২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৪ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 06 সেপ্টেম্বর 2015 17:51

জয়মংগল অট্ঠগাথার বাংলা অনুবাদ ৪র্থ পর্ব

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

জয়মংগল অট্ঠগাথার বাংলা অনুবাদ ৪র্থ পর্ব

উকখিত্ত-খগ্গমতি-হত্থা-সুদারুনন্তং,
ধাবন্তি-যোজন-পথঙ্গুলি মালবন্তং।
ইদ্ধি ভিসংখতমনো জিতবা মুনিন্দো,
তন্তেজসা ভবতুতে জযমঙ্গলানি।

বুদ্ধকালীন সময়ে কোশল জনপদের রাজা ছিলেন প্রসেনজিৎ। তাঁর রাজপুরোহিতের নাম ছিল ভার্গব। পুরোহিতের পত্নীর নাম ছিল ব্রাক্ষ্মণী মন্তানী। চৌর নক্ষত্রে তাঁদের প্রথম পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। তার জন্মলগ্নে নগরীর শস্ত্রাগারে রক্ষিত অস্ত্রশস্ত্র হঠাৎ চমকে যায়। আপনা আপনি ওগুলো হতে থেমে থেমে বেশ কিছুকাল সংঘাতের ঝনঝনানি শব্দ শোনা যায়। একাধিক গণকের মাধ্যমে এর কারণ জানতে চাইলে সকলেই বলেন এই সন্তান একদিন ভয়ানক নরসংহার করবে। অঙ্গুলীমাল কোশল রাজ পুরোহিত ভার্গবের পুত্র ছিলেন। সন্তানের মংগল কামনায় তার নাম রাখা হয় অহিংসক। শুভ নামের প্রভাবে যাতে সন্তান কারো প্রতি হিংসাভাব পোষণ না করে। ক্রমান্বয়ে কাল কেটে যায়। মাতা-পিতা ও পাড়া প্রতিবেশীদের আদর যত্নে অহিংসক বড় হেত থাকে। তার আচরণে সকলেই গণকদের ভবিষ্যৎবাণী ভুলে যায়। তার জন্মের সময় অকল্যানকর লক্ষন প্রকাশ পাওয়ার ফলে পিতা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু কোশল রাজ তা জানতে পেরে শিশুকে রক্ষা করেছিল। ষোল বৎসর বয়সে তক্ষশীলার এক আচার্যের নিকট বিদ্যা শিক্ষার জন্য প্রেরন করা হল। অল্প সময়ের মধ্যে যুবক অহিংসক বিনম্র ও মেধাবী হওয়ার জন্য গুরু পত্নীর অত্যন্ত স্নেহ ভাজন হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে অন্যান্য ছাত্ররা ঈর্ষাপরায়ন হয়ে অহিংসকের বিরুদ্ধে বার বার অভিযোগ করেন যে, তিনি গুরুপত্নীর প্রতি প্রনয়াসক্ত। প্রথমে গুরু বিশ্বাস না করলেও পরবর্তীতে বিশ্বাস করে ক্রোধান্বিত হয়ে হিতাহিত চিন্তা না করে একদিন অহিংসকে ডেকে বললেন- অহিংসক, বৎস তোমার বিদ্যা শিক্ষা প্রায় সমাপ্ত হয়েছে, তুমি এখন গুরু দক্ষিনা দিয়ে চলে যেতে পার। গুরু দক্ষিণা স্বরুপ এক সহস্র মানুষ হত্যা করে প্রত্যেকের দক্ষিনা হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলি এনে আমাকে দিতে হবে। এরপরে অবশিষ্ট বিদ্যা তোমাকে শিক্ষা দান করব। অহিংসক মানুষ হত্যা শুনে ইতস্ততঃ করলে গুরু তাঁকে বাধ্য করলেন। অগত্য নিরুপায় হয়ে গুরুর আদেশ শিরো ধার্য করে কোশল রাজ্যের জালি বনে গিয়ে নর হত্যার নিজেকে নিয়োজিত করলেন। আট রাস্তার কেন্দ্র স্থল ছিল এই জালি বন। তাই এখানে প্রথমে লোকের কোন অভাব ছিল না। ক্রমে বহু লোক হত্যা করে দক্ষিন হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলির মালা গলায় পড়তেন বলে তার নাম হয় অঙ্গুলিমাল। হত্যার কথা জানা-জানি হওয়ার পর ঐ বনে লোকের গমনাগমন কমে যায়। এ সংবাদটি কোশল রাজ প্রসেনজিতের কাছে পৌঁছল এবং সেনাপতিকে সৈন্য প্রস্তুত করতে নির্দ্দেশনা দিলেন। এ খবর শুনে অঙ্গুলিমালেরে মা বের হলেন তাঁর পুত্রকে রক্ষা করতে।

সেদিন বুদ্ধ সমাপত্তি ধ্যানে বসে দেখলেন অঙ্গুলিমালের পূর্ব জন্মার্জিত কর্মফল খুব ভাল। সে মুক্তি কামনায় অতীত জীবনে পারমিতা সমূহ পুরন করেছে। এক মাত্র সম্পর্ক দোষে এ বিজন অরন্যে আজ নৃশংস মানুষ হত্যা যজ্ঞে আত্মনিয়োগ করেছে। তাঁর উদ্দেশ্য গুরু দক্ষিনা, আজ যদি সে মাতৃ হত্যা করে গুরু দেবের অভিলাষ পূর্ন করে তার এ জীবনে মুক্তি লাভের আশা সুদুর পরাহত। এ কর্মের প্রভাবে সে নরকগামী হবে। সে কারণে করুনা সাগর বুদ্ধ অঙ্গুলি মালের উদ্ধার মানসে জালি বনে যাত্রা করলেন।

অঙ্গুলিমাল দুর হতে তাঁর মাকে দেখতে পেয়ে উন্মুক্ত তরবারি হস্তে হত্যার জন্য ছুটলেন। হঠাৎ বুদ্ধ মাতা- পুত্রের মাঝখানে উপস্থিত হন। বুদ্ধকে দেখে খুশী হয়ে হত্যার মানসে ছুটলেন। কিন্তু কিছুতেই বুদ্ধকে না পেয়ে দুস্য অঙ্গুলিমাল দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন- দাড়াও সন্ন্যাসী। তখন বুদ্ধ বললেন- আমি দাঁড়িয়ে আছি, তুমি বরং দাঁড়াও। বুদ্ধের কথায় বিস্মিত হয়ে অহিংসক মনে মনে চিন্তা করলেন- সন্ন্যাসী চলতে চলতে বলছেন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। আর আমি দাঁডিয়ে থাকা সত্ত্বে আমাকে দাঁড়াতে বলতেছেন, এর অর্থ কি? জগত পূজ্য বুদ্ধের স্নেহ পূর্নবাক্যে বিগলিত অন্তরে তিনি বুদ্ধের কথায় তাৎপর্য জানতে চাইলেন- তখন বুদ্ধ বললেন আমি সকল প্রাণীর প্রতি হিংসাহীন ও মৈত্রী ভাবাপন্ন হয়ে শান্ত হয়েছি। আর তুমি মানুষের প্রতি হিংসা ও অমৈত্রী পোষন করে অস্থির হয়েছো। তাই তোমার দাড়ানো প্রয়োজন রয়েছে। বুদ্ধের এই মধুর উপদেশ অহিংসকের অন্তরে জ্ঞানের উদয় হল। অতঃপর তিনি তরবারী ফেলে দিয়ে নতজানু হয়ে বুদ্ধকে বন্দনা করে প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করলেন। বুদ্ধ তাকে প্রব্রজ্যা দান করে জেতবনে নিয়ে গেলেন।

এ দিকে কোশল রাজ প্রসেনজিত সসৈন্য অঙ্গুলিমাল কে দমন করতে বনে যাওয়ার আগে বুদ্ধের পরামর্শের জন্য জেতবন বিহারে উপস্থিত হন। শাস্তা রাজার যুদ্ধ যাত্রার সাজসজ্জ্বা দেখে বললেন- মহারাজ অঙ্গুলিমাল যদি দুস্য বৃত্তি ছেড়ে ভিক্ষু হন, তাহলে তাকে কিরুপ ব্যবহার দেখাবেন। প্রত্যুত্তুরে রাজা বললেন- ভিক্ষু হলে আমি তাঁর প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করবো। বুদ্ধের আদেশে ভিক্ষু অহিংসকে রাজার সম্মুখে আনা হল। তাকে বন্দনা করতঃ তাঁর মনি খচিত কটিবন্ধ উপহার দিতে চাইলে তা গ্রহন করেননি। অঙ্গুলিমালার মত দস্যুকে ত্যাগ করে সর্ব ত্যাগী ভিক্ষুত্বে পরিনত করায় বুদ্ধের গুন কীর্তন করে বন্দনা পূর্বক সসৈন্য প্রাসাদে গমন করলেন। অঙ্গুলিমালও কিছুদিনের মধ্যে শীল, সমাধি, প্রজ্ঞায় পরিপূর্নতা লাভ করে অর্হত্ব লাভে সক্ষম হন।
একদিন অংগুলিমাল ভিক্ষু বুদ্ধের অনুগামী হয়ে শ্রাবস্তীর কোথা ও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে শুনতে পান একটি কুটিএর একজন গর্ভবতী নারী প্রসব বেদনায় করুণ স্বরে আর্তনাদ করছে। এতে অংগুলিমালের হৃদয় ব্যথিত হয়। তিনি বুদ্ধের কাছে ফিরে এসে বিষয়টি জানান। বুদ্ধ তখন বললেন, তোমাকে সত্যক্রিয়া করতে হবে। কোন এক সত্য ঘটনাকে ভিত্তি করে অধিষ্ঠান করতে হবে।
অংগুলিমাল বললেন আমায় শিখিয়ে দিন। তখন বুদ্ধ বললেন—বুদ্ধের শরণাপন্ন হবার পর থেকে আমি একটি প্রাণীও হত্যা করি নাই। একথা যদি সত্য হয়ে থাকে তবে এ সত্যের প্রভাবে ঐ গর্ভবতী নারীর প্রসব-পীড়া অচিরেই দূর হোক।

তখন অংগুলিমাল বিলম্ব না করে ঐ গর্ভবতী নারীর কুটিরের পাশের একটি পাথরে বসে শাস্তার নির্দেশ মতে সত্যক্রিয়ার এইভাবে অধিষ্ঠান করেন ---- হে ভগিনী—বুদ্ধের শরণাপন্ন হবার পর থেকে আমি একটি প্রাণীও হত্যা করি নাই। একথা যদি সত্য হয়ে থাকে তবে এ সত্যের প্রভাবে ঐ গর্ভবতী নারীর প্রসব-পীড়া অচিরেই দূর হোক। অধিষ্ঠান শেষ করতে না করতেই ঐ গর্ভবতী নারীর প্রসব-পীড়া দূর হয়ে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন। একটি সত্য কথার এত মহান ফল হয় তা কি করে অবিশ্বাস করা যায়।

ঐ হতে অংগুলিমাল কৃত সত্যক্রিয়া বৌদ্ধ সাহিত্যে অংগুলিমাল পরিত্ত নামে খ্যাত।

সূত্র-জয়মংগল অট্ঠগাথা, ভিক্ষু সত্যপাল।

Additional Info

  • Image: Image