২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১২ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ সোমবার, ২৬ জুন ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 06 মার্চ 2014 02:12

হাজার বছরের বাংলা-৩: বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম ও পাল বংশের কুলজি

লিখেছেনঃ মো. আবুসালেহ সেকেন্দার

হাজার বছরের বাংলা-৩ : বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম ও পাল বংশের কুলজি

বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম
রাজা গোপাল বৌদ্ধ ছিলেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন_এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে গোপালের পিতা-পিতামহ বৌদ্ধ ছিলেন কি না এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তিব্বতীয় গ্রন্থ থেকে জানা যায়, গোপাল নালন্দায় একটি বৌদ্ধবিহার এবং আরো অনেক বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। ভারতের অন্যান্য জায়গায় যখন বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব পড়তির দিকে, তখনো বাংলাদেশ ও বিহারে পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্মের উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল। গোপাল নিজে বৌদ্ধ হলেও তাঁর রাজসভায় হিন্দুধর্মাবলম্বীদের প্রভাব বেশি ছিল।

পাল বংশের কুলজি
এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে গোপালের আবির্ভাব একটি বড় অধ্যায়। এ অঞ্চলে গণতন্ত্রচর্চার শুরু হিসেবে গোপালের ক্ষমতারোহণ অনেকেই চিহ্নিত করেন। কিন্তু গোপালের বংশ পরিচয় সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। রামচরিত কাব্যে বরেন্দ্রভূমি পাল রাজাদের জনকভু অর্থাৎ পিতৃভূমি বলে বর্ণিত হয়েছে। এ তথ্য থেকে অনুমান করা যায়, গোপাল বরেন্দ্রর অধিবাসী ছিলেন। পাল রাজাদের তাম্রশাসনে বলা হয়েছে, গোপালের পিতামহ দয়িতবিষ্ণু সর্ববিদ্যায় বিশুদ্ধ ছিলেন এবং গোপালের বাবা শত্রুর দমন এবং বিপুল কীর্তিকলাপে সসাগরা বসুন্ধরাকে ভূষিত করেছিলেন। সুতরাং গোপাল কোনো সামন্ত কিংবা রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয় না। তাঁর বাবা যুদ্ধ ব্যবসায়ী ছিলেন এবং গোপালও সম্ভবত বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রবীণ ও সুনিপুণ যোদ্ধা বলে পরিচিত হয়েছিলেন। অনেক পণ্ডিত গোপালের ছেলে ধর্মপালের সমসাময়িক একটি গ্রন্থে 'রাজভটাদি বংশ পতিত'-এর ব্যাখ্যায় মনে করেন, গোপাল খৰ বংশীয় রাজাভটের বংশধর।

'পাগ্ সাম্ জাং' নামের তিব্বতীয় গ্রন্থ, গুজরাটের কবি সোড্ঢলের 'উদয়সুন্দরী কথা' চম্পুকাব্যে এবং তৃতীয় বিগ্রহ পালের মন্ত্রী বৈদ্যদেবের কমৌলি তাম্রশাসনে পাল রাজাদের 'সূর্যবংশীয়' বলা হয়েছে। অন্যদিকে সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত 'রামচরিত' এ গোপালের ছেলে ধর্মপালকে 'সমুদ্রকূলদীপ' অর্থাৎ সমুদ্র বংশোদ্ভূত বলা হয়েছে। আবার রামচরিত কাব্যের প্রথম সর্গের সপ্তদশ শ্লোকের টীকায় তাঁদের 'ক্ষত্রিয়' বলা হয়েছে। রাষ্ট্রকূট ও কলচুরি বংশীয় রাজাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধও পালদের ক্ষত্রীয় বংশে জন্ম সমর্থন করে। তিব্বতীয় লামা তারনাথ বলেন, 'রাজা গোপাল এবং বৃক্ষ দেবতার ঔরসে ক্ষত্রিয় রমণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তবে নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, পাল বংশের শাসকরা উচ্চ বংশের ছিলেন না।' আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্পে পালদের দাসজীবী অর্থাৎ নিম্নজাতি বলা হয়েছে। আবুল ফজলের মতে, পাল রাজারা ছিল 'কায়স্থ'। রমেশচন্দ্র মজুমদার ওপরের মতবাদগুলোর বিরোধিতা করে বলেন, গোপাল পুণ্ড্রবর্ধননিবাসী এক ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরে ভঙ্গল অর্থাৎ বাঙাল বা বঙ্গদেশের রাজা নির্বাচিত হন। বস্তুত প্রথম মহীপালের বানগড় তাম্রলিপিতে যে রাজ্যম পিত্র্যমের উল্লেখ আছে, তা উত্তরবঙ্গ বলে মনে হয় অর্থাৎ উত্তরবঙ্গ পাল বংশের বা গোপালের আদি বাসস্থান ছিল এবং এ অঞ্চলেই তারা প্রথম ক্ষমতা বিস্তার করেছিল।

পরিশেষে বলা যায়, পাল রাজারা বাংলার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চল জয় করেন এবং গৌড়ে সুদীর্ঘ ৪০০ বছর রাজত্ব করেন। তবে পাল বংশের প্রথম শাসক গোপালের রাজ্যকাল সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু জানা যায় না। তারনাথের মতে, 'তিনি ৪৫ বছর এবং আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্প অনুসারে ২৭ বছর রাজত্ব করেন এবং ৮০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।' বাংলাপিডিয়াতে বলা হয়েছে, 'আনুমানিক ৭৫৬ থেকে ৭৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২৫ বছর তিনি শাসন করেন। সার্বিক অবস্থা ও তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে বলা যায়, এ ক্ষেত্রে রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতোই গ্রহণযোগ্য। তাঁর মতে, 'গোপাল ৭৪০ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজা নির্বাচিত হন এবং আনুমানিক ৭৭০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মহারাজাধিরাজ গোপালের মৃত্যুর পর শুরু হয় প্রাচীন বাংলা গ্রন্থ 'ধর্মমঙ্গলের' অন্যতম চরিত্র ধর্ম পালের যুগ।

কৃতজ্ঞতাঃ দৈনিক কালের কন্ঠ

Additional Info

  • Image: Image