২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৪ অগাস্ট ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 29 মে 2016 01:54

হল্যান্ড থেকে : বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া // বুদ্ধের বাণী কাঁদে নিভৃতে : হল্যান্ডে বুদ্ধ পূর্ণিমা

লিখেছেনঃ বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

হল্যান্ড থেকে : বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া // বুদ্ধের বাণী কাঁদে নিভৃতে : হল্যান্ডে বুদ্ধ পূর্ণিমা

Thousands of candles can be lighted from a single candle, and the life of the candle will not be shortened, Happiness never decrease by being shared. - Buddha

অর্থাৎ ‘একটি মোমবাতি হাজারো বাতি প্রজ্জ্বলিত করতে পারে, তাতে ওই বাতির কোন ক্ষয় হয় না। তেমনি ভাগাভাগি করলেও সুখ কখনো কমে না’ - বুদ্ধ বাণী।

গেল সপ্তাহে ছিল বুদ্ধ পূর্ণিমা। বৌদ্ধদের সব চাইতে বড় ধর্মীয় দিন। তিনটি ঘটনার জন্যে এই দিনটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বান বা মৃত্যু এই দিনটিতে। প্রবাসে নানা বৈরী পরিবেশে অনেক সময় দেশের অনেক ধর্মীয় আচার, অনুষ্ঠানের কথা মনে থাকে না। টের পাই অনুষ্ঠান হয়ে গেলে, পত্র-পত্রিকা কিম্বা টেলিভিশনের পর্দায় সংবাদ দেখে। বুদ্ধ পূর্ণিমার একদিন আগে চট্রগ্রাম থেকে আমার এক নিয়মিত পাঠক, যার সাথে ফেইস বুকের মাধ্যমে যোগাযোগ, স্নেহভাজন ইয়ার চৌধুরী বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভেচ্ছা পাঠালে টের পাই কেবল বৌদ্ধ জাতির জন্যে নয়, শান্তিপ্রিয় বিশ্বের গোটা মানব জাতির এই বড় দিনটি আবার উপস্থিত। সহধর্মিনী জানালে, হেগ শহর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে, নেইদারহোর্স্ট নামের এক শহরে শ্রীলংকানদের একটি বৌদ্ধ মন্দির আছে। আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা, সেখানে যাওয়া যাক। সেদিন নানা কারণে মনটাও ছিল বিক্ষিপ্ত। ভাবলাম, সেখানে গেলে হয়তো একটু প্রশান্তি খুঁজে পাব। সাথে সাথে ঠিক হলো সন্ধ্যেয় সেখানে যাওয়া যায়। শনিবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন, হাইওয়েতে ভিড় নেই। যে মন্দিরের কথা বলছি সেখানে বছর কয়েক আগে দু-একবার যাওয়া হয়েছিল। তখন এটি ছিল ভিয়েতনামীদের বৌদ্ধমন্দির। মাস ছয়েক আগে হল্যান্ডে বসবাসকারী শ্রীলংকানরা এটি তাদের দখলে নিয়েছে। যতদূর জেনেছি ভিয়েতনামীরা অন্য একটি শহরে নতুন মন্দির করেছে। তারা এটি বিক্রী করে দেবে। শ্রীলংকানরা এটি কিনতে চায়। কিন্তু সে জন্যে তাদের প্রায় পাঁচ কোটি টাকা অর্থাৎ অর্ধ মিলিয়ন ইউরো গুনতে হবে। ব্যাঙ্কের কাছে ধর্না দিয়েছে। কিন্তু ব্যাংক এখনো নিশ্চিত হতে পারছে না তারা এই বিশাল অংকের সুদ নিয়মিত পরিশোধ করতে পারবে কিনা। আর সে কারণে মন্দির পরিচালনা কমিটি উপস্থিত সবার কাছে যার যতটুকু সামর্থ্য আছে এই ব্যাপারে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে যেন এগিয়ে আসে এই আহবান জানায়। এই সব বিত্তান্ত শোনা অনুষ্ঠানে গিয়ে।

প্রবাস জীবনে ধর্ম চর্চা করার সুযোগ দেশের মত নেই সে আগেই উল্লেখ করেছি। তবে এটিও সত্য আগ্রহ বা তাগিদ যদি হয় প্রবল তাহলে প্রবাস বা দেশ কোন বাধা হবার কথা নয়। আমার মধ্যে সেটির কমতি আছে বলে মনে হয়। হল্যান্ডে ’চার্চ-গোয়িং’ লোকের সংখ্যা কম এবং দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছে। তরুণরা তো যায় না বললেই চলে। আর সে কারণে এই দেশটির অনেক গির্জা অর্থের অভাবে হয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নয়তো বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কটি গির্জা মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে বিক্রী করে দেয়া হয়েছে যেখানে গড়ে উঠেছে মসজিদ। আমারও খুব একটা মন্দিরে যাওয়া হয় না। যতটুকু সামর্থ্য আছে তাই দিয়ে নিকটজনদের উপকার করতে পারলে মনের মধ্যে প্রশান্তি পাই। অতি কাছ থেকে অনেক অর্থবানকে দেখেছি লক্ষ লক্ষ টাকা দান করতে অকাতরে, মন্দির নির্মাণে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। এই ব্যাপারে তাদের কোন কার্পণ্য নেই, কিন্তু মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া জন্মদাতা মা বা-বাবাকে সামান্যতম সেবা করতে দেখিনি তাদের। যে পরিমান অর্থ দান করে চলেছে মন্দির নির্মাণে তার কনা পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে না মা-বাবার চিকিৎসার জন্যে। দেখেছি কী করে গ্রামে আমাদের পারিবারিক শ্বশান বেদখলে চলে যায় বাইরে থেকে হটাৎ উড়ে আসা বৌদ্ধ ভিক্ষুর কারণে। দেখেছি আরো অনেক অনিয়ম। দেখেছি হল্যান্ডে এক ডাচ বৌদ্ধ ভিক্ষুকে যিনি ধর্মের লেবাস পরে কী করে এক নয়, দুই নয়, দশ মহিলার সাথে শারীরিক সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন। জানি হাতে গোনা কয়েক জনের ভুলের জন্যে গোটা শ্রেণিকে কোনো ভাবেই দোষী করা যায় না। করাটাও অন্যায়। সেটি আমি করছিনে। কিন্তু মনের মধ্যে আপনাতেই এক বিরূপ ভাব জন্মে। তারপরও যখন কোন বিশেষ উপলক্ষে ধর্মীয় উপসনালয়ে যাই ভালো লাগে, মনকে হালকা মনে হয়। ইচ্ছে করে বসে থাকি পদ্মাসনে বসে থাকা ২৫০০ বছরের আগে আবির্ভূত ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের সামনে। আপনাতেই মনে পরে বুদ্ধের বাণী, উপদেশ, ’মরণ ভাবনা।’ মুহূর্তে মনে হয় জাগতিক সব কিছু কত অসার। অথচ কী না করি আমরা। শ্রীলঙ্কান বৌদ্ধ মন্দিরে বুদ্ধের সামনে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে এই কথাটিই নতুন করে মনে এলো। আড়াই হাজার বছর আগে রাজপুত্র রাজ্য, স্ত্রী, পুত্র রাহুলকে ত্যাগ করলেন সিদ্ধার্থ, আর আমরা, আমাদের সামান্য কিছু ত্যাগ করতে কী দ্বিধা, কী কষ্ঠ। যাই হোক-

আমাদের আকার, পোশাক দেখে মন্দির পরিচালনার লোকজন টের পেল আমরা শ্রীলংকান নই। আমাদের বেশ খাতির করে বসালো। বুদ্ধ পূর্ণিমা অনুষ্ঠান ভোর থেকে অনেক রাত অবধি চলবে। আমাদের যাওয়া সন্ধ্যে অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান চলছে শ্রীলংকান (সিন্‌হলিস) ভাষায়। মাঝে মধ্যে ডাচ ভাষায় ব্যাখ্যা। আর মন্ত্র বা সূত্রগুলি স্বাভাবিক নিয়মে পালি, যা শুনে কানে অপরিচিত মনে হলো না, যদিও বা তার সব মর্মার্থ বুঝে উঠার মত পালি জ্ঞান ছিল না আমার। আমরা অনেকেই তো অর্থ না বুঝে তোতা পাখির মত আওড়িয়ে যাই। ভালো লাগলো যে শ্রীলঙ্কানরা মাঝে মধ্যে তাদের ভাষায়, আবার কখনো একই মন্ত্র ডাচ ভাষায় পাঠ করে চলেছিল। যে ব্যাপারটি খুব ভালো লাগলো তা হলো প্রায় ত্রিশেক স্কুল গামী শ্রীলংকান ছেলে-মেয়ে যাদের জন্ম এ দেশে, এক সাথে দীর্ঘ সময় ধরে এক সুরে ধর্মীয় সূত্র পাঠ করে চলেছে। পালি ভাষার সাথে মাঝে মধ্যে ডাচ ভাষায়ও একই সুরে তার অর্থ বলে চলেছে। নিজ ধর্মের সাথে পরবর্তী প্রজন্মকে পরিচিত করে তোলার শ্রীলংকানদের এই প্রচেষ্টা ভালো লাগলো। দেখে মনে পড়ে, স্কুল বয়সে আমরা বাসা থেকে হেঁটে সাপ্তাহিক স্কুল ছুটির দিন সকালে এনায়েত বাজার বৌদ্ধ মন্দিরে যেতাম। ধর্মীয় শিক্ষার জন্যে। শ্রীজ্ঞান দিপম্‌কর ভান্তে ছিলেন বিহারাধক্ষ্য।তখন তাকে দেখতাম মাঝে মধ্যে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আমাদের বাসায় আসতে। বাবার সাথে কথা বলতেন, ফরম পূরণ করতেন। তখন অতশত বুঝতাম না। পরে একটু বুদ্ধি হলে জেনেছি, পালি টোলের জন্যে তিনি সরকার থেকে ভাতা পেতেন। ঘণ্টা খানেক পড়ানোর পর আমাদের খাবার দেয়া হতো মন্দিরে। খাবার বলতে জিলিপী কিম্বা বিস্কুট গোছের কিছু। আমরা তাতেই খুশী। পালি শেখার আগ্রহে যতটা না তার চাইতে বেশী আগ্রহ ছিল ওই খাবারে। আর সে লোভে মন্দিরে যেতে মিস করতাম না। সেই যে তখন একটা-দুটা সূত্র শিখেছি সেটিই মনে রয়ে গেছে এখনো। এর পর ঘটা করে আর সূত্র শেখা হয়নি। হল্যান্ডে শ্রীলংকান বৌদ্ধ মন্দিরে এসে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের চমৎকার সুরে সূত্র পাঠ করা দেখে মনে পড়ে গেল ফেলে আসা দিনগুলির কথা। বাংলাদেশে কি এমন করে স্কুল গামী ছেলে-মেয়েরা সূত্র পাঠ করে ? জানিনে। আমি দেখিনি।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে পনের মিনিটের বিরতি। বাইরে সাধারণের জন্যে চা, কফি, কেক রাখা। ঘোষণা দেয়া হলো। আমরাও সেদিকে গেলাম। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে এক মহিলার সাথে পরিচয়। জানালেন শ্রীলংকান দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারী। বাংলাদেশী জেনে বললেন, ’তোমাদের দূতাবাসে পহেলা বৈশাখের চমৎকার অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। খুব ভালো লেগেছিল।’ তাকে বলি, প্রবাসী শ্রীলংকানদের জন্যে আমরা ইউরোপের চারটি দেশে কাজ করেছি।কলম্বোও গেছি এই কাজে।’ প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে তিনি তাকালেন, এমন সময় মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি কাছে এসে বিনয়ের সাথে আমাদের ডেকে নিয়ে গেলেন পৃথক একটি কামরায়।সেখানে আরো জনা তিনেক ডাচ, তাদের একজন হল্যান্ড বুদ্ধিস্ট ইউনিয়নের সভাপতি, এক স্থানীয় পত্রিকার মহিলা সাংবাদিক। আমাদের আর একটু উন্নত মানের খাবার, স্ন্যাক্স, চা কফি দেয়া হলো। ক্ষণিক বাদে এলেন এক ভদ্রলোক। মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ’ইনি আমাদের রাষ্ট্রদূত’।বেঁটে খাটো গোছের, পরনে শ্রীলংকার জাতীয় পোশাক, সাদা রংয়ের লুঙ্গি জাতীয় আর সাদা সার্ট। বিজনেস কার্ড বাড়িয়ে দিলেন। বাংলাদেশি ও বৌদ্ধ জেনে বললেন, ’ফ্রম চিটাগাং হিল ট্রেকটস?’ ’নো, ফ্রম চিটাগাং।’ রাজা ত্রিবিদ রায়ের কথা জানতে চাইলেন। নিজেই বললেন, উনি নিশ্চয় ইতিমধ্যে মারা গেছেন? বলি, তার ছেলে দেবাশিষ রায় এখন রাজা। আমাদের ডাক পড়লো অনুষ্ঠানে আবার যোগ দিতে। পনের মিনিট পার হয়ে গেছে অনেক আগেই। রাষ্ট্রদূতকে বলি, ’চলুন।’ পিঠে ব্যথা আছে জানিয়ে বললেন, ’মাটিতে বসতে কষ্ঠ হয়।’ পরে মনে হলো, ধর্মীয় কারণে তিনি হয়তো হল ঘরে আনুষ্ঠানিকতায় থাকেননি, যদিও বা বৌদ্ধ মন্দিরের ভিন্ন একটি কামরায় গোটা অনুষ্ঠান তক বসে ছিলেন। তার পুরো নাম, আদম এম. জে. সাদিক। খুব ভালো লাগলো তাকে, কোন অহং নেই, সাদামাটা, নেই সকলের মাঝে দর্শনীয় হবার কোনো প্রচেষ্টা কিম্বা নিজেকে আর দশ জনের চাইতে আলাদা করে দেখানোর তাগিদ। আর দশজনের মাঝে, দশের এক হয়ে তিনি ছিলেন গোটা অনুষ্ঠানে।

রাত তখন সোয়া দশ। ছেলে-মেয়েদের দীর্ঘ সময় ধরে চলা সূত্র পাঠ প্রায় শেষের দিকে। বিদায় নেব, এমন সময় পরিচালনা কমিটির সভাপতি এসে অনুরোধ জানালেন আর একটু থেকে যেতে। বললেন, ’আমরা ঠিক করেছি রাষ্ট্রদূত ছাড়াও আপনার হাত দিয়ে ছেলে-মেয়েদের সার্টিফিকেট আর পুরস্কার দেব। আমি আপনার নাম ইতিমধ্যে দিয়ে দিয়েছি ঘোষণা দেবার জন্যে।’ আবারো জুতা খোলা। পুরস্কার দেয়া শেষে হলের এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রদূতের কাছে বিদায় নিতে হাত বাড়িয়ে দিলে তিনি বাংলায় বললেন, ’ধন্যবাদ।’ ’আমার ভাষায় বললেন কী করে?’ জানতে চাই। হেসে উত্তর দিলেন, ’আরো দু একটা বাক্য জানি।’ তার দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকি, জিজ্ঞেস করি, কী জানেন। হেসে আবারও বাংলায় বললেন, ’আমি তোমায় ভালবাসি।’ এবার আমার হাসার পালা। দুজনে শব্দ করে হেসে উঠি। বলি, দেখা হবে, কথা হবে।

পিছু ফেলে আসি বৌদ্ধ মন্দিরকে। গাড়ী দ্রুত এগিয়ে চলে হাইওয়ে ধরে। অন্ধকার নেমে আসে চারিদিক ঘিরে। মনে পড়ে আব্রাহাম লিংকনের উচ্চারিত কথা - ”When I do good, I feel good, When I do bad, I feel bad, That's my religion,.” (যখন আমি ভালো কিছু করি ভালো লাগে, যখন খারাপ কিছু করি তখন খারাপ লাগে। এই আমার ধর্ম। ২৫.০৫.২০১৬

সৌজন্যেঃ দৈনিক আজাদী।

Additional Info

  • Image: Image