২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ সোমবার, ২১ অগাস্ট ২০১৭ইংরেজী
শনিবার, 03 মে 2014 03:22

বৈদিক পূর্ব বৌদ্ধধর্ম আলোয় আলো

লিখেছেনঃ সোনা কান্তি বড়ুয়া

বৈদিক পূর্ব বৌদ্ধধর্ম আলোয় আলো

ভারতে ব্রাহ্মনদের ধর্ম এবং রাজনীতি মানুষ জাতিকে অপমান করার ফলে আজ ২৫ কোটি দলিত জনতা মানবাধিকারের জন্যে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন।  হিন্দু শাসক ও পন্ডিতগণ বৌদ্ধধর্মকে হিন্দুধর্ম বানিয়ে মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের  মাধ্যমে ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মনকে ভারতীয় সমাজে উপরে রেখে নর নারায়নকে দলিত অস্পৃশ্য জাতিবাদের মিথ্যা বেসাতিতে মানবতাকে তিলে তিলে অপমান করে চলেছে। মানব শিশুর অপমানে কোন ধর্মই নেই। প্রসঙ্গত: ২০১৩ সালের ৭ জুলাই বুদ্ধগয়ার  মহাবোধি মন্দির সহ বিভিন্ন পূজনীয় স্থানে ১০ টা বোমা বিষ্ফোরণের অপরাধে ভারতীয় পুলিশ পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু পুরোহিত অরুপ ব্রহ্মচারী সহ আর ও বিভিন্ন জনকে আটক করেছে। জনতার প্রশ্ন : ভারতীয় মুজাহিদীনের নামে  হিন্দু পুরোহিত কেন বুদ্ধগয়ায় বোমা মারলো ?  

বৈদিক রাজা ঈন্দ্র  সিন্ধুসভ্যাতার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার কাশ্যপবু্েদ্ধর প্রচারিত বৌদ্ধধর্ম ধ্বংস করেন। পবিত্র পালি ত্রিপিটকের দীর্ঘ নিকায়ের চক্কবত্তি সীহনাদ সূত্তান্ত (৩য় খন্ড ২৬ নং সূত্র)  অনুসারে বৈদিকপূর্ব চক্রবর্তি রাজর্ষি বোধিসত্ত্বের  ছবি এবং  সুত্তনিপাতের ৩ নম্বর খ¹বিষাণ  সূত্রানুসারে গন্ডারের ছবি মহেঞ্জোদারোর মিউজিয়ামের বাইরের দেওয়ালে বিশাল রেপিকায় বিরাজমান।  ১৯২২ সালে রাখাল দাস বন্দোপাধ্যায় সিন্ধু প্রদেশের (পাকিস্তান, সিন্ধু নদী থেকে কয়েশ’ মাইল দূরে) জমি থেকে ২২ মিটার উঁচু হাইমাউন্ডে অবস্থিত বিরাটকায় বৌদ্ধ স্তুপটি দেখেই  তিনি উক্ত এলাকা খনন করে প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরানো সিন্ধুসভ্যতার  মহেঞ্জোদারো শীর্ষক মহানগরের সন্ধান পেয়েছিলেন (বিবর্ণ সিন্ধু, সেপ্টেম্বর ২৪,  ২০০৬, ভোরের কাগজ, ঢাকা)।  তথাগত গৌতমবুদ্ধের মতে, ”আমি প্রাচীন বুদ্ধগণের আর্য্য অষ্ঠাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করে ধর্ম প্রচার করি (নিদান সংযুক্ত, নিদান বর্গ, সংযুক্ত নিকায়)” এবং গৌতমবুদ্ধের বৌদ্ধধর্মের সাথে মহেঞ্জোদারো হরপ্পার কাশ্যপ বুদ্ধের বৌদ্ধধর্মের সম্বন্ধ বিরাজমান। মহেঞ্জোদারোর বাইরের দেওয়ালে বৌদ্ধ জাতকের ষাঁড়,  হাতি, হাড়ের গয়না, প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন বিদ্যমান।

After Emperor Asoka Buddhist Holocaust was started by Hindu rulers in India:
Those glorious days of Buddhists have gone due to Brahmin and Hindu rulers’ conspiracy. Brahmanism was started to destroy Buddhism in India. About the Buddhist killing fields of Kerala’s Sankhara Swami Vivekananda said, “And such the heart of Sankhara that he burnt to death thousands of Buddhist monks by defeating them in argument. What can you call such an action on Sankhara’s part except fanaticism.” (C.W. works of Vivekananda, Vol.Vll p. 118). Written orders were issued (in Hindu Puran Books) to kill Buddhists in India.

ইতিহাসের সূত্র বিশ্লেষনে দেখা যে, খৃষ্ঠপূর্ব প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে বৈদিক রাজা ইন্দ্র প্রাগৈতিহাসিক বৌদ্ধ নগরদ্বয় মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা ধ্বংস করে প্রাচীন ভারতে বৈদিক সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন (লেখক স্বপন বিশ্বাসের লেখা ইংরেজি বই ‘বৌদ্ধধর্ম’  মহেঞ্জোদারো হরপ্পার ধমর্, কলিকাতা ১৯৯৯), এবং হিন্দুরাজনীতির জাতিভেদ প্রথার কারনে হিন্দু মৌলবাদীগণ বৌদ্ধধর্ম ধ্বংস করলেন।  আইনের শাসনে বৌদ্ধ ত্রিপিটক এবং ভারত সম্রাট অশোকের  রাজকীয় আদেশ শিলালিপির  বৌদ্ধমত অস্বীকার করে হিন্দুরাজনীতি জাতিভেদ প্রথা সহ বেদ বিরোধী ভারতীয় সভ্যতা এবং  মানবতার জনক গৌতমবুদ্ধকে  ভগবান বিষ্ণুর অবতার বানিয়ে বৌদ্ধধর্মকে অপহরণ করে  হিন্দুধর্ম প্রচার করা অন্যায় নয় কি?  

ভারতে বৌদ্ধধর্মকে অপহরণ এবং ধ্বংস করতে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের উৎপত্তি :

পূজনীয় পবিত্র  ত্রিপিটক না মেনে  হিন্দুরাজনীতি বৈদিকপন্থীদের খাঁচায় বুদ্ধের নামকে বন্দী করতে হিন্দুরাজা শশাংক (৬৫০ সালে) বুদ্ধগয়ায় বোধিবৃক্ষ ধ্বংস করে এবং মহাবোধি মন্দিরে পূজনীয় বুদ্ধমূর্তিকে সরিয়ে হিন্দু দেব দেবীর মূর্তি সমূহ প্রতিষ্ঠিত করলেন। তখন থেকে হিন্দু শাসকদের ষড়যন্ত্রে এবং  হিন্দু পুরোহিত প্রধান শঙ্করাচার্যের নির্দেশে বৌদ্ধহত্যা যজ্ঞ  যেই শুরু হয়েছিল আজ ও তা শেষ হয়নি।
সম্রাট অশোকের পর দক্ষিন এশিয়ার (সর্ব ভারতীয়) বৌদ্ধজাতিকে দিনের পর দিন আত্মস্থ করে বিশ্ববৌদ্ধদের মিলনতীর্থ গৌতমবুদ্ধের পূত পবিত্র ধ্যানভূমি বুদ্ধগয়ায় শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে দখলে নিয়েছে। ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রে গৌতমবুদ্ধ ঘোষনা করলেন, “বুদ্ধের ধর্ম বুদ্ধ ব্যতীত অন্য কেহ (সমণ ব্রাহ্মণ বা দেব)  প্রচার  করতে সমর্থ নহেন (সমণেন বা ব্রাহ্মেণন বা দেবেন বা ব্রাহ্মূণা কেনচি বা লোকস্মিন্তি)।”

রাজা ঈন্দ্র বৈদিক পূর্ব বা আর্য্যসভ্যতায় বেদের আগে কাশ্যপবুদ্ধের বৌদ্ধধর্ম ধ্বংস করলেন এবং সম্রাট অশোকের পরবর্তী সময়ে বৈদিক রাজনীতি বৌদ্ধধর্মকে অজগরের মতো গিলে ফেলেছেন। মহেঞ্জোদারোর প্রতœতাত্বিক নিদর্শনে পুরোহিতের ছবিতে দীর্ঘ নিকায়ের চক্রবর্তী সিংহনাদ সূত্রানুসারে,  বৈদিকপূর্ব চক্রবর্তী রাজর্ষি বোধিসত্বের উপদেশ বাণী ছিল “তোমার রাজ্যে হে পুত্র যুবরাজ ! যেন  অধর্ম  না ঘটে বা অনৈতিক কৃত  না হয়। তোমার রাজ্যে যারা ধনহীন গরীব জনতা, তাহাদিগকে সরকারি ধনাঘার থেকে ধন বন্টনের ব্যবস্থা কর। ” নৈতিক বিবর্তনে সামাজিক বিভিন্ন চিত্র আমাদের চোখে পড়ে। সিন্ধুসভ্যতায় কাশ্যপবুদ্ধের বৌদ্ধ সংস্কৃতির  সর্বভারতীয় নৈতিক শক্তিকে বৈদিক জাতিভেদ প্রথা ধ্বংস করার ফলে আজ ভ্রষ্ঠাচারের দহনে করুন রোদনে তিলে তিলে ভারত সহ দক্ষিন এশিয়ার জনতা ক্ষয় হচ্ছে। মানবাধিকারই বৌদ্ধ সাহিত্য এবং ধর্মের মূলমন্ত্র।
আর্য্যগণ প্রাচীন ভারতে বৈদিক সভ্যতা এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার পূর্বে সিন্ধুসভ্যতায় মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পায় কাশ্যপবুদ্ধের বৌদ্ধধর্মের স্মারকমালা প্রতœতান্ত্বিক নিদর্শনে বিরাজমান। বৈদিক পন্থী ব্রাহ্মণগণ ত্রিপিটকের অন্তর্গত চারি আর্য্যসত্য, প্রতীত্য সমুৎপাদের (কার্য কারন মহা প্রবাহ প্রণালী) বিশ্ববিদ্যা কল্পদ্রুম এবং অষ্ঠবিংশতি বুদ্ধ বন্দনায় বুদ্ধবংশের বুদ্ধ বচনকে উপেক্ষা করে ব্রাহ্মণ্যবাদের দ্বারা রচিত নবম অবতার নামক খাঁচায় গৌতমবুদ্ধের ইতিহাসকে বন্দী করে বুদ্ধগয়ায় শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর আদেশে উক্ত শিবলিঙ্গ বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মন্দির থেকে সরিয়ে নেওয়া হল এবং বুদ্ধগয়ায় আজ বিভিন্ন বৌদ্ধ দেশের বৌদ্ধ মন্দির সমূহ সগৌরবে বিরাজমান। এমন কি  বিগত ৭ জুলাই ২০১৩ সালে বুদ্ধগয়ায় নয়টি বোমা বিষ্ফোরণের পাপ কর্মের জন্যে জনৈক হিন্দু পুরোহিত কে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। বৌদ্ধধর্মকে ধ্বংস করবার জন্যে কি ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু বৈদিক ধর্মের উৎপত্তি হয়েছিল ? প্রাগৈতিহাসিক ২৭ জন বুদ্ধগণকে হিন্দুরাজনীতি অবতার না বানিয়ে একমাত্র গৌতমবুদ্ধকে ভগবান বিষনুর অবতার বানিয়ে সর্বভারতীয় রাজনীতি এবং ধর্মের বাজার দখল করে আছে।

হিন্দুরাজনীতি ভারতে বৌদ্ধধর্মকে ধ্বংস করেছে।  জাতিভেদ প্রথায় বিভেদ বিদ্বেষের নামই কি হিন্দুধর্ম । ১২০২ সালে বখতিয়ার খিলজির বাংলা আক্রমনের সময় ও হিন্দু রাজনীতির বৌদ্ধ হত্যার লোমহর্ষকর বিষাদ সিন্ধুর ইতিহাস কথা কথাশিল্পী শওকত আলীর লেখা (১)  প্রদোষে প্রাকৃতজন এবং (২) দুষ্কালের দিবানিশি পুস্তকদ্বয়ে বিদ্যমান।
...    বাল্মিকী রামায়নে আমি রামের মদ্যপ চরিত্রের বর্ণনা পড়েছি। আদবানি ভাল করে বাল্মিকী রামায়ণটা পড়–ন। তারপরে আমার সেেঙ্গ বিতর্কে আসুন। ”   তারপর উক্ত করুণানিধির মস্তক ছেদে আহ্বান জানালেন হিন্দুত্ববাদীরা (আহমদ, হাসান ইমরান, নয়া দিগন্ত, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০০৭)।

 রামায়নের অযোধ্যা কান্ডের (অধ্যায়) বত্রিশ নম্বর শ্লোকে বুদ্ধকে (যথাহি চৌর স তথাহি বুদ্ধ, তথাগতং নাস্তিকমত্র বিদ্ধি।) চোর বলে গালাগাল করার পর  সেই মহাকাব্যটি কি বৌদ্ধ জাতকের আগে রচিত? “তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, / আমি হলাম চোর বটে।”  ধর্মের গোড়ামি ত্যাগ করে রামায়নের ঐতিহাসিক উৎস নিরুপণ করতে গিয়ে পন্ডিত ও ভাষাতত্ত্ববিদ ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির এক আলোচনা সভায় বলেছেন, “দশরথ জাতকই রামায়নের উৎস ( দৈনিক বসুমতি, কলকাতা, ২ মার্চ ১৯৭৮ ইং)।”  

সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ পত্র সহ বাংলাদেশের বাংলা পত্রিকা  দৈনিক ‘নয়া দিগন্তে’ (অক্টোবর ১, ২০১০) ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার রায় সম্বন্ধে পড়তে পড়তে ত্রিপিটকের      দশরথ জাতক শীর্ষক পুরানো বৌদ্ধ ইতিহাসের কথা মনে পড়ে গেল। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পর ভারতীয় আদালতের রায়ে তিন ভাগের মাত্র এক ভাগ পাবেন মুসলিম জনতা।  সর্বগ্রাসী হিন্দুধর্মের রাম কাহিনি নিয়ে ঢক্কানিনাদের সময় দশরথ জাতক এবং ‘আল্লাহ উপনিষদ’ নিয়ে বিচার বিশ্লেষনের জন্য কার ও কোন লজ্জা হয় না বলে। “মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ;” না মেনে রাম মন্দির আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ের মাথায় ১৯৯২ সালে ৬ই ডিসেম্বর প্রায় দুই হাজার অপাপবিদ্ধ মানুষ হত্যা করা হয়েছিল লালকৃষ্ণ আডবাণী সহ হিন্দু রাজনীতিবিদের বকওয়াস রাজনীতির জন্যে।   

হিন্দু রাজনীতির দাদারা বৌদ্ধ ধর্মকে কবর দেবার পর (দেশ, ৪ মে ২০০১ কলিকাতা পৃষ্ঠা ১২), ভারত বিজয়ী ইসলাম ধর্মকে নিয়ে  অভিনব ‘বক্ওয়াস’ কূটনীতি করার মানসে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে “আল্লাহ উপনিষদে” রচিত হলো: “আল্লো জ্যেষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং , পূর্ণং ব্রহ্মানং অল্লাম। অর্থাৎ দেবতাদের রাজা আল্লাহ আদি সকলের বড় ইন্দ্রের গুরু।”     
জনতার প্রশ্ন : আল্লাহ উপনিষদের আলোকে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা অন্যায় ও অমানবিক নয় কি? শুধু পরম করুনাময় আল্লাহের নামে উপনিষদ শীর্ষক শূন্যগর্ভ কথার বুদবুদ যা রাজনীতির নানা কক্ষের আধো অন্ধকার চন্ডীমন্ডপ পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।  আল্লাহ এবং রাম সর্ব শক্তিমান স্রষ্ঠা হলে হিন্দুশাসকগণ ভারতের বৌদ্ধ মন্দির সমূহ (পুরীর জগন্নাথ মন্দির, তিরুপতি বালাজী সহ শত শত বৌদ্ধ মন্দির) দখলে রেখে ভগবান রামের নামে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করলো কেন? কারন ভারতে অহিন্দু ধর্মসমূহকে হিন্দুধর্মের লেজুর বানাতে অবতার ও আল্লাহ উপনিষদ ব্যবহার করা হবে।
 গৌতমবুদ্ধকে হিন্দুরাজনীতি নবম অবতার বানিয়ে আজ ও বৌদ্ধ মূল্যবোধকে গিলে গিলে খাচ্ছে। গোটা রামজন্মভূমির আন্দোলনটাই বকওয়াসের রাজনীতি। হিন্দু ধর্মে সব মায়া, তাই চতুরার্য সত্য নেই এবং বৌদ্ধধর্ম থেকে ধার করে অশোকস্তম্ভে লেখা হয়, “ইহাই ভারতের রাষ্ঠ্রীয় প্রতীক।”

এই প্রসঙ্গে ইহা ও বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কলিকাতার দেশ (৪ মে, ২০০১, পৃষ্ঠা, ১৩) পত্রিকায় সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের মতে, “হিন্দু মন্দিরের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকা বৌদ্ধ উপাসনা গৃহগুলি ও কি অত:পর একই যুক্তিতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে বৌদ্ধদের হাতে? বস্তুত, ইতিহাসের সমস্ত অসংগতির ক্ষতিপূরণ বর্তমানে দাবী করার রীতি এইভাবে স্বীকৃত হতে থাকলে ‘বর্ণ হিন্দু’ আধিপত্যহীন হিন্দুধর্মে ধ্বজাধারীদেরও সুনিদ্রা সুনিশ্চিত থাকার কোনও কারন আদৌ নেই।” একে বলা হয় হিন্দুধর্মের সহনশীলতার বকওয়াস। বিচারের বানী নিরবে নিভৃতে কাঁদে এবং ইহার ফাঁদে সর্বগ্রাসী হিন্দু রাজনীতি নিয়ে মসজিদে হিন্দুত্বকরণ রায় নয় কি? যবনের স্পর্শে হিন্দুর জাত যায়, আর জাত ফেরে না। যবন রাম জন্মভূমির  ভিটের ওপর বাবরি মসজিদ প্রতিষ্ঠার শত শত বছর যাবত নামাজ আদায় করার পর ও হিন্দু মন্দিরের জাত গেল না কেন? ইহাই হিন্দু রাজনীতির ‘বকওয়াস’ অধ্যায়। মানবিক মর্যাদায় মনুষ্যত্ব ধ্বংস হলে “রাম নাম সত্য হে ?”
 
ইতিহাস চুরির চাতুর্যে রামায়নের তথ্য ফাঁস :  গৌতমবুদ্ধ তাঁর  ভিক্ষুসংঘকে উপদেশ প্রসঙ্গে দশরথ জাতক সমাধান করতে গিয়ে বলেছেন, “তখন (পূর্ব জন্মে)    শুদ্ধোধন রাজা ছিলেন দশরথ মহারাজা, মহামায়া ছিলেন সে মাতা, রাহুলমাতা (গোপা) ছিলেন রাজকুমারী সীতা, আনন্দ ছিলেন রাজপুত্র ভরত, সারীপুত্র ছিলেন রাজপুত্র লক্ষন, বুদ্ধ পরিষদ সে পরিষদ, আমি (বুদ্ধ) ছিলাম সে রাম পন্ডিত ( দশরথ জাতক নম্বর ৪৬১, জাতক অট্টকথা,  পালি টেক্সট সোসাইটি, লন্ডন)।”  বৌদ্ধ প্রধান দেশ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক মহানগরীর বিখ্যাত রাজকীয় এমারেল্ড (মরকত মনি) বুদ্ধ মন্দিরের চারিদিক জুড়ে আছে দশরথ জাতকে রামকীর্তির অভিনব চিত্রশালা।
প্রসঙ্গত: উল্লেখযোগ্য যে, আজকের থাইল্যান্ডের মহারাজা ভূমিপল অডুল্যডেজা হচ্ছেন নবম রাম। প্রথম রাম (১৭৮১  থেকে ১৮০৯) ১৭৮২ সালের ৬ই এপ্রিল ব্যাংককে (দেবনগরী) রতœকোষিন ডাইনেষ্ঠি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বৌদ্ধ রাজনীতিতে বোধিসত্ত্ব রামকে (দশবিধ রাজধর্ম) অনুসরন করে রাজত্ব পরিচালনা করার শপথ গ্রহন করা হয় । থাইল্যান্ডে অযোধ্যা (আয়োথায়া) এবং রাজা রাম আজ ও বিরাজমান।
হিন্দুধর্ম ও রাজনীতি অতীত বুদ্ধগণকে স্বীকৃতি না দিয়ে সম্রাট অশোকের বৌদ্ধ  সাম্রাজ্যকে (ভারত) লুটে পুটে খাচ্ছে।

“মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে  
ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে।
 বিধাতার রুদ্ররোষে দুভিক্ষের দ্বারে বসে /
 ভাগ করে খেতে হবে  সকলের সাথে অন্নপান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।”

শ্রীরামচন্দ্র লোভ লালসা ত্যাগ করে মানব জাতির ভগবান হলেন। আজকের হিন্দু রাজনীতি ভারতে সর্বগ্রাসী হিন্দুত্বকরণের জন্য রক্তগঙ্গা প্রবাহিত করতে সর্বদা প্রস্তুত। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু জাতিকে শিক্ষা দিয়েছিলেন:

“সেই সত্য যা রচিবে তুমি,
ঘটে যা, তা সব সত্য নহে,
কবি, তব মনোভূমি,
রামের জন্মস্থান অযোধ্যার চেয়ে
সত্য জেনো।”

চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। হিন্দু রাজনীতি শক্তের ভক্ত (সম্রাট আকবরের ভক্ত ছিল) এবং নরমের (সংখ্যালঘুদের) যম।  
 অযোধ্যায় বৌদ্ধ স্থাপত্যের একটি থামের শালভঞ্জিকায় ঐতিহাসিক ছবি বিরাজমান যেখানে গৌতমবুদ্ধের মাতা শালপাতা তুলছেন। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর ভ্রমন কাহিনি থেকে জানা গিয়েছে যে সপ্তম শতকে অযোধ্যায় ছিলেন তিন হাজার বৌদ্ধভিক্ষু। বৌদ্ধ বিহার ছিল প্রায় একশোটি। বৌদ্ধযুগে অযোধ্যা ছিল বৌদ্ধ প্রধান অঞ্চল এবং আজকের অযোধ্যার স্থাপত্যেকীর্তির পুরাতাত্বিক অতীত অনুসন্ধান করতে গিয়ে বৌদ্ধ প্রাধান্যের যুগে ফিরে যাওয়া সহজ।

যেমন কথিত আছে, কর্ণসুবর্ণের শৈব রাজা শশাংক সেতুবন্ধ থেকে হিমগিরি পর্যন্ত বালকবৃদ্দ নির্বিশেষে সমস্ত বৌদ্ধকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন। আদেশ পালনে শিথিলতা যে দেখাবে তার ও শাস্তি ছিল মৃত্যু।” ডাক্তার কে যমানাদাসের লেখা ‘তিরুপতি বালাজি ওয়াজ এ বুদ্ধিষ্ঠ স্রাইন’ শীর্ষক মহাগ্রন্থে লেখা আছে, “আসলে এটি একটি প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি। ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্ম পতনের সময় হিন্দুরা স্রেফ গায়ের জোরে বিহারটিকে দখল করে নেয়। পুরীর (উড়িষ্যা) জগন্নাথ দেবের মন্দির ও আসলে বুদ্ধ মন্দির।

স্বামী বিবেকানন্দ ও তাই মনে করতেন। স্যার যদুনাথ, নগেন্দ্রনাথ বসু, ডঃ ভাও লোকান্ডের উদ্ধৃতি ও নৃতাত্বিক প্রমাণাদিসহ ড. যমানাদাস হিন্দু ধর্মের সহনশীলতা এই বহু কথিত গুণটিকেই কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। ভারতের সাবেক রাষ্ঠ্রপতি ডক্টর রাজেন্দ্র প্রসাদ ও বলেছিলেন, ‘বুদ্ধগয়ার মন্দিরটিকে দখলে এনে আসলে আমরা অন্যায় করে চলেছি।’ উত্তরে মহান বিদ্বান লেখক রাহুল সাংকৃত্যায়ন বলেন, ‘বুদ্ধগয়া মন্দিরের ষোল আনাই বৌদ্ধদের হাতে দিয়ে দেওয়া উচিত (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪ ফেব্র“য়ারী ১৯৯৭, বৌদ্ধ মঠের কঙ্কাল বিধু বাহিরেতে)।”  
সমাজতত্ত্ববিদগণ মনে করেন যে, ভারতে  বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে হিন্দুরাজনীতিবিদদের সজাগ সতর্ক সহ নৈতিক বোধের অবনতির ফলে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরী হচ্ছে, তা আজ ও আগামী দিনে সমাজের বুকে এক ভয়াবহ ধ্বংসের রুপ নেবে। মানবাধিকারের অস্তিত্বের আলোকে বাবরি মসজিদ আলোকিত  মানবতার প্রতিশ্র“তি এবং ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে “ বৈশাখী পূর্ণিমা ” শীর্ষক কবিতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৌদ্ধকবি হয়ে লিখেছিলেন,

“সকল কলুষ তামস হর’ জয় হোক তব জয়!
অমৃক বারি সিঞ্চন কর ’ নিখিল ভুবন ময়।
জয় হোক তব জয়!
মহাশান্তি মহাক্ষেম,
মহা পুণ্য, মহা প্রেম!”
জ্ঞানসূর্য উদয় ভাতি
ধ্বংস করুক তিমির রাতি,
দুঃসহ দুঃস্বপ্ন ঘাতি ’ অপগত কর ভয়।
জয় হোক তব জয়।
মোহ মলিন অতি দুর্দ্দিন, শঙ্কিত চিত্ত পান্থ,
জটিল গহন পথ সঙ্কট সংশয় উদভ্রান্ত।
করুনাময়, মাগি শরন,
দুর্গতিভয় করহ হরণ;
দাও দুঃখ বন্ধ তরণ মুক্তির পরিচয় ।
জয় হোক তব জয়।
মহাশান্তি মহাক্ষেম
মহাপুণ্য, মহাপ্রেম।”  

আনন্দবাজার পত্রিকার (সম্পাদকীয়, ২২ আগষ্ট, ১৯৯৩) মতে, “রামায়নের আদি হিসাবে তাঁহাদের কেহ কেহ প্রাচীনতর ভারতীয় কাহিনীর যথা: “দশরথ জাতক” (জাতক নম্বর : ৪৬১) এর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়াছেন। ... সেই উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা কেমন করিয়া ভুলিয়া গেলেন যে, একদা রাশি রাশি বৌদ্ধ ধর্মস্থান ধ্বংস করিয়া একদিন গড়িয়া উঠিয়াছিল রাশি রাশি হিন্দু মন্দির। তাঁহারা কি জানেন, হিন্দুর কাছে অতি পবিত্র পুরীর মন্দিরের প্রাক্ ইতিহাস সম্পর্কে কানিংহাম কিংবা রাজেন্দ্রলাল মিত্রের কী অভিমত? তাই বলিতেছিলাম, অযোধ্যা একটি বৃহৎ প্রশ্ন বটে, কিন্তু নিতান্তই মনগড়া এক নির্বোধ প্রশ্ন।”

Additional Info

  • Image: Image