২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ সোমবার, ২১ অগাস্ট ২০১৭ইংরেজী
বুধবার, 22 অক্টোবর 2014 21:01

তাদের সব ইচ্ছা পূর্ণ হয় আকাঙ্খণীয় সূত্র এবং ব্যক্তিগত উপলব্ধি - ০১

লিখেছেনঃ উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু

তাদের সব ইচ্ছা পূর্ণ হয় আকাঙ্খণীয় সূত্র এবং ব্যক্তিগত উপলব্ধি - ০১

অতীতের কোন এক পূণ্য কর্মের ফলে আমার এই ছোট্ট জীবনে বেশ ক’জন শীলগুণে বিভুষিত পূজ্য ভিক্ষুসংঘের একান্ত সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ লাভ হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম শ্মশানভূমি ধ্যানচর্চা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সংঘপ্রধান ভদন্ত প্রজ্ঞেন্দ্রিয় থের যিনি বেশ কিছুদিন ধরে শীলঘাটা জ্ঞানপাল-রত্নপ্রিয় অরণ্য ধ্যান কুটিরে অবস্থান করছেন। এই মুহুর্তে অবশ্য মানিকপুর অরণ্যেই আছেন তিনি। নিজেকে মুক্তির চুড়ান্ত শিখড়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি প্রতিনিয়ত ধ্যানানুশীলনের চেষ্টা করেন ফলে সাধারণ গৃহীদের সাথে তেমন একটা সময় কাটান না বললেই চলে। কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে ভান্তের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ধর্মালোচনা করার সুযোগ পেয়েছি।

এমন সময়ও গেছে পূর্নিমা রাতে দুজন ধর্মালোচনা করতে করতে কখন যে রাতের ০১টা বেজে গেছে আমরা দুজনের কারোরই খেয়াল নেই। একজন গৃহী হয়ে তাঁর এরকম ঘনিষ্ট সান্নিধ্য লাভ দ্বিতীয় কেউ পেয়েছেন আমার জানা নেই। তাঁর সাথে আলোচনায়-ই প্রথম জেনেছিলাম আকাঙক্ষণীয় সূত্রের কথা। পরে আমি নিজে সূত্রটি বেশ কবার পড়েছি।
আকাঙক্ষণীয় সূত্রের মূল কথা হচ্ছে- কোন ভিক্ষু যদি শীলসম্পদে সম্পন্ন হয়ে, প্রাতিমোক্ষ সংবৃত হয়ে আচার গোচর সম্পন্ন হয়ে অনুমাত্র নিন্দনীয় আচরণে ভয়দর্শী হয়ে বিচরণ করে, চরিত্র গঠন করে তবে তিনি যা আকাঙক্ষা করেন তাই পূর্ণ হবে।

তিনি যদি চান তিনি সকলের প্রিয় হবেন তাই হতে পারবেন, তিনি যদি চান চর্তুপ্রত্যয় লাভে লাভবান হবেন তবে তাই হতে পারবেন। তিনি যদি চান এই জন্মেই তার দুঃখের অন্ত সাধন করিবেন তবে তাই করতে পারবেন। এক কথায় লৌকিক বলেন আর লোকোত্তর বলেন তার সর্বপ্রকারের মনোবাসনা পূর্ণ হবেই।

এই সূত্রটি পড়ার পর থেকে বিভিন্ন সময় আমার চিত্ত বিতর্ক উৎপন্ন হতো, আসলেই কি এভাবে পূর্ণ হওয়া সম্ভব?তাই বিভিন্ন সময় পরীক্ষা চালাতাম। বলা বাহু্ল্য প্রায় সবগুলোতেই আমি বাস্তব প্রমাণ পেয়েছি। আজ সেসবের মধ্য থেকে একটা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরছি-আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ভান্তে এবং তাঁর শিষ্যদের সাথে তীর্থ ভ্রমণ এ যাওয়ার। এই তীর্থ ভ্রমণের আয়োজনটা ছিল শুধু আমাদেরই যেখানে ভান্তে, ভান্তের শিষ্য এবং আমরা কয়জন সেবক ছিলাম।

বুদ্ধগয়াতে গিয়ে আমিও শ্রমণ হয়ে যাই। ওখানে প্রায় এক সপ্তাহ অবস্থানের সময়- ভান্তে আমাকে কাছে ডেকে বললেন, আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা আমি বুদ্ধগয়াতে আসলে বুদ্ধের অবস্থানের এই অঞ্চলে পিন্ডাচরণ করবো। এখানে উল্লেখ করতে হয়- যারা বুদ্ধগয়া গেছেন তারা জানবেন যে, বুদ্ধগয়ার আশেপাশে যেসব পরিবার আছে তারা খুবই দরিদ্র, বেশীরভাগই ভিক্ষা করে দিনাতিপাত করে। তাছাড়া এখানে বৌদ্ধ পরিবারও নাই তাই পিন্ডাচরণ পাওয়া সেতো অসম্ভব বলা চলে।

এই বিষয়গুলো আমার মাথায় আসলেও আমি ভান্তেকে বলিনি কারণ একটাই পরীক্ষা করার বাসনা। আমার মনে আসলো যে, আবারও পরীক্ষা নিতে পারবো শীলবানদের আকাঙখা আসলেই পূর্ণ হয় কিনা আকাঙখানীয় সূত্রের কথা অনুসারে। আমি ভান্তেকে বললাম আমিও ইচ্ছুক পিন্ডাচরণে যেতে চলুন কা্লই যাব। ভান্তেও রাজী এক বাক্যে কারণ ইচ্ছাতো তাঁরই।

এদিকে ভান্তের সাথে অন্য যারা সেবক গিয়েছিল বিশেষ করে আমার মেসো শীলঘাটা নিবাসী মিলন কান্তি বড়ুয়া আশেপাশের পরিবারের অবস্থার কথা বলে ভান্তেকে বললেন ভান্তে এখানে পিন্ডাচরণ করে কোন লাভ হবেনা কিছুই পাবেননা। ভান্তে বললেন, না আমি যাবোই। আর আমার মনে বার বার প্রতিধবনি হচ্ছিল বুদ্ধ বচন মিথ্যা হতে পারেনা, আমরা ছোয়াইং পাবোই। কারণ আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি ভান্তে শীলবান। ভান্তের শিষ্যরাও সবাই অরণ্যাচারী, শ্মশানচারী। আর আমরা নবপ্রব্রজিতরা তো আছিই। আমার মেসো মিলন বাবু তখন শ্রামণ তিনি পিন্ডাচরণে না গিয়ে আমাদের জন্য রান্নার আয়োজন করছিলেন বাবুর্চিদের দিয়ে কারণ তার ধারণা ছিল আমরা শুন্য পাত্রে ফিরে আসবো।

যাই হোক আমরা পিন্ডাচরণে বের হলাম-
ড. রাস্ট্রপাল ভান্তের বিহার থেকে আমরা রওয়ানা দিলাম, যাওয়ার সময় বেশ কিছু হোটেলের সামনে দিয়েই যেতে হয়। অল্পকিছুদুর যাওয়ার পর আবাসিক এক হোটেল থেকে এক ভদ্রমহিলা বের হলেন, খুব সম্ভবত শ্রীলঙ্কান হবেন, তিনি ভান্তেকে বন্দনা করে ভান্তে থেকে ছাবাইকটি চাইলেন তার ভাষায়। ভান্তে তার ভাষা বুঝতে না পেরে ইশারা দিয়ে বুঝালেন আমাদের লাইনতো লম্বা আমাকে একা না দিয়ে যা দেবে সবাইকে ভাগ করে দাও। জানি না ভান্তের কথা তিনি বুঝছেন কিনা। ভদ্রমহিলা কিন্তু নাছোড়বান্দা ভান্তের পুরো ছাবাইক তিনি নেবেনই। অগত্যা ভান্তে ভদ্রমহিলার সাথে থাকা পুরুষ ব্যক্তিটির হাতে ছাবাইকটি দিলেন। ভদ্রলোক হোটেলে প্রবেশ করে ছাবাইক পূর্ণ করে এনে ভান্তের হাতে দিলেন। সম্ভবত ভদ্র মহিলা ভেতর গিয়ে ঐ পাত্র পুর্ণ করে দিলেন।

এখানেই শেষ নয়- এবার পরের জনের ছাবাইক নিয়ে নিলেন তিনি এভাবে সম্ভবত ১৮জন ছিলাম আমরা তখন। এই ১৮জন সবাইকেই ছাবাইক পূর্ণ ছোয়াইং দান করলেন ভদ্রমহিলা।এমন সময় আরেক ভদ্রমহিলা একটা বাস থেকে নেমে তৎক্ষণাৎ আমাদের সবাইকে একটা করে বিস্কুট এর পেকেট দান করলেন।

পিন্ডাচরণ শেষে বিহারে যখন ফিরে আসছিলাম আমার মেসোরা তখন প্রস্তুত ছোয়াইং নিয়ে, তারা ভেবেছিলেন শুন্যপাত্রে ফিরে আসছি কিন্তু বাস্তব অবস্থা দেখে তারাও সেদিন অবাক হয়েছিলেন। সত্যি!!! সে এক শিহরণ জাগানো অনুভূতি। সুর্য উদয় হলে অস্ত যাবেই তদ্রুপ বুদ্ধ বাণীরও সত্যতা আছেই- শীলবানদের আকাঙ্খা পূর্ণ হবেই।

আমার মনে হয়েছিল সেদিন দেবরাজ ইন্দ্র নেমে এসে ছদ্মবেশে আমাদের দান দিয়েছিল- কারণ সকাল ৯টায় একটা আবাসিক হোটেলে ১৮ জনের জন্য খাবার প্রস্তুত থাকার কথা নয় তদুপরি গাড়ী থেকে নামা ভদ্রমহিলাও কোত্থেকে এতগুলো বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে আসবে সাথে করে। আর আমাদের ছাবাইক গুলোও ছিল পরিপূর্ণ। ভাত কিংবা তরকারী সবকিছুই ছিল পরিমাণমত। সত্যি এখনো অবিশ্বাস্য মনে হয় আমার। যাই হোক প্রিয় পাঠক- বুদ্ধের বচন যে সত্যি, শীলবানদের আকাঙ্খা যে পূর্ণ হয়, নিজের জীবন থেকে নেয়া তার একটা বাস্তব প্রমাণ আজ তুলে ধরলাম। ভবিষ্যতে আরো তুলে ধরার প্রত্যাশা রইল।
পরিশেষে বলতে চাই চলুন শীলবান হই, শুধু ভিক্ষুদের নয় আমাদেরও সকল আকাঙ্খা পূর্ণ হবেই।

Source: Soshanvumi Meditation Practiciing Center.Karaiyanagor

Additional Info

  • Image: Image