২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৫ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ বুধবার, ২৯ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 21 নভেম্বর 2014 19:04

বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধচর্চার পটভূমি ও প্রাসঙ্গিক তথ্য

লিখেছেনঃ ড. সৌমিত্র বড়ুয়া

বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধচর্চার পটভূমি ও প্রাসঙ্গিক তথ্য

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

বাঙলা ও বাঙালির ইতিহাস সু-প্রাচীন। সে ইতিহাস কত বছরের পুরাণো তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ ও বিস্তর। এ বিচারে বাংলাগানের ইতিহাসের সুপ্রাচীনত্ব নিয়েও মতভেদের অন্ত নেই। শাস্ত্রী মহোদয়ের চর্যাপদ আবিষ্কারের ফলে গবেষকেরা এ বিষয়ে একটি সুনির্দ্দিষ্ট গাইড লাইন পেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে গবেষক ও সাংবাদিক অরুণদাশ গুপ্ত বলেন- “হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’র নামক গ্রন্থটি প্রকাশিত হবার পর থেকে চর্যাগীতির ভাষা, ছন্দ, সাহিত্যমূল্য ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়বস্তু ইত্যাদি বিষয়ে পণ্ডিত মহলে গবেষণা ও অনুসন্ধান শুরু হয়। ভাষাবিদ আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শশি ভূষণ দাশগুপ্ত, সুকুমার সেন, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, নীলরতন সেন, তারা পদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ অনেকের গবেষণালব্ধ ফল থেকে সারস্বত মণ্ডলী চর্যাপদগুলোকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে স্বীকার করেন।”১১

বাঙলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ আবিষ্কার ও রচনা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সূক্ষ্ন চিন্তার ফসল। যা বাঙলা ও বাঙালি জাতির জন্য অমূল্যরত্ন স্বরূপ। অজ্ঞাত ও বিলুপ্ত প্রায় আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির রত্নরাজিগুলো সুদূর নেপাল ও তিব্বতের রাজদরবার গ্রন্থাগারে আবদ্ধ ছিল শাস্ত্রী মহাশয় তা উদ্ধার সম্পর্কে লিখেছেন “১৯০৭ সালে আবার নেপালে গিয়া আমি কয়েকখানি পুঁথি দেখিতে পাইলাম। একখানির নাম চর্য্যাচর্য-বিনিশ্চয় উহাতে কতকগুলো কীর্তনের গান আছে ও তাহার টিকা আছে। গানগুলো বৈষ্ণবদের কীর্তনের মত গানের নাম চর্যাপদ। আর একখানি পুস্তক পাইলাম তাহাও দোহাকোষ, গ্রন্থকারের নাম সররুহ বজ্র, টিকাটি সংস্কৃত, টিকাকারের নাম অদ্বয়বজ্র। আরও একখানি পুচ্চক পাইলাম, তাহারও নাম দোঁহা কোষ, গ্রন্থকারের নাম কৃষ্ণাচার্য, উহারও একটি সংস্কৃত টিকা আছে।”১২

চর্যাপদে প্রকাশিত প্রাচীন পুঁথিগুলো সম্পর্কে শাস্ত্রী মহাশয় লিখলেন- “যে সকল পুস্তক প্রকাশ করিতেছি তাহার মধ্যে চর্য্যাচার্য্য ও ডাকার্ণব নেপাল দরবারের। সে পুঁথি ছাপা হইবার পর তাহারা লইয়া গিয়াছেন। আমি তাঁহাদের অনুমতি লইয়া পুঁথির অনেকগুলো পাতা ফটোগ্রাফ করিয়া রাখিয়াছি এবং আমার পুস্তকের সঙ্গে প্রকাশ করিতেছি। অপর দুইখানি পুঁথি আমার নিজের হইতেও অধিক প্রিয়; কারণ নেপালের পুঁথিখানার সুব্বা সাহেব বিষ্ণুপ্রসাদ রাজভাণ্ডারী আমাকে প্রীতি উপহার স্বরূপ এ দুইখানি প্রদান করিয়াছিলেন....... কৃষ্ণাচার্য্যের দোঁহাকোষ ও তাহার টীকা তাঁহারই উপদেশ মত লেখকেরা (অর্থাৎ নকলকারীরা) লিখিয়া আমায় উপহার দিয়াছিলেন; তাহাও আমি ছাপাইয়াছি। ইহার মূল এখন জাপানে।”১৩
শাস্ত্রীর মতে, তাঁর গ্রন্থে প্রকাশিত রচনাগুলোর নাম “চর্য্যাচর্য্য বিনিশ্চয়” (সংস্কৃত টিকাসহ) সরোজ বজ্রপাদের (সররুহ বা সরোহর) “দোহাকোষ” (অদ্বয় বজ্রেয় “সহজান্ময় পঞ্জিকা” নামের সংস্কৃত টিকা “মেখলা”সহ) এবং সংস্কৃত ও অন্য একটি ভাষায় লিখিত “ডাকার্ণব” এইগুলোর মধ্যে শেষের পুঁথিটির সন্ধান শাস্ত্রী মহাশয় পেয়েছিলেন ১৮৯৭-৯৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নেপাল ভ্রমণের সময়।”১৪

শ্রাবণ মাসে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ হতে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালাভাষায় বৌদ্ধগান ও দোঁহা’ প্রকাশ করেন। চর্য্যাচর্য বিনিশ্চয় সরহপাদ, ও কৃষ্ণপাদের দোঁহা (তৎসহটিকা) এবং ডাকর্ণব, এ চারখানা পুঁথি একত্রে এ নামেপ্রকাশিত হলে সাহিত্যিক ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক সকলেই বিস্মিত হলেন। গ্রন্থটি প্রকাশিত হবার ফলে একদিকে যেমন বাংলা ভাষার আদিম রূপের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেল, অন্যদিকে তেমনি বৌদ্ধধর্মের শেষ পরিণতির কুহেলিকাচ্ছন্ন ইতিবৃত্তটিও কিছুটা স্পষ্ট হলো, পালযুগের বাঙালি জীবন সম্বন্ধেও অনেক মূল্যবান তথ্য পাওয়া গেল। পরে অবশ্য অনেকেই এ বিষয়ের নানাদিক নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বাঙালি, অবাঙালি ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিকেরা এ বিষয়ে বিশেষ আগ্রহভরে আলোচনায় মনোনিবেশ করেন।

বৌদ্ধগান ও দোঁহা প্রকাশিত হবার পর ভাষা বিজ্ঞানিরা অভিমত ব্যক্ত করতে থাকেন, তাঁরা বললেন- উক্ত সংগ্রহের প্রথম মুদ্রিত পুঁথিটি (চর্য) আদিম বাংলা ভাষায় এবং অপর তিনখানা শৌরসেনী বা পশ্চিমা অপভ্রংশে লিখিত, তার সাথে বাংলা ভাষার প্রত্যক্ষ যোগ নেই। যদিও চর্যাগীতিতেও অনেক পশ্চিমা অপভ্রংশ শব্দ আছে। “বিজয় চন্দ্র মজুমদার তাঁহার কদণ ঔর্ধ্রমরহ মত ঈণভথটফধ ীটভথলটথণ (১৯২০) নামক বক্তৃতামালায় (১৩শ বক্তৃতা) এ পুঁথিটির ভাষা লইয়া আলোচনা করিলেও ১৯২৬ সালের ডক্টর শ্রীযুক্ত সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়-ই এ গ্রন্থগুলির ভাষাতাত্ত্বিক স্বরূপ পূর্ণাকারে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইহার ধর্মমত লইয়া সর্ব প্রথম আলোচনা করেন ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁহারHistory of Bengali Language ( 1920) নামক গবেষণা গ্রন্থে।”১৫ এছাড়াও ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত ১৯৪০ সালে রচিত যা ১৯৪৬ প্রকাশিত Los Chants Mystiques de Kanha et Saraha (1927) গ্রন্থে চর্যাপদ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করেন। ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশিত bscure Religious Cutts as of the Department of Letters দোহাকোষ ও চর্যার কয়েকজন কবির পরিচয় তুলে ধরেন। অনেক দেশি বিদেশি সারস্বতমণ্ডলী ও চর্যাপদ নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছেন তৎমধ্যে পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি “হিন্দি কাব্যধারা, তিব্বত মেঁ বৌদ্ধধর্ম, পুরাতত্ত্ব, নিবন্ধাবলী প্রভৃতি প্রবন্ধ পুস্তকে এবং ‘গঙ্গা’ নামক হিন্দি সাময়িক পত্রে রাহুলজী সিদ্ধাচার্য, বৌদ্ধ সহজযান ও চর্যাগীতিকা লইয়া প্রচুর গবেষণা করেন। তাঁহার সেই গবেষণার কিয়দাংশ ফরাসী ভাষায় অনূদিত হইয়া ১৯৩৪ সালে ামলরভটফ ই্রধর্টধ্যলণ এর অক্টোবর ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।”১৬ এক্ষেত্রে ড. বাগচীর অবদান স্মরণীয়। তাঁর তিব্বতী অনুবাদটি উল্লেখযোগ্য। অবশ্য ড. বাগচীরও পূর্বে ড. শ্রীযুক্ত সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় ১৯২২ সালে এ মূল্যবান সংবাদ পরিবেশন করেন যে, “চর্যাগীতির তিব্বতী অনুবাদ আছে এবং তিনিই .P. Cordier Catalogue du fonds Tibetain de ta Bibliotheque-এ উদ্ধৃত তথ্যাদি দ্বারা এই সিদ্ধান্ত করেন যে, বজ্রযান-সহজযানে অন্তর্ভুক্ত অনেক সংস্কৃত অপভ্রংশ বাংলা পুঁথির তিব্বতী অনুবাদ তিব্বতে রক্ষিত আছে।”১৭ অতঃপর ড. বাগচী “১৯৩৫ সালে দোঁহাকোষের সঙ্কলন এবং ১৯৩৮ সালে চর্যাপদের পাঠনির্দেশ করিয়া চর্যাগীতিকার একটি সংস্করণ প্রকাশ করেন। ইহাতেও তিনি তিব্বতী অনুবাদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়াছেন; বিশেষতঃ চর্যাপদের পাঠ নির্দেশ করিতে গিয়া তিনি নেপালে প্রাপ্ত পুঁথি ও তাহার সংস্কৃত টীকা অপেক্ষা তিব্বতী অনুবাদের প্রতি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন।”১৮অবশ্য পরবর্তীতে যাঁরা চর্যাপদগুলো পাঠ সংস্করণ করেছেন তাঁদের মধ্যে পণ্ডিত তারাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য আচার্য সুকুমার সেন, পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. নীলরতন সেন, সৈয়দ আলী আহসান, ড. নির্মল দাশ প্রত্যেকের নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।

শাস্ত্রী মহাশয় প্রণীত ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ মূল্যবান গ্রন্থটি আবিষ্কার ও মুদ্রিত সংস্করণের প্রকাশ ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাস সাধনায় নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী ঘটনা। “কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে মূল রচনাগুলোর ভাষা ও তারিখ সংক্রান্ত শাস্ত্রী মহাশয়ের সিদ্ধান্তগুলো বেশ কিছুটা অনুমান ভিত্তিক। অবশ্য তিনি পদকর্তা লুইপাদের গানের ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্যের অল্প আলোচনা করেছিলেন। এছাড়া তাঁর প্রকাশিত চর্যাবলী, ‘দোহাকোষ’ এবং ডাকর্ণবে, “বাঙ্গালা” শব্দ নিচয়ের তাঁর বিবেচনা মত বিশ্লেষণ ও তালিকা ও চেপেছিলেন।১৯

এ বিষয়গুলো নিয়ে অনেকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করলেও রচনাগুলোর বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার প্রথম পথ প্রদর্শক আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনি রচনাগুলোর ভাষা বিচার করে অভিমত দিলেন যে, “শাস্ত্রী প্রকাশিত চর্যাপদগুলোর ভাষাকে পুরাতন “বাঙ্গালা” বলে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু সরোজ বজ্র বা সরহ এবং কৃষ্ণাচার্য বা কাহ্ন (কাহ্নপা) কৃত দোহাকোষ দুইটি অপভ্রংশ ভাষায় রচিত।”২০ “ডাকার্ণবের অসংস্কৃত অংশের ভাষা প্রাকৃত ভাষারাজির পর্যায়ভুক্ত হলেও উপরোক্ত অপভ্রংশে রচিত গ্রন্থগুলোর পরবর্তী। এতে বাঙ্গালা ভাষার মধ্যযুগের বা উত্তর-মধ্যযুগের শব্দ ও পাওয়া যায়।”২১পঞ্চদশ পটলে লিখিত ‘তুমি’ শব্দটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

শাস্ত্রী মহাশয়ের রচিত ‘ডাকার্ণব” যোগিনীতন্ত্র সম্পর্কিত রচনা। চর্যাপদগুলোর গান ও দোহাকোষ দুইটির কবিতা বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মের সিদ্ধাচার্যদের নানা আধ্যাত্মিক বিষয় সংক্রান্ত লেখা। সহজিয়া সম্প্রদায়ের দোহা শাস্ত্রী মহাশয়ের পূর্বে সি.বেন্ডল প্রকাশ করেন। তাঁর সম্পাদিত ‘সুভাষিত সংগ্রহ’ অপভ্রংশে রচিত।” যদিও তিনি এর ভাষাকে অপভ্রংশ ছাড়া ও বৌদ্ধ প্রাকৃত এবং শুধু প্রাকৃত বলে অভিহিত করেছিলেন।

ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় গ্রন্থটির সার্বিক পর্যালোচনা করে বলেছেন, “প্রাচীনতম বাঙ্গালার নিদর্শন হিসেবে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত চর্যাগুলোর মধ্যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত গ্রন্থের চর্যাবলী, ঐ গ্রন্থে প্রকাশিত মুনিদত্তের টীকায় উদ্বৃত কিছু চর্যাপদ ও পদাংশ তাঁর আবিষ্কৃত একটি সম্পূর্ণ চর্যা, কয়েকটি খণ্ডিত চর্যাগীতি এবং ড. দাশগুপ্ত আবিষ্কৃত চল্লিশটি পদকে গণ্য করতে পারি। এদেরই ভিত্তিতে প্রাচীনতম চর্যাপদাবলীর ভাষা ও বিষয়বস্তু আলোচনা করা উচিত।”২২ এইভাবে বিভিন্ন দিক চুল ছেঁড়া বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে চর্যাপদকে বাঙলা ও বাঙালির অমূল্য সম্পদ স্বীকৃত হলে ‘চর্যাপদ’ রচিয়তা বৌদ্ধ সহজিয়াদের হত গৌরব ও মহিমা আমাদের জাতীয় জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।

সৌজন্যেঃ দৈনিক আজাদী

Additional Info

  • Image: Image