২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১৭ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রবিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 14 জানুয়ারী 2016 14:11

পুনর্জন্ম বিষয়ক মতবাদ

লিখেছেনঃ চয়নিকা রিতিমা

পুনর্জন্ম বিষয়ক মতবাদ

সুপ্রাচীন কাল থেকেই পুনর্জন্ম অথবা মৃত্যু পরবর্তী জীবন বিষয়ক সমস্যা একটি বিতর্কিত বিষয় হিসাবে প্রায় অধিকাংশ ধর্মীয় গুরুদের মনযোগ আকর্ষণ করে আসছে। পুনর্জন্মে বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ ও ছিলেন এবং অবিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ ও ছিলেন।

পুনর্জন্মের পক্ষে বিপক্ষে প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ এবং ব্যখ্যা এসেছে এই মতবাদে বিশ্বাসী এবং বিরুদ্ধবাদীদের নিকট থেকে যা দুদিক থেকেই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়, কিন্তু সকল ধর্মীয় ইতিহাসে এমন কোন সময় নেই যেখানে এই সমস্যার সমাধান দেয়ার চেষ্টা করা হয় নি। এই কাজটি ব্যাপক অর্থে বলা হয়েছে, কারণ এই বিষয়টির চরিত্রই এমন যে এই মতবাদ চূড়ান্তভাবে পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া অথবা নিশ্ছিদ্র যুক্তিপূর্ণ মতবাদের বিরোধিতা করে। তারপরেও বৌদ্ধ ধর্ম এই জটিল, সুপ্রাচীন বলে কথিত বিযয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছে এবং আমাদের ধর্ম কিভাবে এই বিযয়টির সাথে সম্পর্কিত সেই বিযয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধানের গুরুত্ব আরোপ করেছে।

পুনর্জন্ম শব্দের পালি অর্থ পূন:ভব, যা পৃথক ভাবে অনুদিত হয়েছে জন্মান্তর, পুন:অস্তিত্বশীল হওয়া,পুনরায় ফিরে আসা, আত্মার দেহান্তর প্রাপ্তি অথবা নতুন দেহ ধারণ হিসাবে। ভুল বোঝা পরিহার করার লক্ষ্যে প্রথমেই লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন যে, বুদ্ধ মতবাদ মানুষ অথবা অন্য কোন প্রাণীদেহে বসবাসকারী শ্বাশ্বত, অপরিবর্তনীয় কোন সত্ত্বায় বিশ্বাস করাকে অনুমোদন করে না যাকে সাধারণ ভাষায় বলা হয় “আত্মা”। এই জন্য বুদ্ধ মতবাদ অনুযায়ী পুনরায় জন্মগ্রহণ করা বলতে এই কথা বুঝায় না যে আত্মা তার পুরাতন শরীর ছেড়ে চলে গিয়ে নতুন একটি দেহ অধিকার করে নেয়। বুদ্ধ অনাত্ম মতবাদ শিখিয়েছেন ; অন্যান্য অধিকাংশ ধর্ম থেকে এখানেই মূল পার্থক্য রয়েছে।

বুদ্ধ মতবাদ অনুযায়ী অস্তিত্বশীল সব কিছুই পরিবর্তনের অধীন ; কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। জীবন একটি নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহ, শুধুমাত্র পঞ্চস্কন্ধ অথবা পাঁচটি পুঞ্জীভূত উপাদন সমন্বয়ে গঠিত ক্রমানুসারে এগুলো হচ্ছে বস্তুগত আকার, অনুভূতি, ইন্দ্রিয়জাত ধারণা, মনোবৃত্তি এবং চেতনা। এই পঞ্চ উপাদান সমষ্টিকেই আমরা বলি “সত্ত্বা” অথবা “একজন ব্যক্তি” এবং এগুলোও নিত্য পরিবর্তনশীল অবস্থায় বিরাজমান। অন্য ভাবে বলা যায়, এই উপাদান সমষ্টি সৃষ্টি হয়ে ধ্বংস হয়, উৎপত্তি হয়ে বিলীন হয়ে যায়, সমাপ্তি বিহীন এক ধারাবাহিক অনুক্রমে, অতি দ্রুত লক্ষ্যে এবং সুক্ষাতিসুক্ষভাবে যা আমাদের অভিজ্ঞতায় অনুভূত হয় না। এই বিবেচনায় আমরা বলতে পারি যে, একটি অবিভাজ্য জন্ম-মৃত্যু প্রক্রিয়ার অধীন হওয়া অর্থাৎ আমাদের সমগ্র জীবনব্যাপী আমরা প্রতিটি মুহুর্তে “জন্ম নিই” এবং “মৃত্যুবরণ” করে চলি, এই প্রক্রিয়া একইভাবে “পরবর্তী জীবনের”দিকে এগিয়ে যায়।

আরো সঠিক ভাবে বললে,এই জন্য দুইটি ধারাবাহিক মুহুর্তে একজন ব্যক্তি একই রকম থাকে না। ব্যক্তি পৃথক কেউ নয়, কারণ পূর্ববর্তী মুহুর্ত তার পরবর্তী মুহুর্তের আগমণ সূচনা করে, পরবর্তী মুহুর্ত তার পরবর্তী মুহুর্তের আগমনের কারণ হয়। এভাবে অসীম সংখ্যক মুহুর্ত যুক্ত হয়ে যায়।

পূর্ববর্তী মুহুর্তে উৎপন্ন পঞ্চ উপাদান সমষ্টি বিলীন হয়ে যাওয়ার সময় একই প্রকার পরবর্তী উপাদান সমষ্টির গঠন ও পরিচালনা করে, যা তার পরবর্তী উপাদান সমষ্টি উৎপন্নের কারণে পরিণত হয়। এভাবেই জীবন বয়ে চলে এবং বয়ে চলে এবং পরবর্তী জন্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। আত্মার মধ্যস্থতা ব্যতীত এই পদ্ধতিতে পুনর্জন্ম সম্ভব ; এই কারণেই বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থাদিতে বলা হয়েছে পুনর্জন্ম কোন একক ব্যক্তি কিংবা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির মাঝে সংঘটিত হয় না।

মানুষ অথবা অন্যান্য প্রাণীকে পুনরায় জন্ম নিতে হবে এই কথা একটি চরম মতবাদ, কোন পুনর্জন্ম নেই এই কথা বলা আর একটি চরম মতবাদ। বৌদ্ধ মতবাদ এই দুইটি চরম পথ কে পরিহার করে চলে। এর পরিবর্তে কার্য - কারণ নীতির উপর ভিত্তি করে বুদ্ধ মতবাদ একথা বলে যে যথার্থ কারণ অথবা পরিবেশ বিদ্যমান থাকলে পুনর্জন্ম সংঘটিত হওয়া সম্ভব, যথার্থ কারণ অথবা পরিবেশ বজায় না থাকলে পুনর্জন্ম সংঘটিত হয় না।

বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থসমূহ অন্য এক প্রকার পুনর্জন্মের কথাও বলে। প্রচলিত ধারণার সাথে অসংগতিপুর্ণ এই পুনর্জন্ম শুধুমাত্র মানসিক অবস্থা যা এক পরিবেশ থেকে অন্য পরিবেশে রূপান্তরিত হওয়া অব্যাহত রাখে। আমরা এক মুহুর্তে সুখী হই, অন্য মুহুর্তে দু:খী। এক সময় আমাদের মন থাকে কল্যাণকামী এবং বিশুদ্ধ, আর এক মহুর্তে সম্পূর্ণ বিপরীত। মানসিক অবস্থার এই পরিবর্তন মনোভাব প্রকাশের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসারে একটি “পুনর্জন্ম” গঠন করে। এভাবে প্রতিবার আমাদের মানসিক পরিবর্তনের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রত্যেক মুহুর্তে আমরা ভালো অথবা খারাপ “মনোভাব” নিয়ে জন্মগ্রহণ করি।

বৌদ্ধ মতবাদ সুনির্দিষ্টভাবে বলে যে, অজ্ঞতার কারণে গড়ে ওঠা আকাঙ্খা অথবা আসক্তি [অবিদ্যা] বর্তমান জীবন এবং পরবর্তী জন্মের প্রধান কারণ এবং একই সাথে মানুষের কার্যকলাপ পরিচালনাকারী সবচেয়ে গতিশীল শক্তি । প্রদীপ কে জ্বালিয়ে রাখা তেলের সাথে তুলনীয় এই “মানসিক অপূর্ণতা” জন্ম-মৃত্যু চক্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জ্বালানী সরবরাহ করে [সংস্কার]। তেল সম্পূর্ণভাবে নি:শেষ হয়ে গেলে যেভাবে একটি শিখা নিভে যায় তাকে আর প্রজ্জ্বলিত করা যায় না, একই ভাবে সকল মানসিক পঙ্কিলতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেলে জন্ম-মৃত্যুর চক্র স্বাভাবিকভাবেই থেমে যাবে।

নিব্বাণা অথবা নির্বাণ, প্রকৃতপক্ষে সকল মানসিক অপরিপূর্ণতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি প্রাপ্ত অবস্থা যা মন কে বিশুদ্ধকরণের মাধ্যমে অর্জন করা যায়। এখানে পরম সুখ।

এভাবে পুনর্জন্ম প্রত্যেকের নিজস্ব কর্মের ফলাফল। কল্যাণমূলক কাজ আমাদের সূখী জীবনের পথে পরিচালিত করে এবং অকল্যানকর কাজ দু:খময় জীবনের প্রতি। মানুষের উচিত সবসময় কল্যাণমূলক কাজ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা, কারণ কল্যাণমূলক কাজ শুধুমাত্র বর্তমান জীবনেই প্রশান্তি নিয়ে আসে না, বরং প্রবাহিত পরবর্তী জীবনেও।

-সমাপ্ত


পঞ্চস্কন্ধ:- রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার এবং বিজ্ঞান
এই পাঁচটির সমন্বয়ে পঞ্চস্কন্ধ গঠিত।

 এই প্রবন্ধটি BASIC BUDDHISM COURSE,
By Phra Sunthorn Plamintr,Ph.D গ্রন্থ- এর Chapter 28, [ page 96 to 98],
The Doctrin Of Ribarth নামক প্রবন্ধের বাংলা অনুবাদ।

Additional Info

  • Image: Image