২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 17 আগষ্ট 2015 03:33

মোর পরিত্তং (ময়ূর পরিত্রাণ) ও বট্টক পরিত্তং সূত্রের ব্যাখ্যা

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

মোর পরিত্তং (ময়ূর পরিত্রাণ) ও বট্টক পরিত্তং সূত্রের ব্যাখ্যা

মোর পরিত্তং (ময়ূর পরিত্রাণ)

ভূমিকা
অতীতকালে বারাণসীরজ ব্রহ্মদত্ত্বের রাজত্বকালে বোধিসত্ত্ব বোধিসম্ভার পূর্ণ করিবার সময় একদা ময়ূর রূপে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তখন তিনি ডিম্বাবস্থায় কর্ণিকারপুষ্পের কণিকা তুল্য ছিলেন। সেই ডিম্বকোষ হইতে বহির হইবার সময় তাঁহার আকৃতি সুবর্ণ বর্ণ এবং অতিশয় সুন্দর ছিল। পালকের অভ্যন্তরেও সুরজ্ঞিত রেখারাজি বিরাজ করিত। ফলতঃ অন্যান্য ময়ূর ছানা অপেক্ষা তাঁহার আকৃতি লোভনীয় ছিল। তিনি নিজের জীবনরক্ষার জন্য তিনটি পর্ব্বতশ্রেণী অতিক্রম করিয়া চতুর্থ পর্বতশ্রেণীর দণ্ডকহিরণ্য নামক এক পর্বততলে বাস করিতেছিলেন। রাত্রি প্রভাত হইলে তিনি পর্বতশীর্ষে বসিয়া সূর্য্যরে উদয়শোভা দেখিতে দেখিতে নিজের গোচরভূমি অর্থাৎ বিচরণ স্থানের রক্ষার জন্য ‘উদেতয়ং’ এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার সময় ‘অপেতয়ং’ ইত্যাদি মন্ত্র আবৃত্তি করিতেন। ইহাকে ব্রহ্মমন্ত্র বলা হয়।

সূত্রারাম্ভ
০১। এই একাধিপতি পৃথিবী আলোককারী সোনার বর্ণ ও চক্ষুষ্মান রাজা উদিত হইতেতেছে। তদ্ধেতু সেই সোনার বর্ণ জগতালোককারীকে আমি নমস্কার করিতেছি। তাঁহার দ্বারা রক্ষিত হইয়া আজ সুখে বিচরণ করিত।
০২। যে বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণগণ (বুদ্ধগণ) সমস্ত ধর্মে দেবজ্ঞ তাঁহাদিহকে আমার নমস্কার। তাঁহারা আমাকে রক্ষা করুন। অতীত বুদ্ধগণকে আমার নমস্কার এবং চারিমার্গ ও চারিফলযুক্ত বোধিকে আমার নমস্কার। পঞ্চবিধ বিমুক্তি দ্বারা বিমুক্ত অর্হৎগণকে আমার নমস্কার এবং বিমুক্তিকে আমার নমস্কার। এইরূপে সেই ময়ূর এই পরিত্রাণ পাঠ করিয়া আহার অন্বেষণে বিচরণ করিত।
০৩। ‘অপেতি’- সুর্য্য অস্তগমন করিতেছেন। এই গাঁথার অন্য সমস্তই ১ম গাঁথার ন্যায়।
“এই পরিত্রাণ পাঠ করিয়া ৭০০ বৎসরকাল সেই ময়ূর রাত্রি-দিন নিরূপদ্রবে তথায় বাস করিয়াছিল।”

বট্টক পরিত্তং

ভুমিকা
পুরাকালে বোধিসত্ত্ব মগদরাজ্যেও এক অরণ্যেও বর্তক (ভাড়–ই) জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার পিতা মাতা তাঁহাকে বাসায় রাখিয়া আহার সংগ্রহ করিতে যাইতেন। তখনও তাঁহারা পাখা মেলিয়া উড়িবার ও পা ফেলিয়া চলিবার ক্ষমতা হয় নাই। তথায় প্রতি বৎসর দাবাগ্নি জ্বলিয়া উঠিত। ঐ বৎসরও প্রচন্ড বেগে হঠাৎ জ্বলিয়া উঠিল। পাখীরা প্রত্যেকে নিজ নিজ বাসা ছাড়িয়া মরণভয়ে কিচিরমিচির করিতে করিতে পলাইয়া গেল।
বর্তকশাবক বোধিসত্ত্বেও পিতামাতাও মরণভয়ে আপন শাবকটিকে ফেলিয়া পলায়ন করিয়াছিল। বোধিসত্ত্ব বাসা হইতে মাথা তুলিয়া দেখিলেন চারিদিক হইতে ধূ ধূ রবে আগুন আসিতেছে। তখন তিনি ভাবিলেন- অহো! আমার যদি উড়িবার শক্তি থাকিত, তাহা হইলে অন্যত্র উড়িয়া যাইতাম। যে মাতাপিতা আমার পরম হিতৈষী, তাঁহারাও মরণভয়ে চলিয়া গিয়াছেন। আমার অঅর জীবনের কোন আশা নাই, আমাকে নিশ্চই মরিতে হইবে। তখন তিনি শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা, দয়া ও শুচিতা প্রভৃতি সৎগুণরাশি স্মরণ করিতে লাগিলেন। এরুপ সত্যক্রিয়া অধিষ্ঠানের দ্বারা অগ্নি অস্বাভাবিকরূপে প্রতিনিবৃত্ত হইয়াছিল। এই বর্তকপরিত্রাণ ভগবাণ বুদ্ধ সারীপুত্র স্থবিরের নিকট দেশনা করিয়াছিলেন।

সূত্র
০১। জগতে যে সমস্ত গুণরাশি শীল, সত্য, শুচি, দয়া প্রভৃতি আছে আমি সেই সমস্ত গুণরাশি স্মরণ করিয়া অনুত্তর সত্যক্রিয়া করিব।
০২। আমি অপরিমিত ধর্মবল অনুস্মরণ, অতীত বুদ্ধগণকে স্মরণ ও সত্যবলকে আশ্রয় করিয়া সত্যক্রিয়া করিলাম।
০৩। আমার পাখা আছে বটে, পালকহীন হওয়াতে উড়িতে পারি না। পা আছে বটে কিন্তু চলিতে পারি না। মাতাপিতাও প্রাণভয়ে অন্যত্র চলিয়া গিয়াছেন। অতএব হে অগ্নিদেব! তুমি ফিরিয়া যাও।
০৪। অমার এই সত্যক্রিয়া করার সঙ্গে সঙ্গেই ভীষণভাবে জ্বলন্ত অগ্নি ষোড়শকরীষ পরিমিত স্থান হইতে জল সেচনে নিভিয়া যাওয়ার মতই নিভিয়া গেল। আমার এই শীলগুণাদির তুল্য সত্য আর নাই। ইহাই আমার সত্যপারমী।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।
লেখক ঃ কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক ঃ নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশন, সহযোগী সম্পাদক ঃ নির্বাণা (www.nirvana.com), This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Additional Info

  • Image: Image