২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১০ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 21 জুন 2015 03:24

বাবা...! তুমি আজ কত দূরে : সুলেখা বড়ুয়া

লিখেছেনঃ সুলেখা বড়ুয়া

বাবা...! তুমি আজ কত দূরে : সুলেখা বড়ুয়া

২০০৩ সালর ২৩শে অক্টোবর বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল না ফেরার দেশে। আজ প্রায় বার বছর চলছে। গত ১২ বছর বাবা ডাক থেকে বঞ্চিত। যে সন্তানের উজ্জল ভবিষৎতের জন্য এক সময় সরকারী চাকুরী ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলে এবং নিজের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে তবে কেন সময় না হতেই তোমার সন্তানের সুখের দিনগুলি না দেখে চলে গিয়েছ বাবা? তোমার সন্তানেরা এ বিদায় কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি সেদিন।
তোমাকে হারিয়ে ছোট বেলার স্মৃতিগুলো বেশী মনে পড়ে। আমাদের গ্রামের বাড়ীর দক্ষিণ পাশে বিলের মাঝখানে যে রাস্তা গিয়েছে তুমি বিকেল বেলায় কোলে করে নিয়ে যেতে আমাদের। বিভিন্ন সব্জীর গাছ দেখাতে এবং খালের পাশে যেতে নৌকা দেখাবার জন্য। ধান ক্ষেতের মাঝখানে রাস্তা দিয়ে বাবার কাঁধে করে ঘূরে বেড়ানোর অনুভূতিই অন্যরকম। বিকেলের হিমেল হাওয়াতে হাঁটতে হাঁটতে এরি মধ্যে বাবা শুরু করে দিত গান। রবীন্দ্রসঙ্গীত, কখনো মান্না দে কিংবা হেমন্তের। বাবার মুখে বেশী যে গানগুলো শুনতাম-

• মন মোর মেঘের সঙ্গী
• পথের ক্লান্তি ভুলে
• এবং তুমি আজ কত দূরে

সত্যি বাবা, তুমি আজ অনেক অনেক দূরে আমাদের থেকে। আমার প্রিয় বাবা কমল বিকাশ বড়ুয়া।
শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং আজ অবধি যে টুকু মনে পড়ে. তোমার কাছে শুধু আদর, ভালবাসা এবং প্রয়োজনীয়তা সামর্থ অনুযায়ী পূর্ণ করতে সচেষ্ট ছিলে। তবে যত প্রকারের শাসন ছিলো সব মা করতো, মা কিছু বললে বাবা মাকে বলতো, শাসন করার জন্য তুমি তো আছো। তবে, বাবার শাসন কিংবা উপদেশ ছিল একটু ভিন্ন রকমের যখন পড়ার টেবিলে বসতাম, বাবা মাঝে মাঝে খাতা নিয়ে কিছু লিখে দিত- যেমন-

“ধৈর্য্য বিষের মতো, আগে মনে হয়
পরে কিন্তু তার ফল অতি মধুময়।
রাজার চেয়ে সুখী দীন দু:খীজন
সন্তোষ সুধায় ভরা যাহাদের মন।“

“প্রাণী হত্যা মহাপাপ।“
একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাবা আমি যদি না জেনে কিংবা না বুঝে প্রাণ আছে এমন জীবন হত্যা করি তাহলে কী আমার পাপ হবে ? তখন বাবা আমাকে উপমা দিযে বুঝিয়ে দিল, তুমি যদি বাবা না জেনে না বুঝে আগুনে হাত দাও, তখন তোমার হাত পুড়ে যাবে না? আমি বললাম হুম, যাবে তো। ঠিক তেমনি জেনে কিংবা না জেনে পাপ করলে সব পাপের কর্মফল ভোগ করতে হবে অবশ্যই। এই ভাবে অন্য একদিন লিখে দিয়েছিল,

“অবোধের বৃথা জন্ম। “
এই উক্তি যদিও বাল্য শিক্ষা বইয়ের। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের জন্য কথাটি যুক্তিযুক্ত। বৌদ্ধ ধর্ম হচ্ছে জ্ঞানীর ধর্ম। অজ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রই অবোধের সামিল। তাদের জন্ম বৌদ্ধ ধর্মে কিংবা অন্য ধর্মে হলেও বৃথা।
পঞ্চশীরের নীতিগুলো বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করে লিখে দিত। এভাবে আরো কত লেখা লিখে দিয়েছে। যখন নিজে নিজের ভাল মন্দ একটু একটু বুঝতে কিংবা জানতে শিখেছি তখন বুঝে নিয়েছি বাবার শাসনটা হচ্ছে এমনি।

পঞ্চশীলের নীতিগুলো বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করে লিখে দিত। এভাবে আরো কত লেখা লিখে দিয়েছে, যখন থেকে নিজে নিজের ভাল-মন্দ একটু একটু করে বুঝতে বা জানতে শিখেছি তখন বুঝে নিয়েছি, বাবার শাসনটা হচ্ছে এমনটি।
মায়ের কাছে জেনেছি, জীবন তুমি কোনদিন জাল এবং রশি কোনটাই হাতে তুলে নাও নি। কারণ তোমার হাতে যেন কোন প্রাণী হত্যা না হয়, আমার বুদ্ধি বয়সে তোমাকে কোনদিন বাজার থেকে জীবিত মাছ আনতে দেখিনি। বাজারে কোনদিন অন্য কাউকে পাঠালে যদিও জীবিত মাছ দু-একটা থাকলেও মাকে দেখেছি পুকুরে নিয়ে ছেড়ে দিতে।

এভাবে বাবার কাছ থেকে শেখা এবং মা-বাবা এ দুজনের কাছ থেকে আচরণগুলো দেখা দুই মিলে আজ আমরা মোটামুটি বুদ্ধের ধর্ম যথাযথভাবে আচরণ করতে সচেষ্ট। ছেলে ছিলো না বলে তোমাদের কখনো আক্ষেপ করতে দেখিনি। বাবা সব সময় বলতো মেয়ৈরা প্রতিষ্ঠিত হলে ছেলের মতোই। তবে, বাবা-মাকে কোনদিন বিয়ে নিয়ে চিন্তা করতে দেখিনি। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট চিন্তা করতো।

কর্মক্ষেত্র থেকে যেদিন আমার জাপান যাওয়ার সুযোগ এসেছিলো, সেদিন বাবাকে আমি প্রণাম করে যখন বললাম, বাবা আমার জাপান যাওয়ার টিকেট নিশ্চিত হল। বাবা তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল কে বলেছে আমার ছেলে নাই এই যে, আমার ছেলে কর্মক্ষেত্রে থেকে জাপান যাবে। চিৎকার করে সেদিন মাকে বলেছিলে, সেদিনের আনন্দ-ঘন মূহুর্তটা মনে হলে, আজও গর্বে বুকটা ভরে ওঠে। কে বলেছে বাবা তুমি নাই, তুমি আছ আমাদের সবার অন্তরে।

যেদিন তোমার কথা বেশি মনে পড়ে তখন তোমার প্রিয় গান- মন মোর মেঘের সঙ্গী – গানটি কতবার শুনি আমি নিজে ও জানি না। গানটি আমারও খুব প্রিয় বাবা। যখন এটা শুনি, তখন মনে হয় তুমি আশে পাশে কোথাও আছ এবং আমার সাথে তুমিও শুনতেছ।

বাবা তোমার ভালবাসাটা দেখা যায় না, তবে খুব অনুভব করা যায়। একদিন মা “মিলিন্দ প্রশ্ন” বইটা পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো বলে বইটা সংগ্রহ করে নিজের হাতে লিখে বাঁধাই করে মাকে উপহার দিয়েছিলে। মায়ের প্রতি তোমার এমন ভালবাসা আমাদের কাছে চিরদিন অমলিন হয়ে থাকবে।
বাবা যখন অবসর নিয়েছিল, তখন প্রিয় (ধর্মীয়) সংগ্রহ গুলো নিজের হাতে লিখে আরো চারটি বাঁধাই করা বই মাকে উপহার দিয়েছে এই ভাবে আমাদের সব বোনদেরকে ও উপহার দিয়েছে ১/২ টি করে বাঁধাই করা বই।

যতদূর জানি, তালসরা-মুৎসদ্দীপাড়া বিবেকারাম বিহারের শ্রদ্ধেয় শাসনমিত্র মহাস্থবির, বর্তমানে ঢাকা বাড্ডা মন্দিরের শ্রদ্ধেয় ধর্মমিত্র মহাস্থবির এবং তালসরা আনন্দরাম বিহারের শ্রদ্ধেয জিনরতন স্থবির মহোদয় উনাদের কাছেও তোমার সংগ্রহগুলি খুউব যত্ন সহকারে আছে যা উনাদের উপহার দিয়েছিলে।

বাবা তুমি দু-বার বিদর্শন ভাবনার কোর্স সমর্পন করে অন্ত:ত নির্বাণের বীজ বুনে গিয়েছ, ওটা মনে হলে আমরা খুব প্রীতি অনুভব করি।

তুমি যেখানেই থাক না কেন বাবা, আমাদের সমস্ত পূর্ণরাশি তোমাকে দান করছি। এই পুর্ণ্যর প্রভাবে দু:খ থেকে মুক্তি লাভ করে চির শান্তি নির্বাণ লাভের হেতু হউক।

বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবা প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই।
চক্রবাল বাসী সুখী হউক এবং দু:খ থেকে মুক্তি লাভ করুক।

Additional Info

  • Image: Image