২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 31 আগষ্ট 2015 16:53

জয়মংগল অট্ঠগাথার বাংলা অনুবাদ ২য় পর্ব

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

জয়মংগল অট্ঠগাথার বাংলা অনুবাদ ২য় পর্ব

মারাতিরেকমভিযুজ্ঝিত সব্বরত্তিং,
ঘোরম্পনালবক-মক্খ-মথদ্ধ-যক্খং।
খন্তি-সুদন্ত-বিধিনা জিতবা মুনিন্দো,
তন্তেজসা ভবতু তে জয়মংগলানি।

বুদ্ধের সময়কালীন শ্রাবস্তী ও কাশী জনপদের রাজধানী বারাণসী, আর শ্রাবস্তী ও মগধের রাজধানী রাজগৃহের মধ্যবর্তী এক জনপদের নাম ছিল আলবী। রাজার নাম ছিল আলবক। রাজপুত্রের নাম ছিল আলবক কুমার। ঐ জায়গায় বাস করত দুর্ধর্ষ ও পাষাণ হৃদয় সম্পন্ন আলবক যক্ষ। আলবক যক্ষ যক্ষরাজের কাছ থেকে বর লাভ করেছিল প্রতিদিন একটি প্রাণী বলি রূপে পাবার। সেই মতে যক্ষের বাসভবনের নিকটবর্তী অশ্বত্থবৃক্ষের নীচে যে আসবে তাকে যক্ষ খেতে পারবে। একদিন আলবীর রাজা শিকারে বের হয়ে ভুলক্রমে ঐ স্থানে আসলে আলবক যক্ষ রাজাকে আটকে রাখলেন। অগত্যা রাজা আলবক প্রতিদিন যক্ষের জন্য একজন নাগরিককে পাঠানোর শর্তে মুক্তি পেলেন। শর্ত মোতাবেক কিছুদিন অপরাধীদের পাঠানো হয়। একসময় ওখানে আর কোন অপরাধী বেঁচে রইল না। তাই রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন রাজ্যের প্রত্যেক গর্ভবতী নারী তার সন্তানকে যক্ষের নিকট বলিরূপে পাঠাবে। একথা শুনে গর্ভবতীরা চুপি চুপি অন্য রাজ্যে চলে যায়। এতে রাজার দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। অবশেষে কোন উপায় না দেখে রাজকুমারকে অলংকৃত করে যক্ষের কাছে নিয়ে যাবার প্রস্তুতি নেয়া হয়।

তখন মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ প্রতিদিনের নিয়ম মতো ধ্যানস্থ হয়ে দেখেন আজ কার উপকার সাধিত হবে? দেখা যায়, আলবক যক্ষের জন্য রাজকুমার আলবক-কে প্রেরণ এবং রাজার দুশ্চিন্তার বিষয় বুদ্ধের দিব্যদৃষ্টিতে ধরা পড়ে। রাজকুমার আলবক এর প্রাণ রক্ষার্থে বুদ্ধ শ্রাবস্তী হতে ত্রিশ যোজন দূরে আলবক যক্ষের বাসভবনে যান। সেইসময় যক্ষ হিমবন্ত প্রদেশে যক্ষ সভায় গিয়েছিলেন। বুদ্ধ আলবক যক্ষের বাসভবনের দ্বার-রক্ষীর নিকট যক্ষ ভবনে বিশ্রাম নেবার অনুমতি চাইলে দ্বার-রক্ষি অনুমতি না দিয়ে পারেননি। তবে আলবক যক্ষের চন্ডাল স্বভাবের কথা বলে সতর্ক করে দেন বুদ্ধকে। বুদ্ধ তখন যক্ষ ভবনের যক্ষ আসনে উপনীত হয়ে যক্ষের রক্ষিতা নারীদের উপদেশ দিচ্ছিলেন। এদিকে দ্বার-রক্ষী আলবক যক্ষের নিকট বুদ্ধের কথা জানান। ওখানে সাতগির ও হেমবন্ত নামে দুই যক্ষ ছিল। তারা বলেন আপনার বাসভবনে উপর দিয়ে আসার সময় আকাশ-মার্গে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কারণ জানার জন্য নীচে নামেন। যক্ষ ভবনে তারা সুগতকে ধর্মদেশনারত অবস্থায় দেখতে পান।

তিনজনের মুখে বুদ্ধের প্রশংসা শুনতেই আলবক যক্ষ প্রচন্ড রেগে গিয়ে ঐ যক্ষ সভা থেকেই শ্রমণ গৌতম বলে চিৎকার শুরু করেন। সেখান থেকেই যক্ষ বুদ্ধকে আসন চ্যুত করার জন্য তার আসুরিক শক্তি প্রয়োগ করেন। যক্ষের হুংকার সারা জম্বুদ্বীপে শোনা যাচ্ছিল। যক্ষ তার আয়ত্ত সব ঋদ্ধিশক্তিগুলি প্রয়োগ করেন। এভাবে বুদ্ধকে আসন চ্যুত করতে না পেরে যক্ষ তার শেষ অস্ত্র ‘দুস্সায়ুধ’ প্রয়োগ করেন। ‘দুস্সায়ুধ’ আকাশে ছোঁড়া হলে বার বছর বৃষ্টি হতো না, পৃথিবীতে ছোঁড়া হলে বার বছর গাছপালা শুকিয়ে যেত, সমুদ্রে ছোঁড়া হলে সমুদ্রের জল ও শুকিয়ে যেত, এমনকি সুমেরু পর্বতকে টুকরো টুকরো করার সামর্থ্য ছিল। এমন অস্ত্র বুদ্ধগুণের প্রভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এবার যক্ষ বুদ্ধকে যক্ষের বাসভবনের বাইরে আসার জন্য বলেন। যক্ষ-শ্রমণ, বাইরে বেরিয়ে পড়।

বুদ্ধ-‘বেশ আয়ুষ্মান’। এ কথা বলে বুদ্ধ বাসভবনের বাইরে বেরিয়ে আসেন। এভাবে তিনবার করার পর বুদ্ধ বলেন, আমি আর তোমার নিকট যাব না। তোমার যা ইচ্ছে করো।
তখন যক্ষ বললেন, তোমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করব। সঠিক উত্তর দিতে না পারলে তোমার হৃদয় বিদীর্ণ করবো নতুবা পা দুটো বেঁধে গংগার ওপারে ছুঁড়ে ফেলবো।

বুদ্ধ বললেন, জগতে এমন কাউকে আমি দেখছি না যে আমার হৃদয় বিদীর্ণ করতে পারবে বা পা দুটো বেঁধে গংগার ওপারে ছুঁড়ে ফেলতে পারবে। যা জানতে চাও জিজ্ঞেস করো।
১। জগতে পুরুষের শ্রেষ্ঠ ধন কি? কি সংরক্ষিত হলে সুখদায়ক হয়? রসসমূহের মধ্যে সর্বাধিক রসদায়ক কি? কিভাবে জীবন-যাপন করলে তা শ্রেষ্ঠ জীবন কথিত হয়?

বুদ্ধ - শ্রদ্ধাই পুরুষের শ্রেষ্ঠ ধন। ধর্ম সুগৃহীত হলে সুখদায়ক হয়? সত্য সর্বাধিক রসদায়ক। প্রজ্ঞাবান পুরুষের জীবন-যাপন করলে শ্রেষ্ঠ জীবন কথিত হয়।
২। কোন উপায়ে বন্যার জল অতিক্রম করা যায়? সাগর উত্তীর্ণ হওয়া যায়? দুঃখ জয় করা যায়? শুঁচিতা লাভ করা যায়?

বুদ্ধ - শ্রদ্ধার মাধ্যমে বন্যার জল অতিক্রম করা যায়। অপ্রমাদের দ্বারা সাগর উত্তীর্ণ হওয়া যায়। বীর্যের দ্বারা দুঃখ জয় করা যায়। প্রজ্ঞার মাধ্যমে শুঁচিতা লাভ করা যায়।
৩। কোন উপায়ে প্রজ্ঞা লাভ করা যায়? কোন উপায়ে ধন সঞ্চিত হয়? কোন উপায়ে কীর্তি লাভ করা যায়? কোন উপায়ে মিত্র লাভ করা যায়? কোন উপায়ে পরলোকের দুঃখ লাঘব করা যায়?
বুদ্ধ –নির্বাণগামী শ্রেষ্ঠ মার্গে (ধর্ম) শ্রদ্ধাবান, অপ্রমত্ত ও বিচক্ষণ হয়ে এবং ধর্মশ্রবণে আগ্রহী হয়ে প্রজ্ঞা লাভ করা যায়।

প্রতিরূপকারী, ধুরবান ও উদ্যমশীল ব্যক্তি ধন লাভ করেন। সত্য আচরণের মাধ্যমে যশ-কীর্তি লাভ করা যায়। দানশীলতার মাধ্যমে মিত্র লাভ করা যায়।
সত্য, ধর্ম, ধৃতি ও ত্যাগ এ চার প্রকার গুণের অধিকারী ব্যক্তি পরলোকের দুঃখ লাভ করেন না।

সব শুনে আলবক যক্ষ বললেন আজ আমি জানলাম ভবিষ্যতের জন্য মংগলদায়ক কি? আমার মংগলের জন্য তথাগত মহাকারুণিক এখানে এসেছেন। ধর্মোপদেশ শ্রবণের পর আলবক যক্ষ স্রোতাপন্ন হন। আলবক যক্ষ মহানন্দে ও সকৃতজ্ঞ চিত্তে সাধুবাদ দেন। আর বলেন, আমৃত্যু বুদ্ধের, ধর্মের প্রচারের প্রসারের জন্য গ্রামে-নগরে সানন্দে বিচরণ করব।
এদিকে রাজপুত্র আলবককে যক্ষের কাছে বলিরূপে তুলে দেয়ার জন্য রাজার প্রতিনিধিগণ নিয়ে আসেন। স্রোতাপন্ন আলবক যক্ষ লজ্জাবোধ করেন। কারণ প্রাণের বিনিময়েও প্রাণ হত্যাজনিত শীল লংঘনের মানসিকতা তার অন্তর হতে সমূলে বিনষ্ট হয়েছে। আলবক যক্ষ রাজকুমারকে বুদ্ধের হাতে তুলে দেন। বুদ্ধ রাজকুমারকে আশীর্বাদ করেন।
আলবক যক্ষ বুদ্ধের শিষ্য হয়েছেন শুনে নগরবাসী আনন্দিত ও আশ্বস্ত হলেন।
বুদ্ধ যে ক্ষান্তি ও পারমিতার গুণে যক্ষকে দমন করেছিলেন ঐ সত্যের অকাট্য ক্ষমতা সম্পর্কে জেনে যদি সত্যক্রিয়া করা হয় তবে তার সুফল অবশ্যম্ভাবী।

সূত্র-জয়মংগল অট্ঠগাথা, ভিক্ষু সত্যপাল।

Additional Info

  • Image: Image