২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৫ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ বুধবার, ২৯ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 27 সেপ্টেম্বর 2015 00:34

ভাদ্র পূর্ণিমা এবং তথাগত বুদ্ধের পারিল্যেয় বনে ১০ম বর্ষাবাস যাপন

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

ভাদ্র পূর্ণিমা এবং তথাগত বুদ্ধের পারিল্যেয় বনে ১০ম বর্ষাবাস যাপন

ভগবান বুদ্ধ কৌশাম্বীর ঘোষিতরামে অবস্থান করার সময় এক সংঘারামে ২ জন ভিক্ষু বাস করতেন। একজন বিনয়ধর, অপরজন সৌত্রান্তিক। সৌত্রান্তিক একদিন পায়খানায় গমন করে সৌচের অবশিষ্ট জল পাত্রে রেখে আসেন অল্পক্ষণ পরে বিনয়ধর পায়খানায় গিয়ে রেখে আসা অবশিষ্ট জল দেখে সৌত্রান্তিক ভান্তেকে বললেন, আপনি কি পাত্রে জল রেখে এসেছেন? জবাব দিলেন হ্যাঁ বন্ধু। তাতে যে অপরাধ হয় সেই বিষয় কি ্আপনার জানা আছে? আমি তা মনে করি না বন্ধু। এইরূপ করলে কিন্তু অপরাধ হয়ে থাকে। সৌত্রান্তিক বললেন যদি অপরাধ হয় তাহলে আমি তার প্রতিকার করব। যদি ভুলবশতঃ করেন তাহলে অপরাধ হবে না। সৌত্রান্তিক তার অপরাধকে অপরাধ মনে করলেন না, প্রথমে ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করলেও পরে তাও অস্বীকার করলেন। এতে বিনয়ধর তার শিষ্যগণকে সৌত্রান্তিক ভিক্ষুর বিনয় বিরুদ্ধ আচরণের বিষয় জানালেন। তখন সেই শিষ্যরা আবার সৌত্রান্তিক ভিক্ষুর শিষ্যদের নিকট গিয়ে বলতে লাগলেন তোমাদের গুরু অপরাধ-নিরপরাধ বুঝেন না। শ্রামণ্য ধর্মের নিয়ম-কানুন বুঝেন না ইত্যাদি বলে সৌত্রান্তিক ভিক্ষুর নিন্দা করতে লাগলেন। সৌত্রান্তিক ভিক্ষুর শিষ্যরাও তাদের গুরুর নিন্দা সহ্য করতে না পেরে তাদের গুরু বিনয়ধরের নিন্দা করতে লাগলেন। এভাবে উভয় গুরুর শিষ্যেরা পরষ্পর পরষ্পরের প্রতি দুর্ব্যবহার করতে লাগলেন। মিথ্যাবাদী অবিনয়ী অধার্মিক অপরাধী ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করে কলহ শুরু করে দিলেন। ক্রমে এই কলহ গুরুতর আকার ধারণ করলে। বিষয়টি ভগবানের কর্ণগোচর হলে ভগবান উভয়কে ডেকে ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করে সংঘের শৃংখলা বজায় রাখার জন্য উপদেশ প্রদান করেন। কিন্তু ভিক্ষুরা বুদ্ধের উপদেশ উপেক্ষা করে একদল অন্যদলের সঙ্গে আহার-বিহার ও বিনয় সম্বন্ধীয় কার্যাদি হতে বিরত রইলেন। একদল সীমার অভ্যন্তরে অন্যদল সীমার বাইরে সংঘকর্ম করতেছিল। একজন অন্যজনকে বাক্যবাণে বিদ্ধ করছিলেন, এমতাবস্থায় বুদ্ধ আবারও উভয়ের কাছে সংঘের একতা, সংঘভেদের অপকারিতা বিষয়ে জ্ঞান দান করেন। যাতে সংঘের শৃংখলা বিনষ্ট না হয়। পরষ্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য স্থাপনের পরামর্শ দিলেন। বিবাদ বিসম্বাদ মনে না রাখার জন্য উপদেশ দিলেন এবং এই প্রসঙ্গে ”দীর্ঘ কারায়ণের” নাতিদীর্ঘ কাহিনী শুনালেন। এতে ভিক্ষুরা ভগবানকে এ ব্যাপারে নীরবতা পালন করার জন্য আহবান জানালে ভগবান আক্ষেপ করে বললেন, অহো ভিক্ষুসংঘ বিভক্ত হয়ে পড়ল! অতঃপর ভগবান কৌশাস্বীর এই কলহপ্রিয় ভিক্ষুদের সঙ্গ ত্যাগ করে একাকী বাস করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং পূর্বাহ্নে পাত্র চীবর নিয়ে একাকী কৌশাম্বীতে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করে আহারকৃত সমাপন করে পারিল্যেয় বনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে প্রাচীন বংশদাব নামক স্থানে অনুরুদ্ধ, নন্দিয় ও কিম্বিল নামক যশস্বী ভিক্ষুত্রয়কে ধর্ম উপদেশ প্রদান করে ক্রমে বিচরণ করতে করতে পারিল্যেয় বনে প্রবেশ করলেন। বনে প্রবেশ করে রক্ষিত বনখন্ডে ভদ্রশাল বৃক্ষমূলে অবস্থান গ্রহণ করেন। সেই অবস্থানে ধ্যানস্থ হয়ে তিনি মনে মনে এ বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন যে, বহুবাক্য ব্যয়ী, বৃথাবাক্য ব্যয়ী, বিবাদকারী, কলহকারী কৌশম্বীর ভিক্ষুগণ হতে পৃথক হয়ে আমি অত্যন্ত সুখে অবস্থান করছি।

হস্তীরাজ কর্তৃক সেবা দান ও বানর কর্তৃক মধুদান ঃ সেই সময়ে একটি হস্তীরাজ তার দলের হস্তী, হস্তীনি, হস্তী শাবকদ্বারা উপদ্রুত হয়ে যুথ পরিত্যাগ পূর্বক একাকী বিচরণ করার মানসে পারিল্যেয় বনে ভদ্রসাল বৃক্ষমূলে ভগবানের নিকট উপস্থিত হল। হস্তীরাজ মনে মনে চিন্তা করছিল হস্তী-হস্তীনি যুবক হস্তী ও হস্তী শাবকেরা প্রতিনিয়ত আমাকে নানাভাবে উৎপীড়ন করেছে, আমার আহার-বিহার বিঘœ সৃষ্টি করত, আমার নির্দেশ অমান্য করে যত্র-তত্র গমনাগমন করত তাদের থেকে পৃথক হয়ে আমি নিরাপদে স্বচ্ছন্দে অবস্থান করছি। ভগবান বুদ্ধ জ্ঞান দ্বারা হস্তীর মনোভাব অবহিত হয়ে এই উদান গাথা উচ্চারণ করলেন ----

ঈষাদন্ত দীর্ঘদন্ত হস্তী নাগসনে
সম্বুদ্ধ মিলায় চিত্ত আপন জীবনে
যেহেতু উভয়ে রমে একা এই বনে।

বুদ্ধকে দেখে অত্যন্ত প্রসন্ন চিত্তে হস্তীরাজ মনে প্রাণে বুদ্ধের সেবা করতে লাগল। শুন্ডদ্বারা ভগবানের জন্য পানীয় ও পরিভোগ্য জল আহরণ করে রাখত, পাথরে পাথরে ঘসে পাথর উত্তপ্ত হলে পানিতে সেই পাথরেরর টুকরা বার বার নিক্ষেপ করে গরম পানির ব্যবস্থা করে দিত। ভদ্রশাল বৃক্ষের চারিদিকে স্থান শুন্ডদ্বারা তৃণহীন করে দিত। বনের বিভিন্ন ফল সংগ্রহ করে ভগবানকে দান দিত। হস্তীরাজের এই সেবা কার্য একটি বানরের দৃষ্টি আকর্ষণ করল তার মনেও বুদ্ধকে কিছু দান করার ইচ্ছা জাগ্রত হল। বানর বনে বনে বিচরণ করতে করতে মৌমাছিবিহীন এক মৌচাক দেখতে পেল, সেই মৌচাক এনে বুদ্ধকে দান দিল। বুদ্ধ বানরের সেই দান গ্রহণ করল এবং মধু পান শুরু করল। এটাকে একটি উপযুক্ত দানীয় সামগ্রী মনে করল।

১। ঈষাদন্ড ঃ রথদন্ডের ন্যায় দীর্ঘদন্ত। ২। সম্বুদ্ধ ঃ বুদ্ধরূপী নাগরাজ।
বানরের এই মধুদান স্মরণে এই ভাদ্র পূর্ণিমার আর এক নাম মধু পূর্ণিমা। এই পূর্ণিমার দিনে সকল বৌদ্ধ উপাসক-উপাসিকারা মধুদান করে থাকেন। বিহারে গিয়ে পঞ্চশীল, অষ্টশীল গ্রহণ করেন। সাধারণ ইতর প্রাণীর দানও সেবার মহিমায় দিনটি বৌদ্ধদের কাছে অত্যন্ত স্মরণীয়।

শুন্ড দিয়ে বনকাষ্ঠ করি আহরণ
উষ্ণজল করিবারে করিয়া চিন্তন
পাষাণে পাষাণ যোগে করিয়া ঘর্ষণ
শ্রদ্ধাবলে অগ্নি তাহে করি উৎপাদন
উষ্ণ পাষাণে জল করিয়া সিদ্ধ
মনের আনন্দে গজ পূজিলেন বুদ্ধ
বুদ্ধের মহিমা গুণ খ্যাত চরাচরে
শ্রদ্ধাবলে পূজে বুদ্ধ বনের কুঞ্জরে
কুঞ্জরের শ্রদ্ধা ভক্তি করি দরশন
বুদ্ধকে পূজিতে কপি ভাবে মনে মন
বৃক্ষ হইতে মধু চাক আহরণ করে
মধু দানে বুদ্ধ পূজে বনের বানরে
গজ-বানরে পূজা করি পূর্ণ করে স্বাদ”
স্বর্গ হতে দেবগণ দিলেন সাধুবাদ।

এইভাবে হস্তীরাজের অতিথিরূপে ভগবান পরম সুখে পারিল্যেয় বনে ১০ম বর্ষা অতিবাহিত করেছিলেন। বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দ স্থবির গভীর মনোবেদনা নিয়ে ৫০০ জন ভিক্ষুসহ বুদ্ধ দর্শনে পারিল্যেয় বনে আসেন। স্থবির আনন্দ বুদ্ধকে শ্রাবস্তীতে নিয়ে যাবার জন্য অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে প্রার্থনা জানাল। ভদন্ত আনন্দের প্রার্থনা শুনে বুদ্ধ ধর্মপদের গাথাটি ভাষণ করলেন
একসস চরিতং সেয়্যো
নত্থিবালে সহায়তা
একা চরে ন চ পাপানি করিরা
অপ্পোস্উক্কো মাতঙ্গরঞ্ঞেব নাগো।
একাকী বাস করাই শ্রেয়ষ্কর, মূর্খের সঙ্গে বাস করায় সহায়তা লাভ হয় না।

একাকী বাস করবে কোনরূপ পাপাচরণ করবে না, মাতঙ্গ হস্তী যেমন বনে একাকী বিচরণ করে তদ্রুপ অল্প উৎসুক নিরাসঙ্গ ও নিরাস্থায়ী হয়ে বাস করবে। তথাগত বুদ্ধ আনন্দকে আরও বললেন যদি পন্ডিত প্রজ্ঞাবান ও মৈত্রীপরায়ন ব্যক্তির সাহচর্য্য লাভ কর তাহলে সিংহ, ব্যাঘ্র প্রভৃতি দৃশ্যমান এবং রাগ-দ্বেষাদি অদৃশ্যমান উপদ্রব পরিহার করে আনন্দিত চিত্তে তাঁর সহিত বাস করা উচিত। আর যদি সেরকম ব্যক্তি পাওয়া না যায় তাহলে একাকী বিচরণ করবে তবুও পাপাচরণরত দুঃশীল ও মূর্খের সঙ্গে বাস করবে না। অতঃপর বুদ্ধ বর্ষাযাপন শেষে বিচরণ করতে করতে শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে এসে উপস্থিত হলেন। কৌশাম্বীর ও শ্রাবস্তীর শ্রদ্ধাবান উপাসক-উপাসিকারা বুদ্ধের অদর্শনে ভিক্ষুসংঘের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আমরা ভিক্ষুগণকে ভিক্ষা প্রদান কিংবা মান্য করব না। অঞ্জলি কর্ম কিংবা দেখিয়াও সম্মান প্রদর্শন করব না। অভিবাদন কিংবা কুশল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব না ভিক্ষুরা আমাদের অনর্থকারী তাদের কারণেই ভগবান পারিল্যেয়ে বনে চলে গিয়াছেন। এভাবে দায়ক-দায়িকারা যখন ভিক্ষুদের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে সহযোগিতা ও চর্তুপ্রত্যয় প্রদান হতে বিরত রইলেন তখন কৌশাম্বীবাসী ভিক্ষুগণ যারা পরষ্পর কলহে লিপ্ত হয়েছিল তারা জনসাধারণের মান গৌরব পূজা সৎকার হতে বঞ্চিত হয়ে জেতবনে ভগবানের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। সংঘ সম্মেলনের মাধ্যমে সংঘ ব্যবস্থান এবং সংঘ পার্থক্য বন্ধ হল।

পৃথিবীর সকল দেব, নাগ, ব্রক্ষ্মা, যক্ষ, অসুর রাক্ষস, ভূত, প্রেত, সকল মনুষ্য, সকল অমনুষ্য, সকল হিংস্র জীবজন্তু, উপরে ভবাগ্রে থেকে নীচে অবীচি পর্যন্ত একত্রিশ লোকভূমির সকল সত্ত্ব-কে কায় মনো বাক্যে আমার সকল মৈত্রী এবং পুণ্যরাশি দান করছি। এই পুণ্যরাশি লাভ করিয়া সকলে সুখী হোক। সকলের মঙ্গলময় মনষ্কামনা পরিপূর্ণ হোক। সকলের চিত্ত অন্তর সুখী হোক, সুখী হোক, সুখী হোক।

সূত্র ঃ শিক্ষক দীপংকর বড়ুয়া রচিত বুদ্ধ জীবন পরিক্রমা।

Additional Info

  • Image: Image