২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ইংরেজী
Sunny

28°C

Chittagong

Sunny

Humidity: 61%

Wind: 22.53 km/h

  • 21 Nov 2017

    Sunny 29°C 19°C

  • 22 Nov 2017

    Partly Cloudy 27°C 17°C

শনিবার, 12 এপ্রিল 2014 00:24

অভিধর্ম আড়ালেই থাকে

লিখেছেনঃ উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু

অভিধর্ম আড়ালেই থাকে

বৌদ্ধধর্মের প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ ত্রিপিটক তিনটি অংশে বিভক্ত। বিনয় পিটক, সুত্র পিটক এবং অভিধর্ম পিটক। বিনয় পিটকে ভিক্ষুসংঘের জীবন চলার প্রায় সব দিকনির্দেশনা সমূহ উল্লেখ থাকে বলে ভিক্ষুসংঘদের মধ্যে বিনয় পিটকের চর্চা হয় প্রতিনিয়তই। অন্যদিকে বুদ্ধ বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন প্রয়োজনে যে ধর্মালোচনা করেছেন তার সম্মিলিত সংগ্রহ হচ্ছে সুত্র পিটক। বুদ্ধের অগ্রশ্রাবক, মহাশ্রাবক, যেমন- সারিপুত্র, মৌদগল্যায়ন, আনন্দ, কচ্চায়ন ভান্তের কিছু কিছু ধর্মালোচনাও এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে তৎকালীন সময়ের কিছু ঘটনা। সুত্র পিটকে বিভিন্ন উপদেশাদি রয়েছে আর তাই বিভিন্ন ধর্মদেশনায় উপদেশ হিসেবে এই সুত্র পিটকেরই চর্চা হয়। এমনকি সংঘদান কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সুত্রাদি পাঠ হয়। আর অভিধর্ম অনেকটা আড়ালেই থাকে। কারণ অভিধর্ম অত্যধিক জ্ঞানচর্চা ব্যতীত অনুধাবন করা যায় না বলে অভিধর্মের ব্যবহার হয়না বললেই চলে। ত্রিপিটক অনুবাদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় বিনয় পিটক সম্পূর্ণ অনুবাদিত, সুত্র পিটক প্রায় সম্পূর্ণ অনুবাদিত হলেও অভিধর্মেরই বেশ কিছু বই এখনো বাংলায় অনুবাদিত হয়নি। অথচ তিনটি পিটক বা অংশের মধ্যে অভিধর্মই সবচেয়ে বড়। সুত্র ও বিনয়ে ৪২ হাজার ধর্মস্কন্ধ রয়েছে অন্যদিকে অভিধর্মেই রয়েছে আরো ৪২হাজার ধর্মস্কন্ধ। চলুন অভিধর্ম সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নিই।

অভিধর্ম বলতে বুঝায় ধর্মের অতিরিক্ত কিছু। অভি পূর্বক ধর্ম অর্থাৎ ধর্মের অতিরিক্ত বা অধিকতর ব্যাখ্যা। অভিধর্ম হচ্ছে অধিকতর বা বিশেষায়িত ধর্ম। এখানে ধর্ম কি সেটা জানতে গেলে প্রথমেই হয়তো অন্যান্য ধর্মের মত সৃষ্টিকর্তাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত মতবাদ সমূহের কথা চলে আসবে। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে ধর্মের বিশ্লেষণ সেরকম নয়। বৌদ্ধধর্মে অদৃশ্য কোন শক্তির স্থান নেই। স্বীয় কর্ম দ্বারা কীভাবে দুঃখের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তাই বৌদ্ধধর্ম নির্দেশ করে। অভিধর্ম হচ্ছে উচ্চতর বাণী যা কোন ব্যক্তিকে বিমুক্তির সোপানে পৌঁছিয়ে দিতে সক্ষম। সুত্ত পিটকে রয়েছে ব্যবহারিক দেশনা, বিনয় পিটকে সংঘের নিয়মাবলী বা আজ্ঞা দেশনা আর অভিধর্মে রয়েছে পারমার্থিক দেশনা।

বৌদ্ধধর্মে একটি মাত্র স্বাদ পাওয়া যায় আর তা হচ্ছে মুক্তির স্বাদ। অভিধর্মে মূলত এই মুক্তির স্বাদকেই চুড়ান্তভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সুত্ত পিটকে বুদ্ধ শ্রোতাদের উদ্দেশ্য করে আমি, তুমি, সে ইত্যাদি লৌকিক শব্দসমূহ ব্যবহার করলেও অভিধর্মে তার ব্যবহার হয়নি বললেই চলে। অনিত্য, দুঃখ, অনাত্মার সমন্বয়ে পারমার্থিক সত্যকেই এখানে বড় করে দেখানো হয়েছে। আগেই বলেছি, ত্রিপিটকের তিনটি ভাগের মধ্যে অভিধর্মই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সংগ্রহ। অভিধর্ম পিটককে সাত খন্ডে বিভক্ত করা হয়েছে- ধর্মসঙ্গনী, বিভঙ্গ, ধাতুকথা, পুগ্গলপঞ্ঞতি, কথাবত্থু, যমক, পট্ঠান।

অভিধর্মের আলোচনা হল- চিত্ত, চৈতসিক, রূপ ও নির্বাণ। অভিধর্মে ‘আমি’ শব্দটির বিস্তৃত ব্যাখ্যা এবং প্রকৃত শান্তির পথ নির্দেশ আছে। এই শান্তির পথে চলতে হলে নিজেকে অর্থাৎ এই আমাকে পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে। অশুদ্ধ ও অসৎ ব্যক্তির পক্ষে শান্তির পথ অন্বেষণ আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র। বৌদ্ধ নীতিতে পথ আছে এবং পথের পরিসমাপ্তিও আছে। নীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে কে পথে নামবে? ‘আমি’ নামক সংজ্ঞাটি। তাই আবার প্রশ্ন চলে আসে- আমি কে? অভিধর্ম মতে আমি হচ্ছে নাম ও রূপের সমন্বয়। নাম হল বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানের সমাহার। রূপ হচ্ছে- চার মহাভূত(পঠবী, আপ, বায়ু এবং তেজ এর গুণ) এবং এই চার মহাভূতোৎপন্ন ২৪ প্রকার রূপের সমাহার। নাম রূপকে আশ্রয় করে প্রবর্তিত হয় এবং রূপ নামের প্রবর্তনের মধ্যে প্রকাশ পায়। অনেকে এই নাম ও রুপকে অন্ধ ও খঞ্জের মিলনের চলনশক্তির সহিত সামঞ্জস্য খুঁজে থাকেন। বস্তুতঃ সংসারে এমন কোন বস্তুর কল্পনা করা যায় না যার নামও নেই, রূপও নেই। সুতরাং ইন্দ্রিয় নিচয় ও তাদের গ্রাহ্য বিষয় সমূহও এ নাম-রূপের অন্তর্ভূক্ত।

আরও একটু গভীর ভাবে আলোকপাত করলে দেখা যায় নামের বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান বিষয়ে আরো যা আছে তা হচ্ছে- চিত্ত ও চৈতসিক। বেদনা ও সংজ্ঞা সহ চৈতসিক ৫২ প্রকার। সংস্কারকে প্রতীত্যসমুৎপাদের নীতির হেতুতে নিবদ্ধ রেখে বিজ্ঞান নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যায় এটি চিত্ত ও মন প্রভৃতি শব্দের সমার্থক। বিজ্ঞান অর্থাৎ বিজানন বা বিশেষভাবে জানা। চিত্ত অর্থাৎ চিন্তন বা কোন বিষয়ে চিন্তার মধ্যে জানা। মন অর্থাৎ মনন বা মনের মধ্যে ধারণ বা বিশেষভাবে জেনে রাখা। তাই চিত্ত, বিজ্ঞান ও মন শব্দগতভাবে একই অর্থবোধক। বৌদ্ধধর্মে চিত্তকে সত্তে¡র অবস্থানের ভূমি বা লোক ভেদে ৮৯ প্রকারে এবং বিস্তারিতভাবে ১২১ প্রকারে বিভক্ত করা হয়েছে। চিত্তের উৎপত্তির সাথে সাথে উহার কতগুলি সহজাত চিত্তবৃত্তি চৈতসিক এক সাথে উৎপত্তি হয় এবং এক সাথে নিরোধ হয়। সুতরাং নাম-রূপের মধ্যে আমরা ৮৯ চিত্ত, ৫২ প্রকার চৈতসিক এবং রূপের সন্ধান পাই।

চিত্তের গতি অতি সুক্ষ্ণ, জটিল এবং অসীম। চিত্তোৎপত্তির সময় সময়ের পরিমাপে নির্ণয় করা যায় না। প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য উৎপন্ন হচ্ছে আবার নিরোধ হচ্ছে। চিত্তোৎপত্তি ও চিত্তনিরোধের সময় ১৭ ক্ষণ বলে অভিধর্মে বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে চিত্তের আলম্বন, বেদনা, হেতু, কৃত্য, দ্বার, ও বাস্তু প্রভৃতি বিষয়ের স্ব স্ব অবস্থানের সহিত চিত্তের সম্পর্ক আছে। চিত্ত পরিভ্রমণের পথকে চিত্তবীথি বলা হয়। চিত্তবীথির উৎপত্তিক্ষণ, স্থিতিক্ষণ এবং ভঙ্গক্ষণ আছে। প্রতিসন্ধি ও প্রবর্তনকালে চিত্তবীথিতে চিত্ত বীথিযুক্ত বা বীথিমুক্তও থাকতে পারে। তাই চিত্তকে সঠিক পথে পরিচালিত করার সম্যক দৃষ্টিও আছে। সম্যক দৃষ্টিকে সঅবস্থানে রেখে লক্ষ্যে পৌছাবার জন্য বৌদ্ধধর্মে ৩৭ প্রকার বোধিপক্ষীয় ধর্ম আছে। তাই এই ধর্ম হল দুঃখ মুক্তির পথ। বৌদ্ধধর্মে ইহাকে মধ্যম পথ বলা হয়। এই মধ্যম পথ হল আর্য-অষ্টাঙ্গিক-মার্গ। সংক্ষেপে আমরা শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা বলতে পারি। শীলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে প্রজ্ঞায় উৎকর্ষ সাধনের জন্য যে সাধনা তাহাই বিদর্শন। বিদর্শন ভাবনায় সুখের আকর নির্বাণ সাক্ষাৎ মেলে। চলুন নির্বাণের সাক্ষাৎ করার জন্য বিদর্শনচর্চা করি।

লেখকঃ উদীয়মান লেখক ও সমাজকর্মী

ই-মেইলঃ This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Additional Info

  • Image: Image