২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৫ মে ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 26 সেপ্টেম্বর 2014 03:12

গীতিকার জীবক বড়ুয়ার সাথে কিছুক্ষণ

লিখেছেনঃ সবুজ বড়ুয়া শুভ

গীতিকার জীবক বড়ুয়ার সাথে কিছুক্ষণ

উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ওয়াকিল কাওয়াল আমাকে বাবা সম্বোধনে বুকে জড়িয়ে নিতেন । বলতেন “তুই অনেক বড় মানুষ হবি”- সংগীত ভূবনে এটাই আমার সর্বোচ্চ পুরষ্কার ।

নির্বাণা’র পক্ষ থেকে সম্পাদক সবুজ বড়ুয়া শুভ সাম্প্রতিক বরেণ্য গীতিকার জীবক বড়ুয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সংগীত জগতে তাঁর প্রাপ্তি, বর্তমান ব্যস্ততাসহ নানান বিষয় সম্পর্কে আলোচনা হয়। যার সারসংক্ষেপ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো ।

নির্বাণা : কেমন আছেন ?

জীবক বড়ুয়া  : ভালো ।

নির্বাণা : বর্তমান ব্যস্ততা সম্পর্কে বলেন ?

জীবক বড়ুয়া  : আমার লেখায় অশোক পালের সূরে ইন্ডিয়া থেকে দু’টি গানের ট্রেক করে আনলাম, যা সনু নিগম ও আরজিৎ সিংহ দু’য়ের একজনকে দিয়ে গানগুলো করাবো। এবার সিডিউল না পাওয়াতে সম্ভব হয়নি, চেষ্টায় আছি। আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে, এক’ফোটা বিষ আজ আমার প্রিয়ার-খ্যাত সুরকার শাহনেওয়াজ স্যার আমার লেখা গানে সুর করছেন। তাছাড়া সুরকার আবিদ হোসেন, দেবেন্দ্র নাথ চট্টপাধ্যায়,টিটন, রিমু বিপ্লব, আতিক ডালিম,সাব্বির,মিন্টু পরদেশী সহ অনেকের সাথে কাজ করছি যা ধারাবাহিকভাবে আপনারা পাবেন ।

নির্বাণা : মাঝখানে আপনাকে পাইনি, এই বিরতি কেন ?  

জীবক বড়ুয়া  : খুবই সম্মানের সাথে আপনাকে বলছি, আমি পরিবার কেন্দ্রিক মানুষ। “প্রকাশের আগে বিকাশ হওয়া চাই”- রবী ঠাকুরের এই বাণীটা মাথায় ঢুকানো আছে। শিক্ষা আর পরিবারকে সময় দিয়েছি। তাছাড়া প্রথম ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতা আমাকে বড়ভাবে পরিচয় করে দেওয়াতে নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা করেছি। যার কারণে ভালো কাজগুলোই করতে পেরেছি ধারাবাহিকভাবে । একটু খেয়াল করলে দেখবেন- ‘nTv-এর সূচনা সংগীত “ সময়ের সাথে আগামীর পথে”, ফেরিওয়ালা ( নকিব খানের সূরে রাশেদের এ্যলবামের টাইটেল সং), হৃদয় নদী (ওস্তাদ অনুপ বড়ুয়া র এ্যলবামের টাইটেল সং), হৃদয় খান-সোনিয়ার ভেবে নেব এ্যলবামের এক্সক্লুসিভ সং আমি লিখতে পেরেছি।

নির্বাণা : আপনার ফেইসবুকে ধর্মীয় দু’টি এ্যলবামের ছবি আছে - এ সম্পর্কে বলবেন ?

জীবক বড়ুয়া  : পূজনীয় আসিন জিন রক্ষিত ভান্তে আমাকে ডেকে বলল, জীবক প্রবাস জীবনে অনেক উপাসক-উপাসিকা আছেন যারা ধর্ম শ্রবণের ব্যাপারে আগ্রহী । বৌদ্ধ প্রতিরূপ দেশ না হওয়াতে প্রার্থনার জন্য ভিক্ষুসংঘ পাননা। তুমি তাঁদের ব্যাপারে কী সহযোগিতা করতে পার। আমি ভান্তের কন্ঠে “বুদ্ধোপাসনা এবং মহাপরিত্রাণ” দু’টি এ্যলবামের উদ্দ্যেগ গ্রহন করি। এখানে উল্লেখ করা আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে,মহীয়সি নারী কবি নার্গিস এটি প্রযোজনা করার প্রস্তাব দেন। অবশেষে সূরকার অশোক পালকে নিয়ে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি ভালো কাজ হয়ত করতে পেরেছি। আমার অত্যন্ত সুভাগ্য ভান্তের কল্যাণে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু দেশে এই এ্যলবাম দু’টি পৌঁছে গেছে।

নির্বাণা : কীভাবে সংগীত জগতে এলেন ?

জীবক বড়ুয়া  : আমার বাবা অমিতাভ বড়ুয়া  একজন প্রখ্যাত কীর্তনীয়া। বাবার কন্ঠের গান আমার কাছে প্রার্থনার মত। সেই যে শুরু।তাছাড়া  আপন এবং চাচাতো মিলিয়ে আট মামা, ছয় মাসীর রাজকীয় মামা পরিবারে অনেক আদরে আমার বেড়ে ওঠা। প্রকৃতির বুক চিরে বিশাল এক বাড়ীই হচ্ছে মামা বাড়ি। বাড়ির পাশে নদী বয়ে গেছে, যে কারণে প্রকৃতিকে আমি হৃদয়ে ধারণ করতে পেরেছি । আপেক্ষিকভাবে বললে, প্রকৃতি থেকে আমি গানকে পেয়েছি। মামা বাড়িতেও গানের চর্চা ছিল।স্যার মিহির লালা ও জয়ন্তী লালার কাছে আমি গান শিখেছি।    

নির্বাণা : গান গেয়ে তো আপনার শুরু - এ সম্পর্কে বলবেন কী ?

জীবক বড়ুয়া  : সদরঘাট কালী বাড়ীর গীতাসংঘে আমার গাওয়া প্রার্থনা সংগীত ছিল ভক্তদের আকর্ষণের বিষয়। চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ছাত্রাবস্থায় ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কলেজের করিডোরে আমি ছিলাম অলিখিত স্টার। কলেজের যে কোন অনুষ্ঠানে আমার গান অবধারিত। প্রিন্সিপাল থেকে সাধারণ ছাত্রের নয়নমনি ছিলাম আমি। এই সুবাদে চট্টগ্রাম মহানগরের অনেক বড় বড় অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুভাগ্য হয়।

নির্বাণা : গান লেখার জগতে কীভাবে এলেন ?

জীবক বড়ুয়া  : গায়ক পরিচিতির সুবাদে বড় কিছু পরিবারে আমার যাতায়াত ছিল যেখানে আধ্যাত্মিক গানের আসর বসত। উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ওয়াকিল কাওয়াল চাচার গান শুনে আমার মনে সৃষ্টি এবং স্রষ্টা সম্পর্কে কিছু লেখার ভাব উদয় হয়। একদিন আমার লেখা চাচাকে দেখালে,আমাকে বাবা সম্বোধনে বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং বললেন “তুই অনেক বড় মানুষ হবি”- সংগীত ভূবনে এটাই আমার সর্বোচ্চ পুরষ্কার । আশি বছর বয়সে এত প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়া আওয়াজ আমি খুব কম শুনেছি যা চাচার কন্ঠে পেয়েছি। অগ্নিবীণা সংগীত নিকেতন নামে আমার একটা গানের স্কুল ছিল।  ক্লাসের পরে বন্ধুরা মিলে গান নিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্ঠা করতাম। আমি লিখতাম সাথে পংকজ, সাব্বির, রাশেদ( ক্লোজআপ ওয়ান খ্যাত তারকা) সবাই মিলে তৈরি করতাম নতুন নতুন গান। আমাদের এই সৃষ্টি বৃথা যায়নি। ২০০৪ সালে আমার লেখা গানে সাব্বির বেনসন এন্ড হ্যাজেস-স্টার সার্চ প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম বিভাগে প্রথম হন। আরেক বন্ধু রাশেদ প্রথম ক্লোজআপ ওয়ানে আমার লেখা গান গেয়ে ইয়েস কার্ড পান। বেঙ্গল বিকাশ প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় মৌলিক গান পর্বে সারা দেশ থেকে বাছাই করা ২৬টি গান নেয়া হয়েছিল, যার দু’টি গানই আমার লেখা।

নির্বাণা : জাতীয় পর্যায়ে কীভাবে প্রতিষ্ঠা এলো ?

জীবক বড়ুয়া  : ক্লোজআপ ওয়ান গান লেখার সুবাদে ঢাকায় নিয়ে যান। গীতিকার হিসেবে আমার পরিচিতি পাওয়াতে ক্লোজআপ ওয়ানের প্রতিযোগী মেহেরাবের বাবা মা আমাকে ছেলের তুল্য স্নেহে আশ্রয় দেন। মেহেরাব আমাকে বড় ভাইয়ের মর্যাদায় সম্মান করেন। ওখান থেকে আহম্মেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্যারের বাসায় যেতাম। বুলবুল স্যার সংগীতাঙ্গনের অনেকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। একিসাথে স্যার আমাকে একটি মোবাইল সীম উপহার দেন যাতে সবার সাথে যোগাযোগ রাখতে পারি। ভালো কিছু রান্না হলে স্যার আমাকে বাসায় ডেকে নিতেন। মেহেরাবের খালা রুনা লায়লার বান্ধবী, সেই সুবাদে খালা আমাকে উনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আমার লেখা গান দেখে উনার পরিচিত অনেক সুরকারকে আমার কথা বললেন। এভাবেই শুরু ।

উল্লেখ করার মত আরো কিছু কথা আছে । চট্টগ্রাম থাকাবস্থায় আমার গানের কর্মকান্ড দেখে নটরাজ স্বপন বড়ুয়া, আপনি ( নিবার্ণা’র সম্পাদক) আমাকে প্রায়ই বলতেন ঢাকায় যাওয়ার কথা। আপনাদের শুভ প্রত্যাশা আমাকে এতদুর নিয়ে এসেছে।

 

নির্বাণা : এত ভালো ভালো কাজ করছেন, প্রচার মাধ্যমে আপনাকে পাইনা কেন ?

জীবক বড়ুয়া  : দেখুন আমার কাজটা সবার কাছে প্রত্যাশার আমাকে নয়। আর গীতিকারদের নিয়ে সাধারণ মানুষদের তেমন কৌতুহল নেই এটাও একটা কারণ । এই তো আপনি এত ব্যস্ততার মাঝেও আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন এখন নিশ্চয়ই সবাই জানবে।  

নির্বাণা : ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে বলুন ?
জীবক বড়ুয়া  : আমি খুব ভালো আছি । আগেই বলেছি আমি পরিবার কেন্দ্রিক মানুষ। পরিবারের ভালোবাসার বলয়ে আছি।

নির্বাণা : আপনার কন্ঠে গান কি শুনতে পাব না ?

জীবক বড়ুয়া  : দেখুন আমি সফ্ট মেলোডি গান করি, বর্তমান সময়টা মনে হয় রক সংগীতের যুগ। এ সময় পেরিয়ে অবশ্যই আবার শ্রোতারা মেলোডি গান শুনবে সে সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। বলতে পারেন আগামীর গায়ক।

নির্বাণা : নতুন শিল্পীদের প্রতি আপনার কোন পরামর্শ আছে কিনা ?

জীবক বড়ুয়া  : সাধনার বিকল্প কিছু নেই। যে শিখবে সে টিকে থাকবে। আমিও এখনো শিখছি।

নির্বাণা : আপনার অনুরাগী, অনুসারী যারা তাদের কিছু বলবেন ?

জীবক বড়ুয়া : “তবুও হাল ছেড়োনা বন্ধু” ।

নির্বাণা : নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশন-এর পক্ষ থেকে আপনাকে আবারও অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
জীবক বড়ুয়া : আপনাকেও শুভেচ্ছা এবং সেই সাথে 'নির্বাণা' এর সকল পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদেরও অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা ।

Additional Info

  • Image: Image