২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ইংরেজী
Sunny

28°C

Chittagong

Sunny

Humidity: 61%

Wind: 22.53 km/h

  • 21 Nov 2017

    Sunny 29°C 19°C

  • 22 Nov 2017

    Partly Cloudy 27°C 17°C

সোমবার, 28 সেপ্টেম্বর 2015 18:09

পেরিয়ে এলাম রামু ট্র্যাজেডির ৩ বছর, সাম্প্রতিক সময় এবং অতঃপর ...

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

পেরিয়ে এলাম রামু ট্র্যাজেডির ৩ বছর, সাম্প্রতিক সময় এবং অতঃপর ...

প্রথমেই বলি আমাদের বৌদ্ধ সমাজের একতা বর্তমান সময়ে খুব বেশি প্রয়োজন। সময়ের প্রেক্ষিতে এই ঐক্য সুদৃঢ় করা সময়ের দাবী। শুধুমাত্র যেখানে সেখানে সংগঠন করলেই হবে না। সংগঠকদের একত্রিত হয়ে সূদুর প্রসারী পরিকল্পনা করতে হবে বৌদ্ধ সমাজের উন্নয়নে। বৌদ্ধদের সংষ্কৃতি ঐতিহ্য রক্ষাকল্পে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বর্তমান প্রজন্মকে কিভাবে ধর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায় সেই চিন্তা করা খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। কারণ বর্তমানে প্রজন্মের বেশীর ভাগ সন্তান তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে অনেক কিছুই জানছে, শুধুমাত্র নিজেদের ধর্ম, কৃষ্টি, সভ্যতা সম্পর্কে জানে না। এবার আসি মূল ঘটনায়।

২০১৫ সাল শেষ পর্যায়ে। ২০১২ সালে যে ঘটনা ঘটেছিল তার পুনরাবৃত্তি কিন্তু এখনো হচ্ছে খন্ডিত ভাবে। কিছু কিছু মিডিয়া কিংবা পত্রিকায় আসলে ও অনেক ঘটনা অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং সদিচ্ছার দরুণ আমরা রামুতে পেয়েছি নান্দনিক, দর্শনীয় বিহার। যেগুলি দুবৃত্তরা নষ্ট করে দিয়েছিল। সেজন্য সমগ্র বৌদ্ধ জাতির পক্ষ থেকে সরকারকে জানাচ্ছি আন্তরিক সাধুবাদ এবং কৃতজ্ঞতা। একমাত্র সরকারের সদিচ্ছার কারণেই খুবই স্বল্প সময়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া বিহারগুলি পুনঃ নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। বিহারগুলি নির্মিত হবার কারণেই উক্ত বিহারের দায়ক-দায়িকারা শান্তিতে বিহারের বিভিন্ন উৎসবে যোগদান করতে পারছে এবং প্রাত্যাহিক করণীয় কর্মগুলো সম্পাদন করতে পারছে এবং দেশী বিদেশী পর্যটকরা পুনরায় নান্দনিক বিহারগুলো পরিদর্শন করছে।

বর্তমান পৃথিবীতে যে অশান্তির দাবানল জ্বলছে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যে হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, মারামারি, যুদ্ধ বিগ্রহ পৃথিবীর দুঃসময়ে প্রকৃত শান্তি স্থাপনের জন্য বুদ্ধের অহিংসা ও সাম্যের নীতি ও জীবন দর্শন সকলের অনুশীলন করা একান্ত প্রয়োজন। দেশ ও জাতির উন্নয়ন, অগ্রগতিতে এর কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৃথিবীর এই হিংসা বিক্ষুদ্ধ অবস্থা দেখে বুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে লিখেছিলেন ---

হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী হেথা নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব,
হেথা ঘোর কুটিল পন্থ তার লোভ জটিল বন্ধ।
নতুন তব জনম লাগি কাতর যত প্রাণী
কর ত্রাণ মহাপ্রাণ, আনো অমৃত বাণী।
বিকশিত করো প্রেম পদ্ম চিরমর্ধ নিস্যন্দ
শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্ত পুণ্য।
করুণাঘন ধরণীতল কর কলংকশূন্য।

বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক স¯প্রীতির দেশ। এদেশে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করে। আবহমান কাল থেকে সবাই স্বাধীনভাবে ধর্ম-কর্ম পালন করে আসছে। ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকে স্বীকার করে আমরা পারষ্পরিক শ্রদ্ধা, মানবতাবোধ ও ধর্মীয় নীতিবোধ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় রত থাকি। সময়ের নিরীখে সৃষ্ঠি হয়েছে আন্তঃধর্ম সম্প্রীতির প্রসঙ্গ। বৌদ্ধরা সবসময় সম্প্রীতির আদর্শ ও চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ। কারো প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন নয়।

ফিরে দেখা ২০১২:  

বিগত ২৯শে সেপ্টেম্বর ও ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০১২ কক্সবাজার জেলার রামু, উখিয়া, চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার লাখেরা, কোলাগাঁও গ্রামের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার ও বুদ্ধমূর্তি ভাংচুর, বিহারে অগ্নিসংযোগ, বৌদ্ধ পল্লীতে অগ্নিসংযোগ করে যে ক্ষতিসাধন করা হয়েছে তা অপূরণীয়। বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ জনগণ শান্তিতে নিরাপদে ও নির্বিঘেœ বাস করতে চায়। আদর্শ, ঐতিহ্য ও গৌরব নিয়েই বৌদ্ধরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে।

২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১২ কোরআন অবমাননার অভিযোগে কক্সবাজার জেলার রামুতে ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির এবং বৌদ্ধদের ৪০টি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এসময় তারা শতাধিক বাড়ীতে লুটপাট এবং ভংচুর চালায়। তারা রামুর সীমা বৌদ্ধ বিহার, লাল চিং, সাদা চিং, রামু মৈত্রী বিহার ও অপর্ণা মৈত্রী বিহার জ্বালিয়ে দেয়।

৩০শে সেপ্টেম্বর ২০১২ চট্টগ্রামে জেলার পটিয়া উপজেলার দুটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা। কয়েকশ লোক কোলাগাঁও বৌদ্ধ মন্দির, দুর্গা মন্দির ও জেলে পাড়া মাতৃ মন্দিরে হামলা করে।
রামুর ঘটনার পর পর টেকনাফ, উখিয়ায় বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার ও বাড়ি এবং হিন্দু মন্দিরে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চালায় দু®কৃতকারীরা। এই যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত। যারা শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ চায় না, দেশে দ্বি-জাতিতত্ত্বের বীজ বপন করতে চায়, তারাই ধর্মের নামে হানাহানিতে লিপ্ত। এদেশর মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে বাস করতে চায়। কিন্তু রামু এবং বিভিন্ন জেলায় যেভাবে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ চালানো হয়েছে তাতে করে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নষ্ট হয়েছে। আমরা একটি ধর্ম-বর্ণ-বৈষম্য ও শোষণহীন সমাজ গঠন করতে চাই।
সম্মিলিত আইনজীবি সমন্বয় পরিষদের মতে, রামু উখিয়ার আক্রান্ত জনপদগুলো মনস্তাত্ত্বিক ক্ষয়ক্ষতি একধরণের সুনামি সমান ধ্বংস যজ্ঞ সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করা এবং সারাবিশ্বের কাছে ও নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করাই মুখ্য বিষয়।

কক্সবাজারের রামু উখিয়া, টেকনাফ পটিয়ায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে দলমত নির্বিশেষ সমঅধিকারের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে মুক্তি ও সচেতনতার ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুদৃঢ় করতে সকলকেই সম্পৃক্ত করতে হবে। কক্সবাজারের রামু উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ায় হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছিল। এটা বাংলাদেশের সভ্যতা সম্প্রীতির তীর্থভূমি। ইতিহাসের নানা উত্থান-পতনে, বৌদ্ধ-বাঙালী, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কখনই চিড় ধরাতে পারেনি। মন্দিরের পাশেই রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা। একই পাড়ায় পাশাপাশি বাস করছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান পরিবার। রামুর মূল বৌদ্ধ মন্দিরের পাশেই রয়েছে মুসলিম বসতি। ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১২ রাত্রে মুসলমান প্রতিবেশীরা বহু বৌদ্ধ পরিবারকে তাদের বাড়িতে আশ্রয় দেন এবং তাদের জীবন রক্ষা করেন। হিন্দু, মুসলিম বা বৌদ্ধ মুসলিম বিদ্বেষ সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত এ জনপদে।

দেশের বিশিষ্টজনের মতে, ২৯-৩০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ায় বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ পল্লীতে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ ও সন্ত্রাসের যে মর্মান্তিক বর্বরোচিত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তা- থেকে এটা ষ্পষ্ট প্রতীয়মান বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী ও মন্দিরগুলো লুট ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে অশান্ত এবং ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি ছিল আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য। তারা নিমিষেই ধ্বংস করে দিল আমাদের শত বছরের পুরানো ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সং®কৃতি। বৌদ্ধদের ঐতিহ্যে আঘাত করে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে দানবের শক্তি আবার জেগে উঠছে। সংবিধান অনুযায়ী এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে ইহা অত্যন্ত নিষ্ঠুর, অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজ। সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে হিংসাত্মক কার্যক্রম চালানো অত্যন্ত নিন্দনীয়। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হলে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক ঃ রামুর হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যের আর কিছুই নেই। প্রাচীন জনপদটির সবদিকেই শুধু ধ্বংসের চিহ্ন‎। সব পুরাকীর্তিই যেন নিমেষেই শেষ। বৌদ্ধ বিহারগুলিতে রক্ষিত ভারত, থাইল্যান্ড, জাপান, চীন, মিয়ানমার, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশের ব্রোঞ্জ, অষ্টধাতু, শ্বেতপাথরসহ মূল্যবান ধাতুর তৈরি ছোট-বড় সহস্রাধিক মূর্তি ছিল। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক মূর্তি পুড়ে গেছে এবং ভাংচুর ও লুট হয়েছে। এছাড়া বার্মিজ, পালি, বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষার দু®প্রাপ্য ত্রিপিটক পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এসব আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না।

২০১৩ সাল : 

২০১২ সালে সংঘটিত এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে এতবড় ভয়াবহ জঘন্যতম নৃশংস ঘটনার পর বৌদ্ধ সম্প্রদায় আশা করেছিল ভবিষ্যতে আবার এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় ঘোষণার পর আবারো সংখ্যালঘুদের উপর হামলা নির্যাতন লুটপাট শুরু হয়ে গেল। তারই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের কয়েকটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা, বুদ্ধমূর্তি ভাংচুর, বুদ্ধমূর্তি পুড়িয়ে দেয়ার ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম। 

২০১৪-২০১৫ সাল :

২০১৪-১৫ সালে বিচ্ছিন্নভাবে একই ঘটনা অনেক হয়েছে। হয়তো কিছু ঘটনা জনসমক্ষে কিংবা মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে এবং অনেক কিছুই প্রকাশ পায়নি। যার কারণে বৌদ্ধ সমাজ এখনো আতংকমুক্ত হতে পারেনি। এর মধ্যেও আশার কথা হলো বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার রামু এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় সুরম্য বিহার পুনঃনির্মাণ করে বৌদ্ধদের মধ্যে নতুন প্রেরণার সৃষ্টি করেছেন।
কেন এই সহিংসতা? ঃ যারা এসব করছে তারা তো মানব নামের কতিপয় দানব। ঐসকল দানবদের হিংস্র থাবায় কলুষিত হচ্ছে এদেশের ধর্ম, বর্ণ, বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সাম্প্রতিককালের ঘটনা প্রত্যক্ষ করলে বোঝা যায় শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের উপর এহেন আচরণ করে ক্ষান্ত হননি সেই সকল দানব। তারা পুড়িয়ে দিয়েছে মুসলমানদের পবিত্র কোরান শরীফ। কী নির্মমভাবে ধর্মের উপর আঘাত হেনে বাংলাদেশের ধর্মভীরু লোকদের হৃদয়ে আঘাত করেছে।

করণীয় : 

স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ক্ষত বিক্ষত করার চেষ্টা একাধিকবার হয়েছে। ধর্মকে পাশ কাটিয়ে এই অপচেষ্টা রোধের তাত্ত্বিক প্রয়াস খুব একটা সফল হয়নি। তাই এখন সময় এসেছে ধর্মবিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের সক্রিয় হওয়ার। এদেশের প্রকৃত ধার্মিক মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী একযোগে ঐক্য বন্ধনে মিলিত হলে আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িকতার ঐতিহ্য আবার দোদীপ্যমান হবে, আমাদের শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির পথ দেখাবে। সবার উপরে মানুষ সত্য। মনুষ্যত্ববোধই মানুষের সবচেয়ে বড় চেতনা। এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়। মানবধর্মকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া। একটি দেশে নানা জাতি ও ধর্মের লোক বাস করে। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সংবিধানে ধর্মীয় নিরপেক্ষতা বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। দেশের জনগণকে অপর ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অপরের মতের প্রতি সহনশীল হবার জন্য জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা প্রয়োজন। এ সচেতনতার দায়ভার দেশের সকল সচেতন নাগরিক সমাজের। সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসলে জয় আমাদের অনিবার্য।

বুদ্ধ বলেছেন --- শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার উপশম হয় না, মৈত্রী দিয়ে শত্রুকে জয় করতে হয়। হিংসাকে অহিংসা দিয়ে জয় করতে হয়। জগতে প্রত্যেকের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ও মৈত্রী স্থাপনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
এদেশের ক্ষুদ্র বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বিগত কয়েকশত বছরের মধ্যে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর উপর এরকম অপ্রত্যাশিত আক্রমণাত্মক ঘটনা ঘটেনি। বৌদ্ধ সম্প্রদায় সবসময় অন্য ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল। যাদের মধ্যে কোনরকম ধর্মীয় গোঁড়ামি নেই। তারপরও কেন বৌদ্ধ বিহার, ঘরবাড়ি, বুদ্ধমূর্তি কতিপয় দুর্বৃত্ত কর্তৃক আক্রান্ত হলো?

রামুর ভষ্মীভূত বৌদ্ধ বিহারসমূহ শুধুমাত্র বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একক ঐতিহ্য ছিল না, ছিল বাংলাদেশের শত বছরের পুরনো সং®কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের অংশ। যার জন্য দেশী বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনায় সবসময় মুখরিত থাকতে এ বৌদ্ধ জনপদ। বৌদ্ধদের ঐক্য সুদৃঢ় থাকলে কোন অপশক্তিই বৌদ্ধ সমাজের উন্নয়নে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারবে না। কারণ একতাই শক্তি, একতাই বল।
এরূপ বর্বরোচিত হামলার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী যাতে নিরাপদে, নির্ভয়ে বাস করতে পারে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এটাই প্রত্যাশা করি।

অশান্ত অস্থির স্বার্থপর পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহান বুদ্ধের শ্বাশত মানবদর্শন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মকে সমুন্নত রেখে সমাজকে এগিয়ে নিতে হবে। আর এজন্য সবাইকে হানাহানি বন্ধ করে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে কিভাবে সমাজকে উন্নয়নের দিকে নেয়া যায়। কারণ সুষ্ঠু চিন্তা-চেতনার মধ্যেই উন্নয়নের ধারা নিহিত আছে। পারষ্পরিক বিদ্বেষ পরায়ণতা এবং সীমাহীন ক্ষমতা ও বস্তুগত সম্পত্তির লোভে মানুষ নানা ধরণের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে যা আদৌ শুভ নয় বরং সমাজ ও জাতীয় জীবনে তা বিপর্যয় ডেকে আনছে। বৌদ্ধদের আদর্শ অহিংসা পরম ধর্ম। পারষ্পরিক মৈত্রী ও ভালবাসায় বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম-খ্রীষ্টান সকলে এক হয়ে থাকতে পারি। এই দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুন্ন থাকুক এই কামনা করি। মানবতার শক্তি অজেয়, অবিনশ্বর। মানবতার জয় হোক।

পরিশেষে কবিগুরুর চরণ দিয়ে শেষ করছি ------

বাসনারে বলি দিয়া, বিসর্জিয়া সর্ব আপনার
বর্তমান কাল হতে নিষ্ক্রমিয়া, নিত্যকাল মাঝে
অনন্ত তপস্যার বহি মানুষের উদ্ধারের কাজে
অহমিকা বন্দীশালা হতে --- ভগবান বুদ্ধ তুমি।
নির্দয় এ লোকালয়, এ ক্ষেত্রই তব জন্মভূমি।
ভরসা হারালো যারা, যাহাদের ভেঙ্গেছে বিশ্বাস
তোমারি করুণা বিত্তে ভরুক তাদের সর্বনাশ,
আপনারে ভুলে তারা ভুলুক দুর্গতি। --- আর যারা
ক্ষীণের নির্ভর ধ্বংস করে, রচে দুর্ভাগ্যের কারা
দুর্বলের মুক্তি রুধি, বোসো তাহাদেরি দুর্গদ্বারে
তপের আসন পাতি, প্রমাদ বিহবল অহংকার
পড়–ক সত্যের দৃষ্টি, তাদের নিঃসীম অসম্মান
তব পুণ্য আলোকেতে লভুক নিঃশেষ অবসান।

লেখক – কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক, This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Additional Info

  • Image: Image