২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৮ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ সোমবার, ০১ মে ২০১৭ইংরেজী
শুক্রবার, 22 জানুয়ারী 2016 03:32

বিমলেন্দু বড়ুয়াকে শ্রদ্ধা নিবেদন : আনিসুজ্জামান

লিখেছেনঃ আনিসুজ্জামান

বিমলেন্দু বড়ুয়াকে শ্রদ্ধা নিবেদন : আনিসুজ্জামান

আমি যখন চট্টগ্রামে ছিলাম তখন বিমলেন্দু বড়ুয়াকে চিনতাম-মূলত দৈনিক আজাদীর সাংবাদিক হিসেবে। পত্রপত্রিকায় তাঁর গদ্য পদ্য রচনাও দেখেছি, কিন্তু অভিনিবেশ-সহকারে তাঁর রচনাবলি অনুসরণ করার সুযোগ আমার হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর কনিষ্ঠা কন্যা অন্তি বড়ুয়ার সূত্রে তাঁর বইপত্র দেখার সুযোগ হলো। যে মানুষটিকে আমি একভাবে জানতাম, তাঁর অন্যরকম পরিচয় উদঘাটিত হতে লাগ। বিমলেন্দু বড়ুয়ার অপ্রকাশিত আত্মজীবনী ‘জীবন যেখানে যেমন’র যে অংশটি স্মরণপত্রে মুদ্রিত হয়েছে, তা পড়ে আশ্চর্য হতে হয়। রেঙ্গুনে তাঁর বাবা প্রিয়নাথ বড়ুয়ার স্টিলের ট্রাঙ্কের ব্যবসা ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি বোমার আঘাতে সর্বস্ব হারিয়ে পায়ে হেঁটে চট্টগ্রামে ফিরে এসে আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় নিতে হয় তাঁকে। পঞ্চাশের মন্বন্তরও করাল আঘাত হেনেছে তখন। নিজের গ্রাম কধুরখীলে এসে কৃষিকাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি। পুত্র বিমলেন্দু কধুরখীল হাইস্কুলে চতুর্থ শ্রেণী থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে আর পড়াশোনা চালাতে পারেননি অর্থাভাবে। তিনি জড়িয়ে পড়েন পিতার ক্ষেত খামারের কাজে, গো-পালনে। একদিন যখন স্কুল ইন্সপেক্টর এসেছেন কধুরখীল ইনাইটেড মুসলিম হাইস্কুল পরিদর্শনে, তখন অকস্মাৎ গোচারণক্ষেত্র থেকে বিমলেন্দুকে ধরে এনে বসিয়ে দেওয়া হলো চতুর্থ শ্রেণীতে। এমনই হলো যে, পরিদর্শকের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তিনি সন্তুষ্ট করলেন তাঁকে। আর সেই সন্ধ্যায় স্কুলের পণ্ডিত গিরিশচন্দ্র বিদ্যাবিনোদন তাঁদের বাড়ি গিয়ে আবার তাঁকে স্কুলে ভর্তি করার ব্যবস্থা করলেন। তিনি আরম্ভ করলেন সপ্তম শ্রেণী থেকে। বিনা বেতনে পড়া। তারপরও তিনি মাসের মাইনে বাকি পড়ায় পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ স্থগিত হয়ে যায়। আবার প্রধান শিক্ষকের দাক্ষিণ্যে ক্লাসে প্রথম হওয়া বিমলেন্দুর পড়াশোনা অগ্রসর হতে থাকে।

ভেঙে ভেঙে পড়াশোনা করে ১৯৫৮ সালে বি.এ. পাস করেন বিমলেন্দু বড়ুয়া। শুরু করেন স্কুলে শিক্ষকতা। সেখান থেকে ১৯৬৪ সালে চলে আসেন সাংবাদিকতায়। সূচনা হয় সফল পেশাজীবনের। সহকর্মীরা নানাভাবে উপকৃত হয়েছেন তাঁর কাছ থেকে, তাঁকে দিয়েছেন বিনম্র শ্রদ্ধা। সাংবাদিকতার পাশাপাশি চলেছে সাহিত্যচর্চা। কবিতা লিখেছেন, জীবনী লিখেছেন, জাতক কথা লিখেছেন, লিখেছেন ভ্রমণকাহিনী, লিখেছেন বাংলাদেশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিষয়ে। ইংরেজি ও বাংলায় ছোট ও বড় মিলিয়ে তাঁর ১৮টি রচনা প্রকাশিত হয়েছে, পাণ্ডুলিপি রয়ে গেছে আরো কয়েকটি। বিমলেন্দু বড়ুয়া কবিতা লিখেছেন সহজ সরল ভাষায়। ঝুঁকতে চেয়েছেন ছন্দের দিকে, সব সময়ে তা হয়ে ওঠেনি। তবে তাঁর গদ্য ছন্দের মধ্যেও অন্তনির্হিত রয়েছে পদ্যছন্দের বোধ। নিজের অনুভূতিকে তিনি প্রকাশ করেছেন প্রত্যক্ষভাবে। যেমন:

দিনের দুর্যোগ তাই দৈন্যের দীর্ঘতা

দীর্ঘ এক সাপের মতন

জড়ায় জটিল হয়ে

ঋজুদের জীবন-যৌবন।

যে বাতাস ঝিরিঝিরি তাও যেন নাগের নিশ্বাস

মরুর সাইমুম জ্বালায় দাহ করে দিন রাত

অনেক অনেক প্রাণ নীলিম-নির্যাস।

দুর্ভিক্ষে দীর্ণ দেশ। দুঃস্বপ্নে রাত্রিও মন্থর।

অসত্য অলীক আর ভয়ংকর দুঃখবাদে দেহ-মন দুই জর্জর।

(যন্ত্রণা যখন এই, মন পাব জেনে) তাঁর প্রেমের কবিতায় লক্ষ করি এক ধরনের দেহ-সচেতনতা: আশ্চর্য অনেক কথা বলেছি বিচিত্রভাবে

মুখোমুখি পেয়েছি যখন

মনখানি পাব জেনে হয়েছি মুখর,

অথচ প্রত্যকবার নির্ভাষে নীরব চোখে

বুদ্ধের মূর্তির মতো দিয়ে থাকো প্রশ্নের উত্তর।

অনুক্ত উত্তর তবু কী যে সুখ

সে তোমার মন জানে আর জানে

আহা দুই দৃঢ় বাহু পুরুষ্ট [পুরুষ্টু] অধর

কী যে সুখ উদ্ভাসিত নিচে তারা ফোটে যদি শরমার্ত সিক্ত কণ্ঠস্বর।

(‘মন পাব জেনে’, মন পাব জেনে) হৃদয়ানুভূতির প্রকাশে কবি অকুন্ঠিত, ভাষা ও ভঙ্গিও অনবগুণ্ঠিত, কিন্তু কবিত্বময়। বিমলেন্দু বড়–য়ার অন্য একটি কবিতা সম্পূর্ণতই উদ্ধৃতির যোগ্য :

আছি তো মাটির কাছে সবুজ মাঠে ঘাসে

আমাকে কোথায় পাবে তারা জ্বলা উজ্জ্বল আকাশে?

উজ্জ্বল অনন্য নই তারা কিংবা নক্ষত্র নিয়মে

আকাশের অমর আরামে

এ দেহে ধানের গন্ধ ঘামে তার সমুদ্রের লোনা

অনেক শ্রমের শ্রান্তির গন্ধের ঘোষণা;

এখানে কোথায় পাবে অতি নীল আকাশের স্বাদ,

মনে হবে এ জীবন অর্থহীন অনর্থক কলহ বিবাদ।

এতেও আনন্দ আছে

মাটিরঙ আলোছায়া-প্রান্তরের প্রাণ

পেয়ে যেন দুঃখ রাজ্যে

আরণ্য আদিম ঘ্রাণে শরীরের শত শিরা

গেয়ে ওঠে গান।

এই প্রাণ ঘ্রাণ আর গানের মমতা

বেশি যে বাসনা করি

তুচ্ছ মানি আকাশের চির অমরতা।

কাজেই খোঁজোনা [খুঁজো না] বৃথা কুঞ্জবনে বসন্ত বন্দরে।

আছি তো মাটির কাছে দেহে তার বহু বর্ণ রং

রঙিন মৃত্যু হোক, অমরতা চাই না বরং।

(‘ব্যবধান’, কথা ঝরাবার মোহ)

ইচ্ছে করলে কবিতাটির ত্র“টিও লক্ষ্য করা যাবে: নিয়মে ও আরামে বা হিসেবে ও উৎসবের মিল দুর্বল, হয়তো বন্দরে ও আসরে মিলও যথাযথ নয়; গন্ধ ও ঘ্রাণের অনাবশ্যক পুনরুক্তি; আকাশের অমর আরামে শব্দগুচ্ছ- ব্যবহারের অযৌচিত্য। বেঝা যায়, তাঁর কবিতা আরো একটু পরিচর্যার প্রত্যাশী ছিল, কিন্তু সাংবাদিক ও সাংসারিক জীবনের শত ব্যস্ততা সে সুযোগ দেয়নি। তবে একথাও অনস্বীকার্য যে, তা সত্ত্বেও কবিতাটি এই সুখদুঃখবিরহমিলন পরিপূর্ণ নশ্বর জীবনের প্রতি যে-অবিচলিত ভালোবাসা অভিব্যক্ত করেছে, এই শ্যামল ধরণীল প্রতি যে-আন্তরিক মমত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে, তা পাঠকমাত্রেরই হৃদয় স্পর্শ করে। তাঁর গদ্যগ্রন্থের মধ্যে ‘রঙ্গুম রঙ্গিলার দেশে’ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। লেখক দুবার বর্মা তথা মায়ানমার ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিলেন। একবার ১৯৭৭ সালে, শামসুর রাহমানের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের একজন হিসেবে। আরেকবার ২০০১ সালে, শুদ্ধানন্দ মহাথেরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের ২৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে। প্রথমবারে তাঁদের পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশ সরকার, পরেরবারে তাঁদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মায়ানমার সরকার এবং এবারে তিনি গিয়েছিলেন সস্ত্রীক। সহকর্মীদের অনুরোধে দুবারই পৃথকভাবে তাঁর অভিজ্ঞতা লিপিবদ্দ করেছিলেন। পরে সেই বিবরণ একসঙ্গে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়।

চট্টগ্রামের সঙ্গে বর্মার যে-দীর্ঘকালের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চলে এসেছে, বিমলেন্দু বড়ুয়ার নিজেও ছিলেন তার অংশভাগী। সেদেশ সম্পর্কে তাঁর যে-পূর্বধারণা ছিল, ভ্রমণকালে তা যাচাই করতে পেরেছেন, নতুন অনেক কিছু জানারও সুযোগ তাঁর হয়েছে।এসবই তিনি পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। যাযাবরের দৃষ্টিপাতের মতো এখানেও ইতিহাসের কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য লেখক পরিবেশন করেছেন সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও কিছু পরিচয় দিয়েছেন। অং সানের নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের কথা তিনি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেছেন, অং সান ও তাঁর সহকর্মীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শোক প্রকাশ করেছেন এবং নেউইনের নেতৃত্বাধীন সরকারের সমাজতন্ত্র অভিমুখে যাত্রাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। দ্বিতীয় বৃত্তান্তে লেখক উল্লেখ করেছেন বর্মায় সামাজিক শাসনের কথা, অং সান সুচির বন্দিত্বের কথা, গণতন্ত্রহীনতার কথা। একবার সখেদে বলেছেন শাসনতান্ত্রিক সংকট না ঘটলে দেশটি অনেক উন্নতি করতে পারতো। দেশটির পূর্ব ইতিহাস তিনি অনেক স্মরণ করেছেন, যেমন একাধিকবার স্মরণ করেছেন তাঁর পিতার রেঙ্গুন বাসকালীন ব্যবসার কথা, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে তার সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্তির কথা এবং অশেষ কষ্টের মধ্যে পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কথা। এই সময়কালীন ইতিহাসের পাশে আছে অতীতের নানা টুকরো কথা সম্রাট বাহাদুর শাহর প্রসঙ্গও তা থেকে বাদ পড়েনি।

রঙ্গুম রঙ্গিলার দেশে বইটির পূর্বাপর লেখকের প্রসন্নভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। ভালোমন্দ যা-ই ঘটুক, প্রসন্নচিত্তে তা গ্রহণ করার মতো আশ্চর্য ক্ষমতা তাঁর আছে। বইটিতে ছড়ানো আছে তাঁর কৌতুকবোধ। দ্বিতীয়বার বর্মা ভ্রমণে গিয়ে কর্মকর্তার কাছে তিনি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাতে বিব্রত হয়ে সেই কর্মকর্তা বলেছিলেন, আপনারা ধর্মীয় সফরে এসেছেন, নাচ-গান কি শোভা হবে? লেখক এতে চুপসে গেলেন বটে, কিন্তু মেয়ে নাচের প্রতি তাঁর আকর্ষণের কথা জানাতে বিব্রত বোধ করলেন না এবং বর্মী নর্তকীর নাচের নেশায় তার বড় জেঠার মতো কতজন যে সর্বস্বান্ত হয়েছে, সে খবরও পাঠককে জানালেন।

ভ্রমণকাহিনীটি অন্য একটি মাত্রা লাভ করে তাঁর বাল্যসহচরী ও পত্রমিতা মিনতির আবির্ভাবে। প্রথম পর্বের শেষে আমরা তাঁকে দেখতে পাই প্রথমে, কিন্তু তখন তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় পর্বের শেষে জানতে পারি, একদিন মিনতি তাঁকে ব্যাকুলভাবে আহ্বান জানিয়েছিল এবং তাঁর ডাক যদি আবার আসে তা দেখে লেখক এখনো আপ্লুত হন।

জাতক প্রেমকথায় জাতকের কাহিনী নিজের ভাষায় পরিবেশন করেছেন বিমলেন্দু বড়ুয়া। এর অধিকাংশেই নারীর হীনসন্তুষ্টির প্রকাশ পেয়েছে, তাই তা ভালো লাগার কথা নয়। কিন্তু জাতক-কাহিনী পরিবেশনে যে ভাষণ নির্মাণ করেছেন লেখক, তার একটা মোহনীয় আকর্ষণ আছে। সুবোধ ঘোষের ভারত-প্রেমকথার ভাষার যে-অপূর্ব ধ্বনিমাধুর্য ও শক্তি আছে। তার মাঝে জাতক প্রেমকথার ভাষা অতুলনীয়।

ক্রমে সূর্য অস্ত গেল। কালকের সূর্যের উদিত হল। দেবপুরীর ন্যায় সুযদ্দিন অরিষ্টপুরের সকলদিকে দীপমালা প্রজ্জ্বলিত হল। রাজা স্বর্ণাকারে বিভূষিত হয়ে অশ্ববাহিত রথে আরোহন করে অমাত্য মণ্ডলী পরিবৃত হয়ে মহাসমারোহে নগর প্রদক্ষিণ করতে যাত্রা করলেন। সর্বপ্রথমে উপস্থিত হলেন তিনি অতি পরিব্রাজকের গৃহদ্বারে। ঐ গৃহ রক্তাক্ত শিলাবর্ণের প্রকার দ্বারা বেষ্টিত। তোরণাদারও সুশোভিত। পরিবেশ পরম রমনীয়। এ-ভাষণ ঝংকারে পাঠকচিত্ত আকৃষ্ট না হয়ে পারে না।

সাহিত্যসৃষ্টিতে বিমলেন্দু বড়ুয়া নিজের নানাগুণের পরিচয় দিয়েছেন। যে স্বীকৃতি তাঁর প্রাপ্য তা তিনি পাননি। তাঁর বই, রচিত সাহিত্যকাব্য সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় বিধৃত হয়ে রয়েছে। তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করি।

ড. আনিসুজ্জামান : বিশ্ববরেণ্য শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক। দেশ নন্দিত বুদ্ধিজীবী।

Additional Info

  • Image: Image