২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৭ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৭ইংরেজী
সোমবার, 14 মার্চ 2016 14:45

অনাগত আর্যমিত্র বুদ্ধ সম্পর্কে গৌতম বুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী ও পঞ্চ বিলুপ্তি

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

অনাগত আর্যমিত্র বুদ্ধ সম্পর্কে গৌতম বুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী ও পঞ্চ বিলুপ্তি

একদা গৌতম বুদ্ধ শাক্যদের নির্মিত নিগ্রোধারামে অবস্থানকালীন তাঁর বিমাতা ও মাসি মহাপ্রজাপতি গৌতমী দু’খানা চীবর তৈরী করে বুদ্ধকে দান করেছিলেন। বুদ্ধ একখানা চীবর গ্রহণ করে অপর চীবরখানা অন্য ভিক্ষুকে প্রদান করার জন্য বললেন। মহাপ্রজাপতি গৌতমী চীবরখানালয়ে এক এক করে প্রত্যেক ভিক্ষুকে বললেন, ভন্তে, চীবর চীবরখানা দান করছি, গ্রহণ করুন। কিন্তু কোনো ভিক্ষুই ঐ চীবরখানা গ্রহণ করলেন না।” কারণ, তাঁরা জানতেন যে, এ চীবর বুদ্ধের উদ্দেশ্যে তৈরী করা হয়েছে। এজন্যে কেউ গ্রহণ করতে সাহস করেননি।
অবশেষে তিনি (গৌতমী) এক সাধারণ ভিক্ষুর নিকট গিয়ে বললেন, “ভন্তে, আমি চীবরখানা দান করছি, গ্রহণ করুন।” তখন ঐ ভিক্ষু বিনা দ্বিধায় আগ্রহের সাথে চীবরখানা গ্রহণ করে অনুমোদন করলেন। এতে ভিক্ষুরা বলাবলি করতে লাগলেন, বড় বড় ভিক্ষুরা এ চীবর গ্রহণ করেন নি, অথচ একজন সাধারণ ভিক্ষু কোন সাহসে এ চীবর গ্রহণ করলেন? ভিক্ষুদের বলাবলি ও গুঞ্জন বুদ্ধের কানে গেল। তখন বুদ্ধ সমস্ত ভিক্ষুদিগকে আহবান করে বললেন, “আমার জন্য আনীত চীবর নিয়ে তোমাদের মধ্যে বলাবলি হচ্ছে, তা হলে তোমরা শুন, যে ভিক্ষুটি আমার জন্য আনীত চীবর গ্রহণ করেছে, সে সাধারণ ভিক্ষু নহে। সে মগধরাজ অজাতশত্র“র একমাত্র পুত্র-নাম অজিত রাজকুমার। তার মাতার নাম খাঞ্জানা দেবী। বয়ঃপ্রাপ্ত হলে জন্ম-জনামান্তরের পরমী হেতুতে অজিত কুমারের চিত্তে বৈরাগ্যভাব জেগেছিল। তাই সংসারের অসারতা অনিত্য-দুঃখ-অনাত্মার ক্রিয়া উপলদ্ধি করে সংসারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পিতার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়েও অজিত কুমার সংসার ত্যাগ করে বুদ্ধের শাসনে প্রব্রজিত হয়েছিল। আমার পরে অজিত স্থবির বুদ্ধ হবে। তার নাম হবে মৈত্রেয় বুদ্ধ। অজিত স্থবিরই ভদ্রকল্পের শেষ বুদ্ধ। এখন হতে অজিত স্থবির বুদ্ধাংকুর। তোমরা তাকে শ্রদ্ধা কর ও যথাযথ সম্মান প্রদর্শন কর।
তখন সমস্ত ভিক্ষুসংঘ সাধুবাদ করতঃ অজিত স্থবিরকে প্রদক্ষিণ করে সম্মান প্রদর্শন করেন। অজিত স্থবির তখন সবারই নিকট বুদ্ধাংকুর বলে পরিচিত হলেন। অতঃপর অগ্রশ্রাবক ধর্মসেনাপতি, অনুবুদ্ধ সারীপুত্র মহাস্থবির বুদ্ধকে বন্দনা পূর্বক প্রার্থনা করলেন, “আর্যমিত্র বুদ্ধ কখন, কিভাবে বুদ্ধ হবেন? কিভাবে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করা যাবে? এই সম্পর্কে আপনি অনুগ্রহ করে দেশনা করুন। তখন বুদ্ধ সারীপুত্রের প্রার্থনায় একত্রিশ লোকভূমির সকল জীবের মঙ্গলের জন্য অনাগত বুদ্ধবংশ দেশনা করলেন। বুদ্ধ বললেন, “ভিক্ষুগণ, শ্রবণ কর। আমি যে ধর্ম সকল সত্ত্বের জন্য রেখে যাচ্ছি, একদিন তা বিলুপ্তি হবে। পঞ্চ বিলুপ্তিতে আমার সকল ধর্মের চিহ্ন বিলুপ্ত হবে। তা হলঃ-
১। প্রথম বিলুপ্তি ঃ পটিসম্ভিদা (প্রতিসম্ভিদা) বিলুপ্তি। তথাগতের পরিনির্বাণের একহাজার বৎসর পর। প্রতিসম্ভিদা বিলুপ্তি হবে। তখন প্রতিসম্ভিদালাভী অর্হৎ ভিক্ষুর সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে না। কারণ এরূপ অর্হৎ ভিক্ষু জন্ম নেওয়ার পরিবেশ থাকবে না।
২। দ্বিতীয় বিলুপ্তি ঃ মার্গফল। তথাগতের পরিনির্বাণের দেড় হাজার বৎসর পর মার্গফল প্রাপ্ত ভিক্ষু আস্তে আস্তে কমে যাবে। মার্গফল প্রাপ্ত ভিক্ষু খুবই কম দেখা যাবে।
৩। তৃতীয় বিলুপ্তি ঃ শীল চরিত্র। ইহাতে প্রায় শীলবান ভিক্ষু কমে যাবে। একে অপরের দোষ খুঁজবে। নিজেও শীল পালন করবে না, অপরকেও দুঃশীল হতে প্ররোচিত করবে। এমনি করে আস্তে আস্তে ভিক্ষুসংঘ শীল, চরিত্র হারাবে।
৪। চতুর্থী বিলুপ্তি ঃ পরিয়ত্তি বা শাসন বা ত্রিপিটক অধ্যয়ন, চর্চা, প্রথমে বিলুপ্তি হবে অভিধর্ম। অভিধর্মের মধ্যে প্রথমে বিলুপ্ত হবে পট্ঠান। পট্ঠান পাঠে মহাপুণ্য। পট্ঠান পাঠ ক্রমে ক্রমে মুছে যাবে। ত্রিপিটক পাঠ বিলুপ্তি হবে, এমনকি ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকও বিলুপ্তি হবে।
৫। পঞ্চম বিলুপ্তি ঃ বুদ্ধ শাসনের শেষ পর্যায়ে ভিক্ষুসংঘ যখন বিনয় পালন করবেন না, তখন সংঘও মুছে যাবে। ভিক্ষু নিজেও দুঃশীল হবেন, অপরকেও দুঃশীল হতে প্ররোচিত করবেন। চীবরধারী ভিক্ষু মুছে যাবে। কোন ভিক্ষু থাকবেন না। এভাবে পঞ্চ বিলুপ্তিতে তথাগতের শাসন বিলুপ্তি হবে। বুদ্ধেও একটি গাথা বলারও কেউ পাওয়া যাবে না। তখন প্রকৃতপক্ষে তথাগত বুদ্ধের শাসন শূন্য হয়ে যাবে।
এরপর তথাগতের পাঁচ হাজার বৎসর শাসনের শেষ অন্তে বুদ্ধের সকল ধাতু (পূতাস্থি) পৃথিবী, স্বর্গ, নাগলোক হতে এসে গয়ার বোধিবৃক্ষ মূলে একত্রিত হয়ে আবার বুদ্ধরূপ ধারণ করবে। তথাগতের এ রূপকে বলা হবে নিমিত্ত বুদ্ধ। এ নিমিত্ত বুদ্ধ আবার চতুরার্য সত্য ও আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ দেশনা করবে। তথায় দশ সহশ্র চক্রবালের সমস্ত দেব ও ব্রহ্মারা সমবেত হবেন। কিন্তু একজন মানবও তথায় সমবেত হবে না এবং নিমিত্ত বুদ্ধরূপ দর্শন করবে না। দেশনা শেষে দেব-ব্রহ্মারা বুদ্ধরূপ দর্শন করতঃ প্রার্থনা করবেন-অনাগতে বুদ্ধের সাক্ষাৎলাভে যেন তাঁরা বিমুক্তি সুখ লাভ করতে পারেন।
অতঃপর বুদ্ধজ্যোতির তেজে আগুন ধরে নিমিত্ত বুদ্ধরূপ ভষ্মিত হবে। তথায় ভূমিকম্প হবে। পুষ্প বৃষ্টি ও প্রচন্ড বৃষ্টিতে বুদ্ধের ভষ্ম ধুয়ে মুছে যাবে। তখন হবে তথাগত গৌতম বুদ্ধের অনুপাদিশেষ নির্বাণ। তখন শূণ্য অসংখ্য এক লক্ষ কল্প পারমী পূর্ণ করার শেষ মুহুর্তে বোধিসত্ত্বরূপে আর্যমিত্র বোধিসত্ত্ব তুষিত স্বর্গে জন্ম নিবেন। তখন বুদ্ধের শাসনের এক অন্তরকল্পের শেষ মুহুর্তে দেবতারা আর্যমিত্র বোধিসত্ত্বের নিকট প্রার্থনা করবেন, “প্রভূ, ইহাই উপযুক্ত সময়। আপনি মাতৃগর্ভে জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে মানবরূপে জন্মগ্রহণ করুন। একত্রিশ লোকভূমি উজ্জ্বল করুন। নতুবা উহা লক্ষ লক্ষ চক্রবাল অন্ধকার থাকবে। তখন বোধিসত্ত্ব তুষিত স্বর্গ হতে পৃথিবীতে আগমন করবেন। সেই রাজ্যের রাজার নাম হবে শঙ্খ চক্র (কেতুমতী রাজা বর্তমান বারাণসী), তাঁর নাম হবে আর্যমিত্র। রাজা শঙ্খচক্রের পুরোহিত ব্রাহ্মণ সুব্রহ্মা হবে তাঁর পিতা। মাতার নাম ব্রহ্মবতী। স্ত্রীর নাম চন্দ্রমুখী। পুত্রের নাম ব্রহ্মবর্ধন।
পুত্রের ভূমিষ্ঠ সংবাদ শুনেই সংসার বন্ধন না বাড়িয়ে তিনি সংসার ত্যাগ করবেন। বোধিবৃক্ষ হবে নাগেশ্বর বৃক্ষ। গয়ার বোধিপালংকে সেই নাগেশ্বর বৃক্ষ উৎপন্ন হবে। তাঁর বয়স দশ হাজার বৎসর পূর্ণ হলে উদ্যান ভ্রমণে বের হবেন। অনিত্য দর্শনে সংসার ত্যাগ করতঃ একই দিনের সাধনায় বুদ্ধত্ব লাভ করবেন। তাঁর পরমায়ু হবে ৮০ হাজার বৎসর। রাজা শঙ্খচক্র আর্যমিত্রের বুদ্ধত্ব লাভের সংবাদ শুনে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতঃ সৌম্য মূর্তি দর্শনে মুগ্ধ হয়ে দীক্ষা নেবেন। অতঃপর সসাগরা এই পৃথিবী আর্যমিত্র বুদ্ধের পদতলে দান করবেন। ধর্মসেনাপতি অগ্রশাবক সারীপুত্র আবার বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, “প্রভূ, কিভাবে আর্যমিত্র বুদ্ধের সাক্ষাৎ লাভ করা যাবে। তা হল- দান, শীল, ভাবনা, গুরুজনকে মান্য করা, হেয় না করা, মাতা-পিতার সেবা ও ভরণ-পোষণ করা, পূণ্যদান করা, তিনবার-পূণ্যানুমোদন করা, যথাসময়ে ধর্ম শ্রবণ, ধর্মদেশনা ও সম্যক্দৃষ্টি লাভ করা। ভিক্ষুগণ, আর্যমিত্র বুদ্ধের সাক্ষাৎলাভের কামনা ও এই দশ প্রকার কর্ম সম্পাদন করলে যে কোন মানব, দেব-ব্রহ্মা আর্যমিত্র বুদ্ধের সাক্ষাৎ লাভ করতে পারবেন।
সূত্র-ত্রিরত্ন বন্দনা ও গাথাগুচ্ছ

Additional Info

  • Image: Image