২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৬ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
মঙ্গলবার, 27 মে 2014 01:26

নীলা : সাফল্যের অগ্রযাত্রায়

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

নীলা : সাফল্যের অগ্রযাত্রায়

নীলা রাখাইন। আদিবাসী একজন কিশোরী। দক্ষিন বঙ্গের দুর্গম সমুদ্র উপকুলে যার বসবাস। সেই রাখাইন মেয়েটির বয়সও খুব কম। তারপরও সে বাবা-মায়ের বোঝা না হয়ে পরিবারের জন্য এনেছে সম্মান। যে সম্মান বিত্ত দিয়ে ক্রয় করা যায় না। শুধুমাত্র মেধাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে আর বিরামহীন পরিশ্রম দিয়ে জয় করেছে সম্মান এবং অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। নীলা দেখিয়ে দিয়েছে নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোন কিছুকে পরোয়া না করে এগিয়ে যাওয়া যায়। নীলা ঘুণে ধরা সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে অদম্য চেষ্টায় নারীরাও ঘুরে দাড়াতে পারে। মাথা উঁচু করে নিজের মেধার সমন্বয়ে বিশ্বময় তাক লাগিয়ে দিতে পারে। সেটাই করেছে নীলা। ধুলাসার ইউনিয়নের বৌলতলী রাখাইন গ্রামের মেয়ে নীলা। ছোট্ট একটি চালাঘরে তাদের বসবাস।

বাবা একজন গ্রাম্য কবিরাজ। কবিরাজি করে দিনে ৩০-৪০ টাকা আয় করেন। মা নেয়সে তাঁতের কাপড় বোনার কাজ করেন। দুইজনের এই সামান্য আয় দিয়ে পরিবারের খরচ চালানো যেখানে দুঃসাধ্য ব্যাপার সেখানে দুই বোনের পড়ালেখার খরচ যোগানো আকাশ কুসুম কল্পনা করার সামিল। যেখানে নুন আনতে পান্থা ফুরোয় অবস্থা সেখানে নীলার পড়ালেখা করাটা ছিল অনেকটা দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার মতো। তবু নীলা দমেনি। চেষ্টা করেছে নিরন্তর। তার সেই চেষ্টার কারণেই আজ নীলার সফলতা এসেছে। নীলা একজন আদিবাসী শিক্ষার্থী। সে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ডালবুগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল। প্রতিদিন সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে ছয় মাইল দূরে বিদ্যালয়ে হেঁটে যেতো। আসা-যাওয়া হিসাবে ১২ মাইল হাঁটাহাটি। এ যুগে এরকম কষ্ট চিন্তা করা যায়? সারা দিন বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে বিকাল চারটায় বাড়ি ফিরে টিউশনি করতে যেতো। বাবার আর্থিক অসচ্ছলতার দরুণ নীলা টিউশনি করে পড়ালেখার খরচ চালিয়েছে।

বৈরী পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেও পড়ালেখার প্রতি অদম্য উৎসাহ তাকে এনে দিয়েছে সাফল্যের জয়মাল্য। নীলা ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে। নীলার বাবা ৬৪ বছর বয়সী বাচোঁ মং ডায়াবেটিস এর রোগী। কবিরাজী করে কোনরকমে এক বেলা খাবারের টাকা জোগাড় করেন। সরকার থেকে বয়ষ্ক ভাতা পান মাত্র ৩০০ টাকা। নীলাদের বসত বাড়িটির অবস্থাও খুবই বেহাল দশা। টিনের চালে অসংখ্য ছিদ্র যেন পরিহাস করছে তাদের দীর্ণতাকে। টিনের ছিদ্র দিয়ে যেমনি রোদের আলোর ঝলকানি দেখা দিচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে বর্ষার পানিতে আর তাদের চোখের জলে একাকার করে দেয়। রাখাইন এ অসহায়, গরীব পরিবারের দুঃখের যেন শেষ নেই।

নীলা যদিওবা এতকিছুর ধকল সয়ে এসএসসি-তে জিপিএ ৫ পেয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতে কীভাবে এত দুরবস্থা ঠেকিয়ে এগিয়ে যাবে সেই চিন্তায় পরিবারের সকলের চোখে হতাশার চিহ্ন। নীলা ষ্কুলে যেত কোনদিন খেয়ে কিংবা না খেয়ে। দুপুরে উপোষ করা ছিল নিত্য ব্যাপার। ষ্কুল থেকে ফিরে এসে কোনদিন কিছু হয়তোবা খেতে পারতো নয়তো না। এভাবেই দিনগুলি পার করেছে। নীলা পড়াত ৪/৫টা রাখাইন ছেলে মেয়েকে। পড়ানো বাবদ আয় হতো ৪০০-৫০০ টাকা। নীলার বড় বোন চান্দাও ছিল অদম্য মেধাবী একজন ছাত্রী। চান্দাও এসএসসি এবং এইচএসসি-তে জিপিএ ৫ পেয়েছিল। কিন্তু আর্থিক দৈন্যতার দরুণ চান্দাকে উচ্চশিক্ষায় অগ্রসর করতে না পেরে বাধ্য হয়ে বিয়ে দিয়ে ফেলেছেন। এখন নীলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আতংকিত নীলার বাবা-মা। কারণ আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নীলাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারবে তো? আজ নীলার জন্য প্রয়োজন সরকারী, বেসরকারী সহযোগীতা। একটুখানি সহযোগিতা পেলে নীলা আমাদের দেশের গর্বিত একজন চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বৈজ্ঞানিক হয়ে বিশ্বময় আলোকিত করতে পারবে। আনবে দেশের জন্য বিরাট সম্মান। আমরা চাই নীলার এই সাফল্যের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। যাতে তার নিরন্তর অধ্যবসায়, অদম্য প্রচেষ্টা বাংলাদেশের বুকে স্বর্ণালী অধ্যায় হয়ে থাকতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সে হয়ে উঠবে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

লেখক : কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক, ই মেইল - This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.
কৃতজ্ঞতাঃ অতীশ দীপঙ্কর

Additional Info

  • Image: Image