২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭ইংরেজী
বুধবার, 30 জুলাই 2014 04:41

চর্যাপদ : বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধদের অনন্য অবদান

লিখেছেনঃ নির্বাণা ডেস্ক

চর্যাপদ : বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধদের অনন্য অবদান

চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম কাব্য তথা সাহিত্য নিদর্শন। নব্য ভারতীয় আর্যভাষারও প্রাচীনতম রচনা এটি। খৃষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত এই গীতিপদাবলির রচয়িতারা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ। বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ় অর্থ সাংকেতিক রূপের আশ্রয়ে ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যেই তাঁরা পদগুলি রচনা করেছিলেন। বাংলা সাধন সংগীতের শাখাটির সূত্রপাতও এই চর্যাপদ থেকেই হয়। অসমীয়া ও উড়িয়া ভাষার সাথে অনেক মিল থাকায়, অসমীয়া এবং উড়িয়া ভাষারও আদি নিদর্শন হিসেবে দাবী করেন অনেক ভাষা পন্ডিত। একে চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, চর্যাগীতিকোষ বা চর্যাগীতি নামেও অভিহিত করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মমতে এর বিষয়বস্তু সাধন ভজনের তত্ত্ব প্রকাশ। চর্যাপদের তিব্বতীয় ভাষার অনুবাদটি ‘Tibetan Buddhist Canon’ বা ‘তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ’ হিসেবে সংরক্ষিত। এই বিবেচনায় এটি ধর্মগ্রন্থজাতীয় রচনা। একই সঙ্গে সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্রাবলি এই পদগুলিতে উজ্জ্বল। এর সাহিত্যগুণ আজও চিত্তাকর্ষক।

কলকাতার সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বহু ভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার লাইব্রেরির পুঁথিশালায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে ১৯০৭ সালে বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণসম্ভার ভূর্জপত্রে (তালপাতা) হাতে লেখা চর্যাপদের পুঁথি 'চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়' খুঁজে পান। এ চর্যাগীতির ভাষা বিশ্লেষণ করে তিনি প্রমাণ করেন, এটি বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন, যা হাজার বছরের পুরনো। এটি এখন সে যুগের এ অঞ্চলের ধর্মীয়, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনাচারের প্রামাণিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি 'চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়' শুধু বাংলা ভাষার উৎপত্তির দিক থেকেই মহামূল্যবান নিদর্শন নয়, উপমহাদেশের আরো কয়েকটি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীও এর উত্তরাধিকার দাবি করছে । পরবর্তীতে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চর্যাপদের সঙ্গে বাংলা ভাষার অনস্বীকার্য যোগসূত্র বৈজ্ঞানিক যুক্তিসহ প্রতিষ্ঠিত করেন।

সিদ্ধাচার্যদের মধ্যে অনেকের জন্মস্থান এই বাংলার বিভিন্ন জনপদে। চর্যাপদ বা চর্যাগীতি রচয়িতা সিদ্ধাচার্যদের মধ্যে লুইপাদ (পশ্চিমবঙ্গ), কাহ্নুপাদ (পশ্চিমবঙ্গ), জালন্ধরীপাদ (চট্টগ্রাম), ধর্মপাদ (বিক্রমপুর), বিরুপাপাদ (কুমিল্লা), ডোম্বীপাদ (কুমিল্লা), চাটিলপাদ (চট্টগ্রাম), তিলোপাদ (চট্টগ্রাম), নারোপাদ (চট্টগ্রাম), গোরক্ষপাদ (কুমিল্লা), চৌরঙ্গীপাদ (কুমিল্লা), মীননাথ (বরিশাল), সহ অনেকেই ছিলেন বাঙালি। কুমিল্লার শালবন বিহারকে আজো এখানকার স্থানীয় লোকেরা বলে হাড়িপা সিদ্ধার বাড়ি। অনেকে বলে গোরক্ষ সিদ্ধার বাড়ি, আবার কেউ বলে চৌরঙ্গী সিদ্ধার বাড়ি। এই সিদ্ধাচার্যরাই বাংলাদেশে অবস্থিত সোমপুরী, শালবন, বিক্রমপুরী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিত হিসেবে জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত ছিলেন বলে জানা যায়।

অথচ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের কোনো নমুনা কিংবা রেপ্লিকা বাংলাদেশে নেই। চর্যাপদ আবিষ্কারের ১০০ বছরেও এটি সংগ্রহের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রাচীন ও একমাত্র নিদর্শনটি নেপালের রাজদরবারে আবিষ্কৃত হওয়ার পর ১০০ বছর ইতিমধ্যেই পার হয়ে গেছে।

কৃতজ্ঞতাঃ স্বাধীন চিন্তা-চেতনা ও মানব কল্যাণে বৌদ্ধধর্ম

Additional Info

  • Image: Image