২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১২ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 04 এপ্রিল 2014 03:18

‘আমিই প্রথম বিদ্রোহিনী তোমার ধরায়’: শর্মিষ্ঠা বড়ুয়ার একক আবৃত্তি সন্ধ্যা ১১ এপ্রিল

লিখেছেনঃ রানা ইশতিয়াক

‘আমিই প্রথম বিদ্রোহিনী তোমার ধরায়’: শর্মিষ্ঠা বড়ুয়ার একক আবৃত্তি সন্ধ্যা ১১এপ্রিল

শিল্পের সড়কে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ে অভিজ্ঞতা। মনের প্রান্তরে গড়ে ওঠে শিল্পের নন্দনকানন। সঞ্চিত জ্ঞানের বিচিত্র বৈভবে জীবন পরিস্রুত হয়। তখন জীবন আর শিল্প ঘোষণা করে অভিন্ন প্রত্যয়। নিরন্তর মনের গহীনে উঁকি দেয় কথার ফল্গুধারা। শ্রোতার প্রশ্রয় আর উপলক্ষ খোঁজে প্রকাশ-উন্মুখ শিল্পী হৃদয়।

প্রমার নিষ্ঠাবান কর্মী শর্মিষ্ঠা। শিল্পের প্রাঙ্গণে হাঁটছে দেড়যুগ। নিরব তপস্যা, শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ আর প্রস্তুতির পাঠ শেষে এবার দাঁড়াবে একা- একক আয়োজনে।
আবৃত্তিশিল্পী শর্মিষ্ঠা বড়ুয়ার ‘আমিই প্রথম বিদ্রোহিনী তোমার ধরায়’ শীর্ষক একক আবৃত্তি সন্ধ্যা আগামী ১১ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে। এতে তিনি তার প্রিয় বেশ কিছু কবিতা উপস্থাপন করবেন। অনুষ্ঠানে আগ্রহীদের উপস্থিত থাকার জন্য প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সভাপতি রাশেদ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পাল অনুরোধ জানিয়েছেন।

সম্প্রতি দৈনিক আজাদীর বিশেষ আয়োজন ‘আনন্দন’এ শর্মিষ্ঠা বড়ুয়ার এক সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়। পাঠকের জন্য তা উপস্থাপন করা হল। সাক্ষাতকার নিয়েছেন রানা ইশতিয়াক ।

আবৃত্তিতে নিবেদিতপ্রাণ শর্মিষ্ঠা বড়ুয়া

শমিষ্ঠা বড়ুয়া। একজন আবৃত্তিশিল্পী। তাঁর বাবা মৃণাল কান্তি বড়ুয়া (অবসর প্রাপ্ত চিকিৎসক)। মা সুপ্রভা বড়ুয়া (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক)। বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন শিক্ষকতাকে। গত ৮ বছর ধরে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। এছাড়া, কারিকুলাম এর মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রশিক্ষণ প্রদান। বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম এর তালিকাভুক্ত আবৃত্তিশিল্পী শর্মিষ্ঠা বড়ুয়া। বাংলাদেশে আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের আয়োজনে ঢাকায় ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে একক আবৃত্তি পরিবেশনা, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিভিন্ন চ্যানেলে একক আবৃত্তি পরিবেশনা। প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের বিভিন্ন প্রযোজনার গ্রন্থনা ও নির্দেশনা প্রদান যেমন- শ্রুতি নাটক “সোজন বাদিয়ার ঘাট”, “কথা মানবীর ভাষ্য”, “নদীর নিকটে যাই”, ‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে’ প্রভৃতি। ২০০২ সাল থেকে বিভিন্ন আবৃত্তি কর্মশালায় আবৃত্তি প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের কথামালা নিম্নে তুলে ধরছি।

আনন্দনঃ চট্টগ্রামের আবৃত্তি অঙ্গন সম্বন্ধে আপনার অভিমত কি?

শমিষ্ঠাঃ চট্টগ্রামে আবৃত্তির অবস্থান এখন বেশ সুদৃঢ়। সাংগঠনিক চর্চার মাধ্যমেই এখানে আবৃত্তির বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যায়। নতুন নতুন আবৃত্তি কর্মী প্রতিটি দলে উল্লেখযোগ্যভাবে যোগ হচ্ছে। প্রতিটি দল সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। যা আবৃত্তির বিকাশ ও সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পূর্বের তুলনায় বর্তমানে আবৃত্তির অনুষ্ঠানগুলোতে দর্শকের উপস্থিতি বেশ আশাব্যঞ্জক। নতুন নতুন অনেক আবৃত্তি দল গঠিত হলেও আবৃত্তি নিয়ে এক্সপেরিমেন্টাল কাজ সেভাবে চোখে পড়ে না। আবৃত্তি দলের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও সে অনুপাতে খুব বেশি উল্লেখযোগ্য কাজ ও আবৃত্তি অনুষ্ঠান এবং ভালো মানের জাতীয় পর্যায়ের সমকক্ষ আবৃত্তি শিল্পীর সংখ্যা বাড়েনি।

sharmishta barua boby nirvanapeace

আনন্দনঃ এখানে আবৃত্তিচর্চায় কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে বলে মনে করেন?

শমিষ্ঠাঃ ব্যক্তিগতভাবে আবৃত্তিচর্চায় কোন বাধা নেই। তবে আবৃত্তি অনুষ্ঠানগুলোয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। অন্যান্য শিল্পমাধ্যমগুলোর অনুষ্ঠানে যত সহজে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সম্ভব হয়, তার বিপরীতে একটি আবৃত্তির অনুষ্ঠানে সেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায় না। আবৃত্তি যেহেতু নিরন্তর চর্চা এবং অনুশীলনের বিষয়, সেদিক থেকে খুব দ্রুত আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে নিজেকে তৈরি করা অত সহজ নয়। এজন্য আবৃত্তি করে জনপ্রিয় হওয়া বেশি কঠিন। অর্থাৎ আবৃত্তিতে খুব সহজ প্রাপ্তি ঘটে না। হয়তোবা সেজন্য আবৃত্তিদলগুলোতে প্রতিটি কর্মশালায় অনেক প্রশিক্ষণার্থী দেখা গেলেও খুব হাতে গোনা ক’জনকেই আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে ঠিকে থাকতে দেখা যায়।

আনন্দনঃ আপনি তো একজন তরুণ আবৃত্তিকার। আবার শিক্ষকতা আপনার পেশা। কিন্তু আপনার স্বাচ্ছন্দ্য কোন অঙ্গনে?

শমিষ্ঠাঃ বয়সের দিক থেকে তরুণ হলেও গত প্রায় ১৬ বছর ধরে আবৃত্তি অঙ্গনে আমার পদচারণা। শিক্ষকতা আমার পেশা হলেও আবৃত্তি আমার নেশা। আবৃত্তি আমার ভালো লাগার একটা জায়গা। একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে আমি গর্ববোধ করি। আবৃত্তির মাধ্যমে আমি সমাজের কথা, মানুষের কথা, দেশের কথা বলতে চাই। এতে অনেক তৃপ্তি পাই। আর অন্যদিকে ক্লাসরুমে ছাত্রদের পড়াতে, তাদের জানার পরিধি বিস্তৃত করতে যতটা শ্রম দেওয়া প্রয়োজন, ততটুকু আমি আমাকে উজাড় করে দিই। এতেও আমি অনেক আনন্দ পাই, আমার ছাত্রদের ভালোবাসা আমাকে আপ্লুত করে।

আনন্দনঃ আবৃত্তিতে আপনার হাতেখড়ি কখন?

শমিষ্ঠাঃ আমার মা’র মুখে কবিতা শুনতে শুনতে ছোটবেলা থেকেই আবৃত্তির প্রতি আমার ভালো লাগা কাজ করত। স্কুলে অনেক পুরস্কারও পেয়েছি। তবে ১৯৯৮ সাল থেকে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে আবৃত্তি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর আবৃত্তিশিল্পী প্রতিভা দাশ, আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসানের অনুপ্রেরণায় আমি নিজেকে একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছি। সেই উৎসাহের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে শুধু আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে আবৃত্তির একজন প্রশিক্ষক হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছি। একই সাথে আবৃত্তির বিভিন্ন প্রযোজনার গ্রন্থনা ও নির্দেশনার কাজে নিজেকে যুক্ত করেছি। ২০০৫ সালে আমার গ্রন্থনায় প্রমা’র প্রথম শ্রুতি নাটক পল্লী কবি জসীমউদ্দিনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ মঞ্চস্থ হয়। এরপর আমি আরও বেশ কয়েকটি প্রযোজনার গ্রন্থনা ও নির্দেশনা দিয়েছি। ২০০২ সাল থেকে আমি বিভিন্ন আবৃত্তি কর্মশালায় আবৃত্তির একজন প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ প্রদান করে আসছি।

আনন্দনঃ আপনার আগামী লক্ষ্য কি?

শমিষ্ঠাঃ আবৃত্তি নিয়ে আমার অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। যেমন- অনেক বেশি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করতে চাই। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এর মতো ভিন্নধর্মী আরো অনেক অন্যরকম কাজ করতে চাই। এমন একজন আবৃত্তিশিল্পী হতে চাই, যাতে মানুষ যখনি ঐ কবিতাটি শুনবে তখনই আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে আমাকে স্মরণ করবে। যেমন- আবৃত্তিশিল্পী আহ্‌কাম উল্লাহ-এর গলায় “আমার পরিচয়” কবিতাটি অথবা আবৃত্তি শিল্পী রাশেদ হাসানের গলায় “নুরুল দীনের সারাজীবন”। একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে আমার স্বপ্নের জায়গাটি হলো- আবৃত্তিচর্চায় নিবিড়ভাবে নিবিষ্ট থেকে চর্চার মাধ্যমে নিজেকে একজন সত্যিকারের জাতীয় মানের আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে তৈরি করা, একই সাথে এই শিল্প মাধ্যমটিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারা এবং আমার নিজের দল প্রমা আবৃত্তি সংগঠনকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

sharmishta barua boby nirvanapeace.4jpg

আনন্দনঃ সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কৃতিকর্মীদের কি রকম ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?

শমিষ্ঠাঃ ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সমস্ত আন্দোলন, বিপ্লব, স্বাধীনতা আন্দোলন এমনকি দেশের সমস্ত সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে সবসময় প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। দেশের যেকোন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে সংস্কৃতিকর্মীরা সবসময় দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাই, সাম্প্রদায়িক হামলার বিপক্ষে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে সর্বস্তরের সংস্কৃতিকর্মীরা রাস্তায় ব্যানার হাতে দাঁড়িয়েছে, প্রতিবাদ করেছে। তেমনিভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতেও তারা ছিল সব সময় সোচ্চার। সম্প্রতি তরুণদের যে স্বতঃস্ফূর্ত অবিস্মরণীয় জোয়ার তৈরি হয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চের সেই আন্দোলনেও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল সমানভাবে উল্লেখযোগ্য।

কৃতজ্ঞতাঃ দৈনিক আজাদী ও সংস্কৃতিকর্মী রানা ইশতিয়াক।

Additional Info

  • Image: Image