২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বুধবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ইংরেজী
শনিবার, 29 মার্চ 2014 02:04

বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম : উত্থান-পতন, পুনরুত্থান ও ইতিহাসের আলোকে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগ-অবদান (২য় পর্ব)

লিখেছেনঃ নোবেল চৌধুরী প্রজ্ঞা

বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম : উত্থান পতন পুনরুত্থান ও ইতিহাসের আলোকে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগ-অবদান (২য় পর্ব)

বৌদ্ধধর্মই চট্টগ্রামের প্রাচীনতম ধর্ম :

চট্টগ্রামের ইতিহাস লেখক পূর্ণচন্দ্র চৌধুরী'র বর্ণনায় প্রথম খৃষ্টাব্দের প্রারম্ভে মগধদেশ হতে মহাযান বৌদ্ধধর্ম প্রচারকগণ পূর্ববঙ্গে এসে ধর্মপ্রচার করেন । সুতরাং, বৌদ্ধধর্মই চট্টগ্রামের প্রাচীনতম ধর্ম । নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের পর দেবরাজগণের সময় চট্টগ্রামের পণ্ডিত বিহার বৌদ্ধধর্ম চর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠে । পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের পণ্ডিতগণ এই পণ্ডিত বিহারে এসে ধর্মচর্চায় নিয়োজিত হন । তন্মধ্যে - নাড়পাদ, লুইপাদ, অঙ্গবজ্র তঘন, সবরিপদ, অবধুদপদ, নানাবোধ, জ্ঞানবজ্র, বুদ্ধজ্ঞানপ্রদ, অমোঘনাথ, ধর্ম-শ্রীচৈত্র  ইত্যাদি নাম উল্লেখযোগ্য । ত্রয়োদশ শতকের ধ্বংসলীলা ক্রমে ওদন্তপুর, বিক্রমশীলা, সোমপুর, ময়নামতী, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় , জগদ্দল, কণকস্তূপ প্রভৃতি বিহার ভস্মীভূত করে সপ্তদশ শতকে পণ্ডিত বিহার ধ্বংস করা হয় ।
ওদন্তপুর, বিক্রমশীলা, সোমপুর, ময়নামতী, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, জগদ্দল, কণকস্তূপ ধ্বংসাবেশ এবং প্রাপ্ত কিছু প্রত্নসামগ্রীর খণ্ডচিত্র । এসব আজ বাংলার কৃষ্টি-ঐতিহ্য এবং বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগ ও আধিপত্যের সাক্ষী হয়ে রয়েছে ।
 
বৌদ্ধদের উপর পুনঃ পুনঃ আক্রমণ এবং ধর্মান্তর করণ প্রক্রিয়া :  
পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন রাজবংশের অভ্যূত্থান হয় । সেন আমলে বৌদ্ধ, বৌদ্ধমঠে ধ্বংসলীলার সূত্রপাঠ হয় । ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে তুর্কী বীরেরা ওদন্তপুরী, নালন্দা, বিক্রমশীলা, বঙ্গদেশ প্রভৃতি জয় করার পর সমস্ত মূর্তি ও অগণিত আদর্শ শিল্পকলা ধ্বংস, শত শত ভিক্খুকে শিরচ্ছেদ করে বখতিয়ারের নেতৃত্বে, গ্রন্থসমূহ ভস্মসাৎ করা হয় এবং ধ্বংস করা হয় শতাধিক কলা-কৌশলের নমুনা । এ প্রসঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের 'রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় প্রণীত বাংলার ইতিহাস দ্বিতীয় ভাগে এবং খ্যাতনামা লেখক মীন-হাজ-উস-সিরাজী বিরচিত তবকৎ-ই-নাসীরী নামক সুবৃহৎ গ্রন্থের ৫৫০ পৃষ্ঠায় বিবরণ পাওয়া যায়' ।

nalanda1
 
ছবি : নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষের খণ্ডচিত্র । তবে আশার বিষয় হচ্ছে, নতুন করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ৮০০ বছর পর আবারো আলো-সুখ্যাতি ছড়াবে বলে আশা প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অমর্ত্য সেনসহ সংশ্লিষ্টরা ।
 
এভাবে উপর্যুপরি পুনঃপুনঃ মর্মান্তিক বৌদ্ধ নির্যাতন ও বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলি সমূলে ধ্বংস করার মধ্যদিয়ে বৌদ্ধদের রাজকীয় ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয় । এ কারণে দেখা যায়, ধ্বংসপ্রাপ্ত বৌদ্ধ বিহারের সংলগ্ন অঞ্চলে বড় বড় মুসলমান বস্তি গড়ে উঠেছে । ওদন্তপুর বিশ্ববিদ্যালয় বিহারশরিপে পরিণত হল । সোমপুর, জগদ্দল সর্বত্র মুসলমান প্রধান অঞ্চলে পরিণত হল । পক্ষান্তরে চণ্ডীদাসের ন্যায় অনেকে হিন্দু হয়ে গেলেন । তখন দেখা যায় - "বাঙ্গলার অর্ধেক বৌদ্ধ মুসলমান হয়ে গেল এবং অপর অর্ধেক ব্রাহ্মণের শরণাপন্ন হল, আর বৌদ্ধদের মধ্যে যারা নিজের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করল, মুসলমান ও ব্রাহ্মণ উভয় পক্ষ হতে তখন তাদের উপর নির্যাতন চালানো হল " ।
 
বড়ুয়া শব্দের উৎপত্তি :
সেসময় কিছুসংখ্যক বৌদ্ধ নেপাল ও তিব্বতে পলায়ণ করে । আর মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত বৈশালীর বর্জি বংশীয় এক ক্ষত্রিয় রাজপুত্র বহুসংখ্যক অনুচরবৃন্দসহ মগধ সাম্রাজ্য হতে প্রাণভয়ে পলায়ণ করে আসাম, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে । মগধের বর্জিবংশ সম্ভূত 'বর্জি' শব্দ হতে 'বড়ুয়া' শব্দের উৎপত্তি । বড়ুয়া জাতি মগধের বর্জি বংশীয় ক্ষত্রিয় জাতি । বর্জি শব্দের অর্থ বড়ুয়া বা উৎকৃষ্ট । আবার বড়ুয়া শব্দের উৎপত্তি সম্বন্ধে কোন কোন পণ্ডিতের মতে, ভগবান বুদ্ধ দুঃখ মুক্তির লক্ষ্যে যে সত্যপথ প্রদর্শন করেছেন তা হল পালিতে - 'অরিয সচ্চং'; বাংলায়- 'আর্যসত্য' । যারা বুদ্ধের দেশিত ধর্ম তথা আর্যসত্য গ্রহণ করেন, তারা বড় আর্য বা বৌদ্ধ (বৌদ্ধ=বুদ্ধ+ষ্ঞ, বুদ্ধের উপাসক বা শিষ্য) নামে অভিহিত হন । এ 'বড় আর্য' হতে বড়ুয়া শব্দের উৎপত্তি । ত্রিপুরার রাজাদের ইতিহাস 'রাজমালা'-তে বড়ুয়া জাতির উল্লেখ রয়েছে । সেকালে পার্বত্য প্রধানগণ তাদের অধীনস্থ প্রজাগণের নায়করূপে নির্বাচিত হতেন এবং তাদের সর্দার, হাজারী ও বড়ুয়া  উপাধিতে ভূষিত করতেন ।
"বিজয়মাণিক্য রাজার জমিদার আমি,
সে রাজার বড়ুয়া হৈয়া রাজা হৈলা তুমি" । - (রাজমালা, ১২০ পৃঃ)
 
আরাকান বৌদ্ধরাজার নিকট আশ্রয় গ্রহণ ও ভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণ :
সাহিত্যসেবী দ্বিজেন্দ্র নাথ ঠাকুর তাঁর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে চৈত্র সংখ্যায় উল্লেখ করেন - "দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বৌদ্ধরা অমানুষিক নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করে মগধ সাম্রাজ্য পরিত্যাগ করে এদেশে আরাকান বৌদ্ধরাজার আশ্রয় গ্রহণ করে" । আরাকানী মগদের সঙ্গে বসবাস করার ফলে তাদের সাথে পরস্পর সৌহৃদ্যতা উঠে । এর ফলে বড়ুয়া বৌদ্ধদের মাঝেও মগানাম প্রচলিত হয় । যেমন - চাইলপ্রু বড়ুয়া, ছাদপ্রু বড়ুয়া, কেওজপ্রু বড়ুয়া ইত্যাদি । আবার সুদীর্ঘ কালের সম্পর্ক হেতু আজও বহু আরকানী শব্দ বাঙ্গালী বৌদ্ধ সমাজে মাতৃভাষারূপে ব্যবহৃত হচ্ছে । শব্দগুলি প্রায়ই ধর্মীয় সংস্কৃতি মূলক । যেমন - কেয়াং = বিহার, ফাং = নিমন্ত্রণ, ছোয়াইং = ভাত (পিণ্ডদান), থাগা = গৃহী উপাসক, কারেঙ্গা = সেবক, মইসাং = শ্রামণের, চনী = অস্থায়ী শ্রামণের, ছাদাং = ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত আরম্ভ ও পরিসমাপ্তির দিন, থাংথুং = স্তুপাকৃতি অন্ন, ঘেইং = ভিক্খু সীমা, ছাবাইক = ভিক্ষাপাত্র, চাঁই = চীবর, ফারিক = সূত্রপাঠ, ভং = বড় ঘন্টা, লোথক = ভিক্খু ধর্ম পরিত্যাগী গৃহী ইত্যাদি । পাশাপাশি, মুসলমান রাজত্বকালে মুসলমানদের সাথে সুদীর্ঘকাল মেলামেশার ফলে বড়ুয়া সমাজে বিভিন্ন ফরাসী শব্দও ঢুকে পড়ে । অদ্যাবধি এসব শব্দের "গোছল = স্নান; ঘরছালামী = বৈবাহিক অনুষ্ঠানে গৃহদেবতা, বয়ঃবৃদ্ধ-বৃদ্ধাদিগকে নমস্কার করা; পানছল্লা = নিমন্ত্রণ করার পূর্বে সুশৃঙ্খলতার সাথে কর্মপরিধি প্রণয়ন-আলোচনা করার সামাজিক বৈঠক" ইত্যাদির প্রচলন দেখা যায় । আরাকানী বৌদ্ধরা বাঙ্গালি বৌদ্ধদের ব্রহ্মভাষায় 'মার্মাগ্রী' (মার্মাগ্রী শব্দের অর্থ উচ্চ বংশীয় ক্ষত্রিয় বৌদ্ধ) বলে সম্বোধন করত । আবার এ রাজবংশের ক্ষত্রিয়গণ 'মগধ সাম্রাজ্য দেশাগত' বলে তাদের সংক্ষেপে 'মগ' নামেও অভিহিত করত । এর পক্ষে যুক্তি হচ্ছে - মগধ সাম্রাজ্য দেশাগত বড়ুয়াগণ (মগগণ) তাদের পৈতৃক দেশমাতার স্মৃতিকল্পে-স্মরণার্থে পাঁঠি বলি দিয়ে মগধেশ্বরীর সেবা-পূজা । ভিন্নরূপে হলেও অদ্যাবধি প্রায় বৌদ্ধগ্রামে এক একটি সেবা খোলা রয়েছে । উপাসনাকালে 'আয়রে মা মগধ রাজার ঝি' ইত্যাদি বলে নিঃসন্তানের সন্তান লাভ এবং ভূত-প্রেতাদি তাড়াবার মন্ত্র জপ করত । পাশাপাশি, এখনও বিভিন্ন বড়ুয়া বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকাকে 'মগ পাড়া' এবং বাজারকে 'মগের (মইগ্যের) হাট/বাজার' ইত্যাদি রূপে সম্বোধন শ্রুত-দৃষ্ট হয় ।
 
বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় সংষ্কৃতি-পূজা-উৎসব ফানুস উড়ানো বা আকাশ প্রদীপ প্রজ্বলনের দৃশ্য । রাজনন্দন গৌতম গৃহত্যাগের পর মস্তক মুণ্ডন করে সত্যক্রিয়া করতঃ চুল মাটিতে না পড়ে আকাশে উড়ে যায় । এবং আকাশবাসী দেবগণ চুলসমূহ গ্রহণ করে চুলামনি চৈত্য প্রতিস্থাপন করেন । বৌদ্ধগণ সেই চুলামনি চৈত্যের উদ্দেশ্যে প্রবারণা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে ফানুস উত্তোলনের মাধ্যমে পূজা করে থাকেন । কিন্তু বর্তমানে ফানুস অন্যান্য ধর্মাবলম্বী, ব্যক্তি, সংগঠন কর্তৃক ভিন্ন আদর্শ-উদ্দেশ্যে উড়াতে দেখা যায় । যেটি দৃশ্যত নয়নাভিরাম হলেও বৌদ্ধ সংস্কৃতি গ্রাস্যের উপসর্গ বলে মনেহয় ।
 
বাংলার নবার সায়েস্তা খান কর্তৃক আরাকান রাজার পরাজয় :
আরাকান রাজার রাজত্বকালে পর্তুগীজ বণিকেরা চট্টগ্রাম বাণিজ্য করার মধ্যদিয়ে এখানে বসতি স্থাপন করে । তারা নৌবিদ্যা বিশারদ বলে আরাকানরাজ তাদের নৌসৈন্যে ভর্তি করেন । ১৬৬৬ খৃষ্টাব্দে বাংলার নবার সায়েস্তা খান কর্তৃক সর্বশেষ আরকানরাজ পরাজিত হলে অধিকাংশ আরাকানী স্বদেশে চলে যায় । এবং যে কিছু সংখ্যক আরাকানী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন নি তাদের বংশধরগণ কক্সবাজার, রামু, নীলা, টেকনাফ, হারবাং প্রভৃতি স্থানে এবং বরিশাল ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় বসবাস করতেন । এ সময় চট্টগ্রামের পণ্ডিত বিহার সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং রাষ্ট্র বিপ্লবে বৌদ্ধগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তঃ আবার বৌদ্ধধর্মে পরিহানি চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে । তবে তদানীন্তন মুসলমান শাসনামলে অনেক বৌদ্ধদের উচ্চ রাজকর্মচারীর পদেও অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল ।
 
মুৎসুদ্দী-তালুকদার-চৌধুরী-শিকদার-সিংহ-হাজারী :
মুৎসুদ্দী -  যারা স্টেটের ম্যানেজার ছিলেন, তাদের পদবী ছিল মুৎসুদ্দী ।
তালুকদার - ভূমির রাজস্ব আদায়ের জন্য ভূমিখণ্ড তালুক ও তরফে বিভক্ত করা হল । যাদের তালুক (ভূ-সম্পত্তি) ছিল, তাদের পদবী ছিল তালুকদার ।
চৌধুরী -  এবং যাদের তরফ (জমিদারির অংশ) ছিল তারা হলেন তরফদার বা জমিদার । এই তরফদারের পদবী ছিল চৌধুরী বা ভূইঞা ।
শিকদার -  বিভাগীয় রাজস্ব আদায়কারী বলে শিকদার পদবী । এর অন্য অর্থ- সর্দার ।
সিংহ - ক্ষত্রিয় জাতির উপাধি ছিল সিং বা সিংহ । ক্ষত্রিয় শাক্যকুল তথাগত গৌতম বুদ্ধের প্রবর্তিত বৌদ্ধধর্মে ক্ষত্রিয়গণ শরণাগমন করলেও পূর্ব বংশগত ঐতিহ্য সিং বা সিংহ পরিত্যাগ না করায় বর্তমানেও বৌদ্ধদের মধ্যে সিং বা সিংহ পদবী পরিদৃষ্ট ।
হাজারী - এটি সামরিক বিভাগের পদবী । এক হাজার সৈন্যের অধিনায়ককে হাজারী পদবী/উপাধিতে ভূষিত করা হত । এই পদবীধারী বৌদ্ধ নোয়াখালীতে পরিদৃষ্ট হয় । এছাড়াও উত্তরবঙ্গের আদিবাসী বৌদ্ধদের মধ্যে টিকরি, কুজর, মিনজু, টোপোর বা টোপ্প, এক্কা, লাকড়া সহ বিভিন্ন পদবী বর্তমানে পরিদৃষ্ট হয় ।
 
রাউলী (রোলী) পুরোহিত ও বৌদ্ধধর্মের অন্ধকার যুগ :
কোন এক অশুভ সময়ে বৌদ্ধধর্মাচার্যদের মধ্যে বিবাহপ্রথা প্রচলিত হল, তা এখনও অজ্ঞাত । বাংলার প্রাচীন সাহিত্য আলোচনায় আউল, বাউলদের ন্যায় 'রাউল' নামে একটি পুরোহিত সম্প্রদায় 'গোর্থবিজয়' গ্রন্থেও পৃরিদৃষ্ট হয় । এসকল পুরোহিতেরা বৌদ্ধসমাজে লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতীপূজা, কার্তিকপূজা, শিবপূজা, শীলতাপূজা, শনিপূজা, অশ্বিনী কুমারদ্বয়ের (নাসত্য ও দস্র) ব্রত উপবাস, সত্যপীরাদির সিন্নিদান প্রথা প্রভৃতি অবৌদ্ধোচিত কার্যকলাপ এমনকি কালীপূজা, দুর্গাপূজা, মনসাপূজা প্রভৃতিতে পশুবলিও  নিজ হাতে সম্পাদন করত । পরবর্তীতে থেরবাদের সংস্পর্শে এসে তারা বিবাহ ও পশুবলি প্রথা ত্যাগ করলেন । কিন্তু এসকল রাউলী পুরোহিতেরা থেরবাদ ভিক্খু হতে দীক্ষা গ্রহণ করলেও সপ্তাহকাল দশশীল পালন করে, অতঃপর গৃহী হয়ে কাষায়বস্ত্র ঘরে রাখতেন এবং গৃহস্থালী সমস্ত কার্যাদি সম্পন্ন করতেন । আর ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় কাষায়বস্ত্র কণ্ঠে জড়িয়ে পৌরোহিত্য করতেন । পরবর্তীকালে ভিক্খুদের মধ্যে তিনটি শ্রেণী ছিল । যথা:
মাথে - নিমন্ত্রণে যাওয়ার সময় মাথেগণ বৃহৎ ছত্রধারণ করে যেতেন।
কামে - কামেগণ হুতুক পরিতেন ।
পাঞ্জাং - এবং পাঞ্জাংগণ মস্তক বস্ত্রাবৃত করে যেতেন ।
তাঁরা শ্রামণেরকে সীমায় নিয়ে কর্মবাক্য পাঠে উপসম্পদা দিতেন বটে, কিন্তু সীমা হতে বিহারে এসে দশশীল প্রদান করতেন । এ প্রেক্ষিতে এটা প্রতীয়মান যে, তদানীন্তন রাউলী পুরোহিতদের কারো থেরবাদ উপসম্পদা ছিল না । এতটুকু বলা যায়, তাঁরা ছিলেন দশশীলধারী শ্রামণের মাত্র ।
 
সংঘরাজ সারমেধ এবং থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের পুনরুত্থান :
রাউলীদের পাশাপাশি ওঝা-বৈদ্যের প্রভাবে সমগ্র বৌদ্ধ সমাজের উপর নেমে আসে এক চরম বিপর্যয় । বৌদ্ধদের এমন তমসাচ্ছন্ন সন্ধিক্ষণে দেবদূতের মতো সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরো’র আবির্ভাবে বাংলার মাটিতে সদ্ধর্মের পুনরুত্থান ঘটে । সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরো চকরিয়ার হারবাং গ্রামে এক রাখাইন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । বিভিন্ন গ্রন্থে, সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরো আরাকান রাজ পরিবারের বংশধর হিসেবে পরিদৃষ্ট হয় । শৈশবে তিনি আরাকানে গমন করে থেরবাদ বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়ে ত্রিপিটক শাস্ত্রের অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করার পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি সদ্ধর্মের আলোক মশাল ধারণ করে সমগ্র বৌদ্ধ সমজের তান্ত্রিক মতের অসারতা এরং দেব-দেবীর পূজা, পশুবলির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান । যার ফলে বৌদ্ধ সমাজ থেকে ধীরে ধীরে অন্ধ কুসংস্কার তিরোহিত হতে থাকে । পূণ্যশীলা চাকমা রাণী কালিন্দী সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরো’র সদ্ধর্ম দেশনায় আকৃষ্ট হয়ে ‘থেরবাদ বৌদ্ধধর্মে’ দীক্ষিত হন । সারমেধ মহাথেরো'র ধর্মাচরণে ও বিনীত ব্যবহারে রাণী কালিন্দী এতই শ্রদ্ধা সম্পন্ন হন যে, তিনি ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দে ‘রাজ পুণ্যাহ’ উপলক্ষে মহা সমারোহে আরাকানী ভাষায় উপাধি যুক্ত সীলমোহর প্রদানের দ্বারা গুরুর প্রতি অকৃত্রিম সন্মাননা জ্ঞাপন করেন ।
 
বাংলায় থেরবাদ ভিক্খুসংঘ পুনঃ প্রতিষ্ঠা :
১৮৬৪ খৃষ্টাব্দে সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরো  চট্টগ্রামে মহামুনির পূর্ব পার্শ্বে হাঞ্চরঘোনা নামক এক পার্বত্য ছড়ায় প্রথম বিনয় সম্মত উপসম্পদার আয়োজন করেন । এতে সাতজন রাউলী পুরোহিত "পাহাড়তলী গ্রামের জ্ঞানালঙ্কার মহাথেরো (প্রকাশ লালমোহন ঠাকুর) ও কমল ঠাকুর, ধর্মপুরের হরিঠাকুর, মির্জাপুরের সুখচাঁন ঠাকুর, গুমানমর্দনের দুরাজ ঠাকুর, দমদমার অভয় শরণ ঠাকুর, বিনাজুরীর হরি ঠাকুর" থেরবাদ সম্মতভাবে উপসম্পদা গ্রহণ করেন । এঁদের উপসম্পদা গ্রহণের মাধ্যমে বাংলার থেরবাদ বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয় । সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরো’র প্রতিষ্ঠিত ভিক্ষু সংঘকে কেন্দ্র করে এদেশের মাটিতে যুগে যুগে জন্ম গ্রহণ করে অনেক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ । তাঁদের পূণ্য হস্ত স্পর্শে গড়ে উঠে বহু জন হিতকর প্রতিষ্ঠান এবং অনেক ভিক্খু সশিষ্যে মহাযানী ও তন্ত্রযানী মতবাদ বাংলাদেশ হতে অন্তর্হিত হবার মধ্যদিয়ে থেরবাদ বা হীনযান মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হল ।
 
 
আলোর মাঝেও অন্ধকার :
বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজে বিনয় বহির্ভূত বহু অবৌদ্ধচিত প্রথা ছিল যা পূর্বোক্ত আলোচনায় পরিদৃষ্ট । অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সংঘরাজ পণ্ডিত প্রবর বিনয়ধর সারমেধ মহাথেরো'র নেতৃত্বে ১৮৬৪ খৃষ্টাব্দে বিনয় সম্মত নতুন উপসম্পদা প্রদানে এদেশে থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে । নতুন উপসম্পন্ন ভিক্খুসংঘের নাম হল 'সংঘরাজ নিকায়' এবং রাজগুরু সারমেধ মহাথেরো হলেন এ সংঘরাজ নিকায়ের প্রথম সংঘরাজ । সংঘরাজ নিকায় প্রতিষ্ঠার পর তিনি আরাকানে প্রত্যাবর্তন করেন । এদিকে যেসকল ভিক্খু-রাউলী-মাথে প্রভাব-প্রতিপত্তি-বর্ষাবাস অক্ষুন্ন রাখার জন্য বিনয়সম্মতভাবে সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরো'র নেতৃত্বে পুনরায় উপসম্পদা গ্রহণের সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করে পৃথক রয়ে গেলেন । সে সকল ভিক্খুসংঘের নাম হল 'মাথের দল বা মহাস্থবির নিকায়' । আর সেই হতে নিকায়ভেদের বিষবৃক্ষ অদ্যাবধি বৌদ্ধ সমাজে বিষফল প্রদান করে চলেছে !
 
সংঘরাজ নিকায়ের সংঘরাজগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :
১) ১ম সংঘরাজ শ্রীমৎ সারমেধ মহাথেরো (শাসন কাল: ১৮৬৪-১৮৭৭ খৃ:) জন্মস্থান- চকরিয়া থানার হারবাং ।
২) ২য় সংঘরাজ শ্রীমৎ পূর্ণাচার মহাথেরো (শাসন কাল: ১৮৭৭-১৯০৮ খৃ:) জন্মস্থান- পটিয়া থানার উনাইনপূরা ।
৩) ৩য় সংঘরাজ শ্রীমৎ জ্ঞানালংকার মহাথেরো (শাসন কাল: ১৯০৮-১৯২৭ খৃ:) জন্মস্থান- রাউজান থানার পাহাড়তলী ।
৪) ৪র্থ সংঘরাজ শ্রীমৎ বরজ্ঞান মহাথেরো (শাসন কাল: ১৯২৭-১৯৩৬ খৃ:) জন্মস্থান- রাউজান থানার গহিরা ।
৫) ৫ম সংঘরাজ শ্রীমৎ তেজবন্ত মহাথেরো (শাসন কাল: ১৯৩৬-১৯৪২ খৃ:) জন্মস্থান- চন্দনাইশ থানার সাতবাড়িয়া ।
৬) ৬ষ্ঠ সংঘরাজ শ্রীমৎ ধর্মানন্দ মহাথেরো (শাসন কাল: ১৯৪২-১৯৫৭ খৃ:) জন্মস্থান- হাটহাজারী থানার মির্জাপুর ।
৭) ৭ম সংঘরাজ শ্রীমৎ অভয়তিষ্য মহাথেরো (শাসন কাল: ১৯৫৭-১৯৭৫ খৃ:) জন্মস্থান- বাঁশখালী থানার মিজরীতলা ।
৮) ৮ম সংঘরাজ শ্রীমৎ শীলালংকার মহাথেরো (শাসন কাল: (১৯৭৫-২০০০ খৃ:) জন্মস্থান- ফটিকছড়ি থানার নানুপুর ।
৯) ৯ম সংঘরাজ শ্রীমৎ নাগসেন মহাস্থবির (মরণোত্তর সংঘরাজ) জন্মস্থান- বাঁশখালী থানার শীলকূপ ।
১০) ১০ম সংঘরাজ শ্রীমৎ জ্যোতিঃপাল মহাথেরো (শাসন কাল: ২০০০-২০০৩ খৃ:) জন্মস্থান- লাকসাম থানার বড়ইগাও ।
১১) ১১শ সংঘরাজ শ্রীমৎ শাসনশ্রী মহাথেরো (শাসন কাল: ২০০৩-২০০৪ খৃ:) জন্মস্থান- বাঁশখালীর মিজরীতলা ।
১২) ১২শ সংঘরাজ শ্রীমৎ ধর্মসেন মহাথেরো (শাসন কাল: ২০০৪ খৃ: -চলমান) জন্মস্থান- পটিয়া থানার উনাইনপুরা ।
 
 
মহাস্থবির নিকায়ের সংঘনায়কগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :
১) ১ম সংঘনায়ক শ্রীমৎ চাইন্দা মহাস্থবির, কদলপুর বা মহামুনি পাহাড়তলী, রাউজান ।
২) ২য় সংঘনায়ক শ্রীমৎ নাইন্দা মহাস্থবির, আবুরখীল, রাউজান ।
৩) ৩য় সংনায়ক শ্রীমৎ অভয়চান মহাস্থবির (অঙচান মহাস্থবির), হোয়ারাপাড়া, রাউজান ।
৪) ৪র্থ সংঘনায়ক শ্রীমৎ কঙলা মহাস্থবির, হোয়ারাপাড়া, রাউজান ।
৫) ৫ম সংঘনায়ক শ্রীমৎ সুরিয়া মহাস্থবির, নোয়াপাড়া, বৈদ্যপাড়া, রাউজান ।
৬) ৬ষ্ঠ সংঘনায়ক শ্রীমৎ অঙখা মহাস্থবির, হোয়ারাপাড়া, রাউজান ।
৭) ৭ম সংঘনায়ক শ্রীমৎ লোহান মহাস্থবির, হোয়ারাপাড়া, রাউজান ।
৮) ৮ম সংঘনায়ক শ্রীমৎ ঝালা মহাস্থবির, হোয়ারাপাড়া, রাউজান ।
৯) ৯ম সংঘনায়ক শ্রীমৎ রাধাচরণ মহাস্থবির (রাধু মহাস্থবির- ১৮০১-১৮৮৩), বৈদ্যপাড়া, বোয়ালখালী ।
১০) ১০ম সংঘনায়ক শ্রীমৎ রামদাস মহাস্থবির, নোয়াপাড়া, বৈদ্যপাড়া, রাউজান ।
১১) ১১শ সংঘনায়ক শ্রীমৎ তিতন মহাস্থবির (ত্রিরত্ন মহাস্থবির), নোয়াপাড়া, বৈদ্যপাড়া, রাউজান ।
১২) ১২শ সংঘনায়ক শ্রীমৎ কেশরী মহাস্থবির, মধ্যম আঁধারমানিক, রাউজান ।
১৩) ১৩শ সংঘনায়ক শ্রীমৎ পঞ্ঞাসার মহাস্থবির (ক্ষেত্রমোহন মহাস্থবির), বিনাজুরি, রাউজান ।
১৪) ১৪শ সংঘনায়ক শ্রীমৎ অভয়াচরণ মহাস্থবির, লাখেরা, পটিয়া ।
১৫) ১৫শ সংঘনায়ক শ্রীমৎ অমরচাঁন মহাস্থবির, পাঁচখাইন, রাউজান ।
১৬) ১৬শ সংঘনায়ক শ্রীমৎ রামধন মহাস্থবির, শাকপুরা, বোয়ালখালী ।
১৭) ১৭শ সংঘনায়ক শ্রীমৎ দ্যুবরাজ মহাস্থবির, আবুরখীল, রাউজান ।
১৮) ১৮শ সংঘনায়ক শ্রীমৎ অগ্রসার মহাস্থবির, হোয়ারাপাড়া, রাউজান ।
১৯) ১৯শ সংঘনায়ক শ্রীমৎ জয়সুমন মহাস্থবির, নোয়াপাড়া বৈদ্যপাড়া, রাউজান ।
২০) ২০তম সংঘনায়ক শ্রীমৎ সুমনতিষ্য মহাস্থবির (শশী মহাস্থবির), পাঁচখাইন, রাউজান ।
২১) ২১তম সংঘনায়ক শ্রীমৎ প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির, পশ্চিম আঁধারমানিক, রাউজান ।
২২) ২২তম সংঘনায়ক শ্রীমৎ চন্দ্রজ্যোতি মহাস্থবির (পূর্ণ মহাস্থবির), খৈয়াখালী, রাউজান ।
২৩) ২৩তম সংঘনায়ক শ্রীমৎ ধর্মদর্শী মহাস্থবির, শাকপুরা, বোয়ালখালী ।
অন্তবর্তীকালীন সংঘনায়ক শ্রীমৎ ধর্মপাল মহাথের, আবুরখীল, রাউজান ।
২৪) ২৪তম সংঘনায়ক শ্রীমৎ বিশুদ্ধানন্দ মহাথের, হোয়ারাপাড়া, রাউজান ।
২৫) ২৫তম সংঘনায়ক শ্রীমৎ জ্ঞানলোক মহাথের, পশ্চিম আঁধারমানিক, রাউজান ।
২৮) ২৬তম সংঘনায়ক শ্রীমৎ প্রিয়ানন্দ মহাথের, হোয়ারাপাড়া, রাউজান ।
২৭) ২৭তম সংঘনায়ক শ্রীমৎ এস ধর্মপাল মহাথের, পিংগলা, পটিয়া ।
২৮) ২৮তম সংঘনায়ক শ্রীমৎ শুদ্ধানন্দ মহাথের, পদুয়া, রাঙ্গুনিয়া ।
 
 
পরিশিষ্ট :
বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় বৌদ্ধধর্মের আধিপত্যের যুগ । উত্তর ও মধ্য ভারতে লাখ লাখ বৌদ্ধ নিধনের প্রেক্ষাপটে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সেখান থেকে এই বাংলায় সরে আসতে বাধ্য হন । এভাবেই এই বাংলায় সূচনা হয় বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগের । প্রায় হাজার বছর এই বাংলাদেশ ছিল সারা পৃথিবীর বৌদ্ধধর্মের পুণ্যতীর্থ । ময়নামতী, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় প্রভৃতি সে ইতিহাস ধারণ করে আছে । সবদিক বিবেচনায় বাংলায় বৌদ্ধ, বৌদ্ধধর্মের অবদান শীর্ষস্থানীয় । আর বাংলার মাটির নিচে আজও লুকিয়ে রয়েছে বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য; লুকিয়ে রয়েছে বাংলার অমূল্য সম্পদ । তদুপরিও বাংলাদেশী বৌদ্ধদের উপর নির্যাতন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নিয়ত বিরাজমান । পাক-ভারত উপমহাদেশ থেকে বৃটিশ সাম্রজ্যবাদ আন্দোলন-সংগ্রামের মুখে বিদায় নেয়ার সময় সুকৌশলে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে । হিন্দু প্রধান অঞ্চলকে ভারত ও মুসলমান প্রধান অঞ্চলকে পাকিস্থান নামক রাষ্ট্রে বিভক্ত করে । পাকিস্থান রাষ্ট্রে পূর্ব পাকিস্থান তথা পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্থান অংশে বিভক্ত করে । সেসময় পার্বত্য অঞ্চলে ৯৮% অমুসলিম (বৌদ্ধ, হিন্দু এবং খ্রিষ্টান) ছিল যাদের সিংহ ভাগই বৌদ্ধ । কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে বহিরাগত বাঙ্গালিদের অবস্থান, জমি দখল, নির্যাতনের মধ্যদিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পার্বত্য অঞ্চলে ৬% মুসলিম এবং ২০১১ সালে তা বেড়ে  ৬৫% হয় ! আদিবাসী নিধনে ১৯৮০-৯০ সালে তেরটি গনহত্যায় প্রায় ১৫০০০ আদিবাসী মারা যায় আর প্রায় ৭০০০০ দেশান্তর হয় । পাশাপাশি রাজনৈতিক ডামাডোলে খ্রিস্টান মিশনারিরা সাধারণ মানুষের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত । এভাবে পর্যায়ক্রমে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে আদিবাসী হতে উপজাতি, উপজাতি হতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিতে এসে ঠেকেছে ।
 
বিগত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রামু এবং আশাপাশের বৌদ্ধ এলাকায় ঘটে যায় বৌদ্ধদের উপর স্মরণকালের শ্রেষ্ট আরেকটি সহিংসতা । ১১টি বৌদ্ধমন্দির ও অর্ধশত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় । ভাংচুর করা হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি  বৌদ্ধমন্দির এবং শতাধিক বসতঘর । ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া এবং চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার লাখেরা, কোলাগাঁও গ্রামে দিনের আলোয় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির মধ্যদিয়ে স্পষ্ট হয় যে, এটা একটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা । উত্তম বড়ুয়ার ফেসবুকে অন্যের ট্যাগ করা ছবিটি নিছক  ইস্যু । পুনঃপুনঃ বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ধ্বংসের এ হীন কর্মকাণ্ড-অপসংস্কৃতির মধ্যে ধর্মান্ধ মানুষের ধর্মীয় বিজয় সফল হলেও লজ্জিত হয় মানবতা, পরাজিত হয় সভ্যতা, শৃঙ্খলিত হয় শিক্ষা, সুদূর পরাহত হয় সম্প্রীতির মেলবন্ধন;  পাশাপাশি মানুষ বিচার-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনাকে শৃঙ্খলিত করে মনুষ্যত্ব হারিয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে পশুতে ।
 
বিশ্বমাঝে শান্তির বাতাবরণ প্রবাহিত হোক এবং মৈত্রীপ্রেমে হিংসাত্মক-ধ্বংসাত্মক সকল অপসংস্কৃতি ভুলে সম্প্রীতির বন্ধনে জাগ্রত হোক পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ-ভালবাসা  । পরিশেষে,  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৃথিবীর এই হিংসা-বিক্ষুদ্ধ অবস্থা দেখে বুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে যে কবিতা লিখেছিলেন তা আবৃত্তির মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে বৌদ্ধদের ইতিহাস সম্পর্কে আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াসের ইতি টানলাম -
হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী হেথা নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব,
হেথা ঘোর কুটিল পন্থ তার লোভ জটিল বন্ধ ।
নতুন তব জনম লাগি কাতর যত প্রাণী
কর ত্রাণ মহাপ্রাণ, আনো অমৃত বাণী ।
বিকশিত করো প্রেম পদ্ম চিরমর্ধ নিস্যন্দ
শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্ত পুণ্য ।
করুণাঘন ধরণীতল কর কলংকশূন্য ।
 
তথ্যসূত্র :

সদ্ধর্মের পুনরুত্থান - ধর্মাধার মহাস্থবির, চট্টগ্রামের বৌদ্ধ জাতির ইতিহাস - নূতন চন্দ্র বড়ুয়া, বাঙালি বৌদ্ধদের ইতিহাস ধর্ম ও সংস্কৃতি - ড. দীপংকর শ্রীজ্ঞান বড়ুয়া, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট - সুনীল চট্টোপাধ্যায়, চট্টগ্রামের ইতিহাস - পূর্ণচন্দ্র চৌধুরী, বাংলার বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি - শিমুল বড়ুয়া, oshoworld.com, ধম্মইনফো, উইকিপিডিয়া ইত্যাদি ।
 
বিশেষ দ্রষ্টব্য : এ প্রবন্ধটি রচনায় তথ্য নির্ভর বিভিন্ন গ্রন্থের পাশাপাশি বিজ্ঞ লেখকগণের বিভিন্ন প্রবন্ধ, বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সাহায্য নিয়েছি । সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এবং বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি ড. দীপংকর শ্রীজ্ঞান বড়ুয়া, ড. অমর কান্তি চাকমা, ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, সালাহউদ্দীন আহমদ, ড. মনিরুজ্জামান, মোঃ মহিউদ্দিন মজুমদার মাসুম,  রাজীব কান্তি বড়ুয়া, গৌতম ব্যানার্জী, অনির্বাণ বড়ুয়া, রক্তিম বড়ুয়া প্রমুখ । উল্লেখ্য যে, ইতিহাস সম্পর্কে লেখা অনেকটা কঠিন । তদুপরি তথ্যগত বেশ কিছু ভ্রান্তি-জটিলতায়ও ভুগতে হয় । তাই তথ্যগত যদি কোনরূপ ভুল-ত্রুটি আপনাদের দৃষ্ট হয় তা মৈত্রীর সাথে জানাবেন এবং আমার অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি নিজগুণে শুদ্ধ তথা ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন । ধন্যবাদ সকলকে ।

Additional Info

  • Image: Image