২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১১ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 25 জুন 2015 01:52

কাঞ্চন বড়ুয়ার অন্তিম যাত্রা, কিছু স্মৃতিকথা

লিখেছেনঃ শতদল বড়ুয়া

কাঞ্চন বড়ুয়ার অন্তিম যাত্রা, কিছু স্মৃতিকথা

রোজকার মতো বাড়িতেই বিশ্রামে রয়েছি। গাড়ি দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত লাগার কারণে। বলতে গেলে গৃহবন্দী। চিকিৎসক পা ব্যান্ডিজ করে দিয়েছে ২১ দিনের জন্যে। আমার ছোট ভাই প্রশান্ত বললো-কাঞ্চন মারা গেছে (আজ অর্থাৎ শুক্রবার, বাংলাদেশ সময় সকাল দশটায়)। কাঞ্চন বড়ণ্ডয়া সুদূর আমেরিকায় গেছে সপরিবারে। সেখানে সে কঠিন রোগে ভুগছিলো বেশ কিছুদিন যাবত। আমি তার পারলৌকিক সদগতি কামনা করি। ফটিকছড়ি উপজেলার সর্বশেষ দক্ষিণ সীমানায় রয়েছে বৌদ্ধ অধ্যুষিত কোঠেরপাড় গ্রাম। অগ্রিমের বৌদ্ধ পরিবারগুলো এক সমাজ, এক মন্দির এবং এক মতের পথিক সীমা নির্ধারনের কারণে কাঞ্চন বড়ণ্ডয়া জাফতনগর প্রকাশ জাহানপুর ইউনিয়নের অধিবাসী, আমি (শতদল বড়ণ্ডয়া) ধর্মপুর ইউনিয়নের অধিবাসী। কিন্তু সূত্র একটাই আমরা কোঠেরপাড় গ্রামবাসী। আমাদের পূর্ব-পুরুষদের দেয়া দিক-নির্দেশনা মতে আমরা সেই পথেই চলে আসছি। আগামী প্রজন্মকেও এ পথ অনুসরনের শিক্ষা দিচ্ছি। মোট কথা কোঠের পাড় গ্রামের ঐতিহ্য অবহেলার গহ্বরে পড়ে যাতে হারিয়ে না যায় সেই প্রতিজ্ঞা আমরা করেছি।

এ গ্রামেরই স্বনামধন্য সমাজসেবক প্রয়াত পাঁচকড়ি বড়ণ্ডয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান প্রয়াত কাঞ্চন বড়ণ্ডয়া। কোঠেরপাড় বৌদ্ধ সমাজে রয়েছে “কোঠেরপাড় বৌদ্ধ কল্যাণ সমিতি” নামে একটা শক্তিশালী কমিটি। কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার এ কমিটির সভাপতি ছিলেন। প্রয়াত কাঞ্চন বড়ণ্ডয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কোঠেরপাড় বৌদ্ধ কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

কাঞ্চন বড়ুয়া বহুবিধ গুণের অধিকারী ছিলেন। তাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমাকে সম্বোধন করতো শতদলদা হিসেবে। আমি বলতাম ভাই কাঞ্চন। যদিও সে আমার চাচাতো ভাই হতো, আত্মীয়তার সূত্রে তালতো। কাকা প্রয়াত পাঁচকড়ি বড়ণ্ডয়া যেমন দৃঢ়চেতার সমাজসেবক ও জনদরদী ছিলেন, তেমনি তাঁর ছেলে কাঞ্চন বড়ণ্ডয়া কোনো অংশে কম ছিলেন না। সমাজসেবার জন্য কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার ত্যাগ আমি কোনো দিন ভুলবো না। দেশের তথা সমাজের মানুষের ডাকে সাড়া দিতে অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে, সময়ের সমস্যা সময়েই সমাধানকল্পে তালতো কাঞ্চন বড়ণ্ডয়া সরকারি চাকরি ছাড়তেও এক মুহূর্তের জন্যেও চিন্তা করেননি। সমাজে এ ধরনের ত্যাগী মানুষ আমি তেমন একটা দেখিনি। ধর্মপরায়ণ কাঞ্চন বড়ণ্ডয়া আমাকে বলতো-পরিবারের চিন্তা করি না, এদের জন্যে বুদ্ধ রয়েছেন, তিনিই তাদের চালাবেন, আমিতো উপলক্ষ মাত্র।

কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অতিদ্রুত দেশ ও সমাজের লোকদের কাছে পরিচিত লাভ করা। জাতীয় বা স্থানীয় কোনো পত্রিকার কাজে সম্পৃক্ত না থেকেও সাংবাদিকদের সাথে কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার হ্রদ্যতা ছিলো অকল্পনীয়। যার কারণে অধিকাংশ লোকের কাছে সেই সাংবাদিক হিসেেেবও পরিচিতি পায়। চাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আজকের সূর্যোদয়ের চট্টগ্রামের বিশেষ প্রতিনিধি হওয়া থেকে তার ভাগ্যের চাকা অধিকতর সচল হয়। মানুষকে আপন করে নেয়া ছিল তার আরেক বৈশিষ্ট্য। যার ফলশ্রুতিতে কাঞ্চন প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্রে অবাধে বিচরণ করতো। কাঞ্চনের কাছে আমি ছিলাম একজন সৎ ও বিশ্বস্ত লোক। সে আমাকে অনেক গোপন কথা বলে পরামর্শ চাইতো। প্রথমে পরামর্শে মতের অমিল দেখা দিলেও সে নিজেই আবার পরামর্শ মেনে নিতো। মাঝে মাঝে বলতোণ্ড ভাগ্যিস শতদল দা, আপনার পরামর্শ মোতাবেক কাজ করায় অমুক কাজে সফলতা এসেছে, আপনাকে ধন্যবাদ।

কাঞ্চনের বিষয়ে এতো কিছু জানি, যা লিখলে দুই-তিনদিনেও শেষ হবে না। তার মৃত্যু সংবাদ শুনে লিখতে বসে কেনো জানি তালগোল হারিয়ে ফেলছি, গুছিয়ে লিখতে পারছি না। কোঠেরপাড় গ্রামবাসী তথা বৌদ্ধ জনসাধারণ থেকে আর দ্বিতীয় কাঞ্চন উঠে আসবে কিনা আমি জানি না। তবে কোঠের পাড়ের বৌদ্ধ জাতিরা হারিয়ে ফেললো এক সুখ-দুঃখের সাথীকে। তাই বলবো-কোঠেরপাড় বৌদ্ধ কল্যাণ সমিতি তথা কোঠের পাড়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়লো অতি অল্প বয়সে।

কোঠেরপাড় গ্রামবাসি, কোঠেরপাড় বৌদ্ধ কল্যাণ সমিতির সকল কর্মকর্তাবৃন্দ কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারের প্রতি জানাচ্ছে সমবেদনা। কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার মৃত্যু শোক তার পরিবার কাঠিয়ে উঠতে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাই আমরা।

তালতো কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার সাথে আমার সর্বশেষ কথা হয় তারই প্রতিষ্ঠিত আন্দরকিল্লার কণিকার সামনে। আমি বললাম তালতো, একটা সাপ্তাহিক পত্রিকার ‘ছাড়পত্র’ পেলাম। কাঞ্চন বললো এর সম্পাদক ও প্রকাশক কে কে? আমি বললাম- সম্পাদক ও প্রকাশক আমি নিজেই পত্রিকার নাম কি? বললামণ্ড ‘সাপ্তাহিক কর্ণফুলীর দর্পণ’। সাথে সাথে কাঞ্চন ডানহাত বাড়িয়ে করমর্দন করে বললোণ্ড সাব্বাস তালতো, আপনাকে অভিনন্দন। আর কারো গোলামী করতে হবে না, আপনার অর্জন এবং সম্পদ পুত-নাতিরা খেয়েও শেষ করতে পারবে না। আমি বেশ খুশি হলাম, দাদা আশীর্বাদ করবেন আমার জন্যে। আজ বুঝতে পারলাম সেদিন কেনো তালতো কাঞ্চন আমার আশীর্বাদ চেয়েছেন। ভাই কাঞ্চন তোমাকে ওটফর্লণ জানাই, ওটফর্লণ জানাই তোমার ধৈর্য্য ও মনোবলকে। সাপ্তাহিক কর্ণফুলীর দর্পণ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়াত কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার পরিবারের প্রতি জানাই সমবেদনা। প্রয়াত কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার দূরদর্শিতা এতোই প্রখর ছিলো, যা তার কর্মকাণ্ডে প্রমাণিত হয়? তাকে নিয়ে হয়তো আরো অনেকে লিখবেন, উঠে আসবে নানা অজানা তথ্য। এ জন্যে আমি নিজে স্বীকার করছি, কাঞ্চন বড়ণ্ডয়াকে নিয়ে তেমন তথ্য-উপাত্ত লিখতে পারলাম না। এতে প্রধান অন্তরায় হলো আমার মানসিক অবস্থা। কাঞ্চন বড়ণ্ডয়াকে কখনো মলিনমুখে দেখিনি। সদা হাস্যমুখের এ মানুষটি একা চিরকালের জন্যে চলে যাবে ভাবতেও পারিনি। রাজসি প্রবর বাহারি চালচলনেতা ছিলো না কোনো জুড়ি। কাঞ্চন বড়ণ্ডয়ার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে আহ্বান জানাই কোঠেরপাড় গ্রামবাসীসহ তার শুভাকাঙক্ষীদের।

উল্লেখ্য, কাঞ্চন বড়ণ্ডয়া গত শুক্রবার (১৯ জুন ২০১৫) বাংলাদেশ সময় সকাল দশটায় আমেরিকার বোস্টনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে কাঞ্চন বড়ণ্ডয়া স্ত্রী দুই পুত্র, ভাইবোনসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন রেখে যান।
লেখক ঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

সৌজন্যেঃ দৈনিক আজাদী

Additional Info

  • Image: Image