২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
শনিবার, 22 অক্টোবর 2016 23:08

থাই রাজা ভূমিবল অদুলাদেজের মহাপ্রয়ান এবং আমার কিছু অভিজ্ঞতা

লিখেছেনঃ সঞ্জয় বড়ুয়া চৌধূরী (থাইল্যান্ড প্রবাসী)

থাই রাজা ভূমিবল অদুলাদেজের মহাপ্রয়ান এবং আমার কিছু অভিজ্ঞতা

গত ১৩ই অক্টোবর, ২০১৬ থাইবাসীদের জন্য ছিল এক অশ্রুভরা ও বেদনামিশ্রিত দিন। সেই দিনে থাইল্যান্ডের মহামান্য রাজা ভূমিবল অদুলাদেজ ৮৮ বছর বয়সে ব্যাংককের প্রসিদ্ধ সিরিরাজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উল্লেখ্য, প্রয়াত রাজা ভূমিবল প্রায় ৭০ বছর ধরে রাজার আসনে অধিষ্টিত ছিলেন, যেটা মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্ব্বোচ্চ সিংহাসনে থাকা একমাএ রাজা বলে অভিহিত করা হয়। থাই নাগরিকদের কাছে প্রয়াত রাজার ভূমিবলের জনপ্রিয়তা এতটাই আকাশচুম্বী যে, রাজার মহাপ্রয়ানের পর এক বছরের জন্য শোকদিবস পালন করার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিশ্বের অনেক দেশের মত থাইল্যান্ডে কলো রঙকে শোকের প্রতীক হিসেবে ধরে নেয়া হয়; রাজার মৃত্যু উপলক্ষে রাষ্টীয় নিয়ন্ত্রানাধীন সমস্ত প্রতিষ্টানের কর্মকতা-কর্মচারীদেরকে এক বছর ধরে আর সাধারন নাগরিকদের জন্য রাজার মৃত্যুর প্রথম এক মাস কালো পোশাক পরিধানের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়।

থাইল্যান্ডে কয়েক বছর ধরে বসবাস করার সুবাদে প্রয়াত রাজা ভূমিবলের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা তথা রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো পর্যবেক্ষন করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। প্রত্যেক বছর ৫ই ডিসেম্বর সারম্বরের সহিত সারাদেশে রাজা ভূমিবলে জন্মদিন উদযাপন করা হয়। অনুরূপভাবে, প্র মহামান্য রাণী সিরিকিটের জন্মদিনও (১২ই আগষ্ট) প্রত্যেক বছর জাঁকজমকভাবে পালন করা হয়। থাইবাসীরা রাজার জন্মদিনকে ‘পিতৃদিবস’ (Father’s Day), আর রানীর জন্মদিনকে ‘মাতৃদিবস’ (Mother’s Day) হিসেবে পালন করে।

গত ১৩ই অক্টোবর, সেইদিন ছিল বৃহস্পতিবার, আমি ব্যাংককে ছিলাম। সেইদিন আমার পিএচডির ক্লাশ ছিল, তাই যতারীতি সকাল থেকেই আমার ভার্সিটির পিএচডি ছাএ-ছাএীদের সাথে ছিলাম। সেইদিন যদিও পুরোটা সময় জুড়ে আমার বিভাগের সব পিএচডির ছাএ-ছাএীরা ভার্সিটির সেমিনার হলের ক্লাশে ছিলাম, কিন্তু আমাদের সবার আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল প্রয়াত রাজা ভূমিবলের সর্বশেষ শারিরীক অবস্থা; আমার প্রায় সব থাই ক্লাশমেটরা একটু পরপর যার যায় মুঠোফোনের স্ক্রিনের দিনে তাকাচ্ছে আর রাজার সর্বশেষ শারিরীক অবস্থা সম্পর্কে আমাদেরকে হালনাগাদ করছে। রাজা যেহেতু ব্যাংককের সিরিরাজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, আমরা কয়েকজন ক্লাশমেট সিদ্ধান্ত নিলাম যে বিকেলের ক্লাশ শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমরা সিরিরাজ হাসপাতাল প্রাংগনে রাজার জন্য সাধারন সাধারন থাইবাসীদের সাথে রোগমুক্তির প্রার্থনায় শামিল হব সেইদিন দুপুরে ক্লাশ শেষ হওয়া মাএই আমরা সিরিরাজ হাসপাতাল অভিমুখে রওনা দিলাম। আমি আর আমার থাইল্যান্ড প্রবাসের দীর্ঘদিনের বন্ধু জয়েন্তু আমাদের থাই ক্লাশমেট মিসেস শামসুখের ( Toey Sermsook P) গাড়ী করে সিরিরাজের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, অন্যদিনে আমাদের আরেক থাই ক্লাশমেট মিস্টার পাতসাকপোল (Patsakpol Thongpool) তার গাড়ী করে আমাদের আগেই দ্রুত রওনা দিল; কারন সিরিরাজ হাপপাতালে তার সহধর্মিনী মিসেস পাতসাকপোল (Rungkanit Thongpool) তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। উল্লেখ্য, মিসেস পাতসাকপোলও আমাদের সাথে পিএইচডি করছেন, সেই সাথে উনি সিরিরাজ হাসপাতালে একজন সিনয়র নার্স হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। 

বিকেল চারটার দিকে আমরা সবাই সিরিরাজ হাসপাতাল প্রাঙ্গনে পৌছঁলাম। হাসপাতাল প্রাঙ্গনে আমাদের সাথে মিস্টার এবং মিসেস পাতসাকপোল যোগ দিল। সে এক অভূতপূর্ব আবেগগগন দৃশ্য ! হাজার হাজার মানুষ মহামান্য রাজা ভূমিবলের ছবি আর গোলাপী রঙের টি-শার্ট পরে রাজার জন্য প্রার্থনা করছে; আর চিৎকার করে বলছে “সঙ প্রা চারন” (song pra charon), যার অর্থ হচ্ছে ‘মহামান্য রাজা দীর্ঘজীবি হউক’ (Long Live the King)। রাজার দ্রুত আরোগ্য কামনার এই প্রাথর্নাস্রোতে দেখলাম, কেউবা ‘মহামান্য রাজা দীর্ঘজীবি হউক’ বলে চিৎকার করতে করতে মূর্ছা যাচ্ছে; আর কেউবা রাজার আরোগ্য কামনা করে গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে ভাবনা (meditation) করছে; আর কিছু মানুষ প্রচলিত থাই রীতিতে হাতজোড় করে ফুল আর মোমবাতি জ্বালিয়ে রাজার আরগ্যলাভের জন্য প্রার্থনা করছেন। এই জনস্রোতের কিছুক্ষন পরপর কিছু জনতা রাজার জন্য প্রচলিত বিশেষ সমবেত সংগীত আর থাইল্যান্ডের জাতীয় সংগীত গাইতেছিলেন।



সিরিরাজ হাসপাতাল প্রাঙ্গনে তোলা ছবি (বাম থেকে ডানে)ঃ জয়েন্তু চাকমা, মিস্টার পাতসাকপোল (Patsakpol Thongpool), মিসেস পাতসাকপোল (Rungkanit Thongpool), মিসেস শামসুখের ( Toey Sermsook P) এবং আমি

ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক সন্ধ্যা সাতটা। রাস্ট্রীয় গনমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে ঘোষনা আসল যে, থাইদের প্রানপ্রিয় রাজা ভূমিবল তাদের মাঝে আর নেই। সে এক অশ্রুসিক্ত হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সিরিরাজ হাসপাতাল প্রাঙ্গন হাজার মানুষের কান্না শব্দে ভারী হয়ে এসেছে। আমার পাশে থাকা আমার থাই ক্লাশমেট মিসেস শামসুখ , পাকসাপোল আর তার সহধর্মিনি চোখ মুছছে আর সাধারন জনতার মত বলছেন, আজ আমরা থাই জাতির একজন সৎ, ন্যায়পরায়ন আর নীতিবান অভিবাবককে হারালাম। একসাথে যে হাজারো মানুষ কোন মানুষের জন্য কান্না করতে পারে, সেটা সিরিরাজ-হাসপাতাল প্রাঙ্গনে না গেলে আমার কাছে হয়ত অবিশ্বাস ঠেকাত। সেইসময় আমার থাই-ক্লাশমেট মিসেস শামসুখ আমাদেরকে বললেন, চিরসত্য যে সবাইকে একদিন এই ইহধাম ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু,, কিছু কিছু মৃত্যু বিশেষ অর্থবহন করে; যেমনটা হয়েছে মহামান্য থাই রাজা ভূমিবলের মহাপ্রয়ান। একটা ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয় যে, সাধারন থাই মানুষদের সাথে অনেকগুলো বিদেশীও সিরিরাজ প্রাঙ্গনে জড়ো হয়েছিল আর তারাও রাজার মৃত্যুর খবর শোনার সাথে সাথে থাইদের মত চোখ মুছঁছিলেন। সেই সাথে হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম যে আমি আমার চোখ মুছঁছি, সেইসাথে আমার পাশে থাকা আরেক বাংলাদেশী জয়েন্তুও।


পরেরদিন সকালে, ১৪ই অক্টোবর, শুক্রবার, আমি আমার থাই বন্ধুদের সাথে রাজকীয় শোভাযাএা দেখার জন্য ব্যাংককের রাজবমন্দির ওয়াট প্রাকেয় (wat phra kaew, the temple of emerald Buddha) মাঠে উপস্থিত হলাম। সেইদিনও আমার সাথে যথারীতি জয়েন্তু আর আমাদের আরেক ক্লাশমেট মিস জেজা (Sawapa Jeeja) এবং পাঙ্গাস্বামী (Ashin Pannasami) রাজমন্দিরের মাঠে ছিল। দুপুর দুইটার দিকে রাজার মরদেহ বহনকারী গাড়ীটি অন্যান্য রাজপরিবারের সদস্য আর কর্মকর্তাদের গাড়ীবহরের সাথে সিরিরাজ হাসপাতাল থেকে ওয়াট প্রাকেয় সংলগ্ন রাজপ্রাসাদে (royal grand palace) রওনা দিল। রাজশোভাযাএার সময় দেখা গেল যে, হাজার হাজার মানুষ হাতজোর করে হাটুঁগেরে রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে বসে রাজার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। রাজশোভাযাএার আগে অবশ্য কর্তব্যরত নিরাপরাপত্তাকর্মীদের কাছ থেকে ঘোষনা ছিল যে, সবাই যেন নিরবতা পালন করে আর হাঁটুগেরে হাতজোর করে বসে প্রয়াত রাজার জন্য প্রার্থনা করে। রাজশোভাযাএার সময় আমি যে ব্যাপারগুলো প্রত্যক্ষ করলাম তা আমার কাছে রীতিমত বর্ননাতীত। লক্ষ লক্ষ মানুষ কিভাবে অদ্ভুতভাবে নিরব আর সুশৃঙ্খলভাবে অবস্থান করতে পারে- সেটা আমার কাছে এখনও বিস্ময়। রাজার মরদেহ বহনকারী যখন অন্যান্য রাজকীয় গাড়ীবহরের সাথে যাচ্ছিল, লক্ষ লক্ষ মানুষ অপূর্বভাবে সারবদ্ধ হয়ে নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে প্রয়াত রাজা ভূমিবল আর দেশের কল্যানের জন্য প্রার্থনা করছিল। উল্লেখ্য, সব মানুষ কালো পোশাকে আচ্ছাদিত হয়েই এসেছিল। সেই সাথে আরও কিছু ব্যাপার না বললেই নয় যে, থাই মানুষদের নম্রতা আর ভদ্রতা; এত মানুষের ভীড়ের মধ্যেও তারা কোনরূপ বিশৃঙখলা না করে, খুব সুচারুরূপে সারিবদ্ধ হয়ে রাজশোভাযাএা শেষে বাড়ী ফিরেছিল।

রাজার প্রতি সাধারন মানুষদের আবেগ, শ্রদ্ধা আর ভালবাসা -রাজার মহাপ্রয়ানের সময় আমাকে সত্যিই অভিভূত করেছিল। রাজা ভূমিবল সাধারন মানুষদের ভালবাসা আর শ্রদ্ধার যোগ্যতা রাখেন। আজকে যে উন্নত থাইল্যান্ড আমরা দেখছি, সেটা হচ্ছে রাজার বিচক্ষ্ণতার অভূতপূর্ব নিদর্শন। সাধারন থাই মানুষের মতে, রাজা ভূমিবল ছিলেন দারিদ্র নির্মূলের একজন কান্ডারী; তিনি দারিদ্র নির্মূলের জন্য অজস্র রাজকীয় অনুদান দিয়েছিলেন; সেই সাথে উনার গুরত্বপূর্ন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তুগুলো, যেগূলো পরবর্তীতে থাইল্যান্ডকে আর থাই নাগরিকদেরকে অর্থনৈ্তিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে। জয়তু থাই রাজার দেশপ্রেম ও প্রজাপ্রেম; জয়তু থাই রাজা ভমিবল।
লেখক পরিচিতিঃ সঞ্জয় বড়ুয়া চৌধূরী , পিএইচডি গবেষনারত, মহাচুলালংকর্নরাজাবিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি, ব্যাংকক, থাইল্যান্ড। ই-মেইলঃ This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Additional Info

  • Image: Image