২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৫ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ বুধবার, ২৯ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 22 সেপ্টেম্বর 2014 03:38

ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ও বিলুপ্তির ইতিহাস

লিখেছেনঃ জামাল উদ্দিন

ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ও বিলুপ্তির ইতিহাস

মধ্যযুগে সমতটে বৌদ্ধধর্মের যে বিকাশ ও প্রসার ঘটেছিল সে ইতিহাস আজও অনেকটা তমসাচ্ছন্ন। এর মূল কারণ হল এতদঅঞ্চলের সমসাময়িক আকর ইতিহাসের অভাব। তথাপি ঐতিহাসিক তথ্যের এ শূন্যতা অনেকটাই পূরণ হয়েছে সমসাময়িক সাহিত্য, বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত, উৎখননকৃত স্থাপত্যনিদর্শন, শিলালেখ, তাম্রলিপি, ধাতব মুদ্রা, হিন্দু-বৌদ্ধ মূর্তি ও উৎকীর্ণ টেরাকোটা ফলকের মাধ্যমে।

ঐতিহাসিকগণ একমত যে, মধ্যযুগে সমতট ছিল বৌদ্ধ ধর্মের শেষ আশ্রয়স্থল। সমতটের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কারণ, সমতট অঞ্চলে ঘন ঘন ক্ষমতার পালাবদলের ফলে এর রাজনৈতিক সীমারেখা কখনও বর্ধিত ও কখনও সংকুচিত হয়েছে। তবে মোটামুটি ধরে নেওয়া যেতে পারে যে এটি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার একটি প্রাচীন ভৌগোলিক অংশ। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং (যিনি সপ্তম শতকে বাংলায় পদার্পণ করেছিলেন) এর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সে সময় সমতট জনপদ ছিল বাংলায় বৌদ্ধ সংস্কৃতির একটি বিখ্যাত কেন্দ্র। সমতটের উত্তর- সীমানা ছিল সিলেট সীমান্তের পর্বত ও হাওর পর্যন্ত; দক্ষিণের সীমানা ছিল হাওর- এর পর থেকে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত; পূর্বদিকে ত্রিপুরা ও আরাকানের উচ্চভূমি; পশ্চিমের সীমানা ছিল পদ্মা- মেঘনা-ব্রহ্মপুত্রের সম্মিলিত স্রোতধারা পর্যন্ত।

বৌদ্ধ সূত্র ‘বিনয়পিটক থেকে জানা যায় যে গৌতমবুদ্ধ প্রচারকল্পে স্বয়ং পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট ও কর্ণসুবর্ণে পদার্পণ করেছিলেন। তবে তাঁর এ আগমন ও প্রচারকার্য ছিল ক্ষণস্থায়ী। ঐতিহাসিকদের মতে, সম্রাট অশোকের শাসন আমলে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে বৌদ্ধধর্ম বাংলায় প্রথম প্রবেশ করে। শুঙ্গ ও কুশান যুগেও বাংলায় বৌদ্ধধর্মের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। যদিও গুপ্ত সম্রাটগণ (৩০০-৫৫০ খ্রি.) ছিলেন ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী, তথাপি উদারমনোভাবাপন্ন এ বংশের নৃপতিগণ ছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল। এ সহানুভূতির ফলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ব্রাহ্মণ্যধর্মাবলম্বীদের এত নৈকট্য লাভ করেন যে, ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি বুদ্ধদেব বিষ্ণুর একজন অবতার হিসেবে স্বীকৃতি পান। এ কারণে গুপ্ত শাসন আমলে বাংলায় হীনযান ও মহাযান মতবাদ পাশাপাশি প্রসার লাভ করেছিল। সমসাময়িক ও পরবর্তী চৈনিক পরিব্রাজকদের (যারা ভারত এসেছিলেন) বিবরণ থেকে সমগ্র ভারত, বিশেষ করে বাংলার বৌদ্ধ ধর্মের অবস্থান ও প্রসার সম্বন্ধে জানা যায়। হিউয়েন সাং (৭ম শতক), শেং-চি (৭ম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে), ইৎ-সিং (৭ম শতকের শেষার্ধে) প্রমুখের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, মৌর্য শাসনামলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের ভিত্তিভূমি রচনা হয়েছিল।

গুপ্তোত্তর যুগে হর্ষবর্ধনের পর খড়গরা ছিলেন প্রথম বৌদ্ধ রাজবংশ, যারা সপ্তম-অষ্টম শতকে সমতটে শাসন করেন। খড়গদের শাসনামলে চৈনিক পরিব্রাজক শেং-চি সমতটে ভ্রমণ করেন। সে সময়ে খড়গ বংশীয় রাজভট্ট ছিলেন সমতটের শাসক। তিনি ছিলেন ত্রিরত্নের (বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ) একজন একনিষ্ঠ উপাসক। শেংচির বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রাজভট্ট প্রতিদিন রাজকার্যের প্রারম্ভে ভিক্ষুদের আশীর্বাদ গ্রহণ করতেন। তিনি বর্ণনা দেন যে, সে সময়ে সমতটে ত্রিশটির মতো বিহার বিদ্যমান ছিল, যেখানে তীর্থে আগত চারশত ভিক্ষু একত্রে আতিথেয়তা গ্রহণ ও অবস্থান করতে পারতেন। সমতটের খড়গ বংশের রাজত্বের পর আরও ছয়টি রাজবংশ যথাণ্ডরাত, দেব, দত্ত, চন্দ্র, বর্মণ ও পট্টিকেরা নৃপতিদের শাসন প্রায় পাঁচশত বছর স্থায়ী ছিল। এদের মধ্যে চারজন খড়গ নৃপতির নাম তিনটি তাম্রশাসন থেকে জানা গেছে। দুটি তাম্রশাসন পাওয়া গেছে ঢাকার ৪৭ কি: মি: দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কুমিল্লার আশরাফপুরে, অপরটি পাওয়া গেছে ময়নামতিতে। দেলুবাড়িতে প্রাপ্ত একটি মূর্তির পাদপীঠে খোদিত লিপি ও পূর্বোক্ত তাম্রশাসন থেকে যে নামগুলো পাওয়া গেছে তা হল খড়গদ্যম, জাতখড়গ, দেবখড়গ এবং বলভট্ট। খড়গদের প্রথম রাজধানী ছিল বরকামতা এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় রাজধানী ছিল ময়নামতির রূপবান মুড়ার পশ্চিমে ক্ষীরোদা নদীর তীরবর্তী দেবপর্বতে, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন খড়গ বংশের শাসক বলভট্ট।৭ কুমিল্লার নিকটবর্তী কৈলান গ্রামে প্রাপ্ত তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, রাতবংশের শাসক শ্রীধরণ রাত দেবপর্বতে তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। রাতবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নৃপজীবনধরণ রাত। তার দুই উত্তরাধিকারী ছিলেন যথাক্রমে শ্রীধরণ রাত ও বলধরণ রাত। কৈলান তাম্রলিপি দেবপর্বত নগরীকে ‘সর্বতোভদ্রক’ রীতিতে নির্মিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।৮ উক্ত নগরীটি ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্রের রীতি অনুসরণ করে সম্ভবত দেবপর্বত নগরী নির্মাণ ও সুসজ্জিত করা হয়েছিল। দেবপর্বতের বর্গাকার বা আয়তাকার নকশা এবং প্রধান দিকগুলো নির্দেশ করে চারদিকে চারটি বৃহৎ সুউচ্চ প্রবেশতোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল। বৌদ্ধ বিহারটির অঙ্গনের অভ্যন্তরে প্রধান মন্দিরটির আকৃতি ক্রুশাকার ছিল, যার বাহুর বিস্তৃতি ছিল চারদিকে প্রসারিত।

খড়গদের পরই দেব নামধারী অপর একটি রাজবংশ সমতটে প্রায় পঞ্চাশ বছর রাজত্ব করেছিল। তিনটি তাম্রশাসন থেকে দেববংশের নৃপতিদের নাম জানা গেছে। দু’টি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে শালবন বিহার থেকে এবং তৃতীয়টি আবিষ্কৃত হয়েছে আনন্দ বিহার থেকে, যা এখন কোলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। উপরে উল্লিখিত এ দুই বিহার “ময়নামতি এলাকার আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বৃহৎ এবং পাহাড়পুরের সোমপুর বিহারের পূর্বে নির্মিত সর্বাপেক্ষা বৃহৎ আকারের মঠ দালান।” আলোচ্য তিনটি তাম্রলিপি থেকে দেববংশের কয়েকজন শাসকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁরা হচ্ছেন শ্রী শান্তিদেব, তাঁর পুত্র বীরদেব এবং শ্রী আনন্দ দেব ও তাঁর পুত্র ভবদেব। শালবন বিহারে দেব শাসকগণের নামাঙ্কিত প্রচুর মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে, যাতে তাঁরা নিজেদের ‘মহান যোদ্ধা’ হিসেবে ভূষিত করেছেন। মুদ্রার লিপিসমূহের উপরে ধর্মচক্র প্রতীক দেখা যায়, যার নিম্নে শ্রী ‘ভঙ্গাল মৃগাঙ্কস্যায়’ কথাটি উৎকীর্ণ, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে তাঁরা খড়গদের ক্ষমতাচ্যুত করে সমতটের দেবপর্বত অধিকার করেন। সম্ভবত দেব নৃপতিগণ খড়গদের এ রাজধানী দখল করার পর এটিকে আরও সমৃদ্ধ ও সুসজ্জিত করেন। কারণ, ময়নামতির সুউচ্চভূমির ১ থেকে ২ কিলোমিটার ব্যাপি প্রসিদ্ধ বিহারগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে যেমনণ্ড শালবন বিহার, আনন্দবিহার, ভোজবিহার, কুটিলা মুড়া, রূপবান মুড়াসহ বেশকিছু উপাসনালয়। এছাড়া কিছু পার্থিব ইমারতের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়, তাকে নৃপতিদের নির্মিত বিহার ও নগর পরিকল্পনার বর্ধিত রূপ বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। আনন্দদেবের নামাঙ্কিত তাম্রলিপি থেকে আরো জানা যায় যে, তিনি তাঁর ৩৯ রাজ্যাঙ্কের পূর্বে সমতটে বসন্তপুর নামের অপর একটি রাজধানী নির্মাণ করেছিলেন, যা আজও শনাক্তকরণের অপেক্ষায় রয়েছে।

দেববংশের পর সমতটে অপর যে রাজবংশীয় শাসকদের কথা জানা গেছে তা হল দত্তবংশ। চট্টগ্রাম থেকে প্রাপ্ত কান্তি দেবের তাম্রলিপি থেকে বৌদ্ধ পরিবারের যে প্রজন্মের নাম জানা গেছে তাঁরা হলেনণ্ড ভদ্রদত্ত, তাঁর পুত্র ধনদত্ত এবং ধনদত্তের পুত্র কান্তিদেব। কান্তিদেবেরই শুধু রাজকীয় উপাধিসহ নাম পাওয়া গেছে। দত্তবংশ সম্ভবত দেববংশের উত্তরসূরি ছিল এবং তাদের শাসনকাল ছিল অষ্টম শতাব্দীর শেষে। সম্ভবত তাদের রাজধানী ছিল বর্ধমানপুর, যার অবস্থান ছিল সমতটের পূর্বে হরিকেল অঞ্চলে চট্টগ্রাম এলাকায়। যার বর্তমান পরিচিতি দেয়াঙ পাহাড়ের বড়উঠান। দেববংশের পর যে বংশ সমতট এলাকায় একটানা দেড়শত বছর শাসন করে সে বংশ হল চন্দ্রবংশ (আনু. ৯০০-১০৫০ খ্রি:)। বাংলায় গৌরবময় রাজকীয় পাল ও সেনবংশের সাথে তাদের শাসনামলের তুলনা করা হয়ে থাকে। যদিও রোহিতগিরিতে (লালমাই) তারা একটি ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, পরবর্তীকালে তারা বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সীগঞ্জে) থেকে প্রতাপের সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। অধুনা আবিষ্কৃত পাঁচটি তাম্রলিপি থেকে চন্দ্র নৃপতিদের নাম জানা গেছে। কালপঞ্জী অনুযায়ী এদের নাম ত্রৈলোক্য চন্দ্র, শ্রীচন্দ্র, কল্যাণ চন্দ্র, লড়হচন্দ্র এবং গোবিন্দ্র চন্দ্র। উপরে উল্লিখিত তাম্রলিপিতে তাঁদের দুই পূর্বপুরুষের নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা হলেন যথাক্রমে পূর্ণচন্দ্র ও সুবর্ণ চন্দ্র। এ প্রতাপশালী চন্দ্র নৃপতিগণ ক্রমশ আরও শক্তিধর হয়ে সমগ্র সমতটের উত্তর-পূর্বে হরিকেল (সিলেট) এবং দক্ষিণে চন্দ্রদ্বীপে (বরিশাল) তাঁদের আধিপত্য বিস্তার করেন। রাজধানী বিক্রমপুর ব্যতিত দেবপর্বত ছিল তাঁদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রাজা লড়হচন্দ্র দেবতা লড়হ মাধবের (বিষ্ণু) অনুকূলে কতিপয় ভূমি দান করেন এবং বাসুদেবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এ ঘটনা থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে যদিও চন্দ্র রাজারা অনুরক্ত বৌদ্ধ ছিলেন তবুও তাঁরা ব্রাহ্মণ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

চন্দ্র রাজাদের পর বর্মনগণ সমতটে ক্ষমতায় আসীন হন। তাঁরা ছিলেন ব্রাহ্মণ্য বংশীয় এবং সম্ভবত তাঁদের উৎপত্তিস্থল ছিল কলিঙ্গ। এ বংশের তিনজন নৃপতির তাম্রশাসন থেকে বর্মন বংশের চারজন নৃপতির নাম জানা গেছে। তাঁরা হলেন জাতবর্মন, হরিবর্মন, শ্যামল বর্মন এবং ভোজবর্মন। আনুমানিক ১০৮০ খ্রি. থেকে ১১৮০ খ্রি. পর্যন্ত ছিল তাদের শাসনামল। পট্টিকেরা সমতটের অপর একটি অঞ্চল ও রাজধানী ছিল, যা দেবপর্বতের প্রান্তদেশে অবস্থিত ছিল বলে ঐতিহাসিকগণ প্রায় মতৈক্যে পৌছে গেছেন। হরিকেলদেবের একটি তাম্রলিপি থেকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, রাজা হরিকেলদেব পট্টিকেরার শাসক এবং রাজধানী পট্টিকেরা থেকে (১২২০ খ্রি:) তাঁর শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। পট্টিকেরার এ শাসকগণ বহু দুর্গ ও বিহার দ্বারা তাঁদের রাজধানী সুসজ্জিত করেছিলেন। এ তাম্রলিপিটির তারিখ ইংরেজিতে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ১২২০ খ্রিস্টাব্দ। ময়নামতিতে প্রাপ্ত (উৎখননিত) বহু রৌপ্য মুদ্রায় পট্টিকেরা লিপি এবং বৃষ ও ত্রিরত্ন প্রতীক দেখা যায়। মুদ্রা পাঠ ও বিশ্লেষণ করে সমতটের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, এতদঅঞ্চলে সাতটি রাজ বংশের উত্থান-পতনের মধ্যে ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী উভয় শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে বৌদ্ধধর্মের এক শক্ত ভিত্তি গড়ে উঠেছিল যা পরবর্তীকালে সেন শাসক এবং মুসলিম শাসকদের আগ্রাসনের ফলে প্রায় বিলুপ্ত হয়।

বিশ শতকের প্রারম্ভে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের ফলে সমতটে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির এক লীলাভূমির উন্মোচন ঘটে এবং পর্যায়ক্রমে আজ পর্যন্ত যে অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ হচ্ছে। সেখানে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপত্য যথা-বিহার, মন্দির, রাজপ্রাসাদ, দুর্গ এবং মাটির নিচ থেকে উৎখননিত মূর্তির, তাম্রশাসন, মুদ্রা, ব্যবহার্য তৈজসপত্র ও উৎকীর্ণ পোড়ামাটির ফলক মধ্যযুগে সমতট বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারের সাক্ষ্য আজও বহন করে চলছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশ যুগে এতদঅঞ্চলে ১৭৫৭ সালে প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন শুরু হয়েছিল এবং তা ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ভারতবর্ষ বিভাগোত্তর যুগে এ অঞ্চলে পাকিস্তানের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পর্যায়ক্রমে ধীর গতিতে উৎখনন কাজ চালাতে থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর থেকে ময়নামতি দেবপর্বত অঞ্চলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক উৎখনন কার্য বিরামহীনভাবে চলছে এবং এ পর্যন্ত বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিকৃত হয়েছে যার পঠন-পাঠন আজও চলছে। ১৯৯৫ সালে ১২ মার্চ ময়নামতির ভোজবিহারে যে অনিন্দ্যসুন্দর বজ্রসত্ত্বের ব্রোঞ্জ মূর্তিটি আবিষ্কৃত হয়েছে তা এশিয়ায় প্রাপ্ত অপরাপর ব্রোঞ্জ বজ্রসত্ত্ব মূর্তির চাইতেও বিশাল। মূর্তিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এর অনুপম সৌন্দর্য, মূর্তি-লক্ষণ ও ভাস্কর্যের শৈলী বিচার করে মূর্তি বিশারদ গৌরেশ্বর ভট্টাচার্য্য এবং প্রত্নতত্ত্ব বিশারদ এম. হারুনুর রশিদ আলোচ্য বজ্রসত্ত্ব মূর্তিটি নির্মাণ তারিখ একাদশ শতক বলে নির্ণয় করেছেন এবং এটি একটি আদিবুদ্ধের মূর্তি, যাকে “পঞ্চ তথাগতের” গুরু হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। বর্তমানে এ বিখ্যাত মূর্তিটি ময়নামতি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে (ACC No. 1165)।

ব্রিটিশ উপনিবেশিক যুগ থেকে অধুনা বাংলাদেশে ময়নামতি দেবপর্বত এলাকায় উৎখননের ফলে যে সকল প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল (সাইট) উন্মোচিত হয়েছে তাতে যে সকল বিহার, মন্দির, উপাসনালয় (৮ম থেকে ১২ শতক) বিখ্যাত তার মধ্যে রয়েছে শালবন বিহার, যাকে ‘শালবন রাজার প্রাসাদ’ বলা হত। এরই একটি ক্ষুদ্র উপাসনালয়ে (Chapel) চন্দ্রবংশের রাণী ময়নামতি ও তাঁর পুত্রের গুরু হরিপা (hadip-pa) অবস্থান করতেন বলে জানা গেছে। অপরাপর স্থাপনার মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন রাত নৃপতিদের আমলে নির্মিত কুটিলা মুড়া (৭ম শতকের শেষার্ধ), যার অবস্থান ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে এলাকার তিন মাইল উত্তরে। কুটিলা মুড়ার মন্দিরের স্থাপত্যিক ভূমি নকশায় ত্রিরত্ন প্রতীকের প্রতিফলন লক্ষণীয়, যা ‘বুদ্ধ-ধর্ম ও সংঘ’ নির্দেশ করে। ময়নামতিতে আবিষ্কৃত চরপত্রমুড়া (১০ম শতক) ময়নামতির ২০০ ফুট পাহাড়ি এলাকায় বিস্তৃত। এর উচ্চতা ৩৫ ফুট। ১৯৫৬ সালে এটি আবিষ্কৃত হয়। এতে প্রদক্ষিণ পথসহ ডিম্বাকৃতির একটি দেবালয়ের ভগ্নপ্রায় স্থাপনা রয়েছে। এখানেই চারটি বিখ্যাত উৎকীর্ণ লিপিসহ তাম্রশাসন পাওয়া গেছে। এছাড়া ইটাখোলা মুড়ার আরও প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে।

ময়নামতিতে যে সকল তাম্রশাসন ও মূর্তির পাদপীঠে উৎকীর্ণ লিপি পাওয়া গেছে তার সংখ্যা ১২টি। এর সাতটি শালবন বিহার, চারটি চরপত্রমুড়া এবং একটি ইটাখোলা মুড়ায় পাওয়া গেছে। ইটাখোলা মুড়ার তাম্রলিপিটির তারিখ সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতক বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এ তাম্রলিপির ভাষা সংস্কৃত, প্রাচ্যব্রহ্মী এবং প্রটো-বাংলা যা খড়গ, দেব, চন্দ্র ও পরবর্তী দেবদের শাসন আমলে কৃত। ময়নামতি দেবপর্বতে যেসব ধাতব মুদ্রা (স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্রোঞ্জ ইত্যাদি) আবিস্কৃত হয়েছে এবং হচ্ছে তা সমতটের ইতিহাস বিনির্মাণে আজও বিরাট ভূমিকা পালন করে চলছে।

আলোচ্য অঞ্চলে আবিষ্কৃত বেশ কিছু পাথর, ব্রোঞ্জ, স্টাকো র্(stucco) ও টেরাকোটায় (terracotta) নির্মিত হিন্দু-বৌদ্ধ মূর্তি এবং মন্দির গাত্রের পোড়ামাটির ফলক ময়নামতির প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর এবং দেশ-বিদেশে অপরাপর জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে তাতে সমতটে বৌদ্ধধর্মের বিশালত ও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের একে অপরকে প্রভাবিত করার প্রবণতা লক্ষণীয়। এতদঅঞ্চলের যে ব্রোঞ্জ নির্মিত পদ্মপাণি, ধ্যানীবুদ্ধ, অমিতাভ, বজ্রসত্ত্ব, অক্ষোভ, মঞ্জুশ্রী, জাম্বাল, শ্যামতারা ইত্যাদির মূর্তি পাওয়া গেছে তাতে বাংলার বিশেষ ভাস্কর্য শৈলী লক্ষণীয়। যেমন মূর্তির সুউচ্চ পাদপীঠ, বিশ্বপদ্ম আসন, প্রভাবলী ইত্যাদি।

সপ্তদশ শতকে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শিক্ষক লামা তারানাথ, কর্তৃক রচিত ‘ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস’ (১৬০৪) থেকে জানা যায় যে, বাংলায় পাল মহাজানী নৃপতিদের শাসন আমলে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার শিল্পীরা নবম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত অনিন্দ্যসুন্দর তন্ত্রযানী-বজ্রযানী দেব-দেবীর মূর্তি নির্মাণ করতেন। তিনি আরো মন্তব্য করেন যে, ধর্মপাল ও দেব পালের শাসন আমলে বঙ্গে ধীমান ও তাঁর পুত্র বীটপাল পূর্ব দেশীয় ধাতুমূর্তির রীতি প্রচলনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তবে চিত্রকর পিতা ধীমান যে রীতি প্রচলন করেন তাকে ‘পূর্ব দেশীয়’ রীতি বলা হত। আর পুত্রের রীতি ছিল ‘মধ্য দেশীয়’ অর্থাৎ মগধে, যা বর্তমানে দক্ষিণ বিহার অঞ্চল বলে চিহ্নিত করা যায়। ধীমান ও বীটপাল ব্যতিত বাংলায় আরও কয়েকজন বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন তাঁরা হলেন রণকশুলপানী, জয়, প্রজ্জয় এবং বিজয়। মধ্যযুগে বাংলার এ শিল্পকলার রীতির সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল নেপাল, মায়ানমার (বার্মা), সিংহল (সিলন) ও ইন্দোনেশিয়ায়।

সমতটে ময়নামতির শালবন বিহারে উৎখননকৃত ও মন্দিরসমূহের গাত্রে যে পোড়ামাটির ফলক রয়েছে তাতে নানা বিষয়ে উৎকীর্ণ ভাস্কর্য দেখা যায়। বৌদ্ধ মন্দিরের দেয়াল গাত্রের ফলকগুলোতে (হিন্দু, বৌদ্ধ) ধর্মীয় কাহিনী এবং জনজীবনের চিত্র বিধৃত। হিন্দু বিষয়ের মধ্যে উড়ন্ত কিন্নর-কিন্নরী, গন্দর্ভ ও বিদ্যাধর। এছাড়া রয়েছে সিংহ, হাতি, হরিণ ও ঘোড়ার নতোন্নত ভাস্কর্য (রণফধণত)। মালাঠোঁটে হংসরাজ বিষয়টি বৌদ্ধধর্মে জাতকের কাহিনী থেকে নীত। বৌদ্ধধর্মের প্রতীক হিসেবে এখানে গুরুত্ব পেয়েছে সিংহ, হরিণ ইত্যাদি।

ইট দ্বারা নির্মিত বিহার, মন্দির ও অপরাপর স্থাপনায় ইটের নানাবিধ নকশা ও পোড়ামাটির অলংকরণ দ্বারা সুসজ্জিত ছিল, যা ভারতের নালন্দা মহাবিহার ও বাংলাদেশের মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের বৌদ্ধ স্থাপনা ও শিল্পকলার আন্তমিলের কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। সমতটের এই শিল্পকলার মূল চালিকাশক্তি ছিল বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি।

আশ্রয়স্থল চট্টগ্রাম পণ্ডিত বিহার

খ্রিস্টীয় একাদশ শতক থেকে বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিষ্ঠুর অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্বীয় প্রাণ ও ধর্ম রক্ষার্থে আরাকান শাসনাধীন চট্টগ্রামে এসে শেষ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তার কারণ ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকানের বৌদ্ধ রাজাগণ চট্টগ্রাম শাসন করেছেন। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে তখন চট্টগ্রাম আরাকান রাজ্যভুক্ত ছিল। যে কারণে চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সমাজ ও বৌদ্ধ স্থাপনাগুলোতে হিন্দু ব্রাহ্মণরা কিংবা তুর্কী মুসলিমরা তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাই পলাতক ভিক্ষুদের অধিকাংশ আশ্রয় নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য এক বিহার হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে।

চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ত্রয়োদশ শতকে সেনরাজবংশের শাসনামলে (১১০০-১২৬০ খ্রিস্টাব্দে)। এ সময়কালে বাংলায় বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো নানা রাজনৈতিক দুর্যোগের কারণে ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সেন ও বর্মন রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিরূপ। তাদের শাসনামলে বৌদ্ধদের উপহাস ও বিদ্রুপ করা হতো এবং ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদেরকে পাষণ্ডী ও নাস্তিক বলে নিন্দা করতো। বৌদ্ধ বিহারগুলোতে বুদ্ধ, বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি সরিয়ে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ‘শংকর বিজয় ও শুন্য পুরাণ’ গ্রন্থে ব্রাহ্মণদের বৌদ্ধ নির্যাতনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়। শুন্য পুরাণ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের বিষয় সম্পত্তি কেড়ে নিত এবং তাদের সর্বদা অত্যাচার নির্যাতন করত। বৌদ্ধ বিহারগুলো হিন্দু ব্রাহ্মণদের দখলে চলে যায় এবং বিপুল সংখ্যক বৌদ্ধ হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। এছাড়া অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু দেশ ত্যাগ করে তিব্বত, নেপাল, উড়িষ্যা, কামরূপ, আরাকান ইত্যাদি অঞ্চলের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। এ সমস্ত কারণে বৌদ্ধধর্ম ত্রয়োদশ শতকের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বলতে গেলে বাংলায় তখন সেনবংশের নিয়ন্ত্রণাধীন হিন্দু রাজত্বের রমরমা অবস্থা।

লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী বাংলা আক্রমণ করেন। এ আক্রমণে বাংলায় অবশিষ্ট বৌদ্ধ সভ্যতার যা ছিল তাও সমূলে উৎপাটন হয়ে গেল। ভাগ্যান্বেষণে আগত তুর্কীবীর বখতিয়ার বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মনে করেছিলেন ব্রাহ্মণদের দুর্গ। এ ভ্রান্ত ধারণায় বাংলার বৌদ্ধবিহার, সংঘারাম ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বখতিয়ারের তরবারি ও অশ্বক্ষুরের আঘাতে একের পর এক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। বিহারভিত্তিক বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নালন্দা, বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরী মহাবিহারগুলো একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, নিহত হল অধিকাংশ বৌদ্ধ ভিক্ষু। বিহারে রক্ষিত ধন-সম্পদ লুট করা হল। আগুনে পুড়ে সবকিছুই ছাই হয়ে যাবার পর বখতিয়ার খিলজী জানতে পারলেন এগুলো ব্রাহ্মণদের দুর্গ নয়, এগুলো সুসমৃদ্ধ বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়। এভাবে তুর্কী সৈন্যদের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেল বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপনা। এ প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন ণ্ডযাঁরা তুর্কী বীরদের অস্ত্রাঘাত হতে কোনরকমে প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হলেন তাঁরা অতিকষ্টে হাতের কাছে পাওয়া কয়েকটি পুথি, ছোট ছোট মূর্তি প্রতিমা এবং সূত্রোৎকীর্ণ মাটি বা শিলাফলক নিয়ে পালিয়ে গেলেন তিব্বত, নেপাল, উড়িষ্যা, কামরূপ, আরাকান, পেঁগু, পগান বা আরও দূরদেশে। একই প্রসঙ্গে নলিনীনাথ দাশগুপ্ত লিখেছেনণ্ডমগধের বিহারগুলোতে তুর্কীদের এরূপ জঘন্যতম অত্যাচার কাহিনী শুনে বাংলার সোমপুর, জগদ্দল প্রভৃতি বিহারবাসী শ্রমণগণ অত্যাবশ্যকীয় কিছু পুথিপত্র সঙ্গে নিয়ে আত্মরক্ষার্থে যে যেদিকে পারে পালিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন ণ্ড দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণে প্রথমে মগধ ও পরে ভারতের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাংলার বৌদ্ধবিহার ও সংঘরামগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বৌদ্ধধর্ম গ্রাস করার ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণে প্রতিকূল শক্তির মোকাবেলায় বিধ্বস্ত বৌদ্ধধর্ম বাংলা থেকে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গেল।

বাংলার সুলতানী আমলে ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে ফখর উদ্দিন মোবারক শাহ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয় এবং চট্টগ্রামে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তখন থেকে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে জামাল খাঁ পন্নীর সময়কাল চট্টগ্রামে মুসলিম শাসন বলবৎ ছিল। সুলতানী আমলে চট্টগ্রাম মুসলিম অধিকারে চলে আসলে চট্টগ্রামেও বৌদ্ধরা নির্যাতিত হতে থাকে। হয়তো এ সময়ে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহারও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি এবং এ সময়েই চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার থেকে ভিক্ষুরা দলে দলে তিব্বত, নেপালের দিকে ছুটে যেতে থাকে। পরবর্তীতে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোগলরা আরাকান রাজকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করে নেয়। চট্টগ্রাম দখলের এ ভয়াবহ যুদ্ধে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় বলে ধারণা করা যায়। এ যুদ্ধে চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহার ধ্বংস, ধর্মগ্রন্থ বিনষ্ট, বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ নিহত হন বা পলায়ন করেন। চট্টগ্রাম থেকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা (মগরা) পালিয়ে আরাকানে আশ্রয় নেয়। অবশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর নেমে আসে অমানিশার যুগ। মোগল সম্রাট বা শাসকরা এদেশে বৌদ্ধধর্ম নামে কোন ধর্ম ছিল, মনে হয় তা জানতেনই না। কারণ মোগল শাসনামলের কোন পুথিপত্র বা গ্রন্থে বৌদ্ধধর্ম বা বৌদ্ধদের কোন কথা পাওয়া যায় না। সত্যিকার অর্থে তখন বাংলায় বৌদ্ধদের কোন অস্তিত্বই ছিল না।

শিহাব উদ্দিন তালিশ বিরচিত ‘ফতিয়া-ই-ইব্রিয়া’ গ্রন্থে, দেয়াঙ পাহাড়স্থ প্রাচীন চট্টগ্রাম বন্দর, দেয়াঙ কারাগার, বদরশাহের দরগাহসহ মোগল-আরাকানীদের ভয়াবহ যুদ্ধের বর্ণনা থাকলেও পণ্ডিতবিহার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তাতে ধারণা করা হয় যে, পণ্ডিতবিহারের সেই জৌলুস তখন ছিল না।

চট্টগ্রামের কৃতীসন্তান পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাস ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে কয়েকবার তিব্বতে গিয়ে প্রাচীন পুঁথিপত্র এনে ব্যাপক গবেষণা করেও চট্টগ্রাম পণ্ডিতবিহারের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারেন নি। তবে তিনি চট্টগ্রাম শহরের দেবপাহাড় এলাকায় এর অবস্থান ছিল বলে মনে করেন। পরবর্তীকালে বিশ্ববিশ্রুত বৌদ্ধ মনীষী ড. বেণীমাধব বড়ুয়া ও আইনজীবী উমেশচন্দ্র মুৎসুদ্দী প্রমূখ বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালান। তাঁরা মনে করেন এর অবস্থান আন্দরকিল্লার রংমহল পাহাড় এলাকায়। আবার কোন কোন পণ্ডিতের মতে এর অবস্থান ছিল পটিয়ার চক্রশালায়। তবে অধিকাংশ গবেষকের অভিমত এ যে, বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরবর্তী দেয়াঙ পাহাড়ে। যেখানে দনুজমর্দন দেব, মধুসূদন, বাসুদেব, রাজা কান্তিদেব প্রমুখ দেববংশীয় রাজারা রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। এখানে ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দেববংশীয় রাজাদের রাজধানীর অস্তিত্ব ছিল। দেয়াঙ পাহাড়স্থ তাদের রাজধানীর নাম বড়উঠান।

বড়উঠানের অনতিদূরেই ঝিওরী ও হাজিগাঁও গ্রাম। দেয়াঙ পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এ দু’গ্রামের সীমানা থেকে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে আবিষ্কৃত হয় ৬৬টি বুদ্ধমূর্তি। ঝিওরী গ্রাম থেকে দু’মাইল উত্তরে খিলপাড়া ও কৈনপুরা গ্রামে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে আরও কয়েকটি বুদ্ধমূর্তি ও প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। এ মূর্তিগুলোই ইতিহাসবিদদের সামনে পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানস্থল যে দেয়াঙ পাহাড় তার প্রমাণ অনেকাংশে নিশ্চিত করে দেয়।

অন্ধকার যুগে বৌদ্ধ সম্প্রদায়

বাংলাদেশে এককালে এক কোটির অধিক বৌদ্ধ ও সাড়ে এগার হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু বাস করত বলে পণ্ডিতরা ধারণা করেন। সেন আমল, তুর্কী শাসনামল ও পরবর্তীতে সুলতানী আমলে এ দেশে বৌদ্ধদের বিনাশ পর্ব চলে।

সেই অন্ধকার যুগে বৌদ্ধদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকার ছিল দারুণভাবে উপেক্ষিত। ভিক্ষুসংঘ ও সংঘরাম এবং ধর্মীয় গ্রন্থ বিলুপ্তিতে তারা ভুলে গিয়েছিল ধর্মীয় রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি। শুধু রয়ে গিয়েছিল এক টুকরো গৈরিক বসন। তা দিয়েই তারা ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান, সামাজিক ত্রিয়াকর্ম ও পূজা-পার্বণ সম্পাদন করত। তখন তাদের রাউলি নামে ডাকা হত। রাউলিরা ছিল বিবাহিত। এসব বিবাহিত বৌদ্ধ পুরোহিতরা নিজের মত করে বৌদ্ধধর্ম গড়ে তুলেছিল। এ সময় বৌদ্ধসমাজে ‘মঘা খমুজা’ নামক একটি ধর্মগ্রন্থের সাহায্যে রাউলিরা ধর্মীয় কাজ পরিচালনা করতো। অন্যদিকে বৌদ্ধ গৃহীসমাজে কালীপূজা, দুর্গাপূজা, মনসাপূজা, কার্তিকপূজা, শনিপূজা, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতীপূজা ইত্যাদি হিন্দু ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান প্রচলন শুরু হয়ে যায়। আবার মুসলমানদের মানিকপীরের সিন্নী, সত্যপীরের সিন্নী, বদর শাহের সিন্নী, মির্জির সিন্নী ইত্যাদিও বৌদ্ধদের মধ্যে প্রচলন ছিল। মা মগধেশ্বরীর নামেও সেবাখোলায় পূজা ও বলিদান প্রথা বৌদ্ধদের মধ্যে বহু আগে থেকেই প্রচলন ছিল। বৃহত্তর চট্টগ্রামে বৌদ্ধভিক্ষু ও বৌদ্ধ গৃহীরা তখন এরূপ অবৌদ্ধসম্মত অবস্থার মধ্যে না হিন্দু, না বৌদ্ধ, না মুসলমান হয়ে জীবন যাপন করছিল।

এ প্রসঙ্গে রাখাল দাস বলেছেনণ্ড“অধঃপতন আরম্ভ হইলে সভ্যমানব স্তম্ভিত হইয়া থাকে। অনেক সময় আত্মরক্ষার জন্য হস্তোত্তোলন তাহার পক্ষে অসম্ভব হইয়া পড়ে, তখন আর ইতিহাস রচিত হয় না।” ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দের পর বৌদ্ধদেরও ইতিহাস আর রচিত হয়নি। এ সময় গোবিন্দ পালের রাজ্য-সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র মগধের পতন হয়। ওদন্তপুর ও বিক্রমশীলা অধিকৃত হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয় অন্ধকার যুগে সমগ্র বিশ্বকে আলো দিয়েছে, চীনসহ সমগ্র এশিয়া খণ্ডকে মৈত্রীপাশে আবদ্ধ করেছে ও সাঙ্গীকরণ নীতি অনুসরণ করে সকলকে একসাথে নিয়ে ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে নতুন সভ্যতা গড়ে তুলতে প্রয়াস পেয়েছে, সেই নালন্দা ধ্বংস হল, নালন্দা ও ওদন্তপুরীর সঞ্চিত হাজার হাজার বই ভস্মীভূত হল, শুরু হল তমসাচ্ছন্ন যুগের। ১৩০০ থেকে ১৮০০ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কি হল তা আর জানা নেই। আবিষ্কৃত প্রত্নতত্ত্বের জোড়াতালির ইতিহাস থেকে আভাস পাওয়া যায়, এ সময়ের মধ্যে সঙ্ঘারাম জনশূন্য হয়েছে, পরিচয় হারিয়েছে, অবলুপ্ত হয়েছে আর পৃষ্ঠপোষকহীন বিশাল বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব, শাক্ত ও ইসলাম কবলিত হয়েছে। অনেকে বুদ্ধকে ধর্মঠাকুর হিসেবে পূজা করে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ হিসেবে দিন কাটিয়েছে, আর যারা কিছুই করতে পারল না, তারা প্রবল ব্রাহ্মণ্য বিরোধিতার মুখে উপাস্য হারিয়ে অস্পৃশ্য শূদ্র জাতিতে (হরিজন) পরিণত হয়েছে। এ-ই ভূ-ভারত থেকে বৌদ্ধ বিলীন হয়ে যাওয়ার আভাস। তারপর ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয় নতুন আরেক অধ্যায়। এ অধ্যায়ের ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা, ইংরেজ সন্ধানীরা এল, শুরু হল খনন কার্য, আবিষ্কৃত হল অতীতের স্মৃতিবাহী কত মন্দির, কত ধ্বংসাবশেষ, কত প্রস্তর মূর্তি, প্রাচীন পাত্রে আঁকা কত ছবিণ্ড অজন্তা। ইলোরা-শুরু হল ভারত-মানসের অনুসন্ধান। অশোকের শিলালিপি এল মানুষের সামনে, পাঠ উদ্ধার হল, জানা গেল ভারতে এক সভ্যতা ছিল, এ সভ্যতা অনুপম। জেমস প্রিন্সেপ, এডুইন আর্নল্ড বৌদ্ধ বিজ্ঞানী ইংরেজ পণ্ডিত রিস ডেভিডস প্রমুখ গবেষক ও চিন্তাবিদগণ ভারতকে দিলেন এক নতুন চমক। কবি আর্নণ্ড লিখেছেন, ‘দি লাইট অব এশিয়া’। বুদ্ধের বিপুল বিস্তৃতির খবর দিল নেপাল, তিব্বত, জাপান, শ্রীলংকা, বার্মা, শ্যাম, কম্বোডিয়া প্রভৃতি দেশ। এর প্রভাবে বাংলায়ও বুদ্ধ চেতনা শুরু হল, প্রতীচ্য শিক্ষার উদারতায় এগিয়ে এল রাজেন্দ্র লাল মিত্র, বঙ্কিম প্রমুখ মনীষীগণ।

চট্টগ্রামে যেভাবে পুনরুত্থান হল বৌদ্ধধর্ম

এ ধারা ব্রিটিশ শাসনামলের শেষদিকেও প্রচলিত ছিল। চট্টগ্রামী বৌদ্ধদের মধ্যে যখন এ অবস্থা চলছিল এমন সময় আরাকানী থেরবাদী ভিক্ষু সারমেধ মহোদয়ের আগমন ঘটে। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি রাধাচরণ মহাস্থবিরের সাথে বুদ্ধগয়া থেকে চট্টগ্রাম পরিদর্শন করতে এলে এখানকার বৌদ্ধধর্মের অবস্থা, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধর্মবিনয় সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের রীতিনীতির অনুপস্থিতি লক্ষ্য করেন। তিনি দু’বছর চট্টগ্রামে অবস্থান করে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধর্মবিনয় সম্পর্কে নতুনভাবে জ্ঞান দান করেন। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে সারমেধ প্রয়োজনীয় ভিক্ষু সংঘসহ দ্বিতীয়বার চট্টগ্রামে আগমন করে হীনযান মহাযান মিশ্রিত চট্টগ্রামের রাউলি পুরোহিতগণকে সর্বপ্রথম থেরবাদসম্মত বিনয়বিধান মতে উপসম্পদা প্রদান করেন। একই সালে চট্টগ্রামের সন্তান আচার্য পূর্ণাচার বার্মার সংঘরাজের নিকট থেকে নতুনভাবে উপসম্পদা গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে এসে সংঘরাজ সারমেধ মহোদয়ের সাথে মিলিত হয়ে থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। সেই থেকে বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধদের আবার এ দেশে পথচলা শুরু হয়।

দৈনিক আজাদী-এর সৌজন্যে।। এখানে লেখক তার নিজসব মতামতের উপর ভিত্তি করে লিখেছেন। মতান্তরে এ বিষয়ের উপর লেখা থাকলে তা প্রকাশ করা হবে।

Additional Info

  • Image: Image