২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৪ অগাস্ট ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 07 নভেম্বর 2014 15:11

বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধচর্চার পটভূমি ও প্রাসঙ্গিক তথ্য

লিখেছেনঃ ড. সৌমিত্র বড়ুয়া

বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধচর্চার পটভূমি ও প্রাসঙ্গিক তথ্য

৭৫০ থেকে ১১৬০সাল পর্যন্ত পাল বৌদ্ধরাজারা চারশত বৎসর বাংলা শাসন করেন। তাঁদের শাসনকালে বাঙালির নব যাত্রা শুরু হয়। ধর্ম, শিল্প, সাহিত্য ও শিক্ষায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। তাঁদের সম্যক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা নালন্দা, বিক্রমশীলা, ময়নামতি, পাহাড়পুর, সোমপুর ওদন্তপুর প্রভৃতি মহাবিহারকে ঘিরে বাঙালির মহিমা বৌদ্ধজগতে প্রসিদ্ধি লাভ করে। শীলভদ্র, শান্তিরক্ষিত, পদ্মসম্ভব, কমলশীল, দীপংকর শ্রীজ্ঞান, চন্দ্রগোমিন, অভয়কর গুপ্ত প্রভৃতি বাঙালির পরম গর্বের ধন।

প্রাচীনযুগ

তথাগত বু্‌দ্ধ অহিংসা, করুণা ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকের মাঝামাঝি সময়ের কিছুকাল পরে। তিনি সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন- “লৌকিক কর্মফলের জন্য মানুষ বারবার জন্মগ্রহণ করে ও দুঃখ ভোগ করে। জগৎ মায়াপ্রপঞ্চময়, অবিদ্যাজনিত ভ্রান্তিতে মানুষ জগতের মায়ায় ধরা দেয় ও কষ্ট পায়। সৎকর্ম, চিত্ত সংযম এবং আত্মসাধনা দ্বারা সমাধিস্থ হতে পারলে জীবের চিরমুক্তি তথা মহানির্বাণ ঘটে। যাগযজ্ঞ পশুবলি আচার সর্বস্ব হিন্দুধর্মের মূর্তি পূজার বিরোধীতা করে অহিংস, আত্মনির্লিপ্ত, নিরীশ্বর সাধন পদ্ধতির প্রবর্তন করে বুদ্ধদেব ধর্মজগতে একটা জোয়ার আনলেন।”১ বুদ্ধের এ বাস্তববাদী, যুক্তিসঙ্গত বাণী তৎকালীন ভারত বর্ষের আত্মসচেতন মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন। মগধ থেকে বাংলার দূরত্ব বেশি নয় কিন্তু তথাগত বুদ্ধের বাণী ও আদর্শ বাংলায় পৌঁছতে অনেক দেরি হয়েছিল।

মহান সম্রাট অশোকের (খ্রিঃ পূঃ ২৭৩-২৩২) সময়ে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হয় এবং তা ক্রমে ক্রমে বিস্তার লাভ করে। মহাকারুণিক বুদ্ধ যখন সমগ্র ভারতে তাঁর বাণী ও আদর্শ প্রচার করছেন তখন অনার্য-অধ্যুষিত বাংলাদেশের লোকেরা বস্তুপূজা দ্বারা তাদের ধর্মীয় আচার আচরণ পালন করত বলে গবেষকেরা মনে করেন।

অধ্যাত্মবাদী ও দেবপূজাশ্রায়ী আর্য সংস্কৃতির প্রভাবও তেমন প্রবল হয়নি। সম্রাট অশোকের সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে বাংলাদেশও তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং আর্যাবর্তের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এ যোগাযোগের ফলে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের প্রবেশ ঘটে। বৌদ্ধধর্মের এ প্রভাব কতটুকু বিস্তৃত হয়েছিল তা জানার জন্য ইতিহাস পর্যালোচনা প্রয়োজন প্রসিদ্ধ চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়ান পঞ্চম শতাব্দীতে বাংলাদেশ ভ্রমণে আসেন এবং দুই বৎসর অবস্থানকালে তিনি বৌদ্ধধর্মের সমৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করেন। ত্রিপুরার মহারাজ বন্যগুপ্তের ৫০৬-৫০৭ শতাব্দীর একখানি তাম্রশাসন থেকে যে তথ্য পাই, তাতে দেখা যায় রাজা কর্তৃক ভিক্ষুসংঘের জন্য ভূমিদান, বিহার নির্মাণ ইত্যাদি উল্লেখ রয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, “পঞ্চম শতাব্দীতে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের বিশেষ প্রভাব ছিল।”২ সপ্তম শতাব্দীতে তিনজন চীন পরিব্রাজক হিয়েন-সাঙ, শেংচি ও ই-ৎসিং প্রমুখ বাংলাদেশে আসেন। তাঁরা কজঙ্গল, পুণ্ড্রবর্ধন, কর্ণসুবর্ণ, সমতট ও তাম্রলিপ্তির যে বর্ণনা করেছেন, তা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল।

সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সপ্তম শতাব্দীতে বাংলাদেশে বৌদ্ধদের অবস্থা ও অবস্থান সংহত হয়েছিল ও সমসাময়িক কালে বৌদ্ধধর্ম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। পাশাপাশি বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিতদের খ্যাতিও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সমতটে জন্মগ্রহণকারী বিশ্ববিশ্রুত পণ্ডিত শীলভদ্র এ শতকের একজন খ্যাতিনামা শিক্ষাগুরু। দেশ-বিদেশে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক ‘হিয়েন সাঙ বাঙালি পণ্ডিত শীলভদ্রের ছাত্র।’৩

ভারত জননীর গর্ভ হতে উৎসারিত যে ধর্মটি মানুষকে অহিংসা, প্রেম ও মানবতার শিক্ষা দিয়ে বিশ্বের চতুর্দিকে যখন পরিব্যাপ্ত হচ্ছে তখনই তার মাতৃভূমি ভারত থেকে বিভিন্ন কারণে বৌদ্ধধর্ম অনেকটা বিলুপ্ত হতে থাকে। তবে তখনও বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব তিরোহিত হয়নি। অষ্টম শতকের মধ্যভাগে পালরাজাদের অভ্যুদয়ে বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম এক প্রচণ্ড গতি প্রাপ্ত হয়। ভারতে বৌদ্ধধর্মের নিভু নিভু দীপশিখাটি বাংলাদেশকে ঘিরে এক মহাশক্তিতে আত্মপ্রকাশ করে। সেই সময় বাংলার “পালরাজারা অনেকে শক্তিশালী ও বিচক্ষণ ছিলেন। তাঁদের সুশাসনে দেশে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মপাল, দেবপাল, মহীপাল রামপাল প্রমুখ শাসক সুনাম অর্জন করেছেন। এগার শতক পর্যন্ত পালদের ক্ষমতা কায়েম ছিল। পালগণ বৌদ্ধধর্মের প্রতিপোষক ছিলেন। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রচারণায় বাংলাদেশে বৌদ্ধপ্রভাব ব্যাপকতর ও গভীরতর হয়। বৌদ্ধ সহজিয়া মতের বাংলা চর্যাগীতি এসময়েই রচিত ও প্রচারিত হয়েছিল।”৪

৭৫০ থেকে ১১৬০সাল পর্যন্ত পাল বৌদ্ধরাজারা চারশত বৎসর বাংলা শাসন করেন। তাঁদের শাসনকালে বাঙালির নব যাত্রা শুরু হয়। ধর্ম, শিল্প, সাহিত্য ও শিক্ষায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। তাঁদের সম্যক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা নালন্দা, বিক্রমশীলা, ময়নামতি, পাহাড়পুর, সোমপুর ওদন্তপুর প্রভৃতি মহাবিহারকে ঘিরে বাঙালির মহিমা বৌদ্ধজগতে প্রসিদ্ধি লাভ করে। শীলভদ্র, শান্তিরক্ষিত, পদ্মসম্ভব, কমলশীল, দীপংকর শ্রীজ্ঞান, চন্দ্রগোমিন, অভয়কর গুপ্ত প্রভৃতি বাঙালির পরম গর্বের ধন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পালযুগ মূলত জাগরণ ও উত্তরণের যুগ। কেননা এ যুগে বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায় বাংলাভাষায় ‘চর্যাপদ’ রচনা করে বাংলাসাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁদের এ মহান কীর্তি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

বাংলায় পালযুগের অবসানের পর সেন বংশীয় রাজারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। মূলত “ত্রয়োদশ শতক ভারতবর্ষের ইতিহাসে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থানের যুগ। বাংলাদেশে এ সময়ে সেন রাজাগণের অভ্যুদয়ের ফলে শৈব ও বৈষ্ণব-ধর্ম বেশ প্রতিপত্তি লাভ করে এবং বৈদিক ও পৌরাণিক ধর্মানুষ্ঠান, আচার ব্যবহার প্রভৃতি পুনরুজ্জীবিত হয়।”৫ সেন রাজারা সংস্কৃত ভাষা ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতিপোষক হওয়ায় বাংলাভাষা চর্চাকারী বৌদ্ধ সহজিয়ারা উৎসাহ হারাতে থাকে। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তারা নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী বৌদ্ধ অঞ্চলে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছিলেন। আবার অনেকে ছদ্মাবরণে দেশের মাটিতে অবস্থান করতে থাকেন। এ বিষয়ে সুধাংশুবিমল বড়ুয়ার অভিমত- “পালযুগের সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে যে উদারতা ছিল সেনবর্মন যুগের রক্ষণশীল মনোভাবের মধ্যে তার পরিচয় পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে, এ সময়ে বৌদ্ধধর্মের প্রতি একটি বিরুদ্ধ মনোভাব দেখা দিয়েছে। এরপর তুর্কী আক্রমণের চরম আঘাতের ফলে বৌদ্ধধর্মের প্রাণকেন্দ্র বৌদ্ধবিহারগুলো ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।”৬ প্রথমে সেন ও পরবর্তীতে পাঠান আমলে রাজনৈতিক ধর্মীয় সংস্কৃতির পটভূমি পরিবর্তিত হয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিলুপ্তি ঘটে। এর ফলে তাদের ধর্মসাধনা ও জ্ঞানসাধনার অন্তরায়ও ঘটে; যুগপৎভাবে বাংলা সাহিত্যচর্চার পথও বন্ধ হয়ে যায়। কেননা বৌদ্ধরাই ছিলেন বাংলাভাষার ধারক বাহক। এভাবে বাংলাসাহিত্য চর্চার প্রাচীন যুগের অবসান ঘটে। প্রায় ছয় শতাব্দী পর বাঙালির রেনেসাঁস যুগে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনুসন্ধান করতে গিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সুদূর নেপাল রাজ দরবার থেকে বৌদ্ধ সহজিয়াদের বাংলা রচনাগুলো উদ্ধার করে ‘চর্যাগীতি’ নামকরণে এক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন।

বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশের দলিল ‘চর্যাপদ’ বা ‘চর্যাগীতি’। গৌরব ও মহিমান্বিত আমাদের জাতিসত্তার এ দলিল রচিয়তা বৌদ্ধাচার্যগণ। বাঙালির আদি নিদর্শন চর্যাপদ নেপাল রাজদরবার থেকে উদ্ধার করে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এ দুরূহ কাজের জন্য জাতি তাঁকে অনাগত দিনগুলোতে শ্রদ্ধা এবং সম্মানের সাথে অন্তরের অন্তলে সযত্নে ধারণ করে রাখবে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১) মহাশয়ের ‘চর্যাপদ’ আবিষ্কারের ফলে আমাদের সাহিত্য ও কৃষ্টি সংস্কৃতির সময়কালের পরিসীমা হাজার বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। এ চর্যাপদে তৎকালীন বাঙালির সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এবং মানুষের জীবন-জীবিকার মতো বিষয়গুলো খুব আকর্ষণীয়ভাবে ফুটে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহোদয়ের বক্তব্যে প্রণিধানযোগ্য- “সাহিত্য সর্বদাই সমাজ জীবনের প্রতিচ্ছবি-তাহা শুধু আজিকার দিনে নয়, হাজার বৎসর পূর্বের দিনেও। হাজার বৎসর পূর্বে আমাদের বাঙলায় যে সকল সাহিত্য রচিত হইয়াছে সে সকল দোহা ও চর্যাপদগুলোর ভিতরেও সে হাজার বৎসরের প্রাচীন বাঙলাদেশ ও বাঙালি জাতির পরিচয় নানাভাবে জড়াইয়া রহিয়াছে; সে সকল দোহাকার এবং গীতিকারগণ ধর্ম অবলম্বনে সাহিত্য রচনা করিলেও তাহাদের ভিতরে সে সত্যিকার সাহিত্য প্রতিভা ছিল বহুস্থানে তাহার প্রমাণ রহিয়াছে”।৭ ধর্মের মধ্যে আছে চিন্তা ও অনুভূতি। দুই-ই অস্পষ্ট; এ অস্পষ্টতাকে স্পষ্ট করে তুলতে না পারলে সাহিত্য হয় না। এটির জন্য প্রয়োজন রূপক ও অন্যান্য অলঙ্কার। জীবন ও তার পারিপার্শ্বিকের রূপ ছাড়া রূপক তার রূপ পাবে কোথায়? সুতরাং তৎকালীন বাঙালি জীবন এবং তার পারিপার্শ্বিক বাংলাদেশকে পদে পদে এ দোহা গানগুলোর ভেতরে আসতে হয়েছে। “দর্শনের জটিলতম তত্ত্ব, সাধনার সূক্ষ্নতম অনুভূতিগুলোকেও প্রকাশ করিতে হইয়াছে স্থুল জীবনের চিত্রে ও ভাষায়। বাংলার প্রাচীনতম গানগুলোর ভিতরে তৎকালীন দেশ ও সমাজ জীবনের ছবি ফুটিয়া উঠিয়াছে।”৮ বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায় তাঁদের মেধা মননের উন্মীলন ঘটিয়ে চর্যাগীতি রচনার মাধ্যমে আমাদের জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে করেছে ঋদ্ধ। পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের প্রারম্ভিক সময়ে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির যে প্রভাব সেটাও মূর্ত হয়ে উঠেছে। মূলত চর্যাগীতি সহজিয়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মমত ও সাধনরীতিকে ঘিরে রচিত গীতমালা। সহজিয়া বৌদ্ধদের ধারণা, ধর্মকথা ও সাধনরীতিকে লোকগ্রাহ্য করে তুলতে চর্যাকারেরা লৌকিক ভাষার আশ্রয় নিয়েছিলেন। লোকজীবনের ভাষাই লোকগ্রাহ্য হয় বেশি। সিদ্ধা কবিগণ সে সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করেন। ধর্মীয় নেতাগণ বাংলা ভাষাকে ধর্মচর্চার বাহন করে তাকে মর্যাদার আসন দেন। বৌদ্ধ সাধকদের ধর্মীয় আবেগ, জীবানুভূতি দর্শনচিন্তা ও মনন প্রকাশের মাধ্যম হওয়ায় বাংলা ভাষাও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। “সিদ্ধা কবিগণ আমাদের জাতীয় জীবনের এ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে কেবল ঐতিহ্য সৃষ্টি করেনি; বাংলা ভাষার সৃষ্টিক্ষম শক্তির উৎসমুখ খুলে দেন।”৯

বিভিন্ন রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীক গোলযোগ দুর্বিপাকে এ ধারায় বারবার বাধা আসায় আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি বিকাশের পথ রুদ্ধ হতে থাকে। অসহনীয় এ আঘাতে বাংলা ভাষায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ও চর্চাকারীরা প্রাণ ভয়ে তাঁদের সৃষ্টকর্মগুলো নিয়ে নিরাপদ স্থানে গিয়ে বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল নেপাল ও বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির লালনভূমি তিব্বতে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছিলেন। সুদীর্ঘ ছয় শতাব্দী পরে উনিশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁস যুগে সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি, সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়; ঠিক তেমনি সময়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থটি প্রকাশ করে আমাদের কৃষ্টির সীমা নির্ধারণ এবং বাঙালি সভ্যতার ভীত যে কত প্রাচীন ও মজবুত তা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছেন। এ মহতী কাজে নিয়োজিত হয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জাতীয় জীবনের মূল ভীত রচনা করতে শাস্ত্রী মহাশয় সক্ষম হোন। এটি শাস্ত্রীর জীবনের অভাবনীয় কীর্তি।

মূলত উনিশ শতকের শেষভাগে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র মহোদয় সর্বপ্রথমে বৌদ্ধতান্ত্রিক সাহিত্যের বিচিত্ররূপ সুধীজনের মানসপঠে তুলে ধরেন। তিনি নেপালে গিয়ে সংস্কৃত ভাষায় রচিত বহু পুঁথি উদ্ধার করেন এবং ওটভ্রপরর্ধ ঈলঢঢদর্ধ্র ীর্ধণরর্টলরণ ধভ ূণযটফ (১৮৮২) নামক গ্রন্থে এ বিষয়ে একটি তালিকা প্রকাশ করেন। রাজেন্দ্রলালের মৃত্যু হলে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় সে দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশ হতে অনেক পুঁথি সংগ্রহ করলেন। সে পুঁথি সমূহ দেখে তাঁর মনে জাগল যে, “বাংলাদেশ ও তাহার চতুষ্পার্শ্বে পুঁথিপত্র ও প্রত্মশিল্পে বৌদ্ধধর্মের অনেক নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। মুসলমান আক্রমণের পূর্ব হইতেই পৌরাণিক ও বৈদান্তিক হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের যুগে বৌদ্ধদের কেহ কেহ তাঁহাদের গ্রন্থ ও শিষ্যাদিসহ বাংলার বাহিরে নেপাল-ভূটান-তিব্বতে চলিয়া যান, বাংলার মুসলমান আক্রমণের পর এ ব্যাপারে দ্রুততর হইতে আরম্ভ করে। এ সিদ্ধান্তের বশবর্তী হইয়া হরপ্রসাদ একাধিকবার নেপাল ভ্রমণে গিয়াছিলেন এবং প্রথমবার নেপালে গিয়া এ বৌদ্ধধর্মের অন্যতম আশ্রয়স্থল স্বচক্ষে দেখিয়া আসিয়া বুঝিতে পারেন যে, বাংলায় ধর্ম ঠাকুরের পুঁথিপত্রে যে বৌদ্ধধর্মের আভাস রহিয়াছে; নেপালে প্রচলিত বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্য তাহারই বর্ধিত ও সুসংবদ্ধ সংস্করণ।”১০ অতঃপর সে সময় শাস্ত্রী ঊধ্রডমশণরহ মত ীধশধভথ ঈলঢঢদধ্রব ধভ ঈণভথটফ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি বাংলাদেশ বৌদ্ধধর্মের প্রচ্ছন্ন নিদর্শন সম্বন্ধে কয়েকটি মূল্যবান আনুমানিকতত্ত্ব প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধ্বে বিস্তারিত গবেষণার ফলে এবং মধ্যযুগীয় বাংলা পুঁথি সাহিত্যের আবিষ্কার ও প্রকাশনার সাহায্যে বাংলায় প্রচারিত বৌদ্ধধর্মের একটি স্থুলরূপ নির্দেশ করা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়েছে। শাস্ত্রী মহাশয়ই প্রথম বাংলাদেশে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের বৈজ্ঞানিক গবেষণার পথ উন্মুুক্ত করেন।

(চলমান...)

সৌজন্যেঃ দৈনিক আজাদী

Additional Info

  • Image: Image