২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১২ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৬ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
মঙ্গলবার, 10 ডিসেম্বর 2013 00:34

পূজা প্রসঙ্গ

লিখেছেনঃ রক্তিম বড়ুয়া

পূজা:

উৎপন্ন কুশল এবং অনুৎপন্ন কুশল বৃদ্ধি করার জন্য এবং উৎপন্ন ও অনুৎপন্ন অকুশল বর্জনের জন্য আমরা অনেক কিছু করতে পারি। যার মধ্যে একটি হলো পূজা। পূজা হচ্ছে পূজনীয় ব্যক্তির প্রতি সম্মাণ প্রদর্শণ। দান আর পূজায় পার্থক্য হলো সম্মান প্রদর্শনের মধ্যে। আমরা যখন বুদ্ধকে দান দেই তখন শ্রদ্ধা থাকে, সম্মান থাকে কিন্তু ভিক্ষুক, তির্যক প্রানীদের দান দিলে সেই সম্মান আমরা তাদের প্রদর্শণ করি না। তাই সেটি দান হয় পূজা নয়। উল্লেখ্য পূজনীয় ব্যাক্তির পূজা করাই উত্তম মঙ্গল। পূজা দুভাবে করা যায়। আমিষ (বস্তু পূজা) এবং প্রতিপত্তি পূজা (শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা দিয়ে পূজা)। বুদ্ধ বলেছেন প্রতিপত্তি পূজার ফল আমিষ পূজা থেকে বেশি। কিন্তু কোথাও আমিষ পূজা না করতে বলেন নি। বরং বুদ্ধ নিজে প্রসন্ন চিত্তে আমিষ পূজায় বিপুল ফল লাভ হয় বলে দেশনা করেছেন। এখন জানা যাক পূজনীয় কারা। মঙ্গল সূত্র এর অর্থকথায়- পূজনীয় বলতে বুদ্ধ, প্রত্যেক বুদ্ধ এবং শ্রাবকগণকেই বুঝিয়েছেন। কারণ তাঁরা দোষবিহীণ। তবে ত্রিপিটকে দেখা যায়-রাজচক্রবর্তীদেরও পূজা করা যায়। বুদ্ধকে পূজার জন্য- বুদ্ধের অবর্তমানে বুদ্ধের ধাতু চৈত্য/জাদী, উদ্দেশ্য চৈত্য, পারিভোগ জাদীকে আমরা পূজা দিতে পারি।

 

বুদ্ধের ধাতু পূজা (অর্থাৎ পরিনির্বাপিত বুদ্ধকে পূজা

) করে সুধাপিণ্ডিয় থের চুরানব্বইকল্প দুর্গতি ভোগ করেন নি। শেষ জন্মে প্রতিসম্ভিদা সহ ছয় অভিজ্ঞা লাভ করেছেন। বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর অজাতশত্রু যখন বুদ্ধ ধাতু পূজা করে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন অনেকে সেই পূজায় বাধা দিয়েছিলেন। কারণ তারা ভেবেছিলেন ধাতু বা অস্থিকে পূজা করার কি দরকার, বুদ্ধ তো নেই!!! যারা বুদ্ধ পূজায় বাধা দিয়েছেন তাদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ। তারা সবাই মৃত্যুর পর প্রেত হন। আর যারা পূজা দিয়েছিলেন তারা সর্গে যান। মহাশ্রাবক কাশ্যপ সেই দেবতা এবং প্রেতদের ঋদ্ধি দিয়ে প্রদর্শণ করান। শুধু পূজা না পূজাতে উৎসাহ দান কারিও স্বর্গ সুখ ভোগ করেন। তার প্রমান ত্রিপিটকের ‘অনেকবর্ণ’ দেবপুত্রের দেবলোক গমনে। অনেকে ভেবে থাকেন বুদ্ধ পূজা বুদ্ধের অনেক পরে শুরু হয়। তিপিটক তার প্রমান দেয় না। গৌতম বুদ্ধের সময়তেই যে কাশ্যপ বুদ্ধের উদ্দেশ্য চৈত্যকে পূজা করা হতো তার প্রমান ধর্মপদে আছে। কাশ্যপ বুদ্ধ তো অতীত বুদ্ধ! ভবিষ্যত বুদ্ধকেও পূজা করার রীতি আমরা বুদ্ধ বংশ তে দেখেছি। বুদ্ধকে উদ্দেশ্য করে কেউ যদি বালুকেও পূজা দেয় তবে তাতে মহাপূণ্য হবে। অতীতে এক সত্তা বুদ্ধ অনুৎপন্ন সময়ে জন্ম নেন তখন তিনি পূজার পাত্র না পাওয়াতে বুদ্ধকে উদ্দেশ্য করে বালূ জাদী নির্মাণ করে তাতে পূজা দিতেন। এর ফলে তিনি ৯১ কল্প অপায়ে যাননি। অতঃপর গৌতম বুদ্ধের সময় তিনি ষড়ভিজ্ঞালাভী অরহৎ হন।

শ্রীলংকায় যখন বোধিবৃক্ষ রূপ পারিভোগ জাদী নিয়ে যাওয়া হয় তখন সেটিকে তারা পূজা করার সময় সেই বোধিবৃক্ষটি বুদ্ধের মত ষড়রশ্মি বিকিরণ করেছিল। অনেকে ভাবেন বুদ্ধ তো নেই তাই পূজাতে ফল নাই। তারা ভাবেন, বুদ্ধতো নেই, তো তিনি কিভাবে অন্ন, পানীয় খাবেন? আরো কিছু মানুষ আছে যারা আরেক ধাপ উঠে মনে করেন অন্ন দিয়ে লাভ কি! বুদ্ধকে ফুল, সুগন্ধি দান/পূজা করাই ভালো। বুঝি না এই জ্ঞান তারা কোথা থেকে লাভ করলেন!!! কারণ বুদ্ধ যদি অন্ন গ্রহণ না করেন তবে তিনি ফুলের সুগন্ধি কিভাবে গ্রহণ করবেন! আর যদি অন্ন দান পচেঁ যায় ফুলের কি তবে অনিত্য নেই? মনে রাখবেন কর্মই আপনাকে সুগতি দিবে। আপনি যদি অন্ন দান করেন (বু্দ্ধকে হউক আর অন্য কাউকে হউক) তবে আপনি আয়ু বর্ণ সুখ বল এই চারটি ফল লাভ করবেন। অন্য কোন দান বা পূজায় যদি সেই ফল লাভ করা যায় তবে আপনি এটি থেকে বিরত থাকলে সমস্যা নেই। তবে প্রতিটি পূজার ফল ভিন্ন। সবাইকেই বলছি- সমচিত্তে আপনি জীবিত বুদ্ধকে পূজা করলে যেই ফল পাবেন বুদ্ধের পরিনির্বানের পর আপনি যদি আপনার বাসায় বুদ্ধের ছবিকে আলম্বন করে প্রসন্ন চিত্তে পূজা দেন সমান ফল পাবেন। আমার কথা যাদের বিশ্বাস যোগ্য হচ্ছে না তারা বিমান বত্থু দেখতে পারেন।

পরিনির্বাপিত বুদ্ধকে পূজার ফল আছে কি নাই তা নিয়ে যারা বেশ সন্ধিহান তাদের জন্য নিম্মোক্ত উদাহরণ-এই ব্যাপারটি নিয়ে মিলিন্দ প্রশ্নে মিলিন্দ রাজার সাথে ভিক্ষু নাগসেনের বিতর্ক হয়েছিল। মিলিন্দ রাজা ও আপনার প্রশ্নটিই করেছেন। ‍উত্তরে নাগসেন বলেছেন- ‘মহারাজ, আপনি কি শুনেছেন, নন্দ নামক যক্ষ সারীপুত্ত স্থবিরের মাথায় আঘাত করে পৃথিবীতে প্রবেশ (নরকে) করেছিল?’ হ্যা ভন্তে শুনেছি। মহারাজ, স্থবির সারিপুত্র কি নন্দ যক্ষের পৃথিবী গ্রাস ইচ্ছা করেন? ভন্তে সদেবলোক উল্টে গেলেও, চন্দ্র সূর্য় মাটিতে পড়লেও সারিপুত্র অপরের দুঃখ ইচ্ছা করেন না। তার কারন কি? যে হেতু দ্বারা সারিপুত্র রাগ উৎপাদন করবেন সেই হেতু তাঁর ধ্বংস হয়েছে। হেতু ধ্বংস হওয়াতে তাঁকে কেউ হত্যা করলেও তিনি রাগ করবেন না।’ মহারাজ যদি সারিপুত্র স্থবির নন্দ যক্ষের পৃথিবী প্রবেশ ইচ্ছা না করেন, নন্দ যক্ষ কি কারণে পৃথিবীতে প্রবেশ করল? ভন্তে নিজের অকুশল কর্মের দরুণ। যদি মহারাজ অকুশলের প্রাবল্য হেতু পৃথিবীতে প্রবিষ্ট হয়ে, গ্রহণ না করলেও কৃত অপরাধ সফল হয় তবে মহারাজ কুশল কর্মের প্রাবল্য হেতু কেউ গ্রহণ না করলেও কৃত কাজ সফল হয়। এই কারণে নির্বাণ প্রাপ্ত বুদ্ধ পূজাতে বুদ্ধ পূজা গ্রহণ না করলেও দাতার কৃত কাজ সফল হয়। পূণ্য সঞ্চয় হয়। আর সুত্রপিটকের অংশ বিমান বত্থুতে বলা হয়েছে- সমচিত্তে জীবিত অথবা পরিনির্বাপিত বুদ্ধ পূজার সমান ফল। তাই বুদ্ধ পূজাকে মুর্তি পূজা রূপে পূজা করা উচিত নয়। জীবন্ত বুদ্ধকে পূজা করছি এই রূপ চিন্তা করলে মহাফল দায়ক হয়। অঙ্গুত্তর নিকায় অর্থকথায় বলা হয়েছে- বুদ্ধের জীবদ্দশায় যে ভাবে বুদ্ধকে পূজা করা হতো, তার নির্বাণের পরও যদি তাঁকে উদ্দেশ্য করে পূজা করা হয় তবে তাও বুদ্ধ পূজা হয়। ত্রিপিটকে অসংখ্য উদাহরণ আছে পরিনির্বাপিত বুদ্ধ পূজা নিয়ে।

অনেকে মনে করেন বুদ্ধ পূজা হয়ে যাবার পর সেই পূজার খাদ্য গ্রহণ করা যায় না। তা সঠিক নয়। কারণ বৌদ্ধ ধর্ম চিত্ত প্রধান। আপনি যখন বুদ্ধকে অন্ন দান দেন আপনার চিত্তে থাকে এটি বুদ্ধকে দিচ্ছি, এটি সুখাদ্য। কিন্তু ১২ টার পর যখন নিয়ে নেন তখন চিত্তে থাকে এটি বুদ্ধের ‘আইন্ডা’ বা উচ্ছিষ্ট খাদ্য। তাই বুদ্ধ পূজার আগে কেউ তা গ্রহণ করতে পারবে না কিন্তু তার পরে পারবে। এরুপ উচ্ছিষ্ট খাদ্য গ্রহণের একটি প্রমাণ ত্রিপিটক থেকে দিচ্ছি- একসময় বুদ্ধ অসুস্থ ছিলেন তখন অগ্রমহাশ্রাবক মৌগদলায়ণ ঋদ্ধি শক্তি দিয়ে উড়ে গিয়ে এক শ্রেষ্টি থেকে বুদ্ধের জন্য ছোয়াইং নিয়ে আসলেন। সেই ছোয়াইং অতি সুগন্ধযুক্ত ছিলো। ঠিক দেবগণের খাদে্যর মত। তিনি তা বুদ্ধকে দেন। বুদ্ধ যখন সেই খাদ্য গ্রহণ করছিলেন তখন রাজা বিম্মিসার বুদ্ধকে দেখতে আসছিলেন। সেই খাদ্যের সুগন্ধি রাজার নাকে যায়। তিনি তা গ্রহণে ইচ্ছুক হন। তিনি ভেবেছিলেন এই খাদ্য দেবগণের দান। কিন্তু লজ্ঝায় বুদ্ধকে বলতে পারলেন না। ‍বুদ্ধ তা বুজতে পেরে উনাকে খাদ্য গ্রহণের অনুমতি দিলেন। রাজাও তৃপ্তি সহকারে খেলেন। পিতার অবর্তমানে যেমন পুত্র সম্পত্তি পায় তদ্রুপ বুদ্ধের অবর্তমানে ভিক্ষুরাও তা গ্রহণ করতে পারে। তবে বুদ্ধ ভিক্ষুদের বলেছেন- বস্তুদ্রব্যে নিজেদের নিয়োজিত না রাখতে। তাই কোন ভিক্ষু যদি আপনাকে অনুমতি দেয় আপনি তা গ্রহণ করতে পারেন। তবে বিহারের খাদ্য খেয়ে ধর্ম ভুলে থাকা উচিত নয়। তাই ত্রিরত্নের সেবা করেই তা গ্রহণ উচিত। তবে আপনার বাসায় দেয়া ছোয়াইং আপনি গ্রহণ করতে পারেন। কারন আপনি বাসার বুদ্ধের আসনের সেবা করেন।

পরিশেষে এটি বলব কেউ বুদ্ধ পূজাকে অপচয় ভাববেন না। কারণ বুদ্ধ, প্রত্যেক বুদ্ধ, শ্রাবক বুদ্ধগণের পূজা অতি অল্প হলেও অপরিমেয় হয়। তার ও বড় কারণস্বরূপ অর্থকথায় বলা হয়েছে- তারা জগতে দুলর্ভ। কেউ যদি প্রথমে দান দেন পরে ভাবেন অহ আমার দান তোলা উচিত হয়নি। এই দান বিফলে গেল, অপচয় হল। এইরূপ চিত্ত দিয়ে দান করলে দানের ফল, পূজার ফল পরিপূর্ণ ভাবে পাওয়া যায় না। অধিকন্তু এটির কারণে যদি মনে অকুশল ভাব উৎপন্ন হয় তবে পাপ হবে। কেন পূজা অপচয় নয়? কারণ দক্ষিনা বিভঙ্গ সূত্রে বুদ্ধ বলেছেণ- তিযর্ককে দানের ফল বলা যাবে কিন্তু অর্হতকে পূজার ফল বলা যাবে না। কত কল্প ভোগ করবেন সেই পূজার ফল তা নাকি বলা যায় না। অরহত গণ তো অনেক উর্দ্ধে ত্রিশরণাগত কোন উপাসককে দানের ফলকেও অপরিমেয় বলা হয়েছে।

কৃতজ্ঞতাঃ  WE ARE BUDDHIST, আমরা বৌদ্ধ FaceBook Web Page থেকে নেয়া