২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৬ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
বুধবার, 08 জুন 2016 00:53

রামু এখন আরো দর্শনীয়, বাড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়

লিখেছেনঃ সুনীল বড়ুয়া, রামু

রামু এখন আরো দর্শনীয়, বাড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়

প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনের পাশাপাশি আধুনিক স্থাপত্য শৈলীতে তৈরী নতুন নতুন বৌদ্ধ বিহার নিয়ে রামু এখন হয়ে ওঠেছে আরো বেশী দর্শনীয় স্থান। তাই কক্সবাজারের পাশাপাশি পর্যটকদের ভীড় বেড়েছে রামুতেও। এবারের ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার ভ্রমণে আসা পর্যটকেরা ভ্রমণে বৈচিত্রতা পেতে ছুঠে এসেছিল রামুতে।

রামু যেতে হলে কক্সবাজার আসার পথে রামু বাইপাসে আপনাকে নামতে হবে। ওখানেই রাস্তার দু’পাশে সারি সারি ঝাউগাছ রামুর হয়ে আপনাকে স্বাগত জানাবে । অবশ্য কক্সবাজার থেকেও গাড়ীতে ১৫ কিলোমিটার দূরের রামুতে আসা যায় যখন–তখন। থাকার জন্য হোটেল আর সরকারী ডাকবাংলোও আছে। তবে ভাল হয় কক্সবাজারের কোথাও থাকলে। প্রশ্ন হচ্ছে, রামুতে দেখার মত আছে কী কী ?

রামুর পোড়া মাটিতে আধুনিক স্থাপত্য শিল্প

ইতিহাস প্রসিদ্ধ রামুতে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেবর কাল রাতে ঘটে গেছে এক অবিশ্বাস্য ধ্বংসযজ্ঞ। যে ধ্বংসযজ্ঞে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে রামুর প্রাচীন ইতিহাসের স্বাক্ষী এরকম বারটি নিদর্শন। পুড়ে গেছে মহা মূল্যবান বুদ্ধের ধাতু,তাল পাতার উপর বিভিন্ন ভাষায় লেখা ত্রিপিটক, অনেকগুলো বুদ্ধমূর্তিসহ প্রাচীন প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন। পাশাপাশি ওই একরাতেই পুড়েছে এখানকার হাজার বছরের গর্বের ধন–সম্প্রীতি।

তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টায় মাত্র এক বছরে বদলে গেছে রামুর দৃশ্যপট। সেই ধ্বংস স্থুপের উপর গড়ে তোলা হয় দৃষ্ঠি নন্দন বৌদ্ধ বিহার। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরী নব নির্মিত সেই বিহারগুলোই এখন নতুন ইতিহাস। একদিন এ ইতিহাসের বয়সও হবে হাজার বছর।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার,উত্তর মিঠাছড়ি বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র,রামু মৈত্রী বিহার,লাল চিং,সাদা চিং,অপর্ণাচরণ চিং,জাদী পাড়া আর্য্যবংশ বৌদ্ধ বিহার,উখিয়াঘোনা জেতবন বৌদ্ধ বিহার,উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বন বিহার,চাকমারকুল অজান্তা বৌদ্ধ বিহারসহ নব নির্মিত এসব বৌদ্ধ বিহার যেন এখন নতুন ইতিহাস। এসব বিহারের ঐতিহ্য নিয়ে আবার নতুন করে সমৃদ্ধ এই রামু।

অন্য রকম আলোয় আলোকিত বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র

উচু নীচু পাহাড় টিলায় সবুজের সমারোহ। এ সবুজের মাঝে গড়ে ওঠেছে মানুষের বসতি। শান্ত কোমল পরিবেশে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য মানুষকে অবিরাম কাছে টানার মত জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের উত্তর মিঠাছড়ি গ্রাম। সেই অসাধারণ সৌন্দর্য্যে ঘেরা পাহাড় চূড়ায় এক টুকরো সবুজের মাঝে ছিল বাঁশের তৈরী বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র। এর সামনেই ছিল উত্তর–দক্ষিণ কাত হয়ে শোয়া গৌতম বুদ্ধ মূর্তি। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিহারটি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ হলেও মূর্তিটি প্রায় অক্ষত থেকে যায়। অন্যান্য বিহারগুলোর মত এটিও নতুন ভাবে নির্মান করে সেনাবাহিনী।

তবে সেনাবাহিনী বারটি বিহার নির্মাণ করলেও সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ রূপ পেয়েছে এ বিহারটি। বর্তমানে যে কেউ বিহারটি দেখে অভিভূত হবেনই। বিহারের চমৎকার নির্মাণ শৈলী তো আছেই এ ছাড়াও বিহারের আঙ্গিনাকেও সাজানো দারুনভাবে। সেই অসাধারণ সৌন্দর্য্যের মাঝে নতুনভাবে শোভা পাচ্ছে একশ ফুট দীর্ঘ বিশালাকার আগের সেই মূর্তিটি। বর্তমানে এটি যেন অধারণের চেয়েও বেশী অসাধারণ । বলা যায়,রামুর বৌদ্ধ ঐতিহ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র। পাশাপাশি এটিই এখন পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান।

রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার

চৌমুহনী স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে, রাজারকুল এলাকায় পাহাড় চূড়ায় মন্দিরটি অবস্থিত। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ৩০৮ খ্রীষ্টপূর্বে সম্‌্রাট অশোক এটি নির্মাণ করেন । প্রবেশ পথের দু’ধারে সারি সারি ঝাউবাথি আর সাজানো গুছানো বাগান দেখে আপনার মন পুলকিত হবেই। সিড়ি বেয়ে উপরে ওঠেই দেখবেন বড় বড় দুটি বূদ্ধমূর্তি। বৌদ্ধদের মতে, এর একটিতে মহামতি গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি স্থাপিত হয়েছে। আশে পাশে ঘুরলে আরও অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে পাবেন এখানে। বৌদ্ধদের কাছে অতি পবিত্র তীর্থস্থান এটি।

লামার পাহাড় ক্যাং

লামার পাড়ায় এ ক্যাংটি অবস্থিত বলে এর নাম লামার পাড়া ক্যাং। অনেকে থোয়াইংগ্যা চৌধুরীর ক্যাংও বলে থাকেন। ১৮০০ সালে তৎকালীন রাখাইন জমিদার উথোয়েন অংক্য রাখাইন এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পাড়ার ভেতরের শান্ত নিথর কিছুটা পথ মাড়িয়ে এ ক্যাং পৌঁছবেন। দেখে আশ্চর্য হবেন, এত বড় বড় পিতলের ঘন্টা, এত বড় বুদ্ধমূর্তি এভাবে পড়ে আছে! অষ্টধাতু নির্মিত দেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তি এটি। আর ওই রকম অনেকগুলো পিতলের ঘন্টা চুরিও হয়ে গেছে। হয়তো ভাববেন, প্রাচীন এসব পূরাকীর্তি সংরক্ষণে সরকারের কেন এত অবহেলা?

পাকা মসজিদ

উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের সবুজ পাহাড় ঘেরা উত্তর মিঠাছড়ি গ্রামে ১৮৬২ সালে ওই এলাকার জমিদার প্রয়াত আলী হোসেন চৌধুরী প্রকাশ কালা চাঁন্দ চৌধুরী প্রায় বিশ শতক জমির উপর এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। এক কথায় এ মসজিদের নির্মাণ শৈলি দারুণ, চমৎকার। মসজিদের উপরে ঠিক মাঝখানে একটি বড় গম্বুজ, দুই পাশে দুটি মাঝারি আকৃতির গম্বুজসহ ছোট বড় বারটি মিনার রয়েছে। পাকা সীমানা প্রাচীরে ঘেরা এ মসজিদের মূল ফটকের ঠিক উপরে তৈরী করা হয়েছে আযানখানা। প্রায় দেড়শ বছর পুরনো এই মসজিদে এক সাথে চারশ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে বর্তমানে সংস্কার ও উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে এটি অনেকটা শ্রীহিন অবস্থায় পড়ে আছে।

ঐতিহাসিক রামকোট তীর্থধাম

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহাসিক নিদর্শন রামকোট তীর্থধাম। কথিত আছে, রাম চন্দ্র দেব সপ্তম অবতারে পিতৃ সত্য পালনে চৌদ্দ বছরের জন্য যখন বনবাসী হয়ে ছিলেন, তখন বন–বনান্তরে ঘুরতে ঘুরতে পঞ্চবটি বনে একটি কুটির স্থাপন করেন। ধারনা করা হচ্ছে, সেই কুটিরই হচ্ছে রামকোট তীর্থধাম। জনশ্রুতি আছে এখানে শীতার মরিচ বাটার পাটা আছে। হিন্দু শাস্ত্র মতে সকল তীর্থ ভ্রমনের পর রামুর রামকোট তীর্থধামে সংরক্ষিত শিব দর্শনেই সকল পূর্ণ্যের পুর্ণতা লাভ হয়।

চেরাংঘাটা বড় ক্যাং

এ ক্যাংটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে সিদ্ধ করা বিশাল আকৃতির কাঠ। সব কাঠই রেঙ্গুন থেকে আনা। রেঙ্গুনী কারুকাজ আর ক্যাং এর অভ্রভেদীচূড়া, সামনের গুছানো ফুলের বাগান সত্যিই আপনাকে মুগ্ধ করবে। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে যেতে যেতে দেখবেন দুটি সাদা সিংহ দরজার দুই পাশে বসে আছে। ভয় পাবেন না, ও গুলো শ্বেত পাথরের। উপরে ওঠেই দেখবেন আলো আধাঁরি পরিবেশ আর সেখানে অপূর্ব কারুকাজে খচিত অনেকগুলো বুদ্ধের আসন আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। প্রতিটি আসনে বসানো আছে মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি। খুব সম্ভবত ছোট বড় ২২ টি মূর্তি আছে এখানে। এর মধ্যে ছয় ফুট লম্বা কাঠের সিংহ শয্যা বুদ্ধমূর্তি, সেকালের বড় বড় ১১টি দেয়াল ঘড়ি, তালপাতার উপর পালি ভাষায় লেখা ত্রিপিটক, বুদ্ধের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চিত্রপট, ত্রিপিটক লাইব্রেরীসহ আরো আছে অনেক কিছু। ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারবেন না। কিন্তু ওখানেই লেখা আছে, ‘ছবি তোলা নিষিদ্ধ’ ।

তিনশ ফুট উচু পাহাড়ের চাতোপা চৈত্য

রামু উপজেলা সদরের তিন কিলোমিটার দূরে প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত জাদিটি। উচুঁ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থানের কারণে অনেক দূর থেকে এ জাদির সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। জাদি পাহাড়ে ওঠলে সেখান থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরের কক্সবাজর সমুদ্র সৈকতও দেখা যায়।

এ জাদির প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন মতামত শোনা যায়, ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা গেছে, জাদিটি প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো। তবে এ জাদির প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত শোনা যায়। অনেকের মতে তৎকালীন রাখাইন জমিদার খিজারী দালালের দাদা (পিতামহ) চাতাং রাখাইন জাদিটি নির্মাণ করেন। এজন্য অনেকে এটিকে চাতোপা জাদী বা চৈত্য বলে থাকেন। আবার অনেকে বলেন, বৃটিশ–মিয়ানমার যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সেনাপতি লাউয়ে এ এলাকায় অবস্থান নেন। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সেনাপতি লাউয়ে জাদিটি নির্মাণ করেন। তাই অনেকে এটিকে লাউয়ে জাদিও বলেন। এ কথা জানালেন, শ্রীকুল রাখাইন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উচেকাচারা মহাথের।

নারকেল বাগান

রামু চৌমুহনী থেকে তিন চার কিলোমিটার দক্ষিণে এক মনোরম পরিবেশে বিশাল এই নারকেল বাগান। বাগানের দু’পাশে গ্রাম, মাঝখানে রাস্তা– দেখতে অনেকটা উচু নিচু পাহাড়ী অঞ্চলের মত। ১৯৯২ সালে ৩৪টি নারকেলের চারা রোপন করে এই বাগানের যাত্রা শুরু। বর্তমানে গাছের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। প্রায় ২২৫ একরের বিশাল এ বাগান অনেকের মতেই নাকি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম নারকেল বাগান।

বিখ্যাত রাবার বাগান

চৌমুহনী স্টেশন থেকে এককিলোমিটার উত্তরে গেলেই আপনি পাবেন রামুর বিখ্যাত সেই রাবার বাগান। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি রাবার গাছ আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ১৯৬১ সালে শুরু এ বাগানটি বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬শ একর এলাকায় বিস্তৃত। বাগানের মাঝখানে গড়ে তোলা হয়েছে রামুর সবচেয়ে প্রাচীণ ‘রাবার বাগান রেষ্ট হাউস’। এটি এখনও রামুর অন্যতম পিকনিক স্পট। উঁচু নিচু পাহাড়–টিলায় সারি সারি রাবার গাছ রামুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঘুরে দেখুন না, ভারী হবে আপনার অভিজ্ঞতার ঝুড়ি।

সাগর ধোয়া হিমছড়ি

হিমছড়ি রামুর অন্যতম পর্যটন স্পট হলেও আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের পাশ ঘেষে হিমছড়ি যেন রামুর নিম্নাংশ, যেন পা। বিশাল বঙ্গোপসাগরের দূরন্ত ঢেউয়ের দোলায় দোলায়িত লোনা জলের গভীরে যেন পা ডুবিয়ে আছে রামু। সমুদ্রের পা ঘেঁষে আছে ঝাউবন আর সবুজ পাহাড়। সেই পাহাড় থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে সুন্দরী ঝরণা। বালুচরে ঝিনুক আর লাল কাঁকড়ার আঁকা নকশা দেখে মনে হবে এ যেন শিল্পীর হাতের অসাধারণ শিল্প চিত্র। অদ্ভূত এক সৌন্দর্য্য সুষমায় মন্ডিত এ হিমছড়ি ।

সূত্রঃ দৈনিক আজাদী

Additional Info

  • Image: Image