২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৭ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 14 নভেম্বর 2016 19:10

কার্তিক পূর্ণিমার তাৎপর্য : ধর্ম সেনাপতি অগ্রশ্রাবক সারিপুত্র মহাস্থবির কোন পূর্ণিমাতে পরিনির্বাপিত হন?

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

কার্তিক পূর্ণিমার তাৎপর্য : ধর্ম সেনাপতি অগ্রশ্রাবক সারিপুত্র মহাস্থবির কোন পূর্ণিমাতে পরিনির্বাপিত হন?

আজ কার্ত্তিক পূর্ণিমা। আমরা জানব এই পূর্ণিমার কী ঘটেছিল?

ত্রিপিটক শাস্ত্রে অসাধারণ জ্ঞানী অগ্রশ্রাবক সারিপুত্র স্থবির ছিলেন পন্ডিত, ধীমান, যশস্বী, মহাপ্রাজ্ঞ, ক্ষিপ্র প্রত্যুৎপন্ন, তীক্ষ্ম প্রাজ্ঞ ও বিরাগ প্রাজ্ঞ । একদিন সারিপুত্র মহাস্থবির ফল সমাপত্তি ধ্যান হতে উঠে চিন্তা করছিলেন যে বুদ্ধ আগে পরিনির্বাপিত হবেন না অগ্রশ্রাবক আগে পরিনির্বাপিত হবেন? তিনি নিজের আয়ু সংষ্কার অবলোকন করে দেখলেন যে, সপ্তাহ মাত্র আয়ু অবশিষ্ট আছে। এসময় তিনি কোথায় পরিনির্বাণ যাবেন চিন্তা করত: নিজ মাতার কথা মনে পড়ল। যিনি এখন ও মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন। সারিপুত্রের তিন বোন চালা, উপচালা ও শিশুচালা। তিন ভাই ছন্দ, উপসেন ও রেবত এই সাতজন অরহতের গর্ভধারিণী হয়ে যদি কোন মার্গফল প্রাপ্ত ছাড়া মৃত্যুবরণ করে তাহলে লোকেরা বলবে সারিপুত্র বহু লোকের মুক্তিদাতা বটে, কিন্তু স্বীয় জননীর মিথ্যাদৃষ্টি দূর করতে সমর্থ নহেন। অত:পর তিনি গভীর মনোযোগ সহকারে চিন্তা করে দেখলেন যে, আমার উপদেশেই আমার মা ধর্মচক্ষু লাভ করবেন। তিনি তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধের চরণতলে বন্দনা করত: বললেন, ভগবান মাতৃদর্শন এবং কার্তিকী পূর্ণিমা তিথিতে পরিনির্বাণ লাভের অনুমতি প্রদান করুন।

ভগবান বুদ্ধ স্বীয় প্রধান শিষ্যের মস্তকে দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করে নীরবে সম্মতি দান করত: জিজ্ঞেস করলেন, সারিপুত্র কোথায় পরিনির্বাপিত হবে? সারিপুত্র বললেন, ভগবান মগধরাজ্যের নালক গ্রামে জাত প্রকোষ্টে। অতপর সারিপুত্র স্থবির তথাগতের পদ বন্দনা করে একতাল প্রমাণ উর্ধ্বাকাশে উর্ধ্বগমন করলেন এবং অবতরণপূর্বক পুন: বুদ্ধকে বন্দনা করে আবার সপ্ততাল প্রমাণ উর্ধ্বে অবস্থান নিলেন। সেখানে বিভিন্ন প্রকার ঋদ্ধি প্রদর্শন ও দেশনা করে নেমে আসলেন। প্রভু বুদ্ধকে আবার বন্দনা করে বললেন, প্রভু এখন আমরা প্রস্থানের সময়। সারিপুত্রের সে বিদায় ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। অত:পর ধর্মসেনাপতি সপ্তাহকাল পথ পরিক্রমা করে স্বীয় জন্মভূমি নালক গ্রামের সীমান্তে উপস্থিত হয়ে দেখা পেলেন তদীয় ভাগিনা উপরেবতকে। উপরেবতকে বললেন, তোমার মাতামহীকে গিয়ে বলবে, আমার জন্য জাত প্রকোষ্টে এবং ৫০০ জন ভিক্ষুর শয়নাসন প্রস্তত করতে। সারিপুত্রের আগমন সংবাদ ব্রাক্ষ্মণীকে দিলে ব্রাক্ষ্মণী বিরক্ত হয়ে বলল যৌৌবনে প্রব্রজিত হয়ে বৃদ্ধকালে গৃহী হবার জন্য বাড়ী আসছে।

এত লোকের শয়নাসন কিভাবে করব? তবু সন্তানের প্রতি মমতাপরায়ণ মাতা সারিপুত্র স্থবিরের জন্য জাত প্রকোষ্টে এবং অন্যদের জন্য আলাদা গৃহে আসন প্রস্তুত করে প্রদীপাদি জ্বালিয়ে সারিপুত্রকে গৃহে আগমনের সংবাদ দিলেন। সারিপুত্র জাত প্রকোষ্টে এবং অন্যান্যদের স্ব স্ব স্থানে পাঠিয়ে দিলেন। তখন তার ভীষণ রক্ত আমাশয় রোগ উৎপন্ন হল। এক পাত্র বাইরে ফেললে আর এক পাত্র ভিতরে আনতে হয়। ব্রাক্ষ্মণী নিজ কক্ষে দাড়িয়ে সারিপুত্রের এমন অবস্থা দেখে বললেন, পুত্রের এমন অবস্থা আমার মোটেও ভালো লাগছে না। কিছুক্ষণ পর সারিপুত্রের এই রোগাক্রান্ত অবস্থায় তার সেবা করার জন্য চারিদিক আলোকিত করে চারি লোকপাল দেবতারা এসে স্থবিরের সেবা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। স্থবির প্রয়োজন হবে না বলে তাদের বিদায় দিলেন। এরপর স্বীয় জ্যোতি বিকিরণ করে দেবরাজ ইন্দ্র, তারপর মহাজ্যোতি বিচ্ছুরিত করে ব্রক্ষ্মলোকের মহাব্রক্ষ্মারা স্থবিরের সেবা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। স্থবির প্রয়োজন হবে না বলে তাদের বিদায় দিলেন। সারিপুত্রের মাতা সারী ব্রাক্ষ্মণী দেবতা-ব্রক্ষ্মাদের স্বীয় জ্যোতিতে প্রাসাদ আলোকিত করার দৃশ্য এবং তাদের আগমন নির্গমন স্বচক্ষে অবলোকন করে পুত্রের কক্ষের দরজায় গিয়ে দাড়ালেন। সেবক চুন্দ মায়ের উপস্থিতির কথা স্থবিরকে অবহিত করলেন। অতপর ব্রাক্ষ্মণী সারিপুত্রের সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে পুত্র! সমস্ত ঘর আলোকিত করে প্রথমে কারা এসেছিল? পুত্র বললেন – চারি লোকপাল দেবতারা আমার সেবা করতে এসেছিল।

মাতা বললেন, তুমি কি তাদের চেয়ে বড়? উনারাতো আমার বিহারের সেবক ছেলের মত। মাতা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, সমস্ত প্রাসাদ উদ্ভাসিত করে কারা এসেছিল? উপাসিকা, উনি দেবরাজ ইন্দ্র। তুমি কি দেবরাজ ইন্দ্রের চাইতে বড়? হ্যা উপাসিকা, দেবরাজ ইন্দ্র আমার বিহারের ভান্ড গ্রহণকারী শ্রমণের মত। এবার মাতা জানতে চাইলেন, সমগ্র এলাকা উজ্জ্বল আলোতে ঝলমল দিব্যজ্যোতি বিকিরণ করে যিনি এসেছিলেন উনি কে? সারিপুত্র বললেন, উনি আপনার ভগবান মহাব্রক্ষ্ম। হে পুত্র, তুমি কি মহাব্রক্ষ্ম হতে মহান? হ্যা উপাসিকা আমি মহাব্রক্ষ্ম হতে মহানতর। পুত্রের কথা শুনে ব্রাক্ষণীর অন্তরে আনন্দের শিহরণ বয়ে গেল। আমার পুত্রের এতগুণ যে, চারিলোকপাল দেবতা, দেবরাজ ইন্দ্র, আমার ভগবান সেই মহাব্রক্ষ্মা পর্যন্ত আমার ছেলের সেবা করতে আসে, না জানি আমার পুত্রের যিনি গুরু তিনি কত গুণধর। তার ধর্ম কত সুমহান। সারিপুত্র মায়ের মনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বললেন, মা আমাদের ভগবানের জন্মক্ষণে, গৃহত্যাগ করার সময়, বুদ্ধত্ব লাভকালে, ধর্মচক্র প্রবর্ত্তনের সময় দশ সহস্র চক্রবাল কেঁপে উঠেছিল।

শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা ও বিমুক্তিজ্ঞানে তার সমতুল্য আর কেউ নেই। এই বলে তিনি তথাগতের নবলোকোত্তর ধর্ম দেশনাকালে ব্রাক্ষ্মণী পুত্রের সদ্ধর্ম শ্রবণে সন্দীপ্ত ও উদ্দীপ্ত হলে সম্যকরূপে ধর্ম অবধারণ করে স্রোতাপত্তি মার্গফলে উপনীত হলেন। সারিপুত্র ভাবলেন, আজ আমি মাতৃঋণ শোধ করলাম। এরপর তিনি মাতাকে বিদায় দিয়ে ভিক্ষুসংঘকে সমবেত করলেন। ভিক্ষুসংঘকে লক্ষ্য করে বললেন, ৪৪ বছরব্যাপী তোমাদের সাথে থাকাকালীন যদি আমার দ্বারা কোন মনোবেদনা পেয়ে থাক আমাকে ক্ষমা কর। কারণ ক্ষমা মহত্বের লক্ষণ। ধর্ম সেনাপতির বাক্য শ্রবণে ভিক্ষুগণ সংকোচে বললেন, আপনি এতদিন আমাদের ছায়ার মত ছিলেন ভান্তে। আপনার প্রতি জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে কায়-মনো-বাক্যে অবজ্ঞা বা অবহেলা করে থাকলে আমাদের ক্ষমা করে দিন। সেদিন ছিল কার্ত্তিক পূর্ণিমা। পূর্ব দিকে সূর্য উকি দিচ্ছে এমন সময় মহাপৃথিবী কম্পিত করে বুদ্ধের ধর্মশাসনের সেনাপতি ধর্মচক্রের অনুপ্রবর্ত্তক মৈত্রী পরায়ণ প্রজ্ঞাগুণে প্রতিমন্ডিত অগ্রশ্রাবক সারিপুত্র অনুপাদিশেষ পরিনির্বাণে বিলীন হলেন।

সূত্র : বুদ্ধ জীবন পরিক্রমা, দীপংকর বড়ুয়া

Additional Info

  • Image: Image