২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বুধবার, ২৪ মে ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 25 সেপ্টেম্বর 2015 01:13

মহাযানের মহাভ্রান্তি থেরবাদীরা কোন পথে?

লিখেছেনঃ উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু

মহাযানের মহাভ্রান্তি থেরবাদীরা কোন পথে?

“১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে এপ্রিল মাসে আরাকানের সংঘরাজ সারমেধ মহাথের চট্টগ্রামে থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করলে তৎকালীন চট্টগ্রামের বৌদ্ধেরা মহাযানী তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে। তখন থেকে অর্থাৎ ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দ হতে চট্টগ্রামের তান্ত্রিক দেবী মা মগদ্দেশ্বরীর প্রভাব বৌদ্ধদের কাছ থেকে ক্রমশঃ হ্রাস পেতে থাকে।” প্রিয় পাঠক কথাগুলো আমার নয়; প্রখ্যাত লেখক সুনীতি রঞ্জন বড়ুয়া তার লিখিত “বাংলাদেশের বড়ুয়া জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য” গ্রন্থের ২১ নং পৃষ্ঠায় কথাগুলো উল্লেখ করেছেন।

মহাযানকে আমরা বৌদ্ধধর্মের একটি শাখা হিসেবেই জানি। কিন্তু কি এমন কারণ ছিল যে পুজ্য সারমেধ মহাথের নতুন করে থেরবাদ প্রচার করে মহাযানকে বাংলা থেকে উৎখাত করলেন? মহাযান উৎখাতের পেছনের কারণটা খুঁজে দেখলে যে প্রধান কারণটি উন্মোচিত হয় তা হচ্ছে মহাযানে মূল বৌদ্ধ ধর্মের বিকৃতি। মহাযানীরা বৌদ্ধ ধর্মের এত বেশী বিকৃতি সাধন করেছিলেন যে প্রকৃত বৌদ্ধ ধর্মের স্বত্বাকে হারিয়ে বলা যায় নতুন আরেকটি ধর্মের উদ্ভব হয়। আর তাই সংঘরাজ সারমেধ ভান্তে এদেশে এসে নতুন করে থেরবাদ প্রচার করে।

মহাযানের উৎপত্তিঃ

মহাযানের বিভ্রান্তি তথা বিকৃতির শুরু হয় আনুমানিক ৪৪২ খৃঃ পূর্বাব্দে। সেসময় “বজ্জিপুত্ত” ভিক্ষুরা বিনয় বহির্ভূত “দশবত্থুনি” প্রচলন করলে বৌদ্ধ সংঘে এক ঘোর বিপ্লব দেখা দেয়। এই “দশবত্থুনি” ছিল মূলত দশটি নিয়ম যেখানে সোনা-রুপা দান গ্রহণ, দ্বিপ্রহরের পর ছায়া দুই আঙ্গুলে পশ্চিমে গেলেও ভোজন করা অর্থাৎ বিকালেও ভোজন করার মতো প্রভৃতি দশটি প্রস্তাব ছিল এতে। শীলবান ভিক্ষুসংঘরা এই দশটি বিনয়বিরোধী নিয়ম মেনে নেন নি। ফলে সংগীতি আহবান জরুরী হয়ে পড়ে। যশ, রেবত, সর্বকামী, সম্ভূত প্রমুখ তৎকালীন প্রধান প্রধান সাতশত অর্হৎ স্থবির নির্বাচিত হয়ে বৈশালীর বালুকারামে দ্বিতীয় সংগীতির আয়োজন করে। সাতশত জন অর্হৎ স্থবির এই সংগীতিতে অংশ নেন বলে এটাকে সপ্তশতিকা সংগীতিও বলা হয়।

এই সাতশত অর্হৎ ভিক্ষু দশবত্থুনি কে প্রত্যাখান করে। কিন্তু বজ্জিপুত্ত ভিক্ষুরা সাতশত অর্হৎ ভিক্ষুর এই সংগীতিকে না মেনে আলাদা আরেকটি সংগীতি আয়োজন করে কৌশাম্বীতে। বলা যায় দুইভাগে ভাগ হয়ে যায় ভিক্ষুসংঘরা। সাতশত অর্হৎ ভান্তের সংগীতি যারা মেনে নিয়েছিলেন তাদের ধর্মমত “স্থবিরবাদ বা থেরবাদ” এবং অবিনয়ী, অবাধ্য অপর ভিক্ষুদের ধর্মমত “মহাসাঙ্ঘিক” বলে খ্যাত হয়। পরবর্তীতে এই মহাসাঙ্গিক থেকেই বিভিন্ন শাখায় বিস্তার লাভ করে মহাযানের উৎপত্তি হয়।

এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মহাসাঙ্ঘিক তথা মহাযানের উৎপত্তি হয় বুদ্ধের বিনয় মানতে অনিচ্ছুক ভিক্ষুদের হাত ধরে। আর এরাই বিভিন্ন বিকৃতি, বিভ্রান্তি নিজেদের সুবিধার জন্য তাদের ধর্মমতে অন্তর্ভুক্ত করে প্রচার করে। সাতশত জন অর্হৎ ভান্তের মত গ্রহণ করবেন নাকি বাকীটা গ্রহণ করবেন সেটা নিজের বিবেককে প্রশ্ন করলেই সহজেই উত্তর পাওয়া যাবে। কেউ কেউ ভাবতে পারেন আমার উল্লেখিত কথাগুলো সত্য কিনা। সেক্ষেত্রে পাঠকদের বিভিন্ন বই পড়ে দ্বিতীয় সংগীতি উৎপত্তির কারণ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য আহবান জানাই, আর এতেই সকল সন্দেহ নিরসন হবে। জানা যাবে আমার কথার যথার্থতা কতটুকু।

উল্লেখ করতে হয়, কোনটি প্রকৃত বুদ্ধের ধর্মমত তা নির্ধারণের জন্য স¤্রাট অশোক খৃঃ পৃঃ ৩২৬ অব্দে পাটলিপুত্রে এক ধর্ম মহাসম্মেলন আহবান করেছিলেন। সেখানে কেবলমাত্র স্থবিরবাদীকেই মূল বৌদ্ধ ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হয়। আর এই সম্মেলন-ই হচ্ছে তৃতীয় সংগীতি। তৃতীয় সংগীতির পূর্বে ধর্ম ও বিনয় নামে সংগৃহীত হয়েছিল বুদ্ধ বচনগুলো। আর তৃতীয় সংগীতিতে ধর্মকে সূত্র ও অভিধর্ম এই দুই নামে ভাগ করা হয়। ফলে বিনয়, সূত্র ও অভিধর্মের সমন্বয়ে ত্রিপিটক শব্দটির উৎপত্তিও হয় এই সংগীতিতে।

মহাযানের মহাভ্রান্তিঃ

প্রকৃতপক্ষে মহাযানে একটি নয় অসংখ্য বিকৃতি, বিভ্রান্তি ঢুকে পড়ে যা নিয়ে পুরো একটি বই লিখা যাবে। আমি পাঠকদের জ্ঞাত করার সুবিধার্থে কয়েকটি মাত্র তুলে ধরবো, পরবর্তীতে বিশদ আকারে প্রকাশ করার আশা রাখি। মহাযানীদের প্রধান সূত্র হচ্ছে লোটাস বা সদ্ধর্ম পুন্ডরিক সুত্র। এই সুত্রের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদেই উল্লেখ আছে- একদা রাজগৃহে অর্হৎ আনন্দ সহ বার হাজার অর্হৎ ভিক্ষু তথাগত বুদ্ধের সামনে উপস্থিত হন। প্রিয় পাঠক, একটু লক্ষ্য করুন আমরা সবাই জানি আনন্দ অর্হত্বফল লাভ করেন তথাগতের পরিনির্বাণের পর প্রথম সংগীতি শুরু হওয়ার পূর্ব সময়ে। কিন্তু এখানে সেই আনন্দকে বুদ্ধ জীবিত থাকাকালীন অর্হৎ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয় নবম অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদে গিয়ে বলা হয়েছে- আনন্দ ভবিষ্যত জন্মে বুদ্ধ হবেন। আমরা সবাই জানি যিনি অরিকে ধবংস করেন তিনিই অর্হৎ। তিনি আর জন্ম গ্রহণ করবেন না। অথচ সদ্ধর্ম পুন্ডরিক বা লোটাস সুত্রে বলা হচ্ছে এই অর্হৎ আনন্দ ভবিষ্যত জন্মে বুদ্ধ হবেন। উপরোল্লিখিত বিষয়টা যে মূল বৌদ্ধ ধর্মের কত বড় বিকৃতি তা পাঠকেরা সহজেই বুঝে নিতে পারবেন বলে আশা রাখি।

মহাযানীদের এই প্রধান সুত্রটা কিন্তু আমাদের ত্রিপিটকের কোথাও পাবেন না। সুত্র, বিনয়, অভিধর্মের কোনটাতেই নাই এই সদ্ধর্ম পুন্ডরিক সুত্র। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বৌদ্ধ মহাযান শাস্ত্রাচার্য উপাধি প্রাপ্ত পন্ডিত শীলাচার শাস্ত্রী ভিক্ষু মহোদয় তার লিখিত “মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন” গ্রন্থের ১৪২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে, মহাযানীরা দাবী করে সদ্ধর্ম পুন্ডরিক সুত্র বুদ্ধ কেবলমাত্র বোধিসত্ত্বদিগকেই উপদেশ দিয়েছিলেন। মহাযানীদের এই দাবীর পেছনে কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই, কেবল কল্পনা মাত্রই। এখানে পুজ্য ভান্তে বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করতে উল্লেখ করেছেন বুদ্ধ স্বয়ং আনন্দকে বলেছিলেন- হে আনন্দ! ভিতর-বাহির কোন প্রকার ভেদ না করেই আমি ধর্মের উপদেশ করেছি। ধর্ম বিষয়ে তথাগতের কোন প্রকার আচার্যমুষ্টি (রহস্য) নাই। মহাপরিনির্বাণ সূত্রের ৫৪ পৃষ্ঠায় এভাবেই উল্লেখিত আছে- দেসিতো আনন্দ ময়া ধম্মো অনন্তরং অবাহিরং করিত্বা নত্থানন্দ তথাগতস্স ধম্মেসু আচরিয় মুঠি। আর তাই শুধুমাত্র বোধিসত্ত্বদের দেশনা দিয়েছেন বলে তারা যে সদ্ধর্ম পুন্ডরিক সুত্রের কথা বলে তা কাল্পনিক, অবান্তর ও অবাস্তব বিষয় ব্যতীত কিছুই নয়।

মহাযানীদের বিকৃতি সম্পর্কে তুলে ধরতে গিয়ে মহাপন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন উল্লেখ করেছেন- বোধিসত্ত্বদের মহিমা প্রদর্শন করতে গিয়ে মহাযানীরা সারিপুত্র, মোদগল্যায়ন প্রভৃতি মুক্ত অর্হৎ শিষ্যগণকে অমুক্ত ও বোধিসত্ত্বরুপে প্রকাশ করতেও কুন্ঠাবোধ করেননি। জ্যোতিঃপাল মহাথের অনূদিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন বিরচিত “ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান পতন” গ্রন্থের ২৮নং পৃষ্ঠাতে কথাগুলো পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় স্থবিরবাদের প্রশংসা করতে গিয়ে মহাপন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন ঐ গ্রন্থের ২৫নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন- “স্থবিরবাদ হচ্ছে সবচেয়ে পুরানা নিকায় এবং প্রাচীন নীতিতে বড়ই কড়াকড়ি ভাবে সুরক্ষিত। অন্যান্য নিকায়গুলো দেশ, কাল ও ব্যক্তি ইত্যাদি বিবেচনানুসারে অনেক পরিবর্তন করেছিল।”

মহাপরিনির্বাণ সূত্রে বুদ্ধ বলেছেন- হে আনন্দ! তোমরা নিজেরাই নিজের দীপক হও, অন্যের উপর ভরসা করনা, ধর্মই তোমাদের একমাত্র দীপ, শরণ এবং সহায়। আবার ধম্মপদে পাওয়া যায়, বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘকে বলছেন- নির্বাণের সাক্ষাৎকার তোমাদিগকে নিজেই করতে হবে, তথাগতগণ শুধু মার্গ প্রদর্শক। অন্যান্য প্রচলিত ধর্মসমূহে যেখানে স্্রষ্টার উপর নির্ভরশীলতা দেখা যায় সেখানে বৌদ্ধধর্মে বুদ্ধ নিজেকেই নিজের ত্রাণকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বলা যায়, এ কারণেই বুদ্ধের ধর্ম আর দশটি ধর্ম হতে সম্পূর্ণরুপে আলাদা। মহাযানীরা বুদ্ধের এই বিষয়টিকে বিকৃতি করে বুদ্ধকেই ত্রাণকর্তার আসনে বসিয়েছেন। এই ধরণের মহাযানের মহাবিকৃতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক শীলাচার শাস্ত্রী মহোদয় তার বইয়ের ১৫৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-“তারপরই শুরু হল করুণামায় দেবের পূজা, তাও আবার সংখ্যায় এক নয়, অনেক শাক্যমুনি বুদ্ধ, পূর্ববুদ্ধ, অনাগত বৌদ্ধ, মৈত্রেয় বোধিসত্ত্ব ইত্যাদি। ভক্তির প্রভাব বেড়ে গেল নির্বাণের স্বরুপে পরিবর্তন ঘটল এবং সুখভূমি প্রাপ্তির আশায় প্রার্থনা শুরু হল। তখন ঐতিহাসিক বুদ্ধকে দিব্য মহিমান্ডিত করা হল এবং দেবাতিদেব ঈশ্বরের উপরে স্থান দেওয়া হল। এভাবে ধীরে ধীরে বুদ্ধ হয়ে গেলেন স্বয়ম্ভু, লোকত্রাতা।” অর্থাৎ মহাযানীরা মানবপুত্র বুদ্ধকে ঈশ্বর এক কথায় সৃষ্ঠিকর্তা বানিয়ে ছাড়লেন। অথচ সারাবিশ্বে এ কারণেই বুদ্ধ সবচেয়ে বেশী পুজিত যে তিনি নিজেকে সবসময় মানবপুত্র বলেই প্রচার করেছেন, ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ হিসেবে নয়। তিনি কাউকে শ্রষ্টার ভয় দেখান নি, আর সেই বুদ্ধকেই শ্রষ্টার আসনে বসিয়ে দেয় মহাযানীরা সাধারণ মানুষের খুশী করার জন্য। কারণ সাধারণ মানুষেরা যা করছে শ্রষ্টা করছে, যা হচ্ছে শ্রষ্টার ইচ্ছাই হচ্ছে এভাবেই অন্ধবিশ্বাসে নিজেকে নিমজ্জিত রাখতে বেশী পছন্দ করে। একজন মানবপুত্র রীতিমতো শ্রষ্টা বানিয়ে দেওয়া এ যে কত বড় ভ্রান্তি তা জ্ঞানী পাঠক মাত্রেই সহজে বুঝতে পারবেন।

প্রিয় পাঠক, আগেই বলেছি কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে আমি অসংখ্য বিকৃতির কয়েকটি তুলে ধরছি মাত্র যেখানে আমি একা নয় মহাপন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন, মহাযান শাস্ত্র সম্পর্কে বিশারদ শীলাচার শাস্ত্রীরাও যে অনেক আগে থেকেই এসব বিকৃতি সম্পর্কে তুলে ধরেছিলেন তার কিঞ্চিৎ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি মাত্র।

বাংলাদেশে মহাযানের বর্তমান অবস্থাঃ

১৮৫৬ সালে সংঘরাজ সারমেধ ভান্তের প্রচেষ্টায় মহাযান এদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়েছিল বলা চলে। পরবর্তীতে জাপানে মহাযানের এক শাখার প্রতিষ্ঠাতা এদেশে এসে মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরকে বিভিন্ন কিছু দান করেছিলেন এবং এদেশে মহাযানের প্রচার ঘটাতে চেয়েছিলেন নতুন করে। অত্যন্ত দূরদর্শী সম্পন্ন মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের দান গ্রহণ করলেও এদেশে মহাযানের প্রচার ঘটুক সেটা কোনমতেই চাননি। তাই তিনি কৌশলে মহাযানের প্রচারের বিষয়টাকে এড়িয়ে গিয়ে মহাযানচর্চা শুরু করতে দেননি। তারও পরে বাংলাদেশী কতিপয় সুবিধাবাদী ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক হয় জাপানের মহাযানের ঐ শাখাটির প্রতিনিধিবৃন্দের সাথে। স্থায়ী ঠিকানা গড়ার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয় ঐ সুবিধাবাদী দলের বড় নেতাকে। আর বড় নেতা চট্টগ্রামের লালখান বাজারে জায়গা কিনে অর্ধেক নিজের নামে লিখে নিয়ে জাপানের মহাযান প্রচারকারী গ্রুপটির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় চিরতরে। এ থেকে এটা স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় কি উদ্দেশে তারা ঐ মহাযানীদের এদেশে এনেছিল। অবশ্য জাপানের ঐ মহাযানী দলটি নিজেদের মহাযান নয় একযান বলে দাবী করে।

তাদের প্রার্থনা বই পড়লে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠবে সচেতন বৌদ্ধদের। তাদের প্রার্থনা বইয়ের ৩৩ নং পৃষ্ঠাতে পাওয়া যায়, বুদ্ধ বলছেন- “সর্বপ্রাণিকে ভ্রান্তি থেকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে আমার আশ্রিত বিধিতে তাদের সমক্ষে নির্বাণলাভ করেছিলাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমার নির্বাণ কখনও হয়নি।” এতে আরো উল্লেখ আছে, কেউ যদি বুদ্ধদের দর্শন লাভের উদ্দেশ্যে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে ইচ্ছুক হয় তবে বুদ্ধ তাদের দর্শন দিতে প্রয়াসী হন। বুদ্ধ বলছেন, আমার এই বিশুদ্ধ জগতে কোন বিনাশ নাই..........আমি জগতের পিতা, তাই সন্তানদের দুঃখ থেকে উদ্ধার করা আমার কর্তব্য।
প্রিয় পাঠক, উপরোল্লিখিত কথাগুলো থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় মানবপুত্র বুদ্ধকে তারা সর্বদুঃখের মুক্তিদাতা, ত্রাণকর্তা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এ যে মহাভ্রান্তি, মহাবিকৃতি বৈ কিছুই নয়।

শুধু এরা নয়া জাপান দূতাবাসের মাধ্যমে মহাযানের আরো একটি শাখা বর্তমানে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। তারা মৈত্রী, করুণা, মুদিতার কথা প্রচার করছে ঠিকই কিন্তু সাথে বুদ্ধের ধর্মের বারোটা বাজিয়ে যাচ্ছেন। জাপানের মহাযানের কয়েকটি শাখার পাশাপাশি আরো একটা মহাযান শাখা বর্তমানে এদেশে বিরাজমান তারা মাদার বুদ্ধ নাম দিয়ে মহাযান প্রচার করছে।

থেরবাদীরা কোন পথে?

যদিও মহাযানীদের বিস্তার ধীরে ধীরে বেড়েই চলছে এদেশে তবুও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় এখনো অসংখ্য বাংলাদেশী বৌদ্ধ থেরবাদের মূলধারা চর্চাতে রত আছে। অসংখ্য বৌদ্ধ একটু সুযোগ পেলেই প্রব্রজ্যা নিয়ে কিংবা গৃহীবেশেই সাত/দশদিনের ধ্যানকোর্সে অংশ নিচ্ছে। আবার এমন অনেক বৌদ্ধও পাওয়া যায় যারা প্রতিদিন অষ্টশীল প্রতিপালন করে কেউবা পূর্ণিমা, অমাবস্যা, অষ্টমী দিবসে অষ্টশীল প্রতিপালন করছে, পঞ্চশীলতো পালন করছেই।

এসবের বাইরে গিয়ে কিছু বৌদ্ধ নিছক জাপান যাওয়ার সুবিধা লাভের আশায় ভীড় জমায় মহাযানী বিভিন্ন শাখা গুলোতে। অবশ্য মহাযানীরাও একটা কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে যাচ্ছে যেটাতে তারা পুরোপুরিই সফল বলা চলে। দেশের খ্যাতিমান বৌদ্ধ ব্যক্তি, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তারা জাপানে নিয়ে যায় এতে করে একদিকে তারা স্বীকৃতি আদায় করে নেয় তাদের কাছ থেকে, অন্যদিকে তাদের মুখও চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ঐসব বড় বড় নেতা বা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পরে বুঝতে পারলেও আর কিছুই বলতে পারে না। এদিকে সাধারণ মানুষরা ভাবে এত বড় বড় জ্ঞানী ব্যক্তি তথা ভিক্ষুরাও যেহেতু এসবে গেছেন তাই এটা খারাপ হতে পারেনা এভাবেও অনেকে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে নিকট ভবিষ্যতে মহাযানীদের এক বিশাল উত্থান ধরে নেওয়া যেতে পারে এদেশে। কারণ গুড় যেদিকে পিপড়ার দলতো সেদিকেই যাবে সেটাই বাস্তবতা।

পরিণাম কি?

এভাবে উত্থান হতে থাকলে এদেশে ভিক্ষু সংঘের অস্তিত্ব বিলোপ পাবে কারণ সবাই বোধিসত্ত্ব হওয়ার দিকে নজর দিলে এই জন্মে কেউই ভিক্ষু হতে চাইবেনা। আপনি মহাযান প্রতিষ্ঠিত বিহার বা কেন্দ্র গুলোতে গেলে কোথাও ভিক্ষুসংঘ খুজে পাবেন না। আর ভিক্ষু সংঘ না থাকলে সংঘদান, অষ্ট-পরিষ্কার দান, কঠিন চীবর দান এসবের অস্তিত্ব আপনি আর আশা করতে পারেন না। অন্যদিকে গ্রামে গ্রামে তারা নিজেদের কার্যালয়ের নামে আলাদা বিহার চালু করছে যেখানে বুদ্ধমূর্তি থাকছে, নির্দিষ্ট দিনে প্রার্থনা থাকছে। ফলে সবাই তাদের দিকে ধাবিত হলে বিহারগুলো নিকট ভবিষ্যতে জাদুঘরে পরিণত হওয়া অবশ্যম্ভাবী। আর থেরবাদ শব্দটিও কেবলমাত্র অভিধানেই খুঁজে পাওয়া যাবে তখন।

পরিশেষে বলতে চাই, মানুষ জন্মলাভের পর থেকে পারিবারিকভাবেই একটি ধর্মের উত্তরাধিকারী হয়ে যায়। পরে যখন নিজের আত্মোপলব্ধি আসে তখন কেউ কেউ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ধর্মকে পরিবর্তন করে এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে। কেউ কেউ আবার একই ধর্মের এক শাখা থেকে অন্য শাখাকে বেছে নেয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মনের উপর কোন রকম জোর চলে না। তাই কে কি পালন করবে কোনটাকে বেছে নেবে সেটা একান্তই নিজের ব্যাপার। আমি জন্মগতভাবে হীনযানী। এই হীনযান শাখা মেনে চলা বৌদ্ধদের প্রতি আমার দায়বোধ আছে বলেই সবাইকে সচেতন করতে কলমী অভিযানে লিপ্ত হয়েছি। কোন ব্যক্তি বিশেষ বা বিশেষ কোন সংস্থার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ নাই।

আমার লেখার আরো একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে সম্যক দৃষ্টি সম্পন্ন হতে সবাইকে সচেতন করানো। আগেই বলেছি সাতশত অর্হৎ ভিক্ষুর চিন্তা চেতনা নিয়ম নীতিকে অবজ্ঞা করেই মহাযানের সৃষ্টি হয়, আর তাই এই মহাযানীরা যে মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তথাগত বুদ্ধ মিথ্যাদৃষ্টিকে অতীব ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন। পাপী পাপের ফল ভোগ করে হয়তো একদিন পরিত্রাণ পেতে পারে কিন্তু মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্নরা তাদের মননে মিথ্যাদৃষ্টির কারণে ভবচক্রে ঘুরপাক খেতেই থাকে। মুক্তির পথ তাদের জন্য সুদুঢ় পরাহত। তাই পাঠকদের প্রতি একটাই অনুরোধ, যেদিকেই যান যেটাই পালন করুন না কেন তা জেনে করুন, অন্ধ আবেগের প্রতি বশবর্তী হয়ে নয়, ঐ খ্যাতিমান ব্যক্তি ডেকেছেন বলে নয় কিংবা বিশেষ কোন দেশে বেড়াতে যেতে পারবেন বলে নয়। সামান্য লোভ লালসাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করবেন না।

সকলের প্রজ্ঞা চক্ষু উদয় হোক।

তথ্য সুত্রঃ

  • মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম দর্শন- অধ্যাপক ভিক্ষু শীলাচার শাস্ত্রী।
  • ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান পতন- মহাপন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন।(জ্যোতিঃপাল মহাথের অনূদিত)
  • বাংলাদেশের বড়ুয়া জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য- সুনীতি রঞ্জন বড়ুয়া।
  • লোটাস সূত্র বা সদ্ধর্ম পুন্ডরিক সূত্র- ইন্টারনেট হতে সংগৃহীত।
  • কুড়ফবহ- রিসসো কোসেই কাই এর প্রার্থনা বই।

লেখকঃ সরকারী কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

Additional Info

  • Image: Image