২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১১ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 22 জানুয়ারী 2017 00:54

আমাদের বিমলেন্দুদা : আবুল মোমেন

লিখেছেনঃ আবুল মোমেন

আমাদের বিমলেন্দুদা : আবুল মোমেন

দীর্ঘদেহী ঋজু মানুষটি বাবার গুণগ্রাহী ছিলেন। তখনও বোধহয় চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র এবং তাই বাবার সাথে গুরুশিষ্য সম্পর্ক। তা ছাড়া তখন নবীন লেখক হিসেবে একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের সান্নিধ্য বাড়তি প্রেরণা হিসেবে কাজ তো করতই। তখন অনেক ছাত্রই আমাদের বাসায় আসতেন। বিশেষত যাদের সাহিত্যে উৎসাহ ছিল। সেকালে ফটোকপির কথা দূর-কল্পনাতেও ভাবা যেত না, কাটাকুটির খসড়া থেকে সাধারণত লেখককেই দাঁড় করাতে হত লেখা। কেউ কেউ কপি করার জন্য অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতেন। সেকালে কার্বন কাগজের ব্যবহার হত কপির কাজে। বাংলা টাইপ এসেছে আরও পরে। আর কম্পিউটার তো হাল আমলের ব্যাপার। বিমলেন্দুদা বাবার অনেক লেখা, সম্ভবত পুরো বইও, কপির কাজ করেছেন। হয়ত সেকালের কলেজের মাস্টার সামান্য দক্ষিণাও দিয়েছেন। তবে সে ছিল গুরুভক্তির কাল, কে কাকে দক্ষিণা দিয়েছে তা আজ বলা মুশকিল।

যে কালে বিমলেন্দুদা বেড়ে উঠেছিলেন সেটা ছিল সহজসরল জীবনের কাল। নিুমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের রীতিমতো সংগ্রাম করেই লেখাপড়া চালাতে হয়েছে। খুব কম বয়সে তাদের জীবনযুদ্ধে নেমে পড়তে হত। এখন সাতাশ বছরের আগে এম.এ. পাশ করা যায় না, তখন এত বয়স পর্যন্ত শিক্ষা শেষ করার জন্য অপেক্ষা করার কথা ভাবাই যেত না। বিমলেন্দুদাদাও মনে হয় কলেজের পাট না চুকাতেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাট চুকিয়েছিলেন। তাতে কোন ক্ষতি নেই, কিন্তু হয়তো পরিবারের দায় মেটাতে হয়েছে, দিনে চাকরির দায় বেড়েছে সমানে। ফলে এরই রেশ ধরে দিনে দিনে টান পড়েছে সৃজনশীল লেখার উদ্যমে। তারপর সংসারের বিস্তার ঘটেছে এবং চাপ বেড়েছে কালের নিয়মে। এক সময় বিমলেন্দুদার সাহিত্যকৃতি অতীতের বিষয় হয়ে গেল আর সাংবাদিক বিমলেন্দু বড়–য়ার পরিচয় বড় হয়ে উঠল। ছোটগল্পকার বিমলেন্দু বড়ুয়ার পরিচিতি চাপাই পড়ে গেল এক সময়। দীর্ঘদিন তিনি দৈনিক আজাদীতে সাংবাদিকতা করেছেন।

চট্টগ্রাম দিনে দিনে হারিয়েছে তার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব। আবুল ফজল, মাহবুবউল আলমের পরে একা সুরচিত চৌধুরী জ্বালিয়ে রেখেছিলেন চট্টগ্রামের সাহিত্যের সলতে। সম্ভাবনাময় অশোক বড়–য়া অকালে মারা গেছেন, প্রতিভাবান গোপাল বিশ্বাস দেশ ছেড়েছেন, সংগঠক ও সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম চৌধুরী নিষ্ক্রিয়, বিমলেন্দু বড়–য়া সাংবাদিকতা পেশায় নিবেদিত।

বিমলেন্দুদা আবার লেখালেখিতে ফিরে এলেন নব্বইয়ের দশকে। হয়তো এতদিনে ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে, সংসারের বোঝা হালকা হয়েছে, মন গেছে পুরনো নেশায় ফিরে। একাধিকবার ভ্রমণে গেছেন থাইল্যান্ড, মিয়ানমারসহ কয়েকটি বৌদ্ধপ্রধান দেশে। ভ্রমণকাহিনী আর বৌদ্ধ ঐতিহ্যের নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন। কবিতা আর ছোটগল্পও লিখেছেন। কয়েখটি বই একসাথেই প্রকাশ করেছেন। ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে, স্বাবলম্বী হয়েছে, চাকরির চাপ কমেছে। এবার সাংবাদিক বিমলেন্দু বড়–য়াকে ছাপিয়ে সাহিত্যিক বিমলেন্দু বড়–য়া যেন সুপ্তি ভেঙে জেগে উঠলেন। নতুন বই বেরুলেই হাতে করে নিয়ে আসতেন। দু-একটার প্রকাশনা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করেছেন। দীর্ঘদেহী বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটার সহজসারল্য দেখতে দেখতে ও অনুভব করতে করতে কেমন যেন নষ্টালজিক হয়ে যেতাম। তিনি বারবার আমার মায়ের স্মৃতিচারণ করতেন, তাঁদের প্রথম তারুণ্যে মা যে স্নেহমমতায় তাঁদের আপ্যায়ন করতেন সেসব কথা শোনাতেন।

গ্রামীণ প্রেক্ষাপট থেকে একবুক স্বপ্ন আর আদর্শ নিয়ে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করেছেন। শিক্ষিত স্বাপ্নিক বাঙালি তরুণ তো প্রথম কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখে, হতে চায় সাহিত্যসাধক। এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে তাকেও জীবনযুদ্ধে নামতে হয়। সে বড় কঠিন লড়াই। মধ্যবিত্ত-নিুমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের স্বপ্ন স্বভাবতই বাস্তবের কশাঘাতে চোট খায়। আস্তে আস্তে স্তিমিত হয় আবেগ আর জোয়ার। এদিকে জীবনও ক্রমে হয়ে উঠেছে জটিল, কুটিল আর কঠিন। সরল স্বাপ্নিক তরুণ জীবনযুদ্ধে লড়তে লড়তেও এর খেই ধরতে বেগ পান। সাহিত্যের নতুন ধারার সাথে একটু দূরত্ব তৈরি হয়। তাঁর কাল সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যেন থমকে যায়।

এদিকে সাংবাদিকতা যা কিনা দ্রুততার সাহিত্য বা লিটারেচার ইন এ হারি হিসেবে পরিচিত তার সাথে সৃজনশীল সাহিত্যের মৌলিক দ্বন্দ্বও অস্বীকার করা যাবে না। সাংবাদিকতার মনোযোগ সমকালের দিকে, সাহিত্যের সহজাত টান চিরকালের দিকে, সাংবাদিকতা তাৎক্ষণিকের দায় মেটায়, সাহিত্যের অনিষ্ট শাশ্বত সৃষ্টি, সাংবাদিকতায় আজকের বিষয় কালই বাসি হয়ে যায়, সাহিত্য অমরতার সন্ধানী। এই টানাপোড়েনে পড়ে মনের টান ছাপিয়ে জীবিকার তাগিদে সাংবাদিকতার পালে হাওয়া লেগেছিল একসময়। সাহিত্য তখন নোঙর করে বন্দরে কাল কাটিয়েছে।

তিনি হঠাৎ কখন তাঁর সুদীর্ঘকালের কর্মস্থল দৈনিক আজাদী থেকে অবসর নিলেন জানি না। হঠাৎ আবিষ্কার করি যে বিমলেন্দুদাদা অবসরে গেছেন। এটি স্বাভাবিকভাবেই হয়েছিল কিনা আমি জানি না, তবে এসব বিষয় নিয়ে কখনও কথা তোলেন নি তিনি। আমিও জিজ্ঞেস করি নি।

তবে স্বস্তি পেয়েছিলাম অবসরে এসে লেখালেখিতে তাঁকে মনোযোগী হতে দেখে। পরপর কয়েকটা বই বেরুল, ছেলেমেয়ে প্রতিষ্ঠিত, নতুন বইয়ের পরিকল্পনা করছেন। সব মিলে ভাল লাগছিল।

এমন সময় অকস্মাৎ ছন্দপতন। মাঝে একবার অসুস্থ হয়েছিলেন, কিন্তু তা আবার কাটিয়েও উঠেছিলেন। তারপর হঠাৎ শুনি বিমলেন্দুদাদা ঢাকায় মারা গেছেন। মনের পর্দায় ভেসে উঠল তাঁর স্মিত হাসিমুখ, শান্তমুখে হাসি ধরে পুরনো দিনের গল্প করছেন। সেইসব স্বপ্নময় সুদিনের কথাই মনে পড়ে যায় বিমলেন্দুদার সূত্রে। পুরনো দিনের স্বপ্নসমুদ্রে সাঁতার কাটাতে কাটতে সেই সময়ের এক নাবিকের প্রতি জানাই সৌহার্দময় শ্রদ্ধা।

Additional Info

  • Image: Image