২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ২৮ মে ২০১৭ইংরেজী
শনিবার, 26 মার্চ 2016 01:04

বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ : অধ্যাপক বাদল বরণ বড়ুয়া

লিখেছেনঃ অধ্যাপক বাদল বরণ বড়ুয়া

বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ : অধ্যাপক বাদল বরণ বড়ুয়া

॥ নাটক ॥
বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নানাভাবে প্রতিফলিত হয়েছে- নাটকে, কবিতায় ছড়ায় গানে, ছোটগল্পে উপন্যাসে, প্রবন্ধে-নিবন্ধে রোজনামচায় ধৃত স্মৃতিকথায়, ইতিহাসের ধারাবাহিক গবেষণায় কতরূপেই না এর প্রকাশ হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কেন্দ্র উৎস হলো: যুগে যুগে অবদমিত বাঙ্গালী জাতিসত্তার নির্দ্বিধ উজ্জীবনের মাধ্যমে শোষণমুক্ত সুখীসুন্দর অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এক কথায় সোনার বাংলা গড়ার এক আপোষহীন স্বপ্ন-এ স্বপ্ন দেখেছেন এবং জাতিকে দেখিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির পথ বেয়ে ক্রমোত্তরণের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তাঁর আহবানে বাংলাদেশের সকল মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল-দীর্ঘ নয় মাসের মরণাপন সংগ্রামে কাঙ্খিত স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছিলাম।

সেই সংগ্রামের ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে থেকেই আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে শুরু করেছিলেন।
তুলনামূলক বিচারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আমাদের নাট্যসাহিত্যই বেশি সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশেষ করে মু্‌ক্ত পরিবেশে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন পাকিস্তান আমলের অবরুদ্ধ নাট্যধারার উৎসবমুখ খুলে দিয়েছে। প্রচুর নাটক লেখা হয়েছে-মঞ্চসফল ও শিল্পসফল নাটকের সংখ্যাও কম নয়। দর্শনীর বিনিময়ে আগ্রহী দর্শক শ্রোতারা নাটক দেখছিল।
মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকেই বাঙ্গালীর অধিকার চেতনার প্রথম প্রবল বিস্ফোরণ ঘটে।
মুর্দা ফকিরের কক্তে শুনতে পাই যেন অনিবার্য মুক্তিযুদ্ধের অমোঘ বাণীঃ
‘এ মুর্দা কবরে থাকবে না। বিশ, পঁচিশ, ত্রিশ, যত নীচেই চাপা দাওনা কেন, এ মুর্দা থাকবে না। কবর ভেঙে বেরিয়ে চলে আসবে, উঠে আসবে।
‘কবর’ নাটকের সবচেয়ে প্রাণবন্ত। প্রতিবাদী এবং নিরীক্ষামূলক চরিত্র মুর্দা ফকির। সে এক সময় স্কুল মাস্টারী করতো। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে তার মা, বাবা, বোন, বৌকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখেছে। কিন্তু কাউকে সে কবর দিতে পারেনি। সেই থেকে সে পাগল, গোরস্থানে থাকে। কেননা, ‘মরে গেলে তাঁকে কেউ যদি কবর না দেয়।’
সে গোরস্থানেই থাকে, মরার সময় হলে সে যেন চট করে কবরে ঢুকে যেতে পারে।
শহীদের লাশগুলো দেখে সে চিনতে পারেনি যে, এদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। সে বলে উঠে-
‘বাসি মরার গন্ধ আমি চিনি না। এ লাশের গন্ধ অন্যরকম। ওষুধের, গ্যাসের, বারুদের গন্ধ।
এর পরেই ঐ বিস্ফোরক সংলাপটি উচ্চারিত ।
ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তমূল্যে অর্জিত বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনে যেন এ ঐতিহাসিক সত্যটি দেদীপ্যমান হয়ে উঠেছে।
শুধু কি তাই! গুলিতে নিহত ছাত্রটির লাশ যখন কবরে যেতে চায় না, তখন নেতার উক্তি:

‘তোমার মত ছেলেরা দেশের মরণ ডেকে আনবে। তুমি বেঁচে থাকলে বারবার দেশে আগুন জ্বলে উঠবে, সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার না করে সে আগুন নিভাবে না।
সত্যিই তো! বাংলার দামাল ছেলেরা পাকিস্তানি জঞ্জাল সব পুড়ে তবেই না বাংলার স্বাধীনতা আনবে। এমন দৃষ্টি উন্মোচনকারী নাটক আর লেখা হয়নি।
স্বাধীনতার অমোঘ প্রেরণায় মুক্ত স্বদেশভূমিতে বসে কেবল ’৭৫ পর্যন্ত স্বল্প সময়ের ভেতরেই খ্যাত-অখ্যাত, প্রবীণ-নবীন মিলে কমপক্ষে চল্লিশজন নাট্যকারের অর্ধ-শতাধিক নাটকে আমরা পেয়েছি। সব নাটক নাট্যগুণান্বিত না হলেও ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কালপর্বের স্মারক হিসেবে সেগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবু বলতে হয় প্রচারসর্বস্ব এসব নাটকে যুদ্ধের সংবাদ আছে। পাকিস্তানি সৈন্য কর্তৃক নারী ধর্ষণের বীভৎস চিত্র আছে। আছে করতালি নিনাদিত জনপ্রিয় বক্তৃতার মেলা, কিন্তু যা নেই তা হলো শৈল্পিক পরিনিতিবোধ।

মমতাজউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সফল নাট্যকার। ২১ শে ফেব্রুয়ারি প্রথম কবিতার মতো স্বাধীনতার প্রথম নাটক ও চট্টগ্রামের অবদান।
‘স্বাধীনতা’ আমার স্বাধীনতার নামে গ্রন্থভুক্ত প্রথম নাটিকা চারটি ১৯৭১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭২ ফেব্রুয়ারির ভেতর রচিত। তিনি নিজেই গ্রন্থপ্রসঙ্গে বলেছেন :
‘তখন যুদ্ধ শুরু-ভিতরে এবং বাহিরে। ঘরে থাকতে পারতুমনা, পথে নেমেছিলুম। পক্ষে ছিল (মুক্তিকামী) মানুষের মিছিল-মিছিলের কক্তে ছিল শ্লোগান-এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। স্বাধীনতার যুদ্ধে আমাদের হাতিয়ার ছিল নাটক (খোলা মাঠের উদ্যোম মঞ্চে স্বাধীনতার জন্য নাটক)।

‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা। নাটিকাটি চট্টগ্রাম কলেজে মঞ্চস্থ হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। এটি লেডি গ্রেগরীর ‘রাইজিং অফ দি মুন’ অবলম্বনে রচিত। রূপান্তরে নির্বিচার স্বাধীনতা নিয়ে এ নাটককে বাংলাদেশের স্বাধীনতাস্পৃহায় সংস্থাপন করা হয়েছে। ‘এবারের সংগ্রাম’ মঞ্চস্থ হয় ১৫ মার্চ ১৯৭১ লালদীঘি মাঠে। ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ মঞ্চস্থ হয় ২৪ মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রাম কলেজ সংলগ্ন প্যারেড মাঠে। এ নাটক দর্শকদের শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছিস। বর্ণচোরা-তে দালালের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীনতার অল্প কিছুদিন পরেই হানাদারদের দোসর দালালচক্র আবার পোশাক পাল্টে স্বাধীনতার স্বপক্ষীয় শক্তির সঙ্গে মিশে গিয়ে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সমাজে পুনর্বাসিত হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে করেছে বিতর্কিত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে করেছে ভুলুক্তিত।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মমতাজউদ্দিন ‘কি চাহ শঙ্খচিল’ নাটকে পাকিস্তানি সৈন্য কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ নির্যাতন এর মর্মন্তু চিত্র তুলে ধরেছেন। শঙ্খচিলের শিকারে পরিণত হয়েছে একাত্তরে ধর্ষিতা নারী রৌশন আরা।
আরো কিছু নাটকে নারীলাঞ্ছনার চিত্র আছে, যেমন-আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘নিঃশব্দ যাত্রা’ ‘নরকে লাল গোলাপী নীলিমা ইব্রাহিমের ‘যে অরণ্যে আলো নেই’। জিয়া হায়দারের ‘সাদা গোলাপে আগুন’, ‘পঙ্খজ বিভাস ইত্যাদি।
নীলিমা ইব্রাহিমের নাটকটির একটি তীক্ষ্ন সংলাপঃ ‘ওরা ধর্মের নামে আমাকে ধর্ষণ করেছে। আর তোলার বাবা ধর্মের দোহাই দিয়া আমাকে আশ্রয়চ্যুত করেছেন।’

কল্যাণ মিত্রের ‘জল্লাদের দরবার’ নাটকটি স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণামূলক ছিল। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে তা নিয়মিত পরিবেশিত হতো। তাঁর রচিত একটি জাতি একটি ইতিহাস’ নাটকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানিদের শোষণ, বঞ্চনা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধসময়ের নানা ঘটনা, রাজাকার আলবদর দালালচক্রের অপতৎপরতা ইত্যাদি জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে।
‘ এ পর্বের নাটকগুলোতে দেখা যায়, আমাদের নাট্যকারেরা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাঙ্গালীদের উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অত্যাচার। নির্যাতনের দৃশ্য, বাঙালি নারীদেরকে পৈশাচিকভাবে ও ধর্ষণ হত্যাচিত্রকে যতটা প্রাধান্য দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, বীরত্বপূর্ণ অভিযান এবং সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব দেননি। অথচ এ কথা কে-না জানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী পদক্ষেপ ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের কারণে দেশ বিজয়ের দিকে এগিয়ে গেছে এবং অবশেষে স্বাধীন হয়েছে’-
[আহমেদ মাওলা]

মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্বের নাটকে আমরা দেখতে পাই, স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশা, মুক্তিযুদ্ধে চেতনার অবক্ষয়, স্বপ্নভঙ্গের করুণ চিত্র, স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্থান ইত্যাদি ঘটনার প্রাধান্য। ঊনিশ’শ পঁচাত্তরে জাতির জনককে সপরিবার হত্যা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সামরিক জেনারেলদের আবির্ভাব, বঙ্গবন্ধু খুনীদের পুনর্বাসন, স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের উত্থান নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুনকে সবচেয়ে বেশি আরক্ত করেছে। তিনি ‘আয়নায় বন্ধুর মুখ’ ‘এখনও ক্রীতদাশ, ‘তোমরাই’ ‘তৃতীয় পুরুষঃ ‘বিবিসার’, ‘দাশের মানুষ’ ইত্যাদি নাটকে মুক্তিযুদ্ধের অবক্ষয়িত চিত্রকে তুলে ধরেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক নাটক রচনার সংখ্যা তাঁরই বেশি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে সর্বশেষ তিনি লিখেছেন ‘তাহারা তখন’।
১৯৭৪ এ ‘সুবচন নির্বাসনে’র মাধ্যমেই তাঁর অব্যাহত জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল।

বস্তুত স্বাধীনতাযুদ্ধ আবদুল্লাহ আল মামুনের নাটকে নানাভাবে এসেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বিভ্রান্তি, প্রচন্ডভাবে তাকে নাড়া দেয়।
যে মুহূর্তে বাংলাদেশে ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে মানবতার অবমাননা ও নারীনিগ্রহের এক বলিষ্ঠ চিত্র ফুটে উঠেছে ‘মেরাজ ফকিরের মা নাটকে।
‘এখনও ক্রীতদাস’ নাটকে দেখানো হয় যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়

যখন সে দল থাকে তারা একরকভাবে তরুণদের ক্রীতদাস বাণিয়ে রুখে। বিরোধীদলও অন্যভাবে দেশের তরুণদের ক্রীতদাস বানিয়ে রাখে। চেতজাগতভাবে।
‘তোমরাই’ নাটকে রঞ্জুরা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অপব্যাখ্যা এবং বিভ্রান্তির শিকার হয়।
‘বিবিসাব’ নাটকটিতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মরিয়ম বিবি একসময় তার অনুকনীয় প্রতিবাদী চরিত্র ও নুরসুলভ ব্যবহারের কারণে এলাকাবাসীর কাছে বিবিসাব হয়ে ওঠে। বিসিাব একটা রিক্সা গ্যারেজের মালিক। বিবিসাব লক্ষ করছে, স্বাধীনতার শত্রুরাই সমাজে ক্ষমতা আর সম্মানের আসনে বসে আছে। বসিরুদ্দিন মোল্লা, যে একাত্তরে শান্তি কমিটির মেম্বার ছিল, সে তখন পরহেজগার, এলাকার মানিলোক। নাটকে মেম্বার চরিত্র, সে একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, সেও ক্ষমতার মোহে স্বাধীনতাবিরোধী বসিরদ্দিন মোল্লার সঙ্গে হাত মেলায়, তার পক্ষ অবলম্বন করলে বিবিসাব তাকে প্রশ্ন করে :
মরিয়ম : স্বাধীনতার পরে পরে আপনি ভাষণ দিচ্ছেন-বসিরুদ্দিন মোল্লা শান্তি কমিটি মেম্বার আছিল, তার দুই পোলা আছিল বদরবাহিনী, স্বাধীন বাংলাদেশে আগে মাপ নাই-দিচ্ছেন না এই ভাষণ?
মেম্বার : তা দিচ্ছি।
মরিয়ম : তাইলে!
মেম্বার : অহন দিনকাল অন্যরকম হইয়া গেছে বিবিসাব।
মরিয়ম : অহন দিনকাল অন্যরকম হয় নাই। অন্যরকম হইছেন আপনারা। ক্ষমতার নেশায় পাইছে আপনেগোরে। ক্ষমতায় যাইবার লাইগ্যা আপনারা আজকে এই পাট্টি করেন, কালকে ঐ পাট্টি করেন।
উল্লিখিত নাটকগুলো ছাড়া আরও যে সব নাটকের কথা আমরা বলতে পারি সেগুলো হলো: মমতাজউদ্দীন আহমদ ‘ফলাফল নিম্নচাপ’, ‘ক্ষমবিক্ষত,’ ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’ সেলিম আল-দীন ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেয়ামত মঙ্গল’, মামুনুর রশীদ: ‘ওরা কদম আলী’, ‘ইবলিশ’, ‘সমতট’, ‘জয়জয়ন্তী’, ‘নাসিরুদ্দীন হউসূপ: ‘একাত্তরের পালা’, ঘুম নেই; এস.এস. সোলায়মান: ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘খান্দানী কিসসা’, এই দেশে ওই বেশে’, ‘ইংগিত’, নিরঞ্জন অধিকারী ‘রাজাকারের রিকসা’। মঈদ আহমদ প্রতিদিন একদিন এবং আরো অনেক নাটক। আবার সচরাচার নাটক লিখেন না এমন লেখকও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে নাটক লিখেছেন। যেমন নাসিমা ইব্রাহিম: ‘সে অরণ্যে আশা নেই; রণেশ পশশুপ্ত: ফোটা আসছে’, বশীর আল হেলাল: স্বর্গের সিঁড়ি ইত্যাদি। মামুনুর রশিদ ও সেলিন আল-দীনের নাটকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনালোকে শ্রেণীদ্বন্দ্বের নানামুখী টানাপোড়েন পক্ষ করা যায়। নতুনদের মধ্যে মান্নান হীরার ‘খেলা খেলা’, ‘একাত্তরের মুদিরায়’ এবং এস.এস. সোলায়মানের ‘ইংগিত’, ‘এই দেশে, এই বেশ’, ‘গোলাপজোর ইত্যাদি বিশেষ তাৎপর্য দর্শকনন্দিত হয়েছে।
এস.এস. সোলায়মান নাটকে তির্যকভঙ্গীতে হাস্যরসের অবারিত শ্লোগান দিয়ে এবং গানের ব্যবহার করে বাংলা নাটকের একটি অবলুপ্ত ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করছেন। সব্যশাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক নাটক রচনার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন। ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ নাটকে মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের পূর্বে বুদ্দিজীবীদের হত্যাকাণ্ড এবং স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিজয়ের সংগ্রাম তুলে ধরেছেন। নাটকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কলিমুল্লাহকে তার দুই ছাত্র রাতের অন্ধকারে ধরে নিয়ে তাকে হত্যা করে। নষ্ট মানুষ, নষ্ট সময় আর অবক্ষয়িত পরিবেশে ব্যতিক্রমীভাবে প্রতিবাদ করতে গিয়ে জিনাত মহল এক রাজাকার কেই বিয়ে করে বসে। সমাজের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা আর প্রশ্নের তীর ছুঁরে দিতে জিনাত মহল ভিন্ন এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ভু-লুণ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জিনাত মহল বিদ্রোহী সত্তা দিয়ে তুলে ধরেছেন :
‘রাজাকারকে তোরা ক্ষমা করতে পারিস, আমি পারি না?

রাজাকারকে তোরা মন্ত্রী বানাতে পারিল, আমি স্বামী করতে পারি না। একাত্তরের দালালকে স্বাধীনতার পদক দিতে পারিস, একাত্তরের দালালের পলায় আমি মালা দিতে পারি না?’
জিনাত মহলের এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তার এই জিজ্ঞাসা দর্শক পাঠককে শুধু সচকিত করেনা। তীব্র তীরে অভিঘাতও করে। মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় ভিন্ন এক যুদ্ধের প্রান্তরে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের যুদ্ধে জিনাত মহল একাই অবতীর্ণ হয় না, পাঠক দর্শক শ্রোতারাও যুদ্ধে সামিল হয়। সৈয়দ শামসুল হক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এভাবে সঞ্চারিত করেছেন নবপ্রজন্মের কাছে। মুক্তিযুদ্ধের সবচাইতে সার্থক নাটক-প্রথম কাব্যনাটক-সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়।’ এটি ১লা মে থেকে ১৩-ই জুন ১৯৭৫ সময়ে লন্ডনে বসে রচিত।

মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তিতে আসন্ন বিজয়লগ্নে গ্রামে প্রবেশ করছে মুক্তিবাহিনী। এ সংবাদে গ্রামের মাতবর-যে যুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের দালালী করেছে, এমনকি নিজের মেয়েকে তুলে দিয়েছে পাকিস্তানী সেনা অফিসারের হাতে-ভীত সম্ভ্রন্ত হয়ে পড়ে। অবশেষে সাতবারের সামনে আত্মহত্যা করে তার আত্মজা-মুক্তিযোদ্ধারা হত্যার করে মাতবরকে।
‘নাটকটির এই পরিণতিতে আমরা দেখতে পাই হানাদার বাহিনীকে মিত্র ভেবে যারা এদেশ। মাটিও মানুষের সাথে বেঈমানী করেছে তাদের পরিনতি একনই হয়, হতে হয়। স্বদেশ মে ঈমানের অঙ্গ কিন্তু তারা সেই ঈমানকে ভুলুণ্ঠিত করেছে, অপমানিত করেছে মানবতার, ধর্মের নামে কলংকিত করেছে জাতির পবিত্র সত্তাকে।
সৈয়দ হকের কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি বিষয়টি কাব্যনাট্যের মতো সুইচ্চ শিল্পাঙ্গিকের মাধ্যমে অত্যন্ত সফলভাবে আনতে পেরেছেন।’
- আহমেদ মাওলা
কাব্যনাট্যের আঙ্গিকে রচিত এই নাটক আঞ্চলিক শব্দের নিপুন ব্যবহারে যুদ্ধকালীন উত্তর বাংলার গ্রামীণ জীবনকে যেন শব্দবন্দী করে ধরে রেখেছে। ভাষার গতিময়তা, আঞ্চলিক শব্দের কুলশী প্রয়োগ এবং যুদ্ধকালীন জীবন বাস্তবতার কাব্যিক উচ্চারণে পাশের আওয়াজ পাওয়া যায়’ বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যের একটি পালাবদলকারী নাটক হিসেবে বিবেচিত। নাটকের সমাপ্তিতে একটি পালাবদলকারী নাটক হিসেবে বিবেচিত। নাটকের সমাপ্তিতে পাইকের সংলাপে যে প্রতিশোধের বাণী উচ্চারিত, তা বুঝি বাংলাদেশের জন্য এখনও প্রাসঙ্গিক:
এদিকে, এদিকে সব আসেন এখন
দেখাইয়া দেই সব কোথায় কখন
কি গজব কি আজাবে ছিল লোকজন
জালেমের হাতে ছিল যখন শাসন
শত শত মারা গেছে আত্মীয়স্বজন।
এদিকে, এদিকে সব আসেন তখন
দেখাইয়া দেই সব কিভাবে কখন
মেলেটারি ঘাঁটি নিয়া ছিল কয়জন
কারা কারা সাথে ছিল তাদের তখন।
অবিলম্বে সারা দেশে ঘেরা প্রয়োজন
জলদি, জলদি সব চলে এখন।

তাঁর আর একটি কাব্যনাট্য ‘গণনায়ক’ সেক্সপীয়রের ‘জুলিয়াস সীজার’ অবলম্বনে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পটভূমিতে রচিত।
একজন বিদগ্ধ সমালোচক মন্তব্য করেছেন : ‘মুক্তিযুদ্ধের নাটকের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই আমাদের নাট্যকারেরা বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে গ্রহণ করলেও নাটকের আঙ্গিক প্রকরণের দিকে তাঁরা ততটা মনোযোগী নন। নাটকের নবনিরীক্ষার বদলে তারা বিষয়সর্বস্ব হয়ে পড়েছেন, তাই মুক্তিযুদ্ধের নাটকে দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া শৈল্পিক পরিচর্যার স্পর্শ কম।
নাট্যকারেরা দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাকে মূল্যায়ন করেছেন। এক : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভয়াল বাস্তবতা নির্মাণ, হানাদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের বিমানধিক দৃশ্য নির্মাণ। দুই : স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমায়িত চিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের বিপর্যস্ত অবস্থা, স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্থান, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল ইত্যাদি।
নাট্যকারেরা মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি দেখছেন। পোশাক কমিটমেন্ট বা সামাজিক দায়বদ্ধতার দৃষ্টিকোন থেকে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নাটকে বিস্তার লাভ করেছে বহুমাত্রিক চেতনায়।’
[ আহমদ মাওলা ]
এ আলোচনা পূর্ণায়ত নয় আরো অনেক নাটক-নাট্যকার আছেন। খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমাদের পাঠ্যসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখা অঙ্কনের একটি অপূর্ণাঙ্গ প্রয়াস মাত্র। লক্ষ্যনীয় : বর্তমানে নাটকে মুক্তিযুদ্ধের ব্যবহার ক্ষীয়মান ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। পরিবেশ পরিস্থিতিগত কারণেই এককালের প্রিয় বিষয় পরে আকর্ষণ হারায়।
তবু আমাদের বিশ্বাস : বাঙালীর সবচেয়ে গৌরবের, সবচেয়ে বেদনার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ-সংগ্রামী বাঙালী জাতিসত্তাকে নতুন আশা আর আকাঙক্ষার বাণী শোনাবে প্রতিনিয়ত।
নাটক হবে আরও শিল্পশোভন ও মানসমৃদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী শ্রেষ্ঠ সাহিত্য মাধ্যম।
বর্তমানে দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্রিয়াশীল। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিও প্রতিনিয়ত ছোবল মারছে। এ দ্বন্দ্বাত্মক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন নাটক প্রত্যাশিত।

Additional Info

  • Image: Image