২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২৩ জুন ২০১৭ইংরেজী
শনিবার, 12 সেপ্টেম্বর 2015 23:06

বুদ্ধগয়ার সপ্ত মহাস্থান : রত্নঘর চৈত্য (সর্বপ্রথম অভিধর্ম গবেষণার স্থান) : ৪র্থ পর্ব

লিখেছেনঃ উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু

বুদ্ধগয়ার সপ্ত মহাস্থান : রত্নঘর চৈত্য (সর্বপ্রথম অভিধর্ম গবেষণার স্থান) : ৪র্থ পর্ব

বুদ্ধগয়ার সপ্তমহাস্থানের ধারাবাহিক বিবরণের ৪র্থ পর্ব
রত্নঘর চৈত্য (সর্বপ্রথম অভিধর্ম গবেষণার স্থান)

এই সেই স্থান যেখানে তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর চতুর্থ সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন। দেবগণ প্রভাবে এই ‘রত্নঘর’ নির্মিত হয়েছিল।বুদ্ধগয়ার মূল মহাবোধির উত্তর পশ্চিম কোণে ‘রত্নঘর চৈত্য’ অবস্থিত। চংক্রমণ করে তৃতীয় সপ্তাহ কাটানোর পর এই স্থানেই অবস্থান করেন বুদ্ধ। তথায় একাসনে বসে গম্ভীর অর্থপুর্ণ অভিধর্ম তথা অনন্ত ন্যায় সমন্বিত ‘পট্ঠান’ গবেষণা করেছিলেন। অভিধর্ম রত্নের গবেষণা হেতু ইহা ‘রত্নঘর চৈত্য’ নামে কীর্ত্তিত হয়েছে।তথাগত অভিধর্ম চিন্তা করার সময় তাঁর শরীর হতে ষড়রশ্মি নির্গত হয়েছিল। দুর্লভ স্থানটি ছবিতে দর্শন করে চলুন তিনবার সাধুবাদ দিই।

অভিধর্ম কি?

অভিধর্ম বলতে বুঝায় ধর্মের অতিরিক্ত কিছু। অভি পূর্বক ধর্ম অর্থাৎ ধর্মের অতিরিক্ত বা অধিকতর ব্যাখ্যা।বুদ্ধের যাবতীয় দেশনা উপদেশকে তিনভাগে ভাগ করা হয়- সুত্ত, বিনয়, অভিধম্ম। সুত্র ও বিনয়ে ৪২ হাজার ধর্মস্কন্ধ রয়েছে অন্যদিকে অভিধর্মেই রয়েছে আরো ৪২ হাজার ধর্মস্কন্ধ। অভিধর্ম হচ্ছে উচ্চতর বাণী যা কোন ব্যক্তিকে বিমুক্তির সোপানে পৌছিয়ে দিতে সক্ষম। সুত্ত পিটকে রয়েছে ব্যবহারিক দেশনা, বিনয় পিটকে সংঘের নিয়মাবলী বা আজ্ঞা দেশনা আর অভিধর্মে রয়েছে পারমার্থিক দেশনা।

বৌদ্ধধর্মে একটি মাত্র স্বাদ পাওয়া যায় আর তা হচ্ছে মুক্তির স্বাদ। অভিধর্মে মূলত এই মুক্তির স্বাদকেই চুড়ান্তভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সুত্ত পিটকে বুদ্ধ শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে আমি, তুমি, সে ইত্যাদি লৌকিক শব্দসমূহ ব্যবহার করলেও অভিধর্মে তার ব্যবহার হয়নি বললেই চলে।অনিত্য, দুঃখ, অনাত্মার সমন্বয়ে পারমার্থিক সত্যকেই এখানে বড় করে দেখানো হয়েছে। ত্রিপিটকের তিনটি ভাগের মধ্যে অভিধর্মই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সংগ্রহ। অভিধর্ম পিটককে সাত খন্ডে বিভক্ত করা হয়েছে- ধর্মসঙ্গনী, বিভঙ্গ, ধাতুকথা, পুগ্গল পঞ্ঞত্তি, কথাবত্থু, যমক, পট্ঠান।অভিধর্মের আলোচনা হল- চিত্ত, চৈতসিক, রূপ ও নির্বাণ এই চার বিষয়ে।

পট্ঠান কি?

‘পট্ঠান’ হলো অভিধর্ম পিটকের সুবিশাল ও অত্যাবশকীয় সর্বশেষ গ্রন্থ। ইহা বৌদ্ধ মনোবিজ্ঞান বা মনস্তত্ত্ব, দার্শনিক ও পারমার্থিক সত্যপূর্ণ ২৪ প্রকার হেতু-প্রত্যয় সম্বলিত আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ। যা মায়ানমারে অনুষ্টিত ৬ষ্ঠ সঙ্গায়ন অনুসারে পাঁচ খন্ডে বিভক্ত। মূলতঃ ‘পট্ঠান’ গ্রন্থে নাম-রূপ, চিত্ত-চৈতসিক ও নির্বাণ সম্পর্কিত যাবতীয় ব্যাপারে পরষ্পর সম্পর্ক ও কারণ নির্ণয় করাই মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

ব্যবহারিক দৃষ্টান্তে ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যেগুলোকে আমরা, আমি, তুমি, মাতা-পিতা প্রভৃতি বলে পরিচিত করি, সেগুলোই আবার পারমার্থিক দৃষ্টিতে বিচার করলে ‘উদয়-বিলয় বা উৎপত্তি-ধ্বংসশীল’ ব্যাপার মাত্র। এরূপ বিচারে ‘পট্ঠান’ কে প্রতীত্য-সমুৎপাদ নীতি বা জন্ম-মৃত্যু রহস্যেরই বিশেষ বিশ্লেষন বলা চলে।আমাদের দেশে খুব বেশী প্রচলন না থাকলেও মায়ানমারে ‘পট্ঠান’ পাঠের আয়োজন হয় সুন্দরভাবে।

পট্ঠান পাঠের সুফলঃ

১। হঠাৎ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
২। পট্ঠান পাঠের ফলে অনাগত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
৩। যে কোন সুকর্মে অন্তরায় বিহীনভাবে সফলতা পাওয়া যায়।
৪। দোষযুক্ত কুকর্ম থেকে মুক্ত থাকা যায়।
৫। যে কোন উত্তম কর্মে সফলতা পাওয়া যায়।
৬। পট্ঠান পাঠের ফলে লোকোত্তর ধর্ম লাভে সহায়ক হয়।

(ছবিতে রত্নঘর চৈত্যের সামনে করজোড়ে দাড়িয়ে লেখক)

তথ্য উৎসঃ

১। সদ্ধর্ম রত্নাকর- ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথের সম্পাদিত
২। বিভঙ্গ- ভদন্ত জ্ঞানেন্দ্রিয় থের অনূদিত
৩। পট্ঠান (২য় খন্ড)- ভদন্ত বুদ্ধবংশ ভিক্ষু অনূদিত
৪। সংক্ষিপ্ত পট্ঠান পালি- ভদন্ত পঞঞা তিলোকা থের

Courtesy: Soshanvumi Meditation Practiciing Center.Karaiyanagor

Additional Info

  • Image: Image