২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 29 জানুয়ারী 2017 01:32

সাহিত্য ভাষ্কর বিমলেন্দু বড়ুয়ার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

সাহিত্য ভাষ্কর বিমলেন্দু বড়ুয়ার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

আলোক ছড়ায় আলোকিত জন
উন্নত শির কর্মে
তোমার অবদান কতই মহান
অনুভব করি মর্মে।

২২ জানুয়ারী নীরবে চলে গেলো সাহিত্য ভাষ্কর বিমলেন্দু বড়ুয়ার মৃত্যুবার্ষিকী। যদি বলা হয় আকাশ কত বড় কিংবা সমুদ্র কত বিশাল, তাহলে তার উত্তর দেয়া যেমন কঠিন, তেমনি মানুষ হিসেবে তিনি কত বড় কিংবা কত মহৎ- এক কথায় তার উত্তর দেয়া সত্যি দুরূহ। আকাশের মতো উদার আর সমুদ্রের মতোই বিশাল তার হৃদয়ের ঔদার্য। আকাশ কিংবা সমুদ্রের পরিধির পরিমাপ না করতে পারলেও তার পরিচয় দেয়ার ভাষা আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে। তেমনি তাঁকে যখন আমরা বিশ্লেষণ করি, তখন তাকে রক্ত-মাংসের একজন মানুষ হিসেবেই, তার দোষগুণ মিলিয়েই তাকে বিশ্লেষণ করি। তাতে তাকে ছোট করা হয় না, বরং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তার যে ব্যাপ্তি, তাঁকেই মহিমান্বিত করা হয়।

চট্টলার কৃতী সন্তান, লব্ধ প্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক বিমলেন্দু বড়ুয়া ছিলেন একজন অনুপম চরিত্রের বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন শান্ত প্রকৃতির; সদা প্রসন্নচিত্ত। পরহিতে নিবেদিত প্রাণ। অনাড়ম্বর জীবন চর্যা ও বিরামহীন জ্ঞান-সাধনা, বিনম্র স্বভাব আর সদ্ব্যবহারের জন্য তিনি ছিলেন সর্বজন নন্দিত। তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী, অধ্যবসায়ী, সহিষ্ণু, ধৈর্য্যশীল, কুসংষ্কার আর সংকীর্ণতার উর্ধ্বে, পন্ডিত, বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী, প্রাজ্ঞ, সহজ সরল জীবন চর্চায় বিশ্বাসী। অন্যায় আর অসত্যের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা প্রতিবাদী ছিলেন। মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার কধুরখীল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক বিমলেন্দু বড়–য়া ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দের ১৫ই এপ্রিল পিতা প্রিয়নাথ বড়ুয়া ও মাতা বিধুমূখী বড়ুয়ার ঘর আলোকিত করে এই ধরায় জন্ম নেন।

তাঁর পান্ডিত্য ও অনুপম চরিত্র মাধুর্য্যরে জন্য তিনি ব্যতিক্রমধর্মী বিরল ব্যক্তিত্ব হিসেবে সর্বত্র পরিচিত ছিলেন। তিনি সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণ করেছেন অনায়াসে তাঁর মেধার গুণে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর প্রকাশিত কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, মহৎ জীবনালেখ্য, রম্য রচনা, ভ্রমণকাহিনী, নাটিকা, জীবন্তিকা। তিনি আমাদের বাংলা সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ পাশাপাশি বৌদ্ধ সমাজের উন্নয়নে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অসংখ্য গ্রন্থ।

তিনি শুধুমাত্র বাংলাভাষাভাষীদের জন্য লিখেই ক্ষান্ত হননি। তাঁর লেখা ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে ভারতের বিভিন্ন সাময়িকী, মঙ্গোলিয়ার এবিসিপি জার্নালে, থাইল্যান্ডের WFB Review ও বুদ্ধগয়ার মহাবোধি সোসাইটি শাখার জার্ণালে। যা আমাদের বৌদ্ধ সমাজের জন্য সত্যিই গর্বের বিষয়। সেই কলেজ জীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ, গল্প ও কবিতা প্রতিযোগীতায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর স্বরূপ পুর®কৃত হয়েছিলেন।

পেশাগত জীবনটা ছিল তাঁর জীবনঘনিষ্ট আর একটি নবদীপের মতোন। তিনি যেহেতু লেখালেখি-তেই মগ্ন থাকতেন, পেশাও ছিল অনুরূপ। যাতে করে তাঁর কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়। তিনি ছিলেন বহুল প্রচারিত জনপ্রিয় সংবাদপত্র দৈনিক আজাদীর সহ-সম্পাদক। একদিকে সাংবাদিকতা, অন্যদিকে সাহিত্য চর্চা দুইদিকেই ছিলেন সমান পারদর্শী।

সমাজ সংগঠক এবং সমাজ সেবায় তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সাধারণ সম্পাদক ও মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি ছিলেন।
শিক্ষায় অনগ্রসর জাতির শিক্ষিত করার লক্ষ্যে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাং®কৃতিক সংগঠনের সাথে। তিনি কধূরখীল জ্ঞানোদয় সাংষ্কৃতিক সংঘ ও আদর্শ ভ্রাতৃসংঘ অনাথালয়ের সভাপতি, কধুরখীল বড়ুয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি, কধূরখীল জ্ঞানোদয় বিহার কমিটির প্রধান উপদেষ্টা, পটিয়াস্থ করল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নিষ্ঠার সহিত।
তিনি নবসমতট পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক, মাসিক কৃষ্টি পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদের সদস্য, চৈত্যগ্রাম, কৃষ্টি, বুলেটিন, সম্যক, অমিতাভ প্রভৃতি সাময়িকীর উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছিলেন।
দেশের বাইরে ভ্রমণ করেছেন একাধিকবার। তিনি ভারত, থাইল্যান্ড, কোরিয়া, লাওস, মঙ্গোলিয়া, মায়ানমার, রাশিয়া (সোভিযেত ইউনিয়ন) এ ভ্রমণ করেন পাশাপাশি ঐসব দেশে আয়োজিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

তিনি ছিলেন বৌদ্ধিক চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব , নিবেদিত প্রাণ কর্মবীর, শিক্ষার প্রতি একাগ্রতা, জ্ঞান চর্চার প্রতি আগ্রহ তাহার প্রতিটি কর্মে প্রতিফলিত। আজ এই মহান ব্যক্তিত্বের জন্মবার্ষিকীতে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলী। তিনি শাসন সদ্ধর্মের উন্নয়নে নিরন্তর কাজ করে গেছেন। তাঁর কঠোর পরিশ্রম, মেধা, আদর্শ ও ত্যাগের পরকাষ্ঠা প্রদর্শনে ঝিমিয়ে পড়া জাতিকে জাগ্রত ও ধর্মময় চৈতন্যে উজ্জ্বীবিত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তিনি একজন আদর্শ, ন্যায় নিষ্ঠাবান সত্যানুসন্ধানী, বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর জ্ঞান, মেধা, পান্ডিত্য ও স্বদেশপ্রেম শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী নয়। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল মানুষকে আলোড়িত করেছে। তাঁর সাফল্য, মহানুভবতা, প্রজ্ঞাদীপ্ত চিন্তা, ত্যাগের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমাজে অনুকরণীয় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি ছিলেন সহজ সরল, মানবতাবাদী, তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন, সত্য ও ন্যায়ের কন্ঠস্বর, বাস্তববাদী, ষ্পষ্টবাদী, সত্য বলতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না অথচ একেবারে সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তিনি ছিলেন জ্ঞান ও কর্মের মূর্ত প্রতীক, বৌদ্ধ সমাজের গৌরবময় আদর্শ। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই তারপরও তিনি সূর্যের মত আলো বিকিরণ করে যাচ্ছেন আমাদের মাঝে তাঁর আলোকিত কর্মধারার আলোকে।

এ এক আশ্চর্য জীবন কর্মযোগী কর্মের প্রবাহ
অস্তিত্বের স্থপতি যে চরিত্র নির্মল – নির্মোহ
শতাব্দীর দীপ্ত সূর্য বীতরাগ শুদ্ধচিত্ত নাম
ভক্তিতে বিনম্র ভক্ত তাঁর উদ্দেশ্যে জানায় প্রণাম।

সুকর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি একাধিক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন।

পরিশেষে বলতে হয় মানবজীবন অতীব দুর্লভ। অতীতের প্রবল কুশল পারমীর ফলেই মানব জীবন লাভ করা যায়। অসম্ভব গুণের অধিকারী সাহিত্যিক ও সাংবাদিক বিমলেন্দু বড়ুয়া বৌদ্ধ সমাজগগণে উজ্জ্বল ভাস্বর হয়ে আমাদের সকলের মাঝে দেদীপ্যমান হয়ে থাকবেন অনন্তকাল। তিনি সাহিত্য কর্মের মাধ্যমে এবং সদ্ধর্মের উন্নয়নে যেসব কাজ করে গেছেন, তা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এ আলোকেই বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিতভাবেই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হবে, তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহান।
পরিশেষে কবিগুরুর ভাষায় ————–

তোমার কীর্তির চেযে তুমি যে মহৎ,
তাই তব জীবনের রথ
পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমারে বারম্বার।
তাই চিহ্ন তব পড়ে আছে,
তুমি হেথা নাই।

লেখক- কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক – নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশন, সহযোগী সম্পাদক-নির্বাণা (www.nirvana.com), This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Additional Info

  • Image: Image