২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 17 মার্চ 2016 03:28

শিশু গড়বে নতুন দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ : আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

শিশু গড়বে নতুন দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ : আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ

আজ ১৭ মার্চ, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৬তম জন্মবার্ষিকী। সরকারিভাবে দিবসটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হবে। আজ সরকারি ছুটি। ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সাহসী ও আপসহীন নেতৃত্বে অনুপ্রাণিত হয়েই পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালি জাতি।

কয়েকদিন আগেই বনশ্রীতে মা তার শিশু সন্তান দুইটিকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু ফেব্রুয়ারিতে ২৪ শিশুকে হত্যা করা হয়। পুরো মাস জুড়েই আলোচনার শীর্ষে ছিল শিশু হত্যা ও নির্যাতন।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার ফেব্র“য়ারি মাসের গবেষণা সেলের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী ফেব্র“য়ারি মাসেই শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। ফেব্রুয়ারিতে ৪০ জন শিশু নির্যাতনের স্বীকার হয় এর মধ্যে হত্যা করা হয় ২৪ জন শিশুকে। ১২ ফেব্রুয়ারি নাটোরের বাগাতিপাড়ার মাকুপাড়া বাজারে স্কুলপড়ুয়া তিন শিশুকে রশি দিয়ে হাত বেঁধে নির্মম নির্যাতন করা হয়। একই দিনে রাজশাহীর দুই স্কুল ছাত্রকে চুরির অপবাদ দিয়ে হাত পা বেঁধে ৭ ঘণ্টা ধরে নির্যাতন করা হয়। ২ ফেব্রুয়ারি সদ্যভূমিষ্ঠ ছেলে সন্তানকে চারতলা বাড়ির বারান্দা থেকে ফেলে দেয় তার মা। শুধু নির্যাতন নয় বেড়ে গেছে শিশু হত্যা । ৭ ফেব্র“য়ারি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে দুই বছরের এক শিশুকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুলের ৪ ছাত্রকে পুলিশ বেধড়ক পিটিয়েছে।
১০ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় শিশু কন্যাকে হত্যার পর আত্মহত্যা করে বাবা। ১৬ ফেব্র“য়ারি অপহরণের পর মুক্তিপণ না পেয়ে গাজীপুরে চার বছরের এক শিশুকে হত্যা করা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জের সুদ্রাটিকি গ্রাম থেকে রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয় ৪ শিশু, পরবর্তীতে তাদের লাশ মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া যায়। কিশোরগঞ্জে পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে দেড় বছরের শিশুপুত্রকে হত্যা করে মা। কুমিল্লায় হত্যা করা হয় দুই শিশুকে। ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯ জন শিশু ।

শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১২ সালে ২০৯ জন, ২০১৩ সালে ২১৮ জন, ২০১৪ সালে ৩৫০ শিশু এবং ২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৯১ জন শিশুকে হত্যা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু হত্যার পাশাপাশি শিশু ধর্ষণ, নির্যাতনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যেভাবে চোর অভিযোগে অভিযুক্ত করে নৃশংসভাবে ১৪ বছর বয়সী রাজনকে হত্যা করা হলো। অমানবিক এবং নৃশংসভাবে খুন করা হয় খুলনার ১২ বছর বয়সী গ্যারেজে কর্মরত রাকিব-কে।

শিশু অপহরণ ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বেড়ে গেছে। ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে কিছু কিছু মানুষ শিশুদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। গত চার বছরে ১২ হাজার ৮৫টি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল ২১ হাজার ২২০টি, যা আগের বছরের তুলনায়ও বেশি। বিশ্বায়নের কুফল পড়তে শুরু করেছে আমাদের সমাজে। শুধু সামাজিক বন্ধন ও মূল্যবোধই নয়, বদলে যেতে শুরু করেছে মানুুষের আচরণও। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজ ও সংসারে। মানুষের মধ্যে সুকুমারবৃত্তির চর্চা উঠে গিয়ে মানবিক বোধশূন্য হয়ে পড়ছে মানুষ।
দেশে সম্প্রতি শিশু হত্যা ও অপহরণের ঘটনায় শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চেয়ারম্যান বলেন, অপরাধীরা নিজেদের স্বাথর্ চরিতার্থ করার জন্য ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। তিনি বলেন, শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো অপরাধ প্রতিরোধ করতে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সচেতনতাই পারে কেবল এ ধরনের সংকট থেকে উদ্ধার করতে।
দেশে একের পর এক শিশু হত্যার ঘটনা অতীতের যে কোনো সময়কে হার মানিয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়, বেকারত্ব, অনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, অনলাইন প্রযুক্তির কুপ্রভাব, অনৈতিক জীবনযাপন, পাচার, বিরোধ-শত্রুতা, ব্যক্তি স্বার্থপরতা, লোভ, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এর জন্য দায়ী। বাংলাদেশে শিশু হত্যা এবং শিশুর প্রতি নির্মমতা বেড়েই চলছে৷ কঠোর আইন করেও কমানো যাচ্ছে না শিশুর প্রতি অমানবিক আচরণ৷ এ সব শিশু হত্যা বা শিশু নির্যাতনে আত্মীয়-স্বজন, এমনকি পরিবারের সদস্যরাও জড়িয়ে পরছেন৷
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সবকিছুর পরিবর্তন হলেও মানবিকতা বা মানবতাবোধ উন্নত হচ্ছে না৷ শিশুরা দুর্বল বলে স্বার্থ আদায়ের জন্য তাদের নির্যাতন এবং হত্যা করা হচ্ছে৷ আমাদের মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে৷ আর এর সঙ্গে কাজ করছে বিচারহীনতা৷ মানুষ এক ধরনের ‘কর্পোরেট কালচার'-এর প্রভাবে স্বার্থের জন্য যে কোনো কিছু করছে৷ কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এর পরিবর্তন আনতে হবে৷ পুলিশকে শিশুবান্ধব হতে হবে৷ শিশুবান্ধব হতে হবে সমাজ এবং সমাজের মানুষকে৷ তা না হলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না৷''

বিভিন্ন জরীপে দেখা গেছে দেশে শিশু শ্রমিকের ৯৩ শতাংশই গৃহকর্মে নিয়োজিত। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ কন্যা শিশু। একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের জরীপে বলা হয়েছে, ৬-১৭ বছরের মোট চার লাখ ২০ হাজার শিশু গৃহ শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত। এর মধ্যে নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে ৩০৫ জন শিশু। এসব শিশুরা গৃহকর্মে মানসিক, শারীরিক, মৌখিক, যৌন ও অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হচ্ছে। কাজের জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট কোন কর্মঘন্টা নেই। নেই ছুটি। রান্নাঘর, বারান্দা কিংবা পরিত্যক্ত ঘরে থাকার জন্য ঠাঁই হয় শিশুদের। এসব শিশু শ্রমিকরা নির্যাতন ও শোষণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিতে আছে। গবেষণায় বলা হয়েছে গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা প্রাপ্য সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের মধ্যে ৬-১৬ বছরের কিশোরীরা সবচেয়ে বেশী অসহায়। এদের মধ্যে ৯২ ভাগের বেশী শিশু দারিদ্র্যতার কারণে গৃহকর্মে নিজেকে নিয়োজিত করতে বাধ্য হচ্ছে।
কেন হয় শিশু নির্যাতন? সবল দুর্বলের উপর আক্রমণ করবে এটা আমাদের চিরায়ত রীতি হয়ে বার বার চোখের সামনে ধরা দেয়। আজকে যে শিশু কাল হবে সে বিশ্বের রাজা। কিন্তু আমরা কথায় বলি কাজে করি না। আমাদের মূর্খতা, নীচু মনের মানসিকতা এসবের উর্ধ্বে উঠতে পারছে না।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বৃহৎ অংশ পথশিশু। এসব শিশুদের মধ্যে ৮০ ভাগের জন্ম পথে নেই জীবনের নিশ্চয়তা। ৮৫ ভাগ শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। জীবন-জীবিকা পথেই। এসব শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে আছে নানা বিড়ম্বনা। বেঁচে থাকার নিশ্চয়তার জন্য অপরাধী চক্র নানা অপকর্মে পথশিশুদের ব্যবহার করছে। এসব শিশুদের মৌলিক চাহিদার নেই কোন নিশ্চয়তা। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এসব শিশু।
শিশুদের অনেক সমস্যার অন্যতম হচ্ছে যৌন নির্যাতন। দিন দিন কন্যা শিশুদের ধর্ষণ ও নির্যাতনের হার বাড়ছে। এতে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। শিশুরা জানে না কোন স্থানটি তাদের জন্য নিরাপদ কিংবা নিষিদ্ধ। অনেক সময় মনের অজান্তেই অপরাধ করে যাচ্ছে তারা। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে জেনেশুনেই অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। পারিবারিক অসচ্ছলতা, অশিক্ষা, অনিরাপদ অবস্থান, যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাবে শিশুরা অল্প বয়সেই যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। একারণে মরণব্যাধি এইডস সহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কমছে গড় আয়ু। শিশু সুরক্ষার আছে জাতীয় আন্তর্জাতিক আইন। আছে সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্প। বস্তুত এসব অসহায়, দরিদ্র শিশুদের উন্নয়নে এই প্রকল্পগুলো ইতিবাচক কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না।

শিশুদের অধিকার, শিশু নির্যাতন তথা খারাপ কাজ থেকে রক্ষা করা বা সুন্দরভাবে বেড়ে উঠার জন্য, অবহেলা রোধ করার জন্য, শিশু উন্নয়নের জন্য আইন রয়েছে। শুধু সমস্যা যথাযথ প্রয়োগে। শিশুর জন্মের জন্য যেমন আমাদের দায় আছে তেমনি শিশুর জীবনের নিরাপত্তা, তার সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা, তার লালন পালন ও সবরকম দেখভাল করার দায়িত্ব পরিবারের, সমাজের সকল প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ। একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ হিসেবে, একজন মা কিংবা বাবা হিসেবে একটি শিশুকে নির্মম নির্যাতন, মা বাবা কর্তৃক নিজ সন্তান হত্যা আমাদেরকে লজ্জিত করে। শিশু অধিকার লংঘন কমাতে হলে প্রয়োজন সঠিক আইনের প্রয়োগ এবং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ। শিশু হত্যা এবং নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
আমরা চাই আর কোন শিশু যাতে নির্যাতন নিপীড়নের শিকার না হয়। সকল শিশুদের সম-অধিকার বাস্তবায়নে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনকে আরো জোরদার, স্কুল পর্যায়ে কাউন্সিলিং, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ছাড়াও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরো সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। শিশুদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তাদের কল্যাণে এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত করতে সবার আগে তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শিশুরা দেশ ও রাষ্ট্রের সেরা সম্পদ। শিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত পূর্বক সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই।
কারণ বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে মা-বাবার কাছেও সন্তান নিরাপদ নয়। ঠুনকো কারণে যত্রতত্র শিশুদের প্রাণ চলে যাবে কিংবা তারা আনন্দ করতে গিয়ে আহত হবে, নিহত হবে, এরকম খবর যেন আমাদের আর পড়তে কিংবা দেখতে না হয়। অনস্বীকার্য যে, মানবিকতা চর্চার বিষয়টি সমাজ থেকে প্রায় উঠে গেছে।
শিশুদের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না যায় এবং রাষ্ট্র যদি তাদের মেধা বিকাশে ও নিরাপত্তাদানে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় তবে তা দেশের ভবিষ্যতের জন্যও হুমকিস্বরূপ। আমরা চাই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাং আর কোন শিশুহত্যার খবর যেন আমাদের শুনতে না হয়। শিশুরা সুন্দর ভবিষ্যত গড়বে, গড়বে নতুন দেশ এই প্রত্যাশাই করি।

লেখক ঃ কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক।

Additional Info

  • Image: Image