২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৮ মে ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 03 সেপ্টেম্বর 2015 04:08

জয়মংগল অট্ঠগাথার বাংলা অনুবাদ ৩য় পর্ব

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

জয়মংগল অট্ঠগাথার বাংলা অনুবাদ ৩য় পর্ব

নালাগিরিং গজবরং অতিমত্তভূতং,
দাবগ্গি-চক্কমসনীব সুদারুণন্তং।
মেত্তাম্বুসেক-বিধিনা জিতবা মুনিন্দো,
তন্তেজসা ভবতু তে জয়মংগলানি।

বুদ্ধের সময়কালীন মগধের রাজা অজাতশত্রুর হাতিশালায় সবচেয়ে হিংস্র বিশালকায় হাতি ছিল নালাগিরি। দেবদত্ত বুদ্ধের অবর্তমানে সংঘের ক্ষমতাসম্পন্ন একজন হবার মানসে রাজা অজাতশত্রুকে বশ করে বুদ্ধের জীবন নাশ করার জন্য একাধিক চক্রান্ত করেন। কোনটিতে সফল হতে পারেননি। এজন্য দেবদত্ত ধারণা করেন বুদ্ধের দিব্যশক্তির প্রভাব পশুর জীবন থেকে মুক্ত। এই চিন্তা করে দেবদত্ত পশুর মাধ্যমে বুদ্ধের জীবন নাশের পরিকল্পনা করেন। তিনি রাজা অজাতশত্রুর হাতিশালার সবচেয়ে চন্ড স্বভাবের হাতি নালাগিরি-কে বেছে নেন। নালাগিরির হিংস্রতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে রাজাজ্ঞায় তাকে প্রতিদিন যে পরিমাণ মদ খাওয়ানো হতো তার দ্বিগুণ মদ খাওয়ানো হলো। রাজ্যের মধ্যে ঘোষণা করা হলো আগামীকাল পূর্বাহ্নে নালাগিরি হাতিকে রাজপথে ছেড়ে দেয়া হবে, নাগরিকেরা কেউ যেন তাকে ধরার বা বাধা দেয়ার চেষ্টা না করে। বুদ্ধের অনুসারীগণ একথা বুদ্ধকে ও তাঁর ভিক্ষুসংঘকে জানান। তাঁরা বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষু সংঘকে আগামীকাল ভিক্ষান্নে বের না হবার জন্য অনুরোধ করে বলেন, আগামীকাল ভিক্ষু সংঘের জন্য অন্ন-পানীয় বিহারে পৌঁছে দেয়া হবে।

বুদ্ধ সকলকে বলেন ---দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। কারণ বুদ্ধগণের কখনো অকালমৃত্যু হয় না। পরদিন বুদ্ধ বিশাল ভিক্ষুসংঘ সহ রাজগৃহের জীবক আম্রবনের পাশ দিয়ে রাজপথ ধরে বেণুবন বিহারের দিকে এগিয়ে চলেন। অন্যদিকে মাহুতের দল নালাগিরিকে জোর করে অংকুশ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উত্তেজিত করে রাজপথে ছেড়ে দেয়। মদমত্ত নালাগিরির উম্মত্ততার খবর পেয়ে পথচারীরা প্রাণভয়ে রাজপথে চলা বন্ধ করে দেয়।

একদিকে মদমত্ত হাতি বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষু সংঘের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছিল। অন্যদিকে বুদ্ধ বিশাল শিষ্য সংঘ নিয়ে ধীরগতিতে মদমত্ত নালাগিরির দিকে এগিয়ে চলেছিলেন। আনন্দ বুদ্ধকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে বলার পর ও বুদ্ধ রাজপথ হতে সরে দাড়াননি। আনন্দকে সান্ত্বনা দিয়ে বুদ্ধ বলেন, বুদ্ধগণের কখনো অকালমৃত্যু হয় না। তুমি সরে যাও। যখন নালাগিরি ও বুদ্ধের দূরত্ব একেবারে কাছাকাছি চলে আসে তখন আনন্দ বুদ্ধের নির্দেশ না মেনে বুদ্ধের প্রাণ রক্ষার্থে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে হাতির সামনে এসে পড়েন। আনন্দের জীবন রক্ষার্থে বুদ্ধ ঋদ্ধিশক্তি প্রয়োগ করে বুদ্ধ পুনরায় এগিয়ে যান। এখন বুদ্ধ ও নালাগিরির মাঝে আর কেহ নেই। এমন সময় ক্রন্দনরত শিশু-কে কোলে নিয়ে একজন নারী হন্ত-দন্ত হয়ে বুদ্ধের সামনে এসে পড়েন। নালাগিরির দৃষ্টি তখন বুদ্ধের থেকে সরে গিয়ে শিশুর দিকে যায়। শিশুটিকে আছড়ে হত্যা করার উদ্দেশ্যে যেই নালাগিরি শুঁড় নীচু করেছে ঐ সময় বুদ্ধ তাঁর ডান হাত বরদ-মুদ্রায় বাড়িয়ে হাতির মাথা ষ্পর্শ করে তার প্রতি মহাকরুণাবশত মহামৈত্রীভাব প্রসার করেন। ভগবান বুদ্ধের মৈত্রী ভরা কোমল হাতের ছোঁয়া পেতেই নালাগিরির শরীর মন এক অদ্ভুদ রোমাঞ্চে রোমাঞ্চিত, হৃদয় পরিপূর্ণ প্রীতিতে প্রমোদিত হয়ে মদের নেশা যেন মুহুর্তেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। চন্ডাল স্বভাবের পরিবর্তে নালাগিরির মন যেন মৈত্রী-করুণা-মুদিতায় পরিবর্তিত হয়ে সুবিনীত শিশুর মতো হয়ে যায়। নালাগিরি সবাইকে অবাক করে দিয়ে মহাকারুণিক বুদ্ধের সামনে হাঁটু গেড়ে মাথা নুইয়ে শুঁড় সংকুচিত করে বুদ্ধের চরণে প্রীতিপূর্ণ হৃদয়ে নতশিরে প্রণাম করে। তখন নালাগিরির দুচোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ে। তথাগত বুদ্ধ নালাগিরির মংগলার্থে ধর্মোপদেশ দান করেন।

নালাগিরি বুদ্ধের সামনে নতজানু হয়ে বন্দনা করার ঘটনা শোনামাত্রই সকলেই ছুটে এসেছে একনজর দেখতে। এরকম বিষ্ময়কর ঘটনায় অনেকেই ভাবাবেগে হাত-গলার অলংকার খুলে নালাগিরির দিএক ছুঁড়ে দেয়। সেই থেকে নালাগিরি ধনপাল নামে সুপরিচিত হয়।
নালাগিরির স্বভাবের অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের কথায় তথাগত মহাকারুণিক বলেন, নালাগিরি এ জন্মে হাতি না হয়ে যদি মানুষ হতো তাহেল তাঁর (বুদ্ধের) উপদেশ শুনে আজ অবশ্যই স্রোতাপন্ন হয়ে আর্য-পুদগলে পরিণত হতো।
সূত্র-জয়মংগল অট্ঠগাথা, ভিক্ষু সত্যপাল।

Additional Info

  • Image: Image