২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ইংরেজী
Clear

22°C

Chittagong

Clear

Humidity: 68%

Wind: 17.70 km/h

  • 23 Nov 2017

    Partly Cloudy 27°C 16°C

  • 24 Nov 2017

    Mostly Sunny 27°C 18°C

বুধবার, 09 মার্চ 2016 03:20

আন্তর্জাতিক নারী দিবস : নারীদের উন্নয়নে বাংলাদেশ

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

আন্তর্জাতিক নারী দিবস : নারীদের উন্নয়নে বাংলাদেশ

৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস । বাংলাদেশ সরকার নারীদের উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কারণে নারীরা ক্রমশঃ উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছেন। ইউএনডিপি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ ১৪২ নম্বরে উঠে এসেছে। ১৮৭টি দেশের মধ্যে আগের বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩। বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকেও এগিয়ে রয়েছে । বর্তমান সরকার নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রচেষ্টা, নারীর দক্ষতা বাড়াতে ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহণ বৃদ্ধিসহ নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, চাকরির ব্যবস্থা করা এবং শতকরা ৫০ শতাংশ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছে। যদি সুষ্ঠু সমন্বয় এর মাধ্যমে কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায় তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে প্রতীয়মান।

পোশাক কারখানার দিকে দৃকপাত করলেই দেখা যাবে, নারী বিপ্লবের একটি বড় ক্ষেত্র এই পোশাক কারখানা সমূহ। প্রায় ৩০ লাখ নারী শ্রমিক নিয়মিতভাবে কাজ করছেন পোশাকখাতে। এছাড়া মোট নারী শ্রমশক্তির হার ২০১০ সালে ছিল ২৪ শতাংশ যা ২০১৩ সালে বেড়ে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকারের বাস্তবমূখী পরিকল্পনার কারণে দেশের নারীরা ধাপে ধাপে উন্নতির দিকে যাচ্ছে ।

উৎপাদন থেকে শুরু করে বণ্টন পর্যন্ত নারীর কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত করতে সরকারের যে আন্তরিক প্রচেষ্টা তারই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছে গ্রামাঞ্চল থেকে সমাজের সর্বস্তরের নারীরা। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী নারীদের অর্থিক প্রণোদনায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলেই অগ্রগতি ত্বরান্বিত হচ্ছে । ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৮৬০ মিলিয়ন ডলার ৫৭ হাজার ৭২২ জন নারীকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ সালে ১৩ হাজার ৮৩১ জন নারীকে ২৩১ মিলিয়ন, ২০১১ সালে ১৬ হাজার ৬৯৬ জনকে ২৫৭ মিলিয়ন এবং ২০১২ সালে ১৭ হাজার ৩৬২ জন নারীকে ২৮২ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ হার প্রতিবছরই বাড়ছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি তহবিল থেকে পুনরায় বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তারা। কোনো জামানত ছাড়াই এসব ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ঋণ পাওয়ার ফলে উদ্যোক্তারা কাজ করতে উৎসাহিত হচ্ছে এবং তারা নিজ উদ্যোগেই গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। যেখানে অনেক বেকার নারীর কর্মসংস্থান হচ্ছে, নারীরা আর্থিক ভাবে সচ্ছল হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

স্বাস্থ্যখাতে ও নারীর উন্নয়ন লক্ষণীয়। যেমন বাংলাদেশে মাতৃ-মৃত্যুর হার এখন ৬৬ শতাংশ কমে এসেছে। দেশে মাতৃ-মৃত্যু হ্রাস করে নারী উন্নয়নের পথকে আরও সুগম করতে কাজ করছে সরকার। দেশব্যাপী ১২ হাজার ৯৫৬টি মাতৃসদন রয়েছে, যাতে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন নারীরা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে প্রান্তিক মানুষের হাতের নাগালে রয়েছে বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক। ফলে নারীরা খুব সহজে স্বল্প মূল্যে কিংবা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের নারীদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে বেশ প্রশংসা করেছে। তারা বলেছে, নারীদের উন্নয়নে বাংলাদেশ যেমন দ্রুত এগিয়ে যাওয়া একটি দেশের নাম, ঠিক তেমনি নারীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি আদর্শ দেশ। দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সূচক।

অসহায়-অবহেলিত-প্রতিবন্ধী নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান, বাল্যবিয়ে বন্ধ করে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীদের বিভিন্ন কাজে দক্ষতা বৃদ্ধি, তৃণমূল নারীদের বাণিজ্যিকভাবে পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের জন্য চলতি অর্থবছরের (২০১৫-১৬) বাজেটে নারীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাল্যবিয়ে রোধেও সফলতা এসেছে বাংলাদেশে। ১৯৮৪ সালে ৫২ শতাংশ কন্যাশিশু বাল্য বিয়ের শিকার ছিল। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী এ হার কমে ১৭ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশের মেয়েশিশুদের উন্নয়নে মেয়েশিশু দশক ঘোষণা, জাতীয় শিশু কর্মপরিকল্পনায় মেয়েশিশুর স্বার্থ ও চাহিদায় মনযোগ দেয়া, প্রতি জেলায় নারী ক্রীড়া কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা, মেয়েশিশুকে জেন্ডারসচেতন করা, ইভটিজিং প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতকরণ ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।

পরিবেশের দিক থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম দিকে; যার প্রভাব হিসেবে আইলা, সিডরের মতো ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে চলেছে। দুর্যোগে নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে এ বিষয়ে সবার সচেতনতা বেড়েছে। নারীরাও এখন এগিয়ে এসেছে অর্থাৎ পরিবেশ বিষয়ে নারীর সম্পৃক্ততা বেড়েছে। সরকার টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনায় নারী চাহিদার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবেশ সচেতনতার বিভিন্ন কর্মকান্ডে নারীর সম্পৃক্ততা বেড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং গণমাধ্যমে নারীর পদচারণা সত্যিই খুব প্রশংসনীয়। নারীর অগ্রগতি গণমাধ্যমের অনুষ্ঠান পরিকল্পনায়, নীতিনির্ধারণ এবং উপস্থাপনায় দেখা যাচ্ছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় শ্রোতার কাছে নারীর মেধাকে তুলে ধরা হচ্ছে। নারীরা সংবাদ পরিবেশন যেভাবে করছে, সেভাবে বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করছে, ফটোসাংবাদিকতায় নারীরা কাজ করছে।

নারী জাতি হিসেবে দুর্বল নয়, পুরুষরাই তাদের দুর্বল করে রেখেছে, রেখেছে অবলা আর অধিকারহীন করে। সময়ের প্রেক্ষিতে বর্তমান সময়ের শিক্ষিত নারীরা এসব বুঝতে পারছে, সচেতন হচ্ছে। তাই নারীর অবস্থার উত্তরণ ঘটছে প্রতিনিয়ত। সর্বোপরি একটি সুন্দর জাতি গঠনে নারীর ভূমিকা অপরিহার্য। একটি আদর্শ পরিবার, সমৃদ্ধ ও আলোকিত সমাজ গঠন এবং পারিবারিক আবহে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাইতো কবি বলেছেন —————
“পৃথিবীর যা কিছু সৃষ্ঠি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”।
এই অর্ধেকাংশ নারীকে পশ্চাতে ফেলিয়া কেহ অগ্রসর হইতে পারিবে না।

নারীদের উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করছে তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি সূচকেই বাংলার নারীদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে এই প্রত্যাশা করি।

লেখকঃ কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক।

Additional Info

  • Image: Image