২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১০ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৭ইংরেজী
মঙ্গলবার, 22 সেপ্টেম্বর 2015 18:03

নর-নারী-বৃহ্নলা নির্বিশেষে মানুষ জাগো আপন বোধ ও বুদ্ধিতে : বৌদ্ধ ধর্ম ও সমাজে নারীর অবস্থান

লিখেছেনঃ ড. সুনন্দা বড়ুয়া

নর-নারী-বৃহ্নলা নির্বিশেষে মানুষ জাগো আপন বোধ ও বুদ্ধিতেবৌদ্ধ ধর্ম ও সমাজে নারীর অবস্থান

নগর পরিভ্রমণরত রাজকুমার সিদ্ধার্থের সৌন্দর্যমুগ্ধা এক রাজ কুমারী। নাম কৃষ্ণা গৌতমী। গানের সুরে তিনি গাইলেন-‘যে মা এরূপ ছেলেকে জন্ম দিয়েছেন,তিনি ধন্য। এ ছেলে যে পিতার পুত্র তিনি ও ধন্য। যে নারী এ কে পতিরূপে বরণ করে নিয়েছেন তিনি ভাগ্যবতী।’ কুমার সিদ্ধার্থ এই তরুনীর আনন্দগীতির মধ্যে অনুভব করেন তাঁর নিবৃত্তির প্রয়োজন।

ঊনত্রিশ বছর বয়সে কুমার সিদ্ধার্থ সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। দিনটি ছিল আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাত। ঘুমিয়ে আছেন যশোধরা গোপা। পাশে সদ্যোজাত শিশুপুত্র রাহুল। গোপা ছিলেন তাঁর জন্ম-জন্মান্তরের সঙ্গিনী। সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগের পর থেকে গোপা বিষাদপ্রতিমা, গৈরিক বসনধারিনী, নিরাসক্ত সন্ন্যাসিনী। পরবর্তীতে গোপা ভিক্ষুণী ধর্ম অবলম্বন করে গৌতম বুদ্ধের পূর্বেই পরিনির্বাণ লাভ করেন।

গৌতমের সাধনার প্রথম লগ্নে সুজাতা নামে এক সেনানী কন্যা গৃহবধুর অবদান স্মরণে আসে। নৈরঞ্জনা নদীর তীরে সিদ্ধার্থ কঠোর ধ্যানে মগ্ন। তিনি জরাজীর্ণ শরীর নিয়ে তপস্যার শেষ মুহূর্তে। তাঁর শরীর এতই দুর্বল হয়ে পড়ে যে তিনি কিছুতেই সর্বজ্ঞতা লাভে সক্ষম হতে পারছিলেন না। সুজাতার প্রতিজ্ঞা ছিল পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে তিনি বন-দেবতাকে পূজা দিবেন। তাঁর পুত্র সন্তান লাভ হল। তিনি পায়সান্ন রান্না করে গভীর অরণ্যে এসে ধ্যানমগ্ন সিদ্ধার্থকে দেখলেন। কঙ্কালসার এই সাধককে দেখে তিনি বুঝতে পারলেন তিনিই তাঁর অভীষ্ঠ দেবতা। সুজাতা সোনার থালায় পায়সান্ন সাজিয়ে সিদ্ধার্থের সামনে প্রণত হলেন। ঐ দিনই তিনি শেষ মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হলেন। নারীর সেবা-যত্ন সিদ্ধার্থকে জীবনের প্রথম লগ্ন থেকে সর্বজ্ঞতা লাভে সহায়ক ভূমিকা দান করেছে। সুজাতার কথা গৌতম বুদ্ধ বারবার বলেছেন। এমন কি পরিনির্বাণ লাভের পূর্ব মুহূর্তেও তিনি তাঁর শিষ্য সম্প্রদায়কে, ভিক্ষু-ভিক্ষুণীকে সুজাতার অবদানের কথা বলে গেছেন। যদিও তাঁর বুদ্ধ জীবনের পঁয়তাল্লিশ বছর ধর্মপ্রচারের সময় সুজাতা অনুপস্থিত ছিলেন। সত্যি এটা একটা আশ্চার্যের বিষয় সুজাতাকে আমরা ভিক্ষুণি বা উপাসিকা হিসেবে বুদ্ধের কাছে দেখিনা, কেন? নার একবার ও তাঁর দেখা মেলেনি।

সিদ্ধার্থের বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমীর অনুরোধে তিনি ভিক্ষুণিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করেন। আম্রপালি, অভিরূপ-নন্দা, সুমনা, পটাচারা, শুভা, বিজয়া, ক্ষেমা, চন্দ্রা, উৎপলবর্ণা, সুমেধা, পূর্ণা প্রমুখ থেরীগণ তাঁর ধর্মপ্রচারে এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র।

উপাসিকা বিশাখা, মল্লিকা তাঁদের সর্বস্ব দান করে ভিক্ষুসঙ্ঘকে এবং নিজের ধর্মের ভিত মজবুত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। নারীর কল্যাণী মূর্তি তাঁর ধর্মপ্রচারের পদক্ষেপে জাগ্রত ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায় নারীর অবমূল্যায়ন ঘটেছে। ভিক্ষু এবং ভিক্ষুণী প্রাতিমোক্ষে অনেক পার্থক্য। একজন শতবর্ষীয়া ভিক্ষুণী সদ্য ভিক্ষুত্ব গ্রহণ করেছে এরকম শ্রমণ বা ভিক্ষুকে প্রণাম করতে বাধ্য। যদিও তিনি মার্গফলে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বুদ্ধ কি তা বলেছিলেন? গৌতম বুদ্ধ কিছুই লিখেননি। তাঁর শিষ্য পরম্পরা শোনা কথা নিয়ে পরবর্তীতে সূত্র, বিনয়, অভিধর্মগ্রন্থ বা ত্রিপিটক শাস্ত্র রচনা করেছেন। প্রয়োজনবোধে তা বিভিন্ন সংগীতিতে পরিবর্তন পরিবর্ধন ঘটেছে। বুদ্ধত্ব লাভের পর তিনি বলেছেন ‘মা যেমন একমাত্র সন্তানকে নিজের প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা করেন তেমনিভাবে সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করবে।’ যেখানে বৌদ্ধ ধর্মের মৈত্রী ‘মা’ শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছে সেখানে নারীর প্রতি ঘৃণা, অবমূল্যায়ন আসতে পারে! ভাবতে আশ্চার্য লাগে ‘মা’ হওয়া এক বিরাট অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর সুন্দরতম শব্দ ‘মা’। বুদ্ধ তাঁর প্রতিটি উপদেশে নারীর প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলেছেন। জাতি উন্নত হতে পারে নারীর সম্মান রক্ষায়। বার বার তিনি তা বলেছেন। ‘থেরীগাথা’ বৌদ্ধধর্মে এক অমর অবদান। প্রতিটি থেরী তাঁদের সুখ, দুঃখ, বেদনার মধ্যে অর্হত্ব ফল লাভের কথা বলেছেন যা থেরগাথা’র চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

মৌর্য সম্রাট অশোক তাঁর কন্যা সঙ্ঘমিত্রাকে ভিক্ষুণী করে দূর দেশে ধর্ম প্রচারের জন্যে পাঠান। ভিক্ষুণী সঙ্ঘমিত্রা রাজকন্যা হয়ে বৌদ্ধ ধর্মে অনুপ্রাণিতা হলেন। তিনি ভিক্ষুণীর কঠোর কষ্টকর জীবণ বরণ করে নিলেন। শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরে তাঁর রোপন করা বোধিবৃক্ষের কাহিনী আজও পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে গৌরবময় ভূমিকা বহন করে আছে।
বর্তমানে ভিক্ষুণীসঙ্ঘ বিলুপ্ত প্রায়। হীনযান, মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিভক্তি যদিও কোন ঘাত-প্রতিঘাতের সৃষ্টি করেনি। কিন্তু কালের অবক্ষয়তায় সুশিক্ষিত বৌদ্ধ ভিক্ষুণীর বড়ই অভাব। বিশেষ করে বাংলাদেশে ভিক্ষুণীসঙ্ঘ নেই।

আমাদের সমাজে নারীর অবস্থান নিরাপত্তাহীন। এই নিরাপত্তাহীনতা শুধুমাত্র শারীরিক নয়, আর্থিকও বটে। নারীকে বলা হয় প্রথমে পিতার অধীন, পরে স্বামী বা ভাই সর্বশেষে পুত্র সন্তানের। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যে নারীর নেই সে পরমুখাপেক্ষী। দাসীবৃত্তিই তার একমাত্র অবলম্বন। ভাইয়ের ঘরে, পুত্র সন্তানের, কন্যা সন্তানের এমনকি দুরসম্পর্কের আত্মীয় স্বজনের ঘরে দাসীবৃতি করে পেটের খোরাক জোগায়।
বৌদ্ধধর্ম এমন কি বৌদ্ধসমাজকে আজও উজ্জ্বল করে রেখেছে নারী। যে কোন ধর্মীয় সভায়, ধর্মকাজে নারী অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছে। মায়ের ধর্মীয় আচরণবিধি পরবর্তীকালে সন্তানদের গড়ে তোলে। একজন ধার্মিক পিতার ভূমিকা একজন ধার্মিক মায়ের সমতুল্য।

শিক্ষার এ যুগে পুত্র সন্তান যেমন অগ্রণী ভূমিকা রাখে তেমনি করে কন্যা সন্তানও নিজ পরিবারকে আলোকিত করতে পারে। কাজেই অবহেলা নয় আসুন না আমরা মাতৃজাতির উন্নয়নে এগিয়ে আসি।
মর্যাদাহীন নারীকে শারীরিক ক্ষমতাধর স্বামী যে কোন মুহূর্তে পদদলিত করতে পারে। নতমস্তকে নারীকে তা মেনে নিতে হয়। কারণ এতেই তার সম্মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। নয়তো তার জন্য জমা হতো একরাশ ধিক্কার। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার এ যুগে শিক্ষিত নারী যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানে অবশ্যই তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ বলে একটি বড় আকারের মাহাত্ম্য তাকে শক্তি দান করবে। শিক্ষিত এই সমাজ তা মানতে বাধ্য। বর্তমান যুগ প্রতিযোগিতার যুগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগ। এখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার। বিপরীত লিঙ্গ বলে নারী শারীরিক দুর্বলতার জন্যে স্বামীর কাছে নির্যাতিত হয়। সত্যি ভাবতে আশ্চার্য লাগে এ সব নির্যাতনের পেছনে থাকে আরেকদল নারী, তারা সতী-সাধ্বী। হিন্দু ধর্মে সতীদাহ প্রথা ছিল। রাজা রামমোহন রায় তা বহু প্রচেষ্টায় বিলুপ্ত করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষা, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করেন। বৌদ্ধধর্মে একটি উন্নত বা প্রোগ্রেসিভ ধর্ম। যে ধর্মে প্রাণী হত্যা নেই, সেই ধর্মে সতীদাহ থাকতে পারে না। সুদূর প্রচীনকাল থেকে বৌদ্ধ নারী শিক্ষিত। তা শুধুমাত্র আক্ষরিক নয়। স্ত্রীর সুন্দর ব্যবহার স্বামী বা শ্বশুড়বাড়ীর সবাই আশা করে। বুঝতে হবে তারও প্রতিদান দিতে হবে। একজন নববধূ দাসী নয়। সে অন্য পরিবারের কন্যা। তাকে সাদরে গ্রহণ করতে হলে মায়া-মমতার প্রয়োজন। সম্পূর্ণ ভিন্ন নতুন পরিবেশ তার সামনে। আজন্ম লালিত পালিত পরিবেশ থেকে নতুন পরিবেশ বুঝতে সময় সাপেক্ষ। জোর জবরদস্তি মূলক চাওয়া পাওয় নারীর জন্য শারীরিক, মানসিক অবমাননাজনক।
বৌদ্ধধর্ম মৈত্রীর ধর্ম, অহিংসার ধর্ম। ঘৃণা নয়, বিদ্বেষ নয়-ভালোবাসাই কাম্য। একটি সুন্দর পরিবার গঠন করতে গেলে দুপক্ষেরই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। কথায় বলে-

‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে
গুনবান স্বামী যদি থাকে তার সনে’

আত্মসম্বরণ করা, বিদর্শন ভাবনার একটি অঙ্গ। নিজেকে নিজে চেনা-জানা। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এই ভাবনা পদ্ধতি। কাজেই আত্মবিশ্বাস, আত্মপ্রত্যয়, মিথ্যা প্রত্যাহার-শিক্ষা এনে দেবে নারীর মর্যাদা। শিক্ষিত গুনবান পরিবারে নারী অবহেলিত হতে পারে না। বুদ্ধের নীতি তা বলে না। প্রগতিশীল সমাজ-জীবন প্রত্যাশা করে সমৃদ্ধতা। শালীন নারীর পাশে মর্যাদাবান পুরুষ। বাঙালি বৌদ্ধ সমাজে শিক্ষিতের হার বেশী। বৌদ্ধ ধর্মের আলোক-প্রবাহ এই সমাজকে দিতে হবে নারীর মর্যাদা। পৃথিবীর অন্যান্য বৌদ্ধ দেশেও নারী অগ্রগামী। আশা করব আমাদের সমাজেও নারী যেন তার সঠিক স্থান লাভ করে। মান্ধাতার আমল আজ আর নেই। বর্তমান যুগের প্রেরণা আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করুক নারীকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মানসী’ কাব্য গ্রন্থে ‘পুরুষের উক্তি’ কবিতায় লিখেছেন-

‘প্রাণ দিয়ে সেই দেবীপূজা
চেয়ো না, চেয়ো না তবে আর।’
পাশাপাশি লিখেছেন নারীর উক্তি –
‘আমি কি চেয়েছি পায়ে ধরে
ওই তব আঁখি তুলে চাওয়া’

আগেই লিখেছি যুগ পরিবর্তন হয়েছে। এ যুগ অর্থনৈতিক স্বাধীনতার যুগ। নারী নির্যাতিত হতো তখন যখন তাঁর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছিলনা। স্বামীর সংসারের দাসীবৃত্তিই ছিল তার একমাত্র পেশা এবং সন্তানধারণ। নারী মুক্তির একমাত্র পথ শিক্ষা। শিক্ষা এনে দিবে তাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। পুরুষকে বুঝতে হবে এই নারীও ক্ষমতায় তার চেয়ে কম নয়। দেখা যায় বৌদ্ধ সমাজে অন্য সমাজের অনেক নিয়ম কানুন এসে গেছে। যার মধ্যে বড়ুয়া সমাজে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বাঙালি সংস্কৃতি বলে তা গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে অত্যন্ত নির্দয় প্রথা হচ্ছে ‘সাত পাকে ঘুরানো’ । বুদ্ধ-মন্ত্রের দ্বারা নব দম্পতিকে স্বামীর দাঁড়ানো অবস্থায় স্ত্রী একবার দুইবার বারবার ঘুরানো, হিন্দু রীতি অনুযায়ী প্রণাম করানো, বৌদ্ধ সামাজিক বিধান বা ধর্মে এই প্রথা কোথায়ও নেই। আমার মনে হয় রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বন্ধ করে না দিলে অপ-সভ্যতার অঙ্গ হিসেবে তাও হয়তো এই সমাজে ধীরে ধীরে গ্রহণ করে নিজেদের আলোয় আলোকিত করত।
রবীন্দ্রনাথ ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থে ‘সবলা’ কবিতায় লিখেছেন-

‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার
কেন নাহি দিবে অধিকার
হে বিধাতা?’

এই বিধাতা কে? পুরুষ সমাজ! কোথাও তো গৌতম নারী অবমাননা করেননি। তাই তো দেখা যায় ধর্মে কর্মে সর্বাধিক উপস্থিতি নারীর। বিদর্শন ভাবনা কোর্স করেন নারী উপাসিকা। আমাদের শ্রদ্ধাভাজন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এই নারীদের খুঁজে পেতে নিয়ে আসেন ভাবনা করার জন্য। চির দুঃখিনী নারীরও মুক্তির পথ হিসাবে ভাবনায় নিরত হয়। তাকে বলা হয়-কঠিন চীবর দান কর। তাহলে জন্ম-জন্মান্তরে নারী হতে হবে না। অত্যন্ত হাস্যকর এই উক্তি। নারী দশ মাস দশ দিন গর্ভধারণ করে যে সন্তান প্রসব করে তা পুরুষ পারে না। একমাত্র নারীই পারে ধৈর্য্যের সঙ্গে সন্তানের লালন পালন। বুকের রক্ত দিয়ে সন্তানের শ্রীবৃদ্ধি। পৃথিবীতে তাই ‘মা’ হতে পারা অত্যন্ত গৌরবের। এই অভিজ্ঞতা পুরুষের নেই। নারী বলতে চায়-
‘ফেলে দেব আচ্ছাদন দুর্বল লজ্জার।’
তাই নারী বলে-
‘হে বিধাতা, আমারে রেখো না বাক্যহীনা-
রক্তে মোর জাগে রুদ্রবীণা।’

সময় এসেছে অনেক আগেই। ‘পালা বদলের পালা।’ পরিবর্তনের ঘটেছে দেশে দেশে, সমাজে। নারীকে মানুষ বলে জানতে হবে। সে ভারবাহী গরু গর্দভ নয়। সন্তান ধারণ, পুরুষের ভোগের বস্তু নয়। কামুক পুরুষ তার দেহ ভোগ করবে। প্রতিদানস্বরূপ সময়ে আদর, সময়ে লাথি তা কি হতে পারে? অবশ্যই না। মর্যাদাবান পুরুষ কোন দিন তা ভাবতে পারে না। তাকে বুঝতে হবে আমার বীর্যে যে নারী আমার সন্তানের ‘মা’ সে আমার জীবন সঙ্গীনি। একদিন বাসরকক্ষে ভালোবাসাহীন দেহভোগে প্রায় প্রতিটা পুরুষ পিতৃত্বের অধিকারী হয়। যদি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে তাহলে গর্বে বুক ফুলে ওঠে। ‘আমি পুত্র সন্তানের পিতা’- একবার ও ভেবে দেখে না কন্যা সন্তানও তারই প্রডাকশন। যতদিন না মা স্বীকার করে এই সন্তানের জন্মদাতা তাঁর স্বামী ততদিন বড় সহজ নয় পিতার অধিকার দাবী করা। অথচ এই মা কে সবাই দেখেছে ধীরে ধীরে তার গর্ভের সন্তান বড় হচ্ছে। পিতা হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ। মা হওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। পেটে ধারন করা থেকে সন্তান মানুষ করতে যে মা পেরেছে তার জীবন সার্থক। বলা হয় সিদ্ধার্থ গৌতমের মা মহামায়া দেবী স্বর্গলোকে দেবপুত্র হয়ে জন্মলাভ করেছিলেন। দেবকন্যা নয়। এসব হচ্ছে শোনা কথা। বুদ্ধ নিজে বলেছেন কিনা, তা কতটুকু সত্য বলা যায় না। সুতরাং বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। কথায় বলে শোনা কথায় বিশ্বাস করতে নেই। এভাবে নারী-জীবনকে ঘৃণা, নিন্দা, অপবাদ অহরহ চলছে। কীভাবে তাকে পদদলিত করা যায় তার অপচেষ্টা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।
আজকের নারী যা ভাবছে আলোচনা করে দেখা গেছে তারা পুরুষের নির্যাতন কে একটি মহত্তম কাজ মনে করে। অবশ্য তার কারণও আছে। ধৈর্যশীলা নারী তার পেটের দায়ে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সংসারকে সুখে রাখার জন্যেই এই পাশবিক নির্যাতন সহ্য করে। অন্য কোন ধর্মীয় যুক্তি নেই।
তবে নারী মুক্তি যে-দিন ঘটবে সেদিন পুরুষ সমাজ সত্যই মেনে নেবে-মেয়েরাও মানুষ। তাই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়-

‘যাব না বাসরকক্ষে বধূ বেশে বাজায়ে কিঙ্কিণী
আমারে প্রেমের বীর্যে করো অলঙ্কিনী।’

প্রবন্ধ'টি 'গৌতমী' ১ম বর্ষ -১ম সংখ্যা থেকে সংকলিত।
লেখকঃ ড. সুনন্দ বড়ুয়া, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

Additional Info

  • Image: Image