২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ইংরেজী
Sunny

28°C

Chittagong

Sunny

Humidity: 61%

Wind: 22.53 km/h

  • 21 Nov 2017

    Sunny 29°C 19°C

  • 22 Nov 2017

    Partly Cloudy 27°C 17°C

মঙ্গলবার, 28 জুলাই 2015 01:10

১২শ বর্ষী মন্দিরে হিন্দু-বৌদ্ধ নিদর্শন : বৌদ্ধ মন্দিরকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করার নির্দশন

লিখেছেনঃ আশিক হোসেন

১২শ বর্ষী মন্দিরে হিন্দু-বৌদ্ধ নিদর্শন : বৌদ্ধ মন্দিরকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করার নির্দশন

দিনাজপুরে মাটির ঢিবি খনন করে বৌদ্ধ মন্দিরকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তর করার প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার করেছেন একদল গবেষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক স্বাধীন সেনের নেতৃত্বে আবিষ্কৃত এই মন্দির তৎকালীন বরেন্দ্র অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্ম চর্চার ওপর পরবর্তীকালের হিন্দু শাসকদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আধিপত্যের সরাসরি নিদর্শন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

খননকারীরা বলছেন, মন্দির দুটির নির্মাণকাল ৮ম থেকে ১১শ শতকের কোনো এক সময়কার। এর আগে বাংলাদেশে বৌদ্ধ স্তূপকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করার উদাহরণ পাওয়া গেলেও, বৌদ্ধ মন্দিরকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করার নির্দশন এটাই প্রথম বলে দাবি করছেন তারা। দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ উপজেলায় আবিস্কৃত এ মন্দির সংলগ্ন স্থান থেকে প্রথমবারের মত শারীরিক স্তূপের নিদর্শনও পাওয়া গেছে।
গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষ দিয়ে স্তুপ নির্মাণ করার ঐতিহ্য মৌর্য সম্রাট অশোক সর্বপ্রথম শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দাহ করা দেহাবশেষের উপরে স্তূপ নির্মাণ করার ঐতিহ্য চালু হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি দল অধ্যাপক স্বাধীন সেন ও অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহসানের পরিচালনায় গত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে খনন চালিয়ে আসছেন।
দলটি একই উপজেলার মাহেরপুরে প্রায় এক হাজার বছর পুরানো একটি হিন্দু মন্দির আবিষ্কার করে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এই খনন চলছে। অধ্যাপক স্বাধীন সেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ২০১২ সাল থেকে তারা সেতাবগঞ্জ (বোঁচাগঞ্জ) এলাকায় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে করছেন। এ সময় প্রায় ১২৬ টি আর্কিওলজিক্যাল সাইট শনাক্ত করা হয়। সেতাবগঞ্জের রণগাঁও ইউনিয়নের বাসুদেবপুর ওয়ার্ডের ইটাকুড়া ঢিবি নামের প্রত্নস্থানে প্রায় ৩,৬০০ বর্গ মিটারেরও বেশি স্থানে খনন পরিচালনা করে মন্দির দুটো পাওয়া যায়। মন্দির দুটো পাওয়ার পরে প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক দীপক রঞ্জন দাশ, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্বের প্রাক্তন অধ্যাপক অরুণ নাগ ও কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাডাম হার্ডির সঙ্গে আলোচনা করে অধ্যাপক সেন হিন্দু মন্দিরটিকে শনাক্ত করেন। পুরো মন্দিরটি পূর্বে, উত্তরে ও দক্ষিণে বেষ্টনী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। এই প্রাচীর ত্রি-রথ অভিক্ষেপ বিশিষ্ট। এই ত্রি-রথ অভিক্ষেপ হিন্দু মন্দিরের স্থাপত্য শৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে তিনি জানান। বেষ্টনী প্রাচীর ও গর্ভগৃহের মধ্যবর্তী স্থানে পূর্ববর্তী বৌদ্ধ মন্দিরের দেয়াল ও ভরাট করা মাটির উপরে ৩০-৪০ সেমি পুরু মেঝে রয়েছে।

অধ্যাপক সেন বলেন, “মন্দিরের প্রধান প্রবেশদ্বার পশ্চিম দিক দিয়ে ছিল। স্থানীয় মানুষজনের বাড়িঘর বানানোর কারণে ইট তুলে নিয়ে যাওয়ায় আয়তক্ষেত্রকার প্রবেশদ্বারটির মূল নির্মাণশৈলী বোঝা কঠিন। তবে সম্ভবত এখানে বড় সিঁড়ি ছিল। “পরবর্তীকালে হিন্দু মন্দিরে নির্মাণ উপকরণের পুনর্ব্যবহারের কারণে বৌদ্ধ মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মন্দিরটি একটি গর্ভগৃহ ও একটি মণ্ডপের সমন্বয়ে গঠিত। পূর্ববর্তী মন্দিরের গর্ভগৃহের উপরেই পরবর্তী মন্দিরের গর্ভগৃহ নির্মিত হয়। এর প্রবেশপথও পশ্চিম দিকে ছিল।”

প্রাচীন মন্দির সাধারণত দুটি প্রধান অংশের সমন্বয়ে নির্মিত হতো। এর মধ্যে যে স্থানটিতে প্রতিমা রাখা হতো সেটিকে বলা হয় গর্ভগৃহ, আর যে স্থানে দাঁড়িয়ে পূজো-অর্চনা করা হতো সেটিকে বলা হয় মণ্ডপ।
খননস্থলে চিহ্নিত বৌদ্ধ মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে তেরটি বুদ্ধ স্তূপ পাওয়া গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পাওয়া গেছে চারটি স্তূপ ও একটি বর্গাকার মন্দির। পরবর্তী মন্দিরের বেষ্টনী প্রাচীর ও সামনের মেঝে উত্তর-পশ্চিমাংশের স্তূপগুলো বালি চাপা দিয়ে তার উপরে নির্মিত হয়েছিল।

এই স্তূপগুলোর মধ্যে চারটির মধ্য থেকে থেকে পোড়ানো মানবঅস্থির টুকরা, ছাই ও কয়লার অবশেষ পাওয়া গেছে। এছাড়াও একটি স্তুপসংলগ্ন স্থান থেকে একটি মাটির ঘটের মধ্যে পোড়া মানবঅস্থির টুকরা ও কয়লা পাওয়া গেছে। এই ধরনের স্তুপকেই শারীরিক স্তুপ বলা হয়ে থাকে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ভারতীয় উপমহাদেশে সাধারণত তিন ধরনের স্তুপের নিদর্শন পেয়েছেন। দেহাবশেষের উপরে নির্মিত শারীরিক স্তূপ, ব্যবহার্য সামগ্রীর উপরে নির্মিত পারিভৌগিক স্তুপ এবং বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা স্মরনে নির্মিত উদেশীক স্তূপ। এছাড়াও পূণ্য অর্জনের জন্যও স্তুপ নির্মাণের উদাহরণ রয়েছে, যেটিকে বলা হয় নিবেদন স্তূপ।

অধ্যাপক সেন জানান, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস এঞ্জেলস -এর বৌদ্ধ শাস্ত্র বিষয়ক পণ্ডিত গ্রেগোরি সোপেন এই ধরনের শারীরিক স্তূপগুলোকে তৎকালীন মৃৎদেহ সৎকার ও সম্পর্কিত আচার-অনুষ্ঠানাদির সঙ্গে যুক্ত করে আলোচনা করেছেন। “দক্ষিণ এশিয়ায় এতকাল নিবেদন স্তূপ হিসাবে চিহ্নিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই আসলে শারীরিক স্তুপ ছিল যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ স্থাপনার (বড় স্তূপ, মন্দির, বিহার) কাছেই নির্মিত হত। কেবল গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মানুষজনই নন, বরং সাধারণ অনুসারীদের মৃতদেহ সৎকার করে সেই দেহাবশেষের উপরেও এই স্তুপ তৈরি করা হত।”

তিনি বলেন, “এ ধরণের অনেক স্থানই পরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে তীর্থস্থানে পরিণত হয়। বাংলাদেশে এ-ধরণের শারীরিক স্তূপ পাওয়ার ঘটনা এই প্রথম।”
এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তৎকালীন বরেন্দ্র অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মীয় সৎকার রীতিনীতি ও তীর্থ গড়ে ওঠার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক।
তিনি জানান, দুই মন্দিরের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষিত থেকে বিভিন্ন পোড়ামাটির চিত্রফলকসহ বিভিন্ন প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে।
এগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ দেবতা যমান্তক-এর প্রতিমা, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও একজন নারী সঙ্গিনীর বা বৌদ্ধ দেবী তারার বলে চিহ্নিত করেছেন ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্লদিন বুতজে পিক্রো।

পাল থেকে সেন আমল

খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে ত্রয়োদশ শতক ইতিহাসে ‘আদি মধ্যযুগ’ হিসাবে পরিচিত। সে সময় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। বৃহত্তর সাম্রাজ্যের জায়গায় উত্থান ঘটে অসংখ্য আঞ্চলিক রাজত্বের।
পাল রাজবংশ সে সময় প্রায় ৪০০ বছর বাংলা অঞ্চল এবং উত্তর ভারতের একটি বড় অংশ শাসন করে। অনেক উত্থান-পতন থাকলেও সার্বিকভাবে পাল যুগকে প্রাচীন বাংলার ‘সবচেয়ে গৌরবময় যুগ’ বলা হয়।
রাজা ধর্মপাল (৭৮১-৮২১) বৌদ্ধ ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে সোমপুর মহাবিহার তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন।
পাল আমলে গ্রামকেন্দ্রিক বসতির পাশাপাশি নতুন নতুন নগরের বিকাশ ঘটে, যাকে ইতিহাসবিদ ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় চিহ্নিত করেন তৃতীয় নগরায়ন হিসেবে। কৃষি জমির বিস্তারের কারণে নতুন নতুন বসতি তৈরি হয় সে সময়।
৪০০ বছরের শাসনামলে পাল রাজাদের ১৮টি প্রজন্ম সিংহাসনে আসে। এ বংশের সর্বশেষ প্রতাপশালী রাজা রামপালের (১০৮২-১১২৪) মৃত্যুর পর পালরা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। দ্বাদশ শতকের তৃতীয় চতুর্থাংশে হিন্দু ধর্মের অনুসারী সেন রাজবংশের উত্থানের মধ্য দিয়ে পাল রাজবংশের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে।
সেতাবগঞ্জের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ওই সময়ের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন অধ্যাপক স্বাধীন সেন।

ভিডিও লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?feature=player_embedded&v=-iXMH-HtZLU

অধ্যাপক সেনের মতে, পূর্ব ভারতে ৬ষ্ঠ থেকে ১২শ শতকে বরেন্দ্র নামে পরিচিত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে জটিল সংঘাত ও আপোষের সম্পর্ক ছিল। ধীরে ধীরে হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন চিন্তা বৌদ্ধ ধর্মীয়দের প্রভাবিত করে, বৌদ্ধ ধর্মের উপরে আধিপত্য বিস্তার করে।
“বরেন্দ্র অঞ্চলে এমন দুটি প্রধান ধারার মধ্যের সংঘাত ও আপোষের জটিল ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ খুব বেশি পাওয়া যায় নাই। এর আগে মহাস্থান গড়ের গোকুল মেধ ও বিরামপুরের বোয়ালা ঢিবিতে বুদ্ধ স্তূপকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেলেও গোকুল মেধের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ তেমন বিশ্লেষণযোগ্য নয়।”
তিনি বলেন “ভারতের পশ্চিম বাংলার বাকুড়ার বহুলড়ার সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দিরটিও বুদ্ধ নিবেদন স্তূপের উপরে নির্মিত। কিন্তু বৌদ্ধ মন্দিরকে সরাসরি হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করার উদাহরণ বাংলাদেশে এই প্রথম।
“একটি স্তূপের কাছ থেকে শিব লিঙ্গের আবিষ্কার আর দুটো মন্দির থেকেই অগণিত মাটির প্রদীপের প্রাপ্তি এ-কথা প্রমাণ করে যে, প্রাচীন বরেন্দ্রে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সংমিশ্রণ ধীরে ধীরে ঘটছিল।”
আবিষ্কৃত মন্দিরগুলোর বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে জানানো হয়েছে। তার আশা, গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবে সরকার। একই দল একই উপজেলার ছাতৈল ইউনিয়নের মাহেরপুরে খনন করে একটি এক হাজার বছর পুরনো একটি ছোট হিন্দু মন্দিরও আবিষ্কার করে।

কৃতজ্ঞতাঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Additional Info

  • Image: Image