বিনাশ ঘটলেও পূর্ববঙ্গ অত তাড়াতাড়ি তার শিকার হয় নি। তা অনুমান করা যেতে পারে। অতএব বৌদ্ধ বিতাড়ন কারা ঘটিয়েছে বলাই যথেষ্ট নয়, কোথায় ঘটেছে সে প্রশ্নও বিচার্য। চট্টগ্রামের মত একটা অস্থির অঞ্চলে (ত্রিপুরা-আরাকান-মোগল এই ত্রিমুখী সংঘর্ষে) বৌদ্ধগণ অভিবাসিত হন নাকি পাল বা প্রাক-পাল আমলেরই জনবাসী ছিলেন সেটা হালন্ধরী পা, চাটিল পা, হাঁড়ি পা প্রভৃতির ইতিহাস পুনর্বিচার করে পুনর্গঠন করা উচিত। সেক্ষেত্রে ‘বিতাড়ন’ তত্ত্বটির ভিত্তি কতখানি শক্তিশালী তাও বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ‘বিতাড়নে’র সাথে সবৎমরহম বা সম্মিলন এবং একত্রীভবনরূপী প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও সম্পৃক্ত।)

লেখক অধ্যাপক শিমুল বড়ুয়া রাংকোট বা রাংকুট (রামকোট), ঝিয়রী প্রভৃতি স্থান ও বিহারের উল্লেখ করেছেন। (দ্রঃ চট্টগ্রামের বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্ব্‌িক স্থান-নিদর্শন: একটি সমীক্ষা)। কয়েকটি স্থানে প্রাক-হিন্দু ও বৌদ্ধদের কীর্তি পাশাপাশি অবস্থান করলেও হিন্দু (মন্দির প্রভৃতির) কার্যাবলীই প্রধান হয়ে আছে। এসব ক্ষেত্রে বৌদ্ধদের কীর্তির কথা ন্যূূন হওয়ার কারণ কি? লামা তারানাথ বা শরচ্চন্দ্র বা পরবর্তী গবেষকগণের অনুসন্ধানের মধ্যে মহেশখালী আদিনাথ মন্দির প্রভৃতির নামকরণ নিয়ে কোথাও কোনও ইঙ্গিত আছে কি না গবেষকগণ তা খুঁটিয়ে দেখতে পারেন। বৌদ্ধ সূত্র সন্ধানের উদ্দেশ্যে এসব স্থানের ইতিহাস নতুনভাবে সন্ধানের আবশ্যকতা আছে। যেমন রামায়ন কাহিনীর সূত্র সর্ব ভারতে ছড়িয়ে থাকলেও রামকোট, সীতাকোট, সীতাকুন্ড, বান্দরবান ও মহেশখালী প্রভৃতি স্থান ও দ্বীপ নামের পেছনে অবস্থিত কিংবদন্তীগুলোর নব বিশ্লেষণ হতেই পারে। যেখানে রামায়নেই ইঙ্গিত আছে যে বরেন্দ্রীতে রামের আগমনকালে বাল্মিকী লব ও কুশকে নিয়ে ভগীরথীর পূর্বপারে তপোবনে অবস্থান করছিলেন এবং বাল্মিকীর কাশ্মীরী সূত্র যখন শেষ পর্যন্ত টিকলোনা তখন ব্রহ্মপুত্র-বাহী পূর্ব দেশে বাল্মিকীর পরিচিতি অনুসন্ধানে দোষ কি? সেই রকম পরিপ্রেক্ষিতেই বৌদ্ধদের অবস্থান, প্রতিষ্ঠা ও বিলোপন প্রসঙ্গেও নতুন দৃষ্টির গবেষণায় হয়ত নতুন তথ্য হাতে আসতে পারে। ইতিহাস মানেই তো ঘটনাসূত্র ও প্রমাণপঞ্জি নির্ভর কোনও সত্যের পুনঃসন্ধান বা পুনর্গঠন। শিমুল বড়ুয়া পরিশ্রম সহকারে বহু তথ্য একত্র করেছেন এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করার সুযোগ করে দিয়েছেন। কেবল আলোচ্য প্রবন্ধটিতেই নয়, এইভাবে প্রতিটি আলোচনাতেই, যেখানে তিনি প্রত্নতত্ত্ব থেকে লোকসংস্কৃতি (বৌদ্ধ মেলা, বৌদ্ধ উৎসব, প্রাচীন বৌদ্ধ চিকিৎসা প্রসঙ্গ প্রভৃতি) নিয়ে বিচ্চারিত ও বিতৃত অনুসন্ধানের প্রয়াস পেয়েছেন, সেখানে বহু তথ্যেরই সমাবেশ ঘটেছে। তাতে বিশেষত চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের ইতিহাসের প্রাচীনত্ব ও অজ্ঞাতপূর্বতার বিষয়গুলো আমাদের চমকিত করবে, কিন্তু তারও অধিক এসব নিয়ে পরবর্তী অধ্যায় রচনারও সূচনা ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস।

অধ্যাপক অমলেন্দু দে’র কথার অনুরণনে বলতে পারি, এই আলোচনায় শুধু বৌদ্ধদের ইতিহাসকেই প্রসারিত করবে না, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটবে। সে ক্ষেত্র যে লাভের কথাটা অধ্যাপক দে ইঙ্গিত করেছেন সেটাও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর ভাষায় ‘বাংলাদেশে পরমত সহিষ্ণুতার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হবে, বিভিন্ন ধর্মের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রটি আরও প্রসারিত হবে, দেশের গঠনমূলক কাজে বৌদ্ধদের ভূমিকা বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগুতে যথেষ্ট সাহায্য করবে।’ আমরা ইতিহাসকে অন্ধের মত অনুসরণ করি, ইতিহাসে নিজেকে খুঁজি না। ইতিহাসই পারে মুক্ত চিন্তার দ্বার খুলে দিয়ে সামনের পথে আলো ছড়াতে। শিমুল বড়ুয়ার আলোচনা আমাদের সেই বোধে উদ্দীপ্ত করবে। এক নতুন আশার আলোয় তিনি আমাদের এগিয়ে যাওয়ার আহবান জানালেন। আবুল মোমেনের মুখবন্ধের শেষ বাক্যটিতেও সেই প্রত্যাশাই ব্যক্ত হয়েছে। শিমুল বড়ুয়ার ঋদ্ধ আলোচনা আমাদের সেখানেই উপনীত করে। আমাদের সমাজের লক্ষ্যহীন যাত্রা, আবুল মোমেনের ভাষায় ‘চিন্তার এই এলোমেলো অবস্থা’ - এসবকে দূর করতে না পারলে আমরা চলমান ও গতিশীল পৃথিবীর অংশভাগী হবো কি করে? শিমুল বড়ুয়া কেবল তথ্যই সঞ্চিত করেন নি, এগিয়ে যাবার এবং নিজের বোধের মুখোমুখি হবার সাহস ও শক্তি সঞ্চারেও সহায়তা করেছেন। এ গ্রন্থের অসামান্যতা তাই উভমুখী- আকরতা দানে এবং পুনঃখননী কর্মযজ্ঞের আ্রয়োজনে।

বাংলার বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি/শিমুল বড়ুয়া, প্রথম প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০১২, প্রকাশক: অনোমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, চট্টগ্রাম।

সৌজন্যেঃ মৃণাল কান্তিৃ বড়ুয়া 

 

Additional Info

  • Image: Image