২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বুধবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 21 মার্চ 2014 03:30

পাল যুগে বৌদ্ধ বিহার কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা

লিখেছেনঃ মো. আবু সালেহ সেকেন্দার

পাল যুগে বৌদ্ধ বিহার কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা  

পাল আমলে বাংলার বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। পাল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠলেও মূলত এখানে চর্চা হয়েছে দর্শন ও বিজ্ঞানের। প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আদলে তৈরি করা বিহার নামে পরিচিত এসব বৌদ্ধ মঠই প্রাচীন বাংলার শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। বৌদ্ধ ধর্মের শাস্ত্রীয় শিক্ষার পাশাপাশি এখানে ব্যাকরণ, শব্দবিদ্যা, হেতুবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, চর্তুবেদ, সংখ্যা, সংগীত ও চিত্রকলা শিক্ষা দেওয়া হতো। এ ছাড়া এসব বিহারকেন্দ্রিক শিক্ষায়তনে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা মহাযান শাস্ত্র, অষ্টাদশ নিকায়বাদ, যোগ শাস্ত্র, জোর্তিবিদ্যা, তন্ত্রাবলিবিধি, সহজগীতি এবং চিত্ত-চৈতন্য প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করত।

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি

বৌদ্ধদের আগমনের আগে বাংলাতে ব্রাহ্মাণ্য শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। গুপ্ত শাসনামলে শাসকদের সহযোগিতায় বৌদ্ধ ধর্ম ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার জন্য বিহারকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে। পাল শাসকদের সময় এ শিক্ষাব্যবস্থা স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে। এ শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাজীবন শুরু হতো প্রব্রজ্যা গ্রহণের মাধ্যমে। বৌদ্ধ ধর্মের জাত বিচার না থাকায় যেকোনো ধর্মের লোকই প্রব্রজ্যা লাভ করতে পারত। শ্রমণ বা শিক্ষার্থীকে ১০ জন ভিক্ষু নিয়ে গঠিত একটি পরিষদ প্রব্রজ্যা দান করতেন। শিক্ষার্থী প্রব্রজ্যা লাভের পর গুরুকে প্রণাম করে জোড়হাতে বলত 'বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধর্মং শরণং গচ্ছামি।' একে বলা হতো ত্রিশরণ। প্রব্রজ্যা লাভের পর থেকেই শিক্ষা শুরু হতো। প্রব্রজ্যার সময়কাল ছিল ১২ বছর। প্রব্রজ্যার ২০ বছর বয়স হওয়ার পর যদি উপযুক্ত বিবেচিত হতো তবে তাকে উপসম্পাদ দেওয়া হতো। ১০ বছর উপসম্পাদ জীবন অতিবাহিত করার পর সে উপাধ্যায় হতে পারত।

বিহারগুলোতে শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল প্রধানত মৌখিক। যদিও এই সময় লিপির প্রচলন ছিল তবুও পাঠদানের ক্ষেত্রে লিপির ব্যবহার সীমিত ছিল। ছাত্রছাত্রীরা বুদ্ধদেব আলোচনা, উপদেশমূলক গল্প, উপকথার সাহায্যে শিক্ষা লাভ করত। বিহারের আচার্য ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষাদানের পুরো সময় থাকতেন এবং বিতর্কের ভঙ্গিতে শিক্ষা দিতেন। সংঘের জীবনযাত্রা কঠোর ছিল, কিন্তু একেবারে নিরস ছিল না। সংঘে তীরছোড়া, অস্ত্র চালানো, হাতি, ঘোড়া, রথ চালানো, কুস্তি, তরবারি চালানো শিক্ষা দেওয়া হতো। এ ছাড়া ভেপু বাজানো, পাশা খেলা, অঙ্গভঙ্গি নকল করা প্রভৃতি আমোদ-প্রমোদেরও ব্যবস্থা ছিল। মেয়েদের সঙ্গে নাচার ও গাইবার প্রথাও অনুমোদিত ছিল বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়।

এ যুগের বিহারকেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাসমাপনী অনুষ্ঠানেরও প্রচলন ছিল। এসব শিক্ষাসমাপনী অনুষ্ঠান বা সমাবর্তনের মাধ্যমে গুরুগৃহ বা বিহার বাসের সমাপ্তি ঘটত। পাঠ শেষ করে ছাত্রছাত্রীরা সাধ্যমতো গুরুদক্ষিণা দিয়ে নিজগৃহে ফিরে যেত। এসব শিক্ষার্থীকে পাঠ শেষে 'স্নাতক' উপাধি প্রদান করা হতো। বস্তুত, শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটত সমাবর্তনের মাধ্যমে।

এ যুগে নারীদেরও শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ ছিল। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ নারীদেরও শিক্ষা প্রদানের পক্ষে ছিলেন। এ জন্য তাঁর অনুসারী শাসকদের সময় গড়ে ওঠা এসব বিহারে নারীরা জ্ঞানার্জন করতে পারত। তবে সংঘে নারী শিক্ষার্থীদের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যে থাকতে হতো।

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক

পালযুগে বিহারগুলোতে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের মতো। শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণের জন্য একজন উপাধ্যায়কে বেছে নিত। এ ক্ষেত্রে একজন ছাত্রছাত্রী উত্তরীয় দিয়ে কাঁধ আবৃত করে উপাধ্যায়কে যুক্ত করে তিনবার বলত 'প্রভু আমার উপাধ্যায় হোন'। অতঃপর উপাধ্যায় সম্মতি প্রকাশ করলে উভয়ের মধ্যে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক স্থাপিত হতো। গুরুর আদেশে শিক্ষার্থী ভিক্ষায় যেত। গুরুর অনুমতি ব্যতিত ছাত্রছাত্রীরা কোনো উপহার গ্রহণ করতে পারত না। গুরু অসুস্থ্য হলে শিষ্যকে সর্বপ্রকার সেবা করতে হতো। গুরুর মানসিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় শিষ্যকে সবকিছু করতে হতো। এমনকি গুরু কোনো অপরাধ করলে তার প্রায়শ্চিত্ত করে গুরুকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বও ছাত্রের ছিল। তবে গুরুরও শিষ্যের প্রতি কতিপয় কর্তব্য ছিল। শিষ্যের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবন গঠনের মূল দায়িত্ব ছিল গুরুর ওপর। তিনি ত্রিপিটক থেকে ছাত্রদের মূল্যবান উপদেশ ও পরামর্শ প্রদান করতেন। শিষ্য অসুস্থ হলে গুরু তার পরিচর্যা করতেন। বস্তুত ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

বিহারে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক। তাদের খাওয়া-দাওয়া এবং হাত খরচও বিহার থেকে দেওয়া হতো। এই ব্যয়ভার বহনের জন্য বিহারের নিজস্ব তহবিল ছিল। এই তহবিল প্রধানত শাসকের অনুগ্রহ এবং কোনো ধনীব্যক্তি প্রদত্ত অর্থ ও জমি যা বিহারের নামে দান করা হয়েছিল, তা থেকে আসত। ভালো ফলাফলের জন্য বিহার থেকে ছাত্রকে উপাধিপত্র প্রদান করার রীতি প্রচলিত ছিল।

পালযুগে যেসব বিহার জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিক্ষাদীক্ষার বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল বিক্রমপুরী বিহার, জগদ্দল মহাবিহার, ত্রৈকূট বিহার, দেবীকোট বিহার, পণ্ডিত বিহার, সন্নগর বিহার, ফুলি্লহরি বিহার, পট্রিকেরক বিহার, হলুদ বিহার, কনকস্তূপ বিহার, সুবর্ণ বিহার, সোমপুর বিহার ইত্যাদি। এসব বিহারে পণ্ডিতরা শিষ্যদের পাঠদানের পাশাপাশি গ্রন্থ রচনা করতেন। যে মহাবিহারে বসে বৌদ্ধ আচার্যরা অগণিত গ্রন্থাদি রচনা করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে নালন্দা, ওদন্তপুরী ও বিক্রমশীল ছাড়া প্রত্যেকটি মহাবিহারই ছিল বর্তমান বাংলাদেশে। মধ্যমকরত্নপ্রদীপ গ্রন্থের অনুবাদক ও বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর, মহাপণ্ডিতাচার্য বোদিভদ্র, কালমহাপদ, বীরেন্দ্র, করুণাশ্রীমিত্র, দানশীল, ধর্মাকার, শুভাকর গুপ্ত প্রমুখ পণ্ডিতের পদচারণে এ বিহারগুলো সদা জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত ছিল।

সমকালীন বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা এত উন্নত ছিল যে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও শিক্ষাগ্রহণের জন্য বাংলায় আসত। তিব্বত, জাভা, সুমাত্রা, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এ বিহারগুলোতে বাংলার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একত্রে বিদ্যার্জন করত। বিদেশি ছাত্রদের পাশাপাশি পণ্ডিতরাও আগমন করতেন। এ ছাড়া বাংলার পণ্ডিতদের খ্যাতি এমন জগদ্বিখ্যাত ছিল যে তাঁদের বিভিন্ন দেশের বিদ্যাপীঠগুলোতে বক্তৃতা প্রদান করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বস্তুত, পালযুগে বাংলায় যে বিহারকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা সমকালীন মানুষের জীবনকে শুদ্ধ ও সহজবোধ্য করতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।

Additional Info

  • Image: Image