২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৮ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 24 সেপ্টেম্বর 2015 03:46

ধর্মান্তরের কারণ, কুফল এবং ধর্মান্তর রোধে করণীয় কি ?

লিখেছেনঃ সুলেখা বড়ুয়া

ধর্মান্তরের কারণ, কুফল এবং ধর্মান্তর রোধে করণীয় কি ? 

বাংলাদেশ মুলত মুসলিম প্রধান দেশ, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যায় স্বল্প। এই স্বল্প সংখ্যক জনগোষ্ঠীর সাথে সমাজের অন্য ধর্মাবলম্বীদের সখ্যতা হতেই পারে, সেটা বন্ধুত্ব কিংবা ভ্রাতৃত্ব পূর্ণ হলেই শ্রেয় । কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় অন্য সম্প্রদায়ের নারী পুরুষের সাথে সম্পর্ক হতে । সাধারণত বয়সন্ধিকালে এ বিষয়টি বেশ চোখে পড়ে, বিশেষত কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মস্থলে ।

ধর্মান্তরের কারণ বয়সন্ধিকালে সন্তানকে যথাযথভাবে পথপ্রদর্শন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কেননা এই সময় শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ হওয়ার দরুন ভাবাবেগ মিশ্রিত সিদ্ধান্তের প্রবণতা প্রবল থাকে, সুতারাং বাবা মা কিংবা পরিবার থেকে ঐ সময়ে সন্তানদের সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হলে অঘটন ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। আর এই আবেগ মিশ্রিত সময়ে কখনো লোভের বশবর্তী হয়ে কিংবা মনে কামভাব উৎপন্ন হলে তখন তারা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। আর তখন জন্মদাতা মাতাপিতা, পরিবার তথা আত্মীয় স্বজন তুচ্ছ মনে হয়। যার কারণে নিজ ধর্ম ত্যাগ করে চলে যেতেও নুন্যতম দ্বিধাবোধ করেনা ।

অনেক সময়ে দেখা যায় বাবা মায়ের সু সম্পর্কের অভাব এবং সন্তানদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণে ব্যর্থতা তা সন্তানদের উপর বিরুপ প্রভাব বিস্তার করে, একটা পরিবারে যদি একে অন্যকে সম্মান প্রদর্শন না করে, ছেলেমেয়েদের স্বীকৃতিমূলক কাজে স্বীকৃতি এবং উৎসাহ দেওয়া না হয়। পরিবারের সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত থাকে (এমন পরিবারও দেখা যায় অনেক) এমতাবস্থায় সন্তানরা মনে করে, পরিবারে আমাকে কেউ গুরুত্ব দেয় না, আমার কোন কাজের স্বীকৃতি মিলে না, তখন তাদের মনে রাগ উৎপন্ন হয় এবং তাতে করে একসময় পরিবার পরিজন থেকে পিছুটান দিয়ে চলে যায় ।

তখন যেখানে একটু ভালবাসা পায় সেটাই জীবনের সব পাওয়া মনে করে, ভালবাসার সত্যতা কতটুকু যাচাই না করেই বা যাচাই করার মানসিকতাটুকু লোপ পাওয়াতে, ভবিষ্যৎতের কথা না ভেবেই অনেক সময় Emotional Blackmail হয়ে নিজ পরিবার, আত্মীয় স্বজন, এমনকি নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ভুল পথে পা বাড়াতে দ্বিধাবোধ করেনা।

আবার সমাজের কিছু বিত্তবানদের দেখা যায় শহরে হোক বা নিজ গ্রামে হোক ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে উনাদের তেমন উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না। সময়ের অজুহাতে বা কোন সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার কথা বলে উনারা অনেক সময় এর দায় এড়িয়ে যায়। আমি মনে করি সময়ের অজুহাত বা সমস্যার কথা না বলে পারিবারিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় অনুষ্টানে (ব্যস্ততা থাকা সত্বেও সময় করে নেওয়া যায় ) ছেলেমেয়েদেরকে সাথে নিয়ে অংশগ্রহণ করা এবং পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শিক্ষাদান দেওয়াই উত্তম। কেননা, সময়ের সাথে সাথে সব মানুষেরই ব্যস্ততা বাড়ছে, তাই মা বাবার দেখানো পথেই সন্তানেরা চলবে। সময়ের অজুহাতে যখন বাবা মা এড়িয়ে যাবে তা দেখে সন্তানদের মনেও সে ধারণাটাই পাকাপোক্ত হতে পারে। আর তাই ছোটকাল থেকেই পারিবারিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় আচার আচরণে উদ্বুদ্ধ করে সুন্দর ও সৎ জীবনধারণের শিক্ষা দেওয়াটা খুবই গুরুত্ববহ। আর তা নাহলে বয়সন্ধিকালে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাব এবং যথাযথভাবে পথপ্রদর্শন আর সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে সন্তান ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে ভুল পথে পা বাড়াতে এবং বাবা, মা, আত্মীয় স্বজন ও জাতির সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে লোভ ও কামের বশবর্তী হয়ে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বিবেকে বাঁধবে না। পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সুশিক্ষার অভাবই ধর্মান্তরের কারণ ।

ধর্মান্তরের কুফলঃ

ধর্মান্তরের কুফল বর্ণনা করতে গিয়ে পূর্বপরিচিত এক মেয়ের সাক্ষাতের কথা তুলে ধরলাম। কিছুদিন পূর্বে এক সামাজিক অনুষ্টানে পূর্বপরিচিত এক মেয়ের সাথে দেখা হয়। ওনার সাথে কথোপকথনের শুরুতে বললাম, দিদি কেমন আছেন, হঠাৎ উনি মুখ গোমড়া করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, অনেকদিন পর কেউ আমাকে দিদি ডাকলো, তাই ফেলে আসা অতীতের কথা মনে পড়ে গেলো । তখন বুঝতে আর বাকী নেই ওনার সংসার জীবনে উনি কেমন আছেন ! তবুও আমার খুব জানতে ইচ্ছে হল ওনার বর্তমান জীবন কেমন যাচ্ছে ।

তারপর যা বললেন উনি....

‘আসলে আমরা দুজনেই ভালবেসে বিয়ে করেছি, তখন বয়সও কম ছিল, ভালমন্দ বোঝার মত জ্ঞান ছিল না। বুঝতে পারিনি কোনটা ভাল এবং কোনটা মন্দ, মা বাবা, ভাইবোন, আত্মীয় স্বজনের প্রকৃত ভালবাসা উপেক্ষা করে মিথ্যে মোহ মায়ার জালে জড়িয়ে পরিবার এবং ধর্ম ত্যাগ করেছি, তা এখন আমাকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে চলছে মনে, মানসিক যন্ত্রণাও প্রতিনিয়ত খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে, মাঝেমাঝে শারিরিক যন্ত্রণাও পেতে হয়। যেহেতু নিজেই নিজের পরিবার ও ধর্ম ত্যাগ করেছি সেহেতু নিজের দুঃখ ও যন্ত্রণার কথাও ভাগ করার মত কেউ নেই। ভুল করার পর বুঝতে পারলাম যে ভালবাসায় অন্ধ হয়ে অন্য ধর্মের কাউকে আপন ভেবে সবকিছু ত্যাগ করেছিলাম। সে আসলে আপন নয় কিন্তু ততদিনে একুল আর ওকুল দুকুলই হারিয়ে উপায়হীনা ।বিয়ের দু’বছর পর একটা ফুটফুটে মেয়ে হলো, কিন্তু তারমধ্যেই আমার স্বামীর পরিবার থেকে আবার বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে লাগলো ওকে। ওর পরিবারের কেউ কেউ মেনে নিলেও মা, বাবা এবং ওর আত্মীয় স্বজন অনেকেই মেনে নেয়নি বিধর্মী মেয়ে বলে। তার উপর না জানা সত্বেও প্রতিদিন নামাজ পড়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে, রোজার মাস আসার আগে থেকেই বলতো যে রোজা থাকতে হবে, কি এক যন্ত্রণার মাঝে না বুঝে ঝাপ দিয়েছিলাম তা আগে বুঝতে না পারলেও এখন বুঝি। তাই সব জেনে শুনে মাঝেমাঝে ইচ্ছে করে আত্মহত্যা করতে কিন্তু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তা করতে পারিনা’।

বাবার বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করাতে বললেন উনি... ‘বাবার বাড়ির দরজা তো সেদিন থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে যেদিন থেকে ওনাদের ত্যাগ করে লোভে পড়ে ভুল পথে পা বাড়িয়েছিলাম। শুনেছি প্রতিবেশিরাও নাকি ভাল চোখে দেখে না এখন ওনাদের, আমার অন্য ধর্মে বিয়ে বা ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে। আমি জানিনা, আমার মা বাবা আমাকে ক্ষমা করে কিনা। আমার এ পাপের জীবন শুরু হলো সেদিন থেকেই যেদিন আমি নিজধর্ম ত্যাগ করে ভুল পথে জীবন সাজাতে চেয়েছিলাম। নিজের ধর্মত্যাগ করে বড় পাপের কাজ করেছিলাম, যা প্রতিনিয়ত এহেন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে চলছি’।

ধর্মান্তর রোধে করণীয়ঃ

বৌদ্ধধর্ম সম্পূর্ণই অনুধাবন যোগ্যধর্ম, জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার দ্বারা এ ধর্মের চর্চা, ধর্মীয় আচরণ যদি সঠিক অনুশীলনে পরিণত হয়, এর ব্যবহারিক ফল অবশ্যই আশাব্যঞ্জক । সাধারণত ছোট বেলা থেকে সন্তানেরা মানবিকতার যে শিক্ষা পায় তা হচ্ছে পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে, যেমন- পরিবারে সবাই একে অন্যকে সম্মান করা, সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করা, যাতে ওরা সব কিছু শেয়ার করে, সে রকম পরিবেশ তৈরি করা, ছোটদের ভাল কাজে স্বীকৃতি দেওয়া, এবং মন্দ কাজে ভুলগুলো ভাল উদাহরণ দিয়ে শুধরে দেওয়া, তাদের যথাযথ সময় দেওয়া, একাডেমীক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা এবং সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমের সাথে নিজেরা তথা সন্তানদেরকেও সম্পৃক্ত রাখা একান্ত প্রয়োজন ।

গ্রাম তথা শহরে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ধর্মীয় ক্লাসের আয়োজন করা ।

সর্বশেষ বলব, প্রতিটি পরিবার যদি কোন বিদর্শন ভাবনা চর্চা কেন্দ্রের সাথে জড়িত থেকে বিদর্শন ভাবনা চর্চা করে, তাহলে আমাদের নব প্রজন্ম ও উদ্বুদ্ধ হবে বিদর্শন ভাবনার প্রতি। বয়সন্ধিকালের শুরুতে যদি দুই তিনটি বিদর্শনের কোর্স চর্চা করে এবং সুচারুভাবে তা সম্পাদন করে, তাহলে ধর্মান্তর রোধে অনেকটা সহায়ক হবে মনে করি। কারণ বিদর্শন ভাবনা করলেই একমাত্র বোঝা যায় বৌদ্ধধর্মে গৌতম বুদ্ধ কি তত্ব আবিস্কার করেছেন। বিদর্শন ভাবনা করে নিজের ধর্ম প্রকৃত সত্যধর্ম জ্ঞান অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন । কেননা, "দুর্লভ মনুষ্য জন্মলাভ - সু দুর্লভ" ।

বৌদ্ধধর্মের সারতত্ব হৃদয়ঙ্গম করতে পারলে আশাকরি ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রশ্নই উঠবেনা। পরিশেষে এটাই প্রত্যাশা করি, সবার মনের ভুলগ্রন্থি খুলে যাক। সুস্থ মানসিকতার বিকাশ হোক। জগতের সকল প্রাণী সুখি হউক। বুদ্ধের শাসন চিরজীবী হউক ।

সুলেখা বড়ুয়া : সদ্ধর্মপ্রাণ সমাজ সচেতন সুলেখক হিসাবে ইতিমধ্যে সুনাম অর্জন করেছেন। বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী। একজন সংস্কৃতিসেবী।

Additional Info

  • Image: Image