২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৬ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
মঙ্গলবার, 12 এপ্রিল 2016 11:35

বুদ্ধ পূজা : প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

লিখেছেনঃ উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু

বুদ্ধ পূজা : প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

একটি মাত্র দিন, তাদের অপচয় করতে দিন
বুদ্ধ পূজা অপচয় কিনা প্রসঙ্গে দুই বছর আগে এ পেইজ থেকে প্রকাশিত হয় প্রবন্ধটি, সময়ের প্রয়োজনে লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো

শুরুতেই বলে রাখা প্রয়োজন বুদ্ধের ধর্ম স্থান, কাল, পাত্র এক কথায় পর্যায়ভেদে ভিন্ন ভিন্ন পরিলক্ষিত হয়। এক জায়গায় আপনি দেখতে পাবেন বুদ্ধ চিত্তকে ৮৯ প্রকার বলেছেন, আবার অন্য জায়গায় এটাকে ১২১ প্রকার পর্যন্ত বিস্তৃত করেছেন। এক জায়গায় বুদ্ধ বেদনাকে ৩ প্রকার বলেছেন আবার অন্য জায়গায় ৬ প্রকার। কিছু বিনয়কর্ম ২০জন ভিক্ষুকে নিয়ে করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন, আবার স্থানভেদে সেটা ১০জন ভিক্ষু নিয়েও করা যাবে বলেছেন। আমরা পর্যায়ভেদ গুলো বুঝতে সক্ষম হই না বলেই অনেক সময় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি। কয়দিন ধরে ফেইসবুকে বুদ্ধপূজাতে আহার অপচয় শীর্ষক বিতর্ক চলছে, তাই লিখতে বসা।

বট্টাঙ্গুলীরাজ জাতকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই বুদ্ধ জীবিত থাকা অবস্থায়ই বুদ্ধমূর্তির পূজা শুরু হয়েছে। রাজা প্রসেনজিত প্রথম বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করেন বুদ্ধের জীবদ্দশায়। বুদ্ধ ঐ সময় পূজার জন্য তিনপ্রকারের চৈত্য এর কথা উল্লেখ করেন উদ্দেশিক, পারিভোগিক ও ধাতুচৈত্য পূজা। বুদ্ধকে উদ্দেশ্য করে মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করা হচ্ছে উদ্দেশিক চৈত্যকে পূজা করা। বুদ্ধের ব্যবহৃত বোধিবৃক্ষ থেকে শুরু করে ছাবাইক কিংবা অন্যান্য দ্রব্যাদিকে পূজা করা হচ্ছে পারিভোগিক চৈত্য পূজা। আর বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর দাহক্রিয়ায় প্রাপ্ত ধাতুকে পূজা করা হচ্ছে ধাতু চৈত্য পূজা। আবার পর্যায়ভেদে সবধরণের পূজাকে দুইভাগে ভাগ করা হয়- ১) আমিষ পূজা ২) নিরামিষ পূজা। বুদ্ধমূর্তির সামনে মোমবাতি, আগরবাতি, পুষ্প ইত্যাদি উপকরণ দ্বারা পুজা করাকে আমিষ পূজা নামে অভিহিত করা হয়। অন্যদিকে বুদ্ধ প্রদর্শিত ধম্মানুধম্মকে যথাযথভাবে অনুশীলন করাকেই নিরামিষ পূজা বলা হয়। প্রথমে উল্লেখিত এই তিন প্রকারের পূজা নিয়েই আমাদের সমাজের আচার, অনুষ্ঠানগুলো সম্পাদিত হয়। বুদ্ধের স্মৃতিময় বিভিন্ন দিবসে কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজনে কেউ পুষ্প, আগরবাতি, মোমবাতি কেউবা আহার দিয়ে বুদ্ধকে পূজা করে। আবার মহাপরিনির্বাণ সূত্রে দৃষ্ট হয় বুদ্ধ উত্তম পূজা বা শ্রেষ্ঠ পূজা বলেছেন- বুদ্ধের ধম্মানুধম্ম অনুশীলন এক কথায় বিদর্শন অনুশীলন করে নিজেকে বিমুক্তির পথে নিয়োজিত রাখাকে যেটাকে নিরামিষ পূজা নামে অভিহিত করা হয়েছে ইতিপূর্বে। অঙ্গুত্তর নিকায়ের বেলামসূত্রে বুদ্ধ- সম্যকসম্বুদ্ধ প্রমূখ ভিক্ষুসংঘকে দান দেওয়া কিংবা বিহার নির্মাণের চেয়েও অনিত্যভাবনাকে অধিক ফলদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে বুদ্ধ কেন মুর্তিপূজাকে মৌন সম্মতি দিলেন জীবদ্দশায়? শুধু উত্তম পূজার কথা-ই প্রচার করলে তো পারতেন। প্রিয় পাঠক, শুরুতেই বলেছি বুদ্ধের ধর্ম পর্যায়ভেদে ভিন্ন ভিন্ন। বুদ্ধ হয়তো জানতেন যে, সবার পক্ষে উত্তম পূজা করা সম্ভব হবেনা আর তাই তিনি মূর্তিপূজা কিংবা আমিষপূজাকেও বাঁধা দেন নাই। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, সবাই গ্রামীণফোনের সি,ই,ও হয়ে কয়েক লক্ষাধিক টাকা মাসে আয় করতে পারে না। অসংখ্য মানুষ আছেন যারা মাত্র ৬-৭হাজার টাকা আয় করে সংসার চালায়। তদ্রুপভাবে সবার পক্ষে উত্তম পূজা করা সম্ভব নাও হতে পারে কারণ জ্ঞানীর সংখ্যা সব সময় কম-ই হয় আর তাই বাকীরা আমিষপূজা বা হীন পূজা-ই করেন।

আহার পূজা কি অপচয়?

মিলিন্দ রাজা তীর্থিকদের মত অনুসারে নাগসেন স্থবিরকে প্রশ্ন করলেন- বুদ্ধ যদি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন তবে তাকে পূজা করা নিষ্ফল। আর যদি এসব পূজা তিনি গ্রহণ করেন তবে তার মহাপরিনির্বাণ লাভ মিথ্যা প্রতীয়মান হয়। প্রত্যুত্তরে নাগসেন স্থবিরের অনেকগুলো উপমার মধ্যে একটি ছিল নন্দ যক্ষ সারিপুত্র ভান্তেকে আঘাত করলে সারিপুত্র ভান্তে কখনোই রাগ করে কামনা করবেন না যে নন্দ যক্ষের ক্ষতি সাধন হোক কারণ সারিপুত্র ভান্তে রাগ, দ্বেষ, মোহ এর উর্ধ্বে চলে গেছেন। সারিপুত্র ভান্তে নন্দের ক্ষতি হোক এই কামনা করবেন না বলে এই নয় যে, নন্দ যক্ষ তার ভোগনীয় কর্ম, পাপের প্রায়শ্চিত ভোগ করবেন না, তার কর্ম তাকে ভোগ করতেই হবে। তদ্রুপভাবে বুদ্ধ পূজা গ্রহণ করেন না এটা যেমন সত্য তেমনি যিনি কুশল চেতনায় পূজা করছেন তার ফল লাভ অবশ্যম্ভাবী এটাও সত্য। অর্থাৎ আপনি যে দ্রব্য দিয়েই পূজা করেন না কেন তার ফল আছেই। বিভিন্ন দ্রব্য দিয়ে পূজার মধ্যে আহার দ্বারা পূজাকে কেউ কেউ অপচয় হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। পর্যায়ভেদে আহারগুলো অপচয় হচ্ছে সেটার পক্ষে অসংখ্য যুক্তি দেওয়া সম্ভব তবে এটাও জেনে রাখা উচিত এই আহার পূজা বন্ধের কথা বলতে গিয়ে আপনি একজনের প্রকারান্তরে ক্ষতি সাধন করছেন কারণ তার কুশল চেতনা দ্বারা সম্পাদিত কুশল কর্মটাকে আপনি থামিয়ে দিচ্ছেন সরাসরি। আপনি আহারপূজার বিকল্প অন্নহীনকে দান দিতে দেখিয়ে দিচ্ছেন সেটা সত্য কিন্তু প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটাও ভাবা উচিত যে আপনি শত বললেও বুদ্ধের প্রতি অত্যধিক শ্রদ্ধা নিয়ে তিনি যে দানের আয়োজন করেন সেটা কোনদিন একটা ভিখারীকে দেওয়ার জন্য করবেন না। অনেকে বলে সিগারেটা না খেয়ে প্রতিদিন কলা খাও সিগারেটের টাকায়। সিগারেট খাওয়া কোন না কোন কারণে বন্ধ হতে পারে কিন্তু কলা খাওয়া আর হয়ে উঠেনা। বুদ্ধপূজা না দিয়ে অন্নহীনকে দেওয়ার প্রেক্ষাপটও সেরকম। কেউ ভাববেন না আমি আহার পূজার পক্ষে বলছি।

সমস্যা থেকে উত্তরণ নিয়ে আলোচনাঃ

আধুনিক বৌদ্ধ ধর্ম আহার পূজার সাথে যায় না তাই বলে সরাসরি এটা থামাতে না বলে ভিন্নভাবে এগিয়ে যাওয়া দরকার। অনেকে আহারপূজাকে নিমিত্ত করে হলেও বিহারে আসেন বিশেষ করে মহিলারা। তারা আসুক, তাদের আসতে দিন। আমাদের পরিবর্তন সাধন দরকার বিহারের গতানুগতিক দেশনা পদ্ধতির যেখানে একজন ভিক্ষু বলে যান উপাসক-উপাসিকারা বুঝুক বা না বুঝুক মাথা নেড়ে যায়। বিহারাধ্যক্ষ ভান্তের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ধম্মইনফো-নিব্বানা’র মাসিক প্রশ্নোত্তর সভার আদলে ধর্ম সভা আয়োজন করা যেতে পারে যেখানে প্রতিটি মানুষের কাছে মূল কথাগুলো প্রশ্নোত্তর আকারে পৌছানো যাবে। তাদের মনে জমে থাকা প্রশ্নেরও উত্তর পাবে। দেশনার চেয়েও বিদর্শন চর্চায় বেশি সময় দিতে হবে। দেখা যাবে ঐ দিন গুলোতে অন্ততঃ দিনে তিন ঘন্টা(সকালে এক ঘন্টা, বিকালে একঘন্টা করে দুই বার) ধ্যানানুশীলনের অভ্যাস সৃষ্ঠি হবে। তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে বাসায় প্রতিদিন কমপক্ষে ১০মিনিট যেন ধ্যানানুশীলন করে। তাদের জানাতে হবে চাকুরীতে যাওয়ার সময় বাসে বসে বসেও ধ্যান করা যায় অফিসে না পৌছানো পর্যন্ত। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, বিদর্শন যারা চর্চা শুরু করবেন এক কথায় উত্তম পূজা যারা করবেন তারা এমনিতেই বাকীগুলো থেকে দূরে সরে আসবেন। কারণ তারা যে জেনে যাবেন তারা শ্রেষ্ঠ পূজা করছেন বাকীগুলোর তেমন দরকারই নেই। আমার জন্মস্থান করইয়ানগর গ্রামের শ্মশানভূমি ধ্যানচর্চা কেন্দ্রে বুদ্ধমূর্তি আছে, বুদ্ধের আসন আছে, বুদ্ধের আলাদা কক্ষ আছে কিন্তু সেখানে বুদ্ধ পুজা হয় শুধুমাত্র ফুল, মোমবাতি আর আগরবাতি দিয়ে। আহারপূজা হয় না কারণ তারা জানে এখানে ধ্যানচর্চা হয়, উত্তম পূজা-ই হয় বুদ্ধের, বাকীটা গৌণ।

আহার পূজা অপচয় বলে যারা প্রচার করছেন তাদের বলছিঃ

গ্রাম্য বধুরা জানে যে প্রতিদিন ১২টার আগে বুদ্ধকে ছোয়াইং তুলতে হবে তাই সকাল থেকেই অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তাড়াতাড়ি রান্না করা বুদ্ধের কাছে ছোয়াইং নিয়ে যাওয়া এই বিষয়গুলো অর্থাৎ কুশল চেতনাগুলো তাদের মাথায় কাজ করে। এক বাটি ছোয়াইং দেওয়ার সময় বৌদ্ধিক সংষ্কার প্রতিদিন নতুন করে সৃষ্ঠি হচ্ছে, বুদ্ধ বা জ্ঞানের পূজা করছেন ঐ সময়। সরাসরি আহার পূজা বন্ধ হয়ে গেলে সেই চেতনাবোধ তো হারিয়ে যাবে। আগে এটা চালু করেন যে প্রতিদিন বুদ্ধের সামনে রক্ষিত দান বক্সে পূজার বদলে ৫ টাকা দান দিবে। এই বিকল্প ব্যবস্থা চালু না হওয়া পর্যন্ত তাদের কুশল চেতনা সৃষ্ঠির পথ রুদ্ধ করবেন না আহার পূজা অপচয় বলে প্রচার করে। কারণ আহার দান করতে গিয়ে দানের চর্চা যেমন হচ্ছে তেমনি কুশল চেতনা বা কর্ম কিংবা কুশল সংষ্কারও যে জাগ্রত হচ্ছে প্রতিদিন।
,
একজন গার্মেন্টস কর্মী যখন জানে যে আগামী এক সপ্তাহ পর বুদ্ধ পূর্ণিমা, সে তখন মনে মনে ভাবে এমনিতে তো বিহারে যাওয়ার সুযোগ পাইনা ওই বন্ধের দিনে পূজা নিয়ে যাব, ছোয়াইং নিয়ে যাব। এসব চিন্তা করার সময় হতেই তার কুশলচেতনা সৃষ্ঠি হয় আর বুদ্ধ তো চেতনাকেই কর্ম বলেছেন। পরে সে স্বীয় সঞ্চিত টাকা থেকে বাজার করে, পূজার দ্রবাদি কিনে, পরিশেষে নির্দিষ্ট দিনে বিহারে যায়। এসময়টাতে বুদ্ধের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধার কারণে তার অনেক পূণ্যসম্পদ বৃদ্ধি হয়। এখন আহার অপচয় প্রচার করলে তার পুণ্যসম্পদ বৃদ্ধির সুযোগটা নষ্ট হবে পুরোপুরি। লবণ বেপারী লবণ বিক্রি করে অল্প আয় করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাকে বেঁঁচে থাকার তাগিদে সেটুকু করতে দিন। সাধারণরা বিভিন্ন পূজা করে কিছু পূণ্য করবেন তা করতে দিন। উত্তম পূজা করার অনুশীলন পুরোপুরি সৃষ্ঠি না হওয়া পর্যন্ত তাদের বাঁধা দিবেন না। বিকল্প চালু করুন। আর উত্তম পূজার অনুশীলন সৃষ্ঠি হলে বাকীটা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। আগে আহার পূজার নিমিত্তে হলেও তাদের আসতে দিন। আসুন প্রচার করে নয় বিকল্প ব্যবস্থা চালু করে কৌশলেই পাল্টাই বাপ-দাদার দিনের সেই আচার। একটি মাত্র দিন অপচয় করলে করুক না বিকল্প সৃষ্ঠি না হওয়া পর্যন্ত। তাই বলতে হয়- একটি মাত্র দিন, তাদের অপচয় করতে দিন।

পরিশেষে বলতে চাই আমার মতের সাথে সবাই একমত নাও হতে পারেন, স্ব স্ব যুক্তি উপস্থাপনপূর্বক গঠনমূলক আলোচনা আহবান করি সবার কাছে।
উল্লেখ্য উত্তম পূজায় কিভাবে বিমুক্তি লাভ করা যায় সেই প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে বিশদ লিখেছি- যার লিঙ্ক http://www.dhammainfo.com/component/k2/1413

তথ্য উৎস
১. মিলিন্দ প্রশ্ন- ভদন্ত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির
২. মধ্যম নিকায় (২য় খন্ড)- পন্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির অনূদিত
৩. মহাপরিনির্বাণ সুত্তং- রাজগুরু শ্রী ধর্ম্মরত্ন মহাস্থবির অনূদিত
৪. জাতক পঞ্চাশক- ভদন্ত জিনবংশ মহাস্থবির অনূদিত
৫. শরণ-গ্রহণের পরম্পরা- ডঃ ভিক্ষু সত্যপাল।
৬. মহাবর্গ- প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির অনূদিত

Additional Info

  • Image: Image