২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
বুধবার, 18 মে 2016 02:43

বৌদ্ধ ভিক্ষু খুন

লিখেছেনঃ ভোরের কাগজ, সম্পাদকীয়

বৌদ্ধ ভিক্ষু খুন

মুসলিম পীর, খ্রিস্ট ধর্মযাজক, হিন্দু পুরোহিত হত্যার পর এবার বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যা। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশরী বৌদ্ধ বিহারের প্রধান ভিক্ষু মংসই উকে (৭৮) মন্দিরে ধ্যানরত অবস্থায় নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। গত শুক্রবার রাতের কোনো এক সময় চাকপাড়া মন্দিরে এ হত্যার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চাকপাড়া বৌদ্ধ মন্দিরটি দুই বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মন্দিরের নির্জন স্থানে বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের অংশ হিসেবে তিনি দুই বছর ধরেই সেখানে ধ্যান করছিলেন। তিনি মন্দিরে একাই থাকতেন। ধর্মীয় নেতা হিসেবে এলাকায় সম্মানের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন তিনি। কারো সঙ্গে তার ঝগড়াবিবাদ কিংবা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো শত্রুতা ছিল না বলে দাবি নিহত ভিক্ষুর পরিবারের। ইতিপূর্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত পীর পুরোহিত যাজক হত্যার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের ধরনের মিল রয়েছে বলছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বা গলা কেটে নৃশংসভাবে ঘটানো হয়েছে এসব হত্যাকাণ্ড। উদ্দেশ্যমূলকভাবে সুপরিকল্পিতভাবেই ঘটানো হচ্ছে এসব হত্যাকাণ্ড। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে চললেও হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না, বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এরকম চলতে থাকলে মানুষের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়তেই থাকবে, দেশ পরিচিতি পাবে উগ্রবাদী খুনিদের অভয়ারণ্য হিসেবে- যার পরিণতি ভয়াবহ।

ভিক্ষু হত্যাকাণ্ডে প্রশাসন প্রধান সন্দেহের তালিকায় আনসারুল্লাহ বাংলাটিমকে রেখেছে। স্থানীয়রা মনে করছে, সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি বিনষ্টের জন্য কোনো মৌলবাদী গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। এ ক্ষেত্রে দেশে থাকা মায়ানমারের রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠনকে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা থাকলে কিংবা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বা ধর্মীয় উগ্রবাদকে উসকে দেয়ার জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকলে বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। গত কয়েক বছর দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ইমাম-মুয়াজ্জিন, পীর-পুরোহিত-যাজকদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে চলছে। গত ৫ বছরে দেশে অন্তত ২২ জন ইমাম-মুয়াজ্জিন, পীর-পুরোহিত-যাজক, ভিক্ষু খুন হয়েছেন। এভাবে একের পর এক হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটলেও এর কোনো কিনারা করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চলমান সন্ত্রাসী তৎপরতা ঠেকাতে, দায়ীদের শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। খুনিদের ধরতে ও ‘হত্যার উৎসব’ থামাতে সরকার ও পুলিশ-গোয়েন্দাদের অসহায়ত্বই প্রকট হয়ে উঠছে। নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশকে একটি সা¤প্রদায়িকভাবে অসহিষ্ণু, ধর্মীয় বা সম্প্রদায়গত সংঘাত-সংকুল অনিরাপদ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় রত রয়েছে একটি মহল। তাদের সঙ্গে রয়েছে উগ্রপন্থীরা। সারা বিশ্বেই চলছে এই উগ্রপন্থীদের তাণ্ডব। এ দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় গুরুদের ওপর হামলার ঘটনায় বিভিন্ন উগ্রপন্থী ইসলামি সংগঠনের নাম উঠে আসছে। উগ্রবাদী সংগঠনের দায় স্বীকারের বিবৃতি প্রকাশ পাচ্ছে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে। তারপরও খুনিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। শনিবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা রেহাই পাবে না। তাদের খুঁজে বের করে অবশ্যই সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হবে। সরকারের ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের এরকম আশ্বাসবাণী মানুষকে আশ্বস্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়। একমাত্র খুনিদের চিহ্নিত করা ও বিচারে শাস্তি দেয়ার দৃষ্টান্তই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে পারে। সরকারের উচিত পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে সেমতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করা। খুনি চক্রকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা।

ভোরের কাগজ, সম্পাদকীয় পাতা থেকে, সোমবার, ১৬ মে ২০১৬।

Additional Info

  • Image: Image