২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৭ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 15 মে 2014 00:06

অষ্টাঙ্গ উপোসথ শীল এবং অর্ধ-উপোসথ শীল পালনের সুফল বর্ণনা

লিখেছেনঃ প্রাঞ্জল বড়ুয়া

অষ্টাঙ্গ উপোসথ শীল এবং অর্ধ-উপোসথ শীল পালনের সুফল বর্ণনা

গতকাল শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপনের মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে নতুন একটি বুদ্ধবর্ষের। বিগত বুদ্ধবর্ষকে বিদায় দিয়ে পূর্ণিমার প্রভারশ্মি ছড়িয়ে সমগ্র বৌদ্ধবাসীকে আন্দোলিত করে গতকাল থেকেই ২৫৫৮ বুদ্ধবর্ষ গণনা শুরু হয়েছে। নতুন বুদ্ধবর্ষ সকলের জীবনে নিয়ে আসুক সৌভাগ্য, প্রশান্তি, সমৃদ্ধি এই শুভ প্রত্যাশা-প্রার্থনায় আশাকরি সকলে অষ্টাঙ্গ উপোসথ শীল তথা অষ্টশীল অনুশীলনের মধ্যদিয়ে শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা তথা ২৫৫৮ বুদ্ধবর্ষকে বরণ করে নিয়েছেন। এবং এটাই আমাদের কর্তব্য।

মিলিন্দ প্রশ্ন গ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে- “পতিট্ঠালক্খনং সীলং সব্বেসং কুসলানং ধম্মানং”। অর্থাৎ, সমস্ত কুশল ধর্মের প্রতিষ্ঠা বা ভিত্তির লক্ষণ হল শীল। যেমন, পৃথিবীরূপ মাটিকে কেন্দ্র করেই আমরা যাবতীয় কর্ম সম্পাদন করি। তেমনি শীলরূপ ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েই আমাদের যাবতীয় কুশল কর্ম সম্পাদন করা উচিত। এ অর্থে, আমাদের সমস্ত কুশল কর্মের ভিত্তি হল শীল পালন। গতকাল যেহেতু সরকারি ছুটির দিন তাই আশাকরি অনেকে পুরো দিবস উপোসথ শীল প্রতিপালন করেছেন; আর যাদের পুরো দিবস সম্ভব হয়নি তারা হয়ত অর্ধ-দিবস বা অর্ধ-উপোসথ প্রতিপালন করছেন। খুদ্দক পাঠের অর্থকথা “পরমার্থ জ্যোতিকায়” অষ্টাঙ্গ উপোসথ শীল তথঅ অষ্টশীল পালনের সুফল বর্ণনা করা হয়েছে। এবং সদ্ধর্ম্ম-রত্ন-চৈত্য গ্রন্থে ভদন্ত জিনবংশ মহাস্থবির অর্ধ-উপোসথে সুফল প্রাঞ্জলভাবে বর্ণনা করেছেন। শীল পালনে অনুপ্রেরণা এবং আপনাদের জানার সুবিধার্থে ড: বরসম্বোধি ভিক্ষু কর্তৃক লিখিত “বুদ্ধ বন্দনা ও সাধনা পদ্ধতি” গ্রন্থ হতে অষ্টশীল পালনের সুফল এবং অর্ধ-উপোসথের সুফল বর্ণিত একটি সংগৃহীত প্রবন্ধ হতে অর্ধ-উপোসথ পালনের সুফল সম্পর্কে নিম্নরূপে বর্ণনা করা হল :

অষ্টাঙ্গ উপোসথ শীল প্রতিপালনের সুফল বর্ণনা :

১) পাণাতিপাতা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি - প্রাণী হত্যা বিরতির দ্বারা অঙ্গ-প্রতঙ্গ সম্পন্ন, বেগবান, সুন্দর-সবল পদযুক্ত, সুশ্রী, মৃদু, মহাবল সম্পন্ন, মহতী পরিষদ সম্পন্ন, নির্ভীক মৃদুভাষী পরাক্রম বা অপরের আক্রমণ ব্যতিত মৃত্যু-বিহীন সুন্দর আকৃতি সম্পন্ন, নীরোগ, শোক বিহীন, লোকপ্রিয় ও প্রিয় বিয়োগহীন দীর্ঘায়ু হওয়া যায়।

২) অদিন্নাদানা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি - চুরি হতে বিরত থাকলে মহা ধনী, প্রভূত ভোগ সম্পদশালী, অলব্ধ সম্পত্তি লাভ, লব্দ সম্পত্তি রক্ষা, ইচ্ছিত সম্পত্তি শীঘ্র লাভ, রাজা, চোর, অগ্নি, জল, ও অপ্রিয় উত্তরাধিকারীর দ্বারা সম্পত্তি না হওয়া লোক শ্রেষ্ঠ, যে কোন বস্থুর অভাবিহীন ও নিরাপদে অবস্থান করা যায়।

৩) অব্রহ্মচরিযা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি - মিথ্যা কামাচার বিরত হলে শত্রু বিহীনতা, সর্বজন প্রিয়তা, অন্ন পানীয় বস্ত্র, ও শয়নাসন লাভ, সুখে শয়ন করা, সুখে জাগ্রত হওয়া, অপায় ভয় হতে বিমুক্তি, স্ত্রী ও নপুংসক জন্মরোধ, অক্রোধী, পরিপূর্ণ শারীরিক লক্ষণ যুক্ত ও সুখে অবস্থান হয়ে থাকে। অষ্টশীলের এই তিন নং শীল পালনকারীগণ মিথ্যা কামাচারের উর্দ্ধে। তারা এই শীল প্রতি পালনের মধ্যদিয়ে সাময়িক ব্রহ্মচর্য জীবন অনুশীলন করে থাকেন।

৪) মুসাবাদা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি - মিথ্যা বাক্য বিরতিশীল পালনের দ্বারা বিশুদ্ধ ইন্দ্রিয় সম্পন্ন, মিষ্টভাষী, সমান ও পরিশুদ্ধ দন্ত সম্পন্ন, সুবাধ্য পরিজন লাভ, কমল বা পদ্ম সদৃশ চক্ষু লাভ। অঙ্গ-প্রত্তঙ্গের পরিপূর্ণতা প্রভৃতি ফল লাভ হয়ে থাকে।

৫) সুরা-মেরেয মজ্জ পমাদট্ঠানা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি - নেশাপানে বিরত থাকার ফলে, অতীত, অনাগত এবং বর্তমান করনীয় কর্তব্য সম্বন্ধে শীঘ্র জ্ঞাত হওয়া, সর্বদা স্মৃতিমান, শান্ত-ধীর ও জ্ঞান পরায়ন, নিরালস্য, জড়তা বিহীন, অপ্রমত্তা, ঈর্ষা বিহীন, সত্যবাদিতা, সংযতেন্দ্রিয়তা, কৃতজ্ঞতা, দানশীলতা, আক্রোধিতা, লজ্জাশীলতা, সম্যক দৃষ্টি ও মেধাবীতা ইত্যাদি ফলের ভাগী হয়।

৬) বিকাল ভোজন বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি - নির্দিষ্টকাল অতিক্রম করে ভোজন করলে তা বিকাল ভোজন বলে গণ্য হয়। বিকালে ভোজন দ্বারা নানা প্রকার ক্লেশ উৎপন্ন হয়ে থাকে। এজন্য তা নিষিদ্ধ। তাছাড়া এতে আলস্য বৃদ্ধি পাওয়ার ধরুণ সাধনায়ও বিঘ্ন ঘটে।

৭) নচ্চ-গীত-বাদিত বিসূকদস্সন-মালাগন্ধ-বিলেপন-ধারণ-মণ্ডণ-বিভূষনট্ঠানা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি - কুশল উৎপাদনের হেতু ভেদ করে বলে নাচ-গান বিসুক বা বিপরীত দর্শন বলে কথিত হয়েছে। তা দর্শন করলে কুশলোৎপত্তির হেতু নষ্ট হয়ে থাকে। নাচ-গান দর্শন ও শ্রবণের জন্য উৎসাহিত হয়ে তথায় গেলে শীল লঙ্ঘন করা হয়। ধর্মীয় গানাদি শুনলে অকুশল হয় না। দুঃশীল চেতনায় পুষ্পমাল্য সুগন্ধি চূর্ণিত পেষিত লেপন ও নানা প্রকার অলঙ্কার ধারন উচিৎ নয়। অপরের সাজ-সজ্জা দেখলে শীল ভঙ্গ হয় না। সুগন্ধি প্রসাদন দ্রব্য ব্যবহার করলে কামরাগ উৎপন্ন হয়।

৮) উচ্চসযন-মহাসযন বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি - প্রমাণ অতিক্রান্ত আসন ও অক্লপিয় বা অযোগ্য আস্তরনাদি বিছানো আসনে শয়ন করা উচিৎ নয়। তাছাড়া উচ্চাসন এবং মহাসন সাধনায় অন্তরায় সৃষ্টি করে।

অর্ধ-উপোসথের শীল পালনের সুফল বর্ণনা :

হিমবন্ত প্রদেশ হতে ৫০০ তাপস কৌশাম্বিতে গমণ করছিলেন। পথশ্রমে বড় ক্লান্ত হয়ে তাঁরা বনের মধ্যে এক অতি বড় বট গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করতে করতে দলপতি বলল- “এই বৃক্ষের অধিপতি দেবতা খুব বড় দেবতা এবং ক্ষমতাশালী হতে পারেন। যদি তিনি ঋষিগণকে জলপান করতে দেন তবে বড় উপকার হয়”। দেবতা জল দিলেন। তাঁরা খুব পিপাসিত ছিল। জলপান করে বড় সুখী হল। জেষ্ঠ্য তাপস আবার ভাবল “যদি স্নানের জল দিতেন তবে সকলে স্নান করতাম।” দেবতা অনেক জল দিল। তাঁরা সকলে ইচ্ছামত স্নান করিল। তারপর জেষ্ঠ্য তাপস আহারের কথা চিন্তা করলেন। দেবতা নানা প্রকার সুস্বাদ অন্ন ব্যঞ্জন দিয়ে ৫০০ তাপসকে উদর পূর্ণ করে আহার করালেন। তারপর তাপসেরা ভাবল “ইনি আমাদের ইচ্ছামত সবই দিচ্ছেন। কিন্তু দর্শন দিলেন না। যদি দর্শন দিতেন দেখে নয়ন সার্থক করতাম”। দেবতা গাছ দোফাঁক করে দর্শন দিলেন। তাপসগণ দেবতাকে দেখে বলিল “হে দেব আপনার ঐশ্বর্যের সীমা নাই। কিরূপে আপনি এই সম্পত্তি প্রাপ্ত হলেন।”

দেবতা নিজের অতি অল্প পুণ্যের ‌‍ফল স্বরূপ এই সম্পত্তি পেয়েছি বলে লজ্জায় বলতে অনিচ্ছুক হয়ে বললেন- “আর্য্যগণ, সে কথা আর জিজ্ঞাসা করবেন না।” বার বার অনুরোধ করায় বললেন “আমি অনাথপিন্ডিক শ্রেষ্ঠীর ঘরে চাকর ছিলাম।” প্রাতে কাজে চলে যেতাম, সন্ধ্যার সময় ঘরে ফিরে আসতাম। একদিন উপোসথের দিনে ঘরে ফিরে দেখি খালি আমার জন্য ভাত বেড়ে রাখা হয়েছে। আর কেহ খেতে আসে নি। অপর দিন এমন সময়ে খাওয়ার জন্য হুরাহুরি পড়ে যায়। আজ একেবারে নিঃশব্দ। জিজ্ঞাসা করে জানলাম সকলে অষ্টশীল নিয়েছে। প্রাতে একবার মাত্র ভোজন করে উপোসথধারীগণ বিকালে কিছু খায় না। শ্রেষ্ঠীর বাড়ীর দাস-দাসী, চাকর-চাকরানী, এমন কি দুধের ছেলেও উপোসথ পালন করে, বিকালে কিছু খায় না। তা শুনে মনে বড় দুঃখ হল। আমার ন্যায় দরিদ্রের আর মুক্তি কোথায়?

এই শ্রেষ্ঠীর বাড়িতেও যদি একটু পূণ্যের সুযোগ না পাই তবে আর কোথায় পাব? আমি তাড়াতাড়ি শ্রেষ্ঠীর নিকট উপস্থিত হয়ে রাত্রে উপোসথ গ্রহণ করার সময় আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলাম। শ্রেষ্ঠী বললেন “প্রাতে উপোসথ গ্রহন করলে পূর্ণ উপোসথ হত, এখন গ্রহন করলে অর্ধ-উপোসথ হবে। “ততটুকুই আমার পক্ষে যথেষ্ট ভেবে” আমি উপোসথ গ্রহন করে অনাহারে অবস্থান করেছি। এবং শীল বিষয় ভাবনা করতে করতে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু সমস্ত দিন অনাহারে থাকায় শেষ রাত্রে ভয়ানক পেট কামরী হল এবং প্রাতঃকালে প্রাণ ত্যাগ করলাম। শ্রেষ্ঠীর অনুরোধ সত্ত্বেও আমি ঔষধ মাত্রও সেবন না করে শীল রক্ষা করলাম। এই সামান্য পূণ্যের ফলে আমি এই সম্পত্তি লাভ করেছি, যা আপনারা স্বচক্ষে দেখছেন। যদি একদিন উপোসথ করতাম তবে কত সুখ ও ঐশ্বর্যের অধিকারী হতাম জানি না। আর যারা সর্বদা উপোসথ রক্ষা করে তাহাদের সুখ ও ঐশ্বর্যের সীমা নাই।

সীলে পতিট্ঠায নরো সপঞ্ঞো, চিত্তং পঞ্ঞং চ ভাবযং, আতাপী নিপকো ভিক্খু, সো ইমং বিজটযে জটন্তি। মানবগণকে শীলরূপ ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে চিত্তকে সমাধি এবং প্রজ্ঞায় ভাবিত করতে হয়। যে সাধক সেভাবে প্রচেষ্টা করেন তিনিই লোভ-দ্বেষ-মোহের বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেন। অতএব, যাঁর শীল নেই, তাঁর সমাধি আসে না এবং যার সমাধি নেই তাঁর প্রজ্ঞা উৎপন্ন হয়না। এজন্য জাগতিক, আধ্যাত্মিক প্রকৃত সুখ শান্তির মার্গ আরোহণের প্রথম সোপান হল শীল।

২৫৫৮ বুদ্ধবর্ষের প্রথম দিন শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা আমরা যেভাবে উপোসথ শীল প্রতিপালন এবং দান, ভাবনানুশীলনসহ কুশল কর্ম সম্পাদন পূর্বক অতিবাহিত করেছি, সেভাবে নব এই বুদ্ধবর্ষের প্রতিটি পূর্ণিমায়ও উপোসথ শীল প্রতিপালনের মধ্যদিয়ে আমাদের শীল পারমীতার পূর্ণতা সাধন করব, এ প্রত্যাশায় মন স্থির করুন। সেই সাথে আপনার সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনদেরকেও পূণ্যকর্ম সম্পাদন সম্পৃক্ত করুন। শৈশব হতেই তাদেরকেও দান, শীল, ভাবনা এবং সর্ব প্রকার কুশল কর্ম সম্পাদনে উৎসাহিত করুন। বুদ্ধ পূর্ণিমার পূণ্যালোকে আলোকিত হোক ধরাময়। জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক। _/\_সাধু সাধু সাধু_/\_

লেখক : প্রাঞ্জল বড়ুয়া; এডমিন: স্বাধীন চিন্তা-চেতনা ও মানব কল্যাণে বৌদ্ধধর্ম।
ই-মেইল:: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. , ফেইসবুক: www.facebook.com/pranjol.barua

Additional Info

  • Image: Image