২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২৩ জুন ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 28 জানুয়ারী 2016 03:59

ষোল প্রকার বিদর্শন স্তরের রুপ বর্ণনা

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

ষোল প্রকার বিদর্শন স্তরের রুপ বর্ণনা

বিদর্শন ভাবনাকারীদের মার্গ লাভের পূর্বে ষোল প্রকার বিদর্শনস্তর অতিক্রম করতে হবে। নিম্নে সে ষোল প্রকার স্তরের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদত্ত হলো :
(১) নাম-রূপ পরিচ্ছেদ জ্ঞান : নাম-রূপ ব্যতিত কোন কিছু সৃষ্ট নয়। নাম-রূপের যথাযথ জ্ঞানের অভাবেই আমি সংজ্ঞা উৎপন্ন হয়। এ নাম-রূপ সত্ত্বও নয়। নাম-রূপই সংস্কারের সৃষ্টি। নৌকার সাহায্যে যেমন নদী পার হওয়া যায় তেমনি নাম-রূপের সাহায্যে এ দেহ তরী চালিত হচ্ছে। নাম-রূপ পরষ্পরের সম্বন্ধযুক্ত পরষ্পরাশ্রিত। বিদর্শন জ্ঞানের প্রথম স্তরে সাধক নাম-রূপ পরিচ্ছেদ জ্ঞান লাভ করেন।
(২) পচ্চয়-পরিগ্রহ জ্ঞান : এ জ্ঞানের প্রভাবে সাধক বুঝতে পারেন, এ নাম-রূপ অহেতুক নয়, এখানে যা কিছু সংঘঠিত হচ্ছে তা সব কারণ সম্ভুত। অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদান, কর্ম ও আহার এ পাঁচটি রূপ-কায়-উৎপত্তি একমাত্র হেতু-প্রত্যয়, যোগী যখন দেখতে পান চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক ও মন এবং এদের আলম্বন রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ ও ধর্ম বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে চক্ষু প্রভৃতি বিজ্ঞান উৎপন্ন হয়, যোগী তখন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাম-রূপের উৎপত্তির ইহাই মূলীভূত কারণ। প্রত্যয় পরিগ্রহ জ্ঞানের ইহাই প্রত্যক্ষ দৃষ্টি।
(৩) সংমর্শন জ্ঞান : যুক্তিপূর্ণ চিন্তা সম্মত জ্ঞান দ্বারা পঞ্চস্কন্ধকে কলাপগুচ্ছ ব্যতিত আর কিছু মনে হয় না।
(৪) উদয়-ব্যয় জ্ঞান : সংমর্শন জ্ঞানের মাধ্যমে সাধক যখন সংস্কার ধর্ম সমূহের প্রকৃত স্বরূপ অর্থাৎ অনিত্য, দুঃখ, অনাত্ম উপলব্ধি করতে পারেন তখন তিনি বুঝতে পারেন, এ সংস্কার সমূহ কিভাবে উদয় হয় এবং কিভাবে বিনাশ প্রাপ্ত হয়।
(৫) ভঙ্গ-জ্ঞান : ধ্যানের গভীরতার মাধ্যমে উদয়-ব্যয় জ্ঞান উত্তরণের পর সাধক কেবল দেখতে পান সংস্কার সমূহ কেবল ভাঙছে। এ জ্ঞানকে ভঙ্গ-জ্ঞান বলা হয়। এ জ্ঞানের প্রভাবেই সাধকের অনিত্যতা সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান জন্মে।
(৬) ভয়-জ্ঞান : সাধক ধ্যানের গভীরতায় ভঙ্গ-জ্ঞান অতিক্রমের সাথে সাথেই দেহের মধ্যে পঞ্চস্কন্ধ ছাড়া আমি বা আমার বলে কিছুই খুঁজে পান না। সে অবস্থায় সাধকের ভীতির সঞ্চার হয়। পঞ্চস্কন্ধকে ভীতির চোখে দর্শনেই এ ভীতি সঞ্চার হয়ে থাকে। তবে এ ভয় নিজের জন্য নয়, কামক্লিষ্ট জনগণের জন্য।

(৭) আদীনব জ্ঞান : এ জ্ঞানে সাধক সংসারকে কেবল জঞ্জাল বা উপদ্রব পূর্ণ বলে মনে করে থাকেন। এজন্য সংসারের প্রতি সাধকের আসক্তি থাকে না। নির্বাণই সাধকের নিরাপদ স্থান ইহা জ্ঞান হন।
(৮) নির্বেদ-জ্ঞান : সংস্কার ধর্মকে আদীনব অর্থাৎ উপদ্রব পূর্ণ দর্শনের ফলে সাধকের মনে সংসারের প্রতি অনীহার ভাব জাগ্রত হয়। তাকেই নির্বেদ-জ্ঞান বলা হয়। সাধকের চিত্ত তখন কেবল নির্বাণ মুখীই থাকে।
(৯) মুমূক্ষা বা মুক্তি কাম্যতা : মুমূক্ষা-জ্ঞান উৎপন্ন হলে সাধকের চিত্ত তখন মুক্তির জন্য আকুল হয়ে উঠে।
(১০) প্রতিসংখ্যা-জ্ঞান : হেতুজ সংস্কারের প্রতি উপেক্ষক হয়ে পুনঃ পুনঃ ত্রি-লক্ষণাকারে ভাবনা করে সংস্কার ধর্ম সমূহ সম্যক রূপে অবগত হলে সাধকের মুক্তির উপায় নির্ধারিত হয়ে যায়।
(১১) সংস্কারোপেক্ষা-জ্ঞান : সাধনা করতে করতে সাধকের যখন সংস্কারের প্রতি অনীহার ভাব উৎপন্ন হয়, সে অবস্থাকেই সংস্কার-উপেক্ষা-জ্ঞান বলা হয়। তখন সাধকের মনে ভয় ও আনন্দ দূরীভূত হয়ে অনাসক্ত ভাব আসে।
(১২) অনুলোম-জ্ঞান : সাঁইত্রিশ প্রকার বোধিপক্ষীয় ধর্ম পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং যোগী জ্ঞানের উচ্চ মার্গের অধিকারী হন এ জ্ঞানের প্রভাবে।
(১৩) গোত্রভূ-জ্ঞান : এ জ্ঞান নিম্নতর সাধনা স্তরকে যেমন অতিক্রম করে তেমন উন্নততর সাধনা পদ্ধতিও উৎপাদন করে। গোত্রভূ-জ্ঞানের পরেই মার্গ-জ্ঞান উৎপন্ন হয়।
(১৪) মার্গ-জ্ঞান : এ জ্ঞান প্রাপ্তিক্ষণে ভবাঙ্গ পাত হয়। সৎকায়, বিচিকিৎসা ও শীলব্রত পরামর্শ বিসর্জিত হয়।
(১৫) ফল-জ্ঞান : স্রোতাপত্তি জ্ঞান লাভের পরেই স্রোতাপত্তি-ফল-জ্ঞান লাভ হয়। এ জ্ঞানের প্রভাবে সাধক ধ্যানের স্থায়িত্বকাল ইচ্ছানুসারে দীর্ঘ করতে পারেন।
(১৬) প্রত্যেবেক্ষণ-জ্ঞান : স্রোতাপত্তি ফল-জ্ঞান লাভ করার সাথে সাথে সাধক প্রত্যবেক্ষণ করেন তাঁর যে ক্লেশ সমূহ ধবংশ করতে এখনও বাকী আছে সে গুলোকে।

ইলা মুৎসুদ্দী
সূত্র - বুদ্ধ বন্দনা ও সাধনা পদ্ধতি

Additional Info

  • Image: Image