২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১২ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 21 ফেব্রুয়ারী 2016 02:39

তথাগত মহাকারুণিক বুদ্ধের আয়ুসংষ্কার বিসর্জন

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

তথাগত মহাকারুণিক বুদ্ধের আয়ুসংষ্কার বিসর্জন

মাঘী পূর্ণিমা দিবসে মহাকারুণিক বুদ্ধ বৈশালীতে পিন্ডাচরণ শেষে আনন্দকে নিয়ে বৈশালীর অদূরে চাপাল চৈত্যে এসে উপস্থিত হয়ে তাঁর জন্য বি¯তৃত আসনে উপবেশন করতঃ আনন্দকে লক্ষ্য করে বললেন, ”হে আনন্দ,! রমণীয় বৈশালী, রমণীয় উদেন চৈত্য, রমণীয় গৌতমক চৈত্য, রমণীয় সত্ত্স্ব চৈত্য, রমণীয় বহুপুত্র চৈত্য, রমণীয় আনন্দ চৈত্য, রমণীয় চাপাল চৈত্য। হে আনন্দ, যে কারো চারি ঋদ্ধিপাদ ভাবিত বর্ধিত, বহুলীকৃত, রথগতি সদৃশ্য, অনর্গল অভ্যস্থ বাস্তুভূমি সদৃশ্য প্রতিষ্ঠিত অধিষ্ঠিত পরিচিত্ত সম্যক নিষ্পাদিত হয়েছে ইচ্ছা হলে তিনি কল্পকাল অথবা ততোধিককাল জীবিত থাকতে পারেন। ” এখানে চারি ঋদ্ধিপাদ মানে ছন্দ, বীর্য, চিত্ত ও বীমংস এই চারটি ঋদ্ধির স্তরকে বুঝানো হয়েছে অর্থাৎ ধ্যানের সর্বস্তরে আরোহন করে অসাধারণ অলৌকিক শক্তির অধিকারী হওয়া। অলৌকিক শক্তির প্রভাব দ্বারা নৈর্বাণিক লৌকিক সবকিছুকে প্রজ্ঞাদ্বারা দর্শন। প্রীতিসুখ, একাগ্রতা, দৃঢ়বীর্য, দৃঢ়চিত্ত সহকারে অবলোকন অনুসন্ধান ও ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করার ক্ষমতা। ”হে আনন্দ, তথাগতের চারি ঋদ্ধিপাদ ভাবিত বর্ধিত, বহুলীকৃত, রথগতি সদৃশ্য, অনর্গল অভ্যস্থ বাস্তুভূমি সদৃশ্য প্রতিষ্ঠিত অধিষ্ঠিত পরিচিত্ত সম্যক নিষ্পাদিত হয়েছে ইচ্ছা হলে তিনি কল্পকাল অথবা ততোধিককাল অবস্থান করতে পারেন। ”
মার কর্ত্তৃক অভিভূত হইয়া সাধারণ ব্যক্তি যেমন বুঝিতে অসমর্থ হয় সেইরূপ আয়ুষ্মান আনন্দও বুঝিতে পারিলেন না। যাঁহাদের দ্বাদশ “বিপল্লাস” (বিপরীত সজ্ঞা) ত্যাগ হয় নাই, তাঁহারাই মার কর্ত্তৃক অভিভূূত হইয়া পড়েন। আয়ুষ্মান আনন্দের এখনও চারিটি “বিপল্লাস” (অশুভে শুভ বলিয়া সংজ্ঞা বিপল্লাস ও চিত্ত বিপল্লাস, দুঃখে সুখ বলিয়া সংজ্ঞা বিপল্লাস ও চিত্ত বিপল্লাস) ত্যাগ হয় নাই। তদ্ধেতু তিনি মারের ভীষণরূপ দেখিয়া; বিকট শব্দ শুনিয়া ভগবানের ভাষিত বিষয়ের তাৎপর্য্য বুঝিতে পারিলেন না।

দ্বিতীয়বার ও তৃতীয়বার ও কথাটি উচ্চারণ করলে ভদন্ত আনন্দের চিত্ত মার কর্তৃক অভিভূত হয়েছিল বলে তথাগতের এরূপ সুষ্পষ্ট ইঙ্গিত আনন্দ বুঝতে সক্ষম হলেন না। তিনি তথাগতকে দেব-মানবের হিতার্থে কল্পকাল বেঁচে থাকার জন্য প্রার্থনা করলেন না। তিনি নিশ্চুপ রইলেন। তখন বুদ্ধ বললেন, আনন্দ তুমি এখন যথাস্থানে গমন কর।
তখন পাপমতি মার তথাগতের নিকট উপস্থিত হয়ে প্রার্থনা করলেন যে, হে সুগত, এখন আপনি পরিনির্বাপিত হউন। হে সুগত, আপনি গয়ার বোধিবৃক্ষমূলে বোধিজ্ঞান লাভ করার পর যখন ৫ম সপ্তাহে অজপাল বৃক্ষমূলে অবস্থান করছিলেন তখন আপনি বলেছিলেন যে যতদিন পর্যন্ত আমার শ্রাবকসংঘ আর্য্যমার্গ লাভ করে বহুশ্র“ত বিশারদ পরনিন্দার ধর্মত প্রতিবাদে ভালরূপে দেশনা করতে সমর্থ হবে না ততদিন আমি পরিনির্বাপিত হব না।
আমার ভিক্ষুণীসংঘ যতদিন বিনীতা নিপুনা ধর্মচারিনী হয়ে বিধর্মীদের মিথ্যাদৃষ্টি অপনোদনে সক্ষম হবে না অনুরূপভাবে গৃহী উপাসক-উপাসিকাবৃন্দ আর্য্যমার্গ লাভ করে সুনিপুণ ধর্মানুচারী হয়ে পরমত খন্ডনে অভিজ্ঞতা লাভ করবে না তাবৎ আমি নির্বাপিত হব না।

হে সুগত ! এখন আপনার প্রচারিত ধর্ম জনসমাজে প্রচার জ্ঞাপন, স্থাপন, উম্মোচন বিভাগ এবং ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। ভন্তে ভগবান এখন আপনি পরিনির্বাপিত হোন, এখন আপনার পরিনির্বাণের যথোচিত সময় হয়েছে। বৌদ্ধ সাহিত্যে ৫ প্রকার মারের কথা উল্লেখ আছে।

১) ষ্কন্ধ মার, ২) মৃত্যুমার, ৩) অভিসংষ্কার মার, ৪) ক্লেশ মার, ৫) দেবপুত্র মার। দেবপুত্র মার পরনির্মিত বশবর্ত্তী স্বর্গের অধিপতি হলেও কামলোকে মারের অখন্ড প্রভাব রয়েছে। তাবতিংস স্বর্গের অধিপতি দেবরাজ ইন্দ্র মানুষের সৎকার্যের সহায়ক ও সৎ পুরুষের বন্ধু। অপরদিকে মার মানুষের অমঙ্গল কার্য্যরে সহায়ক। মানুষকে কু-প্রলোভনে মুগ্ধ করে বিপদগ্রস্থ করে। বুদ্ধ প্রমুখ শ্রাবকসংঘ, প্রজ্ঞাবান, শীলবান, ধ্যানপরায়ন মানুষ পৃথিবীতে না থাকলে মার তার প্রভাব বিস্তার করে মানুষকে নরকগামী করে তার রাজত্ব কায়েম করাই মারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। মহাকারুণিক বুদ্ধের বুদ্ধত্ব লাভের আগে ও পরে বুদ্ধকে বিপদগ্রস্থ ও সংকল্পচ্যুত করার জন্য মার দেবতা অনেক চেষ্টা করেছিল। বুদ্ধের দৃঢ় বীর্যের কাছে মারের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল।

বাহুস্সুতা ত্রিপিটক বুদ্ধবাক্য বশে বহুশ্রুত এবং পটিবেধ বহুশ্রুত। ধম্মধারা পরিয়ত্তি (ত্রিপিটক) ও পটিবেধ ধর্ম্মধারী। ধম্মানুধম্ম পটিপন্না আর্য্য ধর্ম্মের অনুধর্ম্মভূত বিদর্শন ধর্ম্ম প্রতিপন্ন। সকং আচরিযকং স্বীয় আচার্য্য (সম্যকসম্বুদ্ধের বাদ। ব্রহ্মচরিযং শিক্ষাত্রয়(অধিশীল, অধিচিত্ত, অধিপ্রজ্ঞা-শিক্ষা) সংগৃহীত সমস্ত শাসন ব্রহ্মচর্য্য। অপ্পোস্সুক্কো ত্বং পাপিম হোহিÑহে পাপমতিমার, তুমি যে সম্বোধিলাভের অষ্টম সপ্তাহ হইতে “ভন্তে ভগবন্, এখন আপনি পরিনির্ব্বাপিত হউন, সুগত, পরিনির্বান প্রাপ্ত হউন” বলিয়া প্রার্থনা করিয়া আসিতেছ, এখন হইতে তুমি নিশ্চেষ্ট হও, আমার পরিনির্বানের জন্য আর চেষ্টা করিতে হইবে না।
অচিরেই তথাগতের পরিনির্বাণ হবে। অদ্য হতে ৩ মাস পরে অর্থাৎ আগামী বৈশাখী পূর্ণিমা দিনে তথাগত পরিনির্বাপিত হবেন। চাপাল চৈত্যে মাঘী পূর্ণিমা দিবসে তিনি স্মৃতি ও জ্ঞানযোগে আয়ু সংষ্কার বিসর্জন করলেন।
তথাগতের পরিনির্বাণের সময় ঘোষণা ও আনন্দের প্রতিক্রিয়া ঃ

চাপাল চৈত্যে তথাগতের আয়ু বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ঘন বৃষ্টি বর্ষিত হইল। অকাল বিদ্যুৎ দৃষ্ট হল অতি ভীষণ লোমহর্ষকর ভূমিকম্প আরম্ভ হল। সেই মুহুর্তে আনন্দ বুদ্ধের নিকট এসে অত্যন্ত বিষ্ময়ের সহিত এই অদ্ভুত ও আশ্চর্য্য লোমহর্ষকর ভূমিকম্পের কারণ বুদ্ধের নিকট জানতে চাইলেন। উত্তরে বুদ্ধ ভূমিকম্পের ৮টি কারণের কথা বললেন ----
১। এই মহাপৃথিবী জলের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এই জল বায়ুতে প্রতিষ্ঠিত। যখন মহাবায়ু প্রবাহিত হয় তখন জল কম্পিত হয়। জল কম্পিত হলে পৃথিবী কম্পিত হয়।
২। যেই কোন চিত্তজয়ী ঋদ্ধিমান শ্রমণ ব্রাক্ষ্মণ অথবা মহানুভব সম্পন্ন দেবতার যদি পৃথিবী সংজ্ঞা অপ্রমাণ সু-ভাবিত হয় তাহলে তিনি ইচ্ছা করলে এ মহাপৃথিবী কম্পিত ও প্রকম্পিত করতে পারেন।
৩। যে মুহুর্তে বোধিসত্ত্ব স্বর্গ চ্যুত হয়ে সমৃদ্ধি সম্প্রযুক্ত জ্ঞানে মাতৃগর্ভে অন্তিম জন্মগ্রহণ করেন সেই মুহুর্তে পৃথিবী কম্পিত হয়।
৪। যে শুভক্ষণে বোধিসত্ত্ব মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্ক্রান্ত হন সেই মুহুর্তে পৃথিবী কম্পিত হয়।
৫। তথাগত যে মুহুর্তে বোধিজ্ঞান লাভ করেন সেই মুহুর্তে পৃথিবী কম্পিত হয়।
৬। যেই শুভক্ষণে তথাগত ধর্মচক্র প্রবর্ত্তন করেন সেই মুহুর্তে পৃথিবী কম্পিত হয়।
৭। যখন তথাগত স্মৃতি সম্প্রযুক্ত জ্ঞানে আয়ু সংষ্কার বিসর্জন দেন সেই মুহুর্তে পৃথিবী কম্পিত হয়।
৮। যখন তথাগত আনুপাদিশেষ নির্বাণ ধাতুতে পরিনির্বাপিত হন তখন এই মহাপৃথিবী কম্পিত হয়।

তখন স্মৃতিমান আনন্দের আর বুঝতে বাকী রইলো না যে তথাগত নিশ্চয়ই আজ আয়ু সংষ্কার বিসর্জন দিয়েছেন। আনন্দ অশ্র“সজল চোখে কিছু বলতে চাইলে বুদ্ধ তাকে সেই চিন্তার অবকাশ না দিয়ে গম্ভীর ধর্মভাষণ করতে লাগলেন। ”হে আনন্দ, আমি যখন গয়ার বোধিমূলে বুদ্ধত্ব লাভ করার পর ৫ম সপ্তাহে অজপাল বৃক্ষের নীচে অবস্থান করছিলাম তখন এই পাপমতি মার বলেছিল, ভগবান আপনার সাধনা সিদ্ধ হয়েছে। আপনার ইষ্পিত বিষয় প্রাপ্ত হয়েছেন। এখন আপনি পরিনির্বাপিত হউন। তখন আমি মারকে বলেছিলাম, ততদিন পর্যন্ত আমি নির্বাপিত হব না যতদিন আমার ভিক্ষুসংঘ-ভিক্ষুণীসংঘ, উপাসক-উপাসিকা সম্যকরূপে গঠিত না হয়। আর্যমার্গ ও ফলের অধিকারী না হবে, নিপুণ বিশারদ, বহুশ্রুত, পরবাদ খন্ডনে সক্ষম না হবে। কিছুক্ষণ আগে পাপমতি মার এসে আমাকে সে কথা স্মরণ করে দিয়ে নির্বাপিত হবার জন্য প্রার্থনা জানালে আমি সজ্ঞানে স্মৃতি সহকারে আয়ু সংষ্কার বিসর্জন দিয়েছি। বুদ্ধের এ উক্তি শ্রবণ করে আনন্দ মর্মান্তিক দুঃখ ও শোকে অভিভূত হয়ে প্রার্থনা করলেন। ভগবান জগতের কল্যাণার্থে দয়া করে কল্পকাল অবস্থান করুন। একই কথা আনন্দ তিনবার বলার পর বুদ্ধ বললেন, হে আনন্দ, তথাগতের সম্বুদ্ধত্বে তোমার শ্রদ্ধা আছে কি? হ্যাঁ প্রভু আছে। তাহলে কেন তুমি বার বার তথাগতকে অনুরোধ করছ? ইতিপূর্বে গৃধ্নকুট পর্বতে উদেন চৈত্যে বহু স্থানে আমি তোমাকে পুনঃ পুনঃ বলেছি যে কারো চার ঋদ্ধিপাদ ভাবিত বর্ধিত, বহুলীকৃত, রথগতি সদৃশ্য, অনর্গল অভ্যস্থ বাস্তুভূমি সদৃশ্য প্রতিষ্ঠিত সম্যক নিষ্পাদিত হয়েছে ইচ্ছা হলে তিনি কল্পকাল অথবা ততোধিককাল জীবিত থাকতে পারেন। ”এ চাপাল চৈত্যেও একই কথা তোমাকে বলেছি একটু আগে কিন্তু আনন্দ তুমি তো কোন সময়ে কোথাও কল্পকাল অবস্থান করার জন্য প্রার্থনা জানাওনি। দুইবার তোমার প্রার্থনা উপেক্ষা করলেও তৃতীয়বার তথাগত নিশ্চয়ই সম্মত হতেন। এটা তোমারই অপরাধ।

আজ থেকে ৩ মাস পরে তথাগত পরিনির্বাপিত হবেন। এটা সুনিশ্চিত। ইহা তথাগতের অদ্বিতীয় বাক্য। কিছুতেই প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। এমনকি জীবন হেতুও নয়। মাঘী পূর্ণিমা দিবসে ভগবান্ বৈশালীস্থ চাপালÑচৈত্যে স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞান অবস্থায় স্বীয় আয়ুসংস্কার বিসর্জ্জন করেন। তৎপর আয়ুষ্মান আনন্দ শোকাভিভূত হইলে, তাঁহাকে নানা প্রকারে সান্ত্বনা দিয়া বৈশালীর মহাবনে কূটাগার শালায় আগমন করেন। তথায় ভিক্ষু-সঙ্ঘ সমবেত করাইয়া যে সপ্তত্রিংশ বোধি-পক্ষীয় ধর্ম্মের অবতারণা করেন সূত্রে কেবল তাহাদের নাম মাত্রই উল্লেখ হইয়াছে। যেহেতু অন্যান্য বহু সূত্রে এইগুলি বিশদ ভাবে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। এইগুলি বুদ্ধ-ধর্ম্মের মূল তত্ত্ব, যতই উহাদের অর্থ গবেষণা এবং ভাবনা করা যাইবে ততই মানস রতœ কোযে পরম দুর্ল্লভ রত্ন সঞ্চিত হইবে। সেই সমূদয় ভগবান্ কর্ত্তৃক অভিজ্ঞানেই সুদেশিত। সেইগুলির শুধু নাম মাত্র জানিলে কাজ হইবে না। সুচারুরূপে জানিবার জন্য পালি ভাষায় অভিজ্ঞতা লাভই অত্যুত্তম। তথাগতের আয়ু সংষ্কারের সেই বেদনা বিধূর দিনটি ছিল মাঘী পূর্ণিমা।

লেখক ঃ কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক ঃ নির্বাণা পিস ফাউন্ডেশন, সহযোগী সম্পাদক ঃ নির্বাণা (www.nirvanapeace.com), This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

সূত্র ঃ মহাপরিনর্বাণ সূত্র, রাজগুরু শ্রী ধর্ম্মরত্ন মহাস্থবির, বিনয় বিশারদ।
দীপংকর বড়ুয়া রচিত বুদ্ধ পরিক্রমা।

Additional Info

  • Image: Image