২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 24 জুলাই 2015 20:00

করণীয় মৈত্রী সূত্রের উৎপত্তি ও বঙ্গানুবাদ

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

করণীয় মৈত্রী সূত্রের উৎপত্তি ও বঙ্গানুবাদ

সূত্রের ধারাবাহিকতায় আজ আমরা জানব করণীয় মৈত্রী সূত্রের উৎপত্তি

এই করণীয় সূত্র অমনুষ্য-উপদ্রব নিবারণ এবং প্রাণীগণের প্রতি মৈত্রী ভাব পোষণের জন্য উপদিষ্ট হইয়াছে। ভগবান বুদ্ধের শ্রাবস্তীতে অবস্থানকালে বর্ষাবাস আরম্ভের পূর্বে ভিক্ষুগণ আসিয়া নিজ নিজ চরিত্রের অনুরুপ কর্মস্থান গ্রহণ করিয়া বর্ষাবাসের জন্য যাঁহার যেখানে ইচ্ছ্ াসেখানে যাইতেন। এইরুপে একদা পঞ্চশত ভিক্ষু কর্মস্থান গ্রহণ করিয়া হিমালয় পর্বতের পার্শ্বে কোন এক পর্বতে বর্ষাবাস আরম্ভ করিলেন। নিকটস্থ গ্রামে ভিক্ষা সঙগ্রহ করিয়া তাঁহারা পরম সুখে কর্মস্থান ভাবনা করিতেন। পরিশুদ্ধ জল-বায়ু ও সুখাদ্য সেবনে তাঁহাদের স্বাস্থ্য ভাল হইল এবং তাঁহারা খুব উৎসাহের সহিত শ্রমণ-ধর্মপালন করিতে লাগিলেন। কিন্তু বৃক্ষদেবতাগণ তাঁহাদের শীলতেজে উদ্বিগ্ন হইল। সে তেজ সহ্য করিতে না পারিয়া বৃক্ষদেবতাগণ বৃক্ষের আশ্রয় ছাড়িয়া স্বীয় সন্তানাদি লইয়া এদিক সেদিক পলাইয়া গিয়া কখন তাঁহারা চলিয়া যাইবেন সেই প্রতীক্ষা করিতেছিল। কিন্তু দেখিল যে বর্ষাবাস শেষ না করিয়া ভিক্ষুগণ কোথাও যাইবেন না। তখন তাহারা ভাবিল-এত দীর্ঘকাল এত কষ্টে গৃহহীন থাকা অসম্ভব। অতএব ভয় দেখাইয়া ভিক্ষুদিগকে তাড়াইতে হইবে। অনন্তর তাহারা রাত্রে ভীষণ আকৃতি ধারণ করিয়া তাঁহাদের সম্মুখে দাঁড়াইয়া ভয়ঙ্কর চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল। ইহাতে ভিক্ষুগণ ভয় পাইলেন। ভয় ও দুশ্চিন্তায় তাঁহাদেও সমাধির ব্যাঘাত ঘটিল, ক্রমে তাঁহারা অত্যন্ত কৃশ ও দুর্বল হইলেন। তারপর যক্ষগণ ভয়ানক দুর্গন্ধ ত্যাগ করিতে লাগিল। বিকট দুর্গন্ধে ভিক্ষুদের শিরঃপীড়া উৎপন্ন হইল। একদিন তাঁহারা পরস্পরের ভয় ও কষ্টের বিষয় পরস্পরকে বলিলেন এবং বর্ষাবাস ত্যাগ করিয়া সকলে বুদ্ধেও নিকট চলিয়া গেলেন। বুদ্ধ তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন-
হে ভিক্ষুগণ বর্ষাবাসের মধ্যে দেশভ্রমণে যাইও না। এই শিক্ষাপদ আমি প্রজ্ঞাপ্ত করিয়াছি। কেন তোমরা দেশভ্রমণে বাহির হইয়াছ?’ তাঁহারা সকল ঘটনা নিবেদন করিলেন বুদ্ধ বলিলেন-তোমরা অন্যত্র কোথাও যাইও না, সেই স্থানে বাস কর এবং তথায় বাস করিয়াই তোমরা তৃষ্ণাক্ষয় করিতে সক্ষম করিতে সক্ষম হইবে। যদি যক্ষভয় হইতে মুক্ত হইতে চাও, তবে এই পরিত্রাণ শিক্ষা কর। ইহা তোমাদের পরিত্রাণ ও কর্মস্থান উভয়ই হইবে। এই বলিয়া বুদ্ধ ভিক্ষুগণকে করণীয় মৈত্রীসূত্র শিক্ষা দেন। ভূমিকাতে এইজন্য যক্ষভয়ের কথা উল্লেখ আছে।


আমরা করণীয় মৈত্রী উৎপত্তি সম্পর্কে জেনেছি। এই পর্বে আমরা জানব করণীয় মৈত্রী বঙ্গানুবাদ এবং এই সূত্র আমরা যদি প্রতিনিয়ত অনুশীলন করি তাহলে বিভিন্ন রকমের উপদ্রব এবং ভয় থেকে মুক্ত থাকতে পারবো ----- এই প্রত্যাশায় করণীয় মৈত্রী সূত্ত্-এর  বঙ্গানুবাদ

০১। পরম শান্তি নির্বাণ লাভেচ্ছু ব্যক্তির যাহা কর্তব্য তাহা এই,- তিনি সক্ষম, সরল,অতি সরল, সুবাধ্য, কোমল স্বভাব ও অভিমানশূন্য হইবেন।
০২। তিনি যথালাভে সন্তুষ্টচিত্ত, মিতাহারী, অল্পকৃত্য (বিবিধ কাজে অলিপ্ত), অল্পে তুষ্ট, শান্তেন্দ্রিয়, প্রজ্ঞাবান, চাঞ্চল্যহীন এবং গৃহস্থদে প্রতি অনাসক্ত হইবেন।
০৩। তিনি এমন কোন ক্ষুদ্র পাপচরণও করিবেন না যাহাতে অপর জ্ঞানিগণ নিন্দা করিতে পারেন। (অতএব) সর্বদা মনে মনে কামনা করিতে হইবে যে, সকল জীব সুখী হউক, নির্ভয় হউক এবং কায়িক ও মানসিক সুখে সুখী হউক।
০৪। সভয় বা নির্ভয়, হ্রস্ব বা দীর্ঘ, বৃহৎ মধ্যম, ক্ষুদ্র ও স্থুল যত প্রাণী আছে; দৃষ্ট, অদৃষ্ট, দূরবাসী, সমীপবর্তী, যাহারা জন্মিয়াছে বা জন্মিবে সকল জীব সুখী হউক।
০৫। সভয় বা নির্ভয়, হ্রস্ব বা দীর্ঘ, বৃহৎ মধ্যম, ক্ষুদ্র ও স্থুল যত প্রাণী আছে; দৃষ্ট, অদৃষ্ট, দূরবাসী, সমীপবর্তী, যাহারা জন্মিয়াছে বা জন্মিবে সকল জীব সুখী হউক।
০৬। পরস্পরকে বঞ্চনা করিও না, কাহাকেও অবজ্ঞা করিও না এবং ক্রোধ ও হিংসাবশত কাহারও দুঃখ কামনা করিও না।
০৭। মাতা যেমন স্বীয় গর্ভজাত একমাত্র পুত্রকে জীবন দিয়া রক্ষা করে, এইরূপ সকল প্রাণীর প্রাতি অপ্রমেয় মৈত্রীভাব পোষণ করিবে।
০৮। সমগ্র জগতের ঊর্ধ্বে, নিম্নে এবং চতুর্দিকে যত প্রাণী আছে, (তাহারা) বাধাহীন, বৈরীশূন্য ও অপ্রতিদ্বন্দী হউক। চিত্তে এইরূপ মৈত্রীভাব পোষণ করিবে।
০৯। দাঁড়ান অবস্থায়, চলিতে চলিতে, উপবেশন ও শয়নে যে পর্যন্ত নিদ্রা না আসে, সে পর্যন্ত এই মৈত্রীভাব স্মৃতিতে দেদীপ্যমান করিয়া রাখিবে। আর্যগণ ইহাকেই ব্রহ্মবিহার বলেন।
১০। শীলবান ও সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন স্রোতাপন্ন ব্যক্তি মিথ্যাদৃষ্টি পরিহারপূর্বক ভোগ-লালসা ও কামেচ্ছাকে দমন করিয়া পুনর্বার গর্ভাশয়ে জন্মধারণ করিতে আসেন না। অর্থাৎ শুদ্ধাবাসা নামক ব্রহ্মলোকে উৎপন্ন হইয়া তথায় অর্হৎ হইয়া নির্বণ লাভ করেন।
সত্যক্রিয়া ও সত্যপারমীর প্রভাবে কিভাবে রক্ষা পেতে পারেন তজ্জন্য মোর পরিত্তং ও বট্টক পরিত্তং
জানুন, আবৃত্তি করুন এবং নিজেকে সেভাবে গঠন করার চেষ্টা করুন।

Additional Info

  • Image: Image