২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ সোমবার, ২১ অগাস্ট ২০১৭ইংরেজী
মঙ্গলবার, 25 নভেম্বর 2014 21:18

তক্ষশীলা : বিশ্বের সর্বপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্চর্যময় কিছু কথা

লিখেছেনঃ নির্বাণা ডেস্ক

তক্ষশীলা : বিশ্বের সর্বপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্চর্যময় কিছু কথা

তক্ষশীলা হলো প্রাচীন ‘গান্ধার’ রাজ্যের রাজধানী যার অবস্থান ছিল বর্তমান পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এবং পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার (২০ মাইল)উত্তর-পশ্চিমে; যা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে খুব কাছে। এটি পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত ভারতবর্ষের অর্ন্তগত ছিল। ৩টি সুপরিচিত বানিজ্যিক রুটের সম্মিলন স্থান হওয়ায় রাজা ভরত ও তার স্ত্রী মান্দভির পুত্র তক্ষের নামে প্রতিষ্ঠিত এই তক্ষশিলা শিক্ষা ও বানিজ্যকেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে আবার তক্ষশীলার নাম করন করা হয়েছে রাজা তক্ষের নাম অনুসারে। ধারনা করা হয় কোন এক সময় তক্ষশীলা ও উজবেক স্থানের রাজধানী তাজখন্দ তাঁর শাসনাধীন ছিল। আবার রামায়ন মতে রামের ভাই ভরতের ১ম ছেলের নাম তক্ষ অনুসারে এই এলাকার নাম হয়েছে তক্ষশীলা। এখানেই শেষ নয় আরো দাবি করা হয় উজবেক স্থানের রাজধানী তাসখন্দও নাম করন হয়েছে ভরত পুত্র তক্ষানুসারে।
খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতকে এখানকার সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়ে ১ম শতকে এর প্রায় সমাপ্তি ঘটে।

জ্ঞানপিঠ তক্ষশীলা সম্পর্কে ...

ভারত বর্ষের যে ক’টি শহর ধিরে ধিরে জ্ঞান চর্চার কেন্দ্রে পরিনত হয় তক্ষশীলা তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন। তক্ষশীলা হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং বর্তমান সময়েও উক্ত ধর্মদুটির ঐতিহ্যে এ স্থানটির একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে।

খ্রি: পু: ৪১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত তক্ষশীলা বিদ্যাপিঠে ১টি লাইব্রেরিও ছিল,যেখানে অসংখ্য তাল পাতার লেখ্য ছিল। ঐ সংগ্রহশালায় হিন্দুইজম, রাজনিতি, সাহিত্য,মেডিসিন আর দর্শনের অনেক উপাদান ছিল। এখানকার শিক্ষার উচু মানের জন্য একে ভারতের ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপিটাল বলা হতো। ভেদিক শিক্ষার কেন্দ্র হলেও এখানে চানক্যের মতো কৌশলবিদেরাও শিক্ষকতা করেছেন।
এখানে উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজগৃহ (Rajagriha), বেনারস (Benaras), মিথিলা (Mithila), উজ্জয়িনী (Ujjaini) আরকোশল (Kosala)-এর মতো দূর দূরান্ত থেকে ছাত্র আসতো। আলেকজান্ডারের সময়কার দার্শনিকরাও এখানে সমাদৃত ছিলেন।

মহাভারত থেকে জানা যায় দায়ময় (Dhaumya) আর তার ছাত্র উদ্ধলকা (Uddalaka), অরুনী (Aruni) আর ভেদা (Veda)এর মতো শিক্ষকরা এখানে শিক্ষকতা করেছেন। এখানে একেকজন পন্ডিত তার সিনিয়ার ছাত্রদের সহযোগিতায় গড়ে তুলতেন নিজস্ব একেকটা ইন্সটিটিউট। আর একেকজন পন্ডিতের প্রতিষ্ঠানে রাজপুত্র থেকে শুরু করে বিদেশি সহ নানা শ্রেণীর অনধিক ২০ জন ছাত্র আর পুরো তক্ষশীলায় আনুমানিক ৫ শতাধিক ছাত্র অধ্যায়ন করতো । পৃথিবীর প্রথম এই বিদ্যাপিঠ অন্যান্য সভ্যতায়ও এর অবদান অনস্বিকার্য।

কুশান সাম্রাজ্যের শেষ পর্যন্ত তক্ষশীলা বিকাশ মান ছিল। এর পরে তা বর্বর Little Yueh Chis এর অধিনে চলে যাওয়ায় শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে এর মান নষ্ট হয়ে যায়। ৫ম শতাব্দির শুরুতে ফা হি য়েন (Fa-hi-en) এখানে এসে শিক্ষা ব্যবস্থার কোন গুরুত্বই খুজে পায়নি। লাইব্রেরি আর শিক্ষাকেন্দ্র সহ এই শহরের অবশিষ্ট ৫ম শতকের মাঝামাঝি হানাদের দারা ধংশ প্রাপ্ত হয়।

৫ম শতাব্দীর দিকে শ্রীলংকায় লিখিত জাতক কাহিনীতেও তক্ষশীলার বর্ণনা কিছুটা বিস্তারিত ভাবে বর্ণিত হয়েছে। চৈনিক ভিক্ষু ফাক্সিয়েন (যিনি ফা-হিয়েন নামেও পরিচিত) ৪০৫ খ্রিষ্টাব্দের তার তক্ষশীলা ভ্রমণকাহিনীতে তক্ষশীলা রাজ্যের অর্থ 'ছিন্ন মস্তক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে, এই নামটির উৎপত্তি হয়েছে বুদ্ধের জীবনের একটি ঘটনা থেকে, কেননা এটিই সেই জায়গা 'যেখানে বুদ্ধ(বোধিসত্ত্ব থাকা অবস্থায়) তার মাথা একটি লোককে দিয়েছিলেন'। আরেকজন চৈনিক ভিক্ষু জুয়ানজ্যাং (যিনি হিউয়েন সাং নামেও পরিচিত) ৬৩০ এবং ৬৪৩ সালে তক্ষশীলায় ভ্রমন করেছিলেন এবং তিনি শহরটির নাম বলেছিলেন তা-চা-শি-লো (Ta-Cha-Shi-Lo)। ধারণা করা হয় যে, সেই সময়েই শহরটি প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। টলেমির ভূগোলে তক্ষশীলাকে বর্ণনা করা হয়েছে 'তক্ষিয়ালা' (Taxiala)হিসেবে। হিল্ডেশিম এর জন কর্তৃক ১৩৭৫ সালের দিকে প্রণীত Historia Trium Regum (History of the Three Kings বা তিন রাজার ইতিহাস) গ্রন্থে তক্ষশীলাকে বর্ণনা করা হয়েছে এগ্রিশিলা (Egrisilla) হিসেবে।

৭ম শতকে হিউ-য়েন-সাঙ (Hiuen Tsang) এখানে এসে তক্ষশিলার গৌরব পুরোপুরি বিলুপ্ত অবস্থায় পান। এটাই কোন বর্বর ব্যাক্তি বা গোষ্ঠি কতৃক এ উপমহাদেশের মহামুল্যবান জ্ঞান ভিত্তিক সভ্যতা ধংশের ১ম নিদর্শন। আর সম্ভবত তক্ষশীলার দৃষ্টান্ত অনুসরন করেই ১১৯৩ সালে তথাকথিত ইসলামের মুখোশ পরা টার্কিশ বখতিয়ার খিলজি নালান্দা আক্রমন করে সমৃদ্ধ আরেক জ্ঞান ভিত্তিক সভ্যতার প্রায় সমস্ত শিক্ষক ছাত্রকে হত্যা করে, সব পাঠাগারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় যা পুড়তে কয়েকমাস সময় লাগে। এরই সাথে শেষ হয় এই উপমহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী আরেক জ্ঞান ভান্ডার। এ ক্ষতি আমাদের ইতিহাস সভ্যতার অনেক তথ্য ধ্বংস হয়ে যায়।।

সূত্র : গুগল,উইকিপিডিয়া & Blog Site অবলম্বনে...

কৃতজ্ঞতা: বিমুক্তি ডট কম

Additional Info

  • Image: Image