২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ১০ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২৪ মার্চ ২০১৭ইংরেজী
রবিবার, 15 নভেম্বর 2015 18:14

বুদ্ধ ধাতু সংরক্ষণ : মহাকশ্যপ স্থবির, অজাতশত্রু ও সম্রাট অশোক (শেষ পর্ব)

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

বুদ্ধ ধাতু সংরক্ষণ : মহাকশ্যপ স্থবির, অজাতশত্রু ও সম্রাট অশোক (শেষ পর্ব)

রাজা ধর্মাশোক বুদ্ধের ধাতু সমূহ কিভাবে পেলেন? অদ্ভুদ সেই কাহিনী। জানতে চাইলে আজকের শেষ পর্বে পড়ুন বিস্তারিত। তখন দেবরাজ ইন্দ্র বিশ্বকর্ম্মাকে ডাকিয়া বলিলেন; তাত অজাতশত্রু কর্ত্তৃক বুদ্ধাস্থি নিধাহিত হইয়াছে, এখন তুমি গিয়া তৎসমুদয় রক্ষার সুব্যবস্থা কর। দেবেন্দ্রের আদেশে বিশ্বকর্ম্মা আসিয়া বাড় সঙ্ঘাটি যন্ত্র যোজিত করিলেন। স্ফটিকবর্ণের খড়্গ হস্তে কাষ্ঠমূর্ত্তি সকল বুদ্ধাস্থি গৃহের চতুর্দ্দিকে বায়ুবেগে ঘুর্ণয়মানযন্ত্র যুক্ত করিয়া এক আণিতে আবদ্ধ করিলেন। বুদ্ধাস্থি গৃহের চতুর্দ্দিকে ইষ্টক নির্ম্মিত মন্দিরের ন্যায় পাষাণ দ্বারা পরিক্ষিপ্ত করতঃ উপরভাগ এক মহাপাষাণ দ্বারা আচ্ছঅদিত করাইলেন। তৎপর মাটি চাপা দিয়া তদুপরি সমতল করতঃ এক পাষাণ স্তুপ প্রতিষ্ঠিত করাইলেন। এইরূপে বুদ্ধাস্থি সমূহ নিধাহিত হইলে, আয়ুষ্মান মহাকশ্যপ পরিনির্ব্বানে পরিনির্বৃত হইলেন। রাজা অজাতশত্রু ও আয়ুশেষে কর্ম্মানুযায়ী গতি প্রাপ্ত হইলেন। কর্ম্মচারিগণও ক্রমে কালগত হইলেন। ভগবানের পরিনিব্বানের ২১৮ বৎসর পরে চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র কুমার প্রিয়দর্শী রাজ্যভিষিক্ত হইয়া অশোক নামে রাজা হইলেন।

তিনি নিগ্রোধ শ্রামণের দ্বারা-শাসনে প্রসন্ন হইয়া ধার্ম্মিক-ধর্ম্ম-রাজা হইলেন। তৎপর ৮৪ সহস্র বিহার করিয়া ভিক্ষুসঙ্ঘকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ভন্তে, বুদ্ধাস্থি কোথায় পাইব? ভিক্ষুগণ উত্তর দিলেন;-মহারাজ বুদ্ধাস্থি সমূহ নিধাহিত আছে বলিয়া শুনিয়াছি, কিন্তু কোথায় যে রহিয়াছে তাহা সঠিক জানি না। রাজা, রাজগৃহের চৈত্য ভাঙ্গাইলেন, কিন্তু তথায় বুদ্ধাস্থি পাইলেন না। তৎপর তাহা পুনঃ মেরামত করাইয়া ভিক্ষু ভিক্ষুণী, উপাসক, উপাসিকা, এই চতুর্পরিষদ সমভিব্যাহারে বৈশালীতে গেলেন। তথায়ও না পাইয়া কপিলবস্তুতে গেলেন। সেখঅনেও পাওয়া গেল না। তৎপর রামগ্রামে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু সেখানকার চৈত্য ভাঙ্গিতে পারিলেন না। ভাঙ্গিবার অস্ত্রাদি টুকরা টুকরা হইয়া যাইতে লাগিল। যেহেতু তাহা নাগ কত্তৃক অধিকৃত ছিল। সেখানেও অসমর্থ হইয়া অল্পকপ্প, বেঠদ্বীপ, পাবা, কুশীনারা, সর্ব্বত্র চৈত্য ভাঙ্গাইলেন বটে কিন্তু বুদ্ধাস্থি পাইলেন নঅ। তৎপর সেই সমুদয় পুনঃ মেরামত করাইয়া দিলেন এবং রাজগৃহে প্রত্যাবর্ত্তন করতঃ চতুর্পরিষদ সন্নিপাতিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন; আপনাদের মধ্যে কেহই কি শোনেন নাই কোথায় বুদ্ধাদি নিধাহিত আছে”? তত্রেক ১২০ বৎসর বয়স্ক মহাস্থবির বলিলেন; কোথায় বুদ্ধাস্থি নিধান করা হইয়াছে তাহা শুনি নাই।

আমার যখন সাতবৎসর মাত্র বয়স তখন আমার প্রাচার্য্য (পিতামহ) মহাস্থবির মহোদয় আমার দ্বারা ফূল বাত্তি গ্রহণ করাইয়া আমাকে বলিলেন যে এস শ্রামণের, অমুক গাছের নীচে এক পাষাণ স্তুপ আছে, তথায় যাই তখন সেখানে গিয়া পূজা করতঃ তিনি বলিলেন যে, এই স্থানটি মনে রাখা আবশ্যক” মহারাজ, আমি এই পর্য্যন্ত জানি। রাজচক্রবর্ত্তী অশোক, মহাস্থবিরের নির্দ্দেশিত বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত করাইয়া খনন করাইলে পাষাণ স্তুপ প্রাপ্ত হইলেন। তৎপর তাহাও অপসারিত করাইলে সধাময় ভূমি প্রাপ্ত হইলেন, ক্রমে পাষাণ সমূহও অপসারিত হইলে সপ্ত রত্নময় বালুকা ও স্ফটিক বর্ণের অসিহস্তে বায়ুবেগে ঘুর্ণয়মান কাষ্ঠ মূর্ত্তি সকল দেখিতে পাইলেন। তখন মহারাজ যক্ষ-বৈদ্যগণকে আহ্বান করাইয়া তন্ত্র মন্ত্রাদিযোগে বলি (পূজা) কর্ম্ম করিলেন, কিন্তু তাহা কোন মতে রোধ করিতে পারিলেন না, এবং তাহাদের আদ্যন্ত নির্ণীত হইল না। তৎপর মহারাজ দেবগণের উদ্দেশ্যে প্রণাম করিয়া বলিতে লাগিলেন;-আমি এস্থান হইতে বুদ্ধাস্থি সমূহ লইয়া ৮৪ সহস্র বিহারে নিধান করতঃ সৎকার করিব। দেবগণ, অন্তরায় করিবেন না। তখন দেবরাজ ইন্দ্র তাহা জ্ঞাত হইয়া বিশ্বকর্ম্মাকে ডাকিয়া বলিলেন;-তাত, ধর্ম্মরাজ অশোক বুদ্ধাস্থিসমূহ উঠাইতে বুদ্ধাস্থি-গৃহ-প্রাঙ্গণে অবতরণ করিয়াছেন, এখন তুমি গিয়া কাষ্ঠমূর্ত্তি সমূহ অপসারিত কর। অনন্তর বিশ্বকর্ম্মা পঞ্চচুড় গামারক বেশে ধনুর্বাণহস্তে রাজার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া বলিলেন: মহারাজ, ইহাদিগকে নিপাত করিব কি?

হাঁ তাত, কর” রাজা এই রূপ বলিলে তিনি সন্ধি-স্থল লক্ষ্য করিয়া তীর ছুড়িলেন; তখন সমস্তই বিপ্রকীর্ণ হইয়া গেল। তৎপর রাজা স্বয়ং দরজার শিকলেস্থিত চাবি ও মুদ্রা গ্রহণ করিলেন এবং মণিখণ্ডও দেখিতে পাইলেন। অনাগতে দরিদ্র রাজা এই মণিখণ্ড গ্রহণ করিয়া, বুদ্ধাস্থি সমূহের সৎকার করুক পুনঃ ইহা পাঠ করিয়া রাগত স্বরে বলিলেন; আমার মত রাজাকে দরিদ্র বলা উচিৎ হয় নাই। অতঃপর পুনঃ পুনঃ চেষ্টার ফলে দরজা খূলিয়া অভ্যন্তরে প্রবেশ পূর্ব্বক দেখিলেন; অহো কি আশ্চার্য্য, ২১৮ বৎসরের অধিককাল পূর্ব্বে প্রজ্বলিত প্রদীপসমূহ সেইভাবে জ্বলিতেছে, নীলোৎপলসমূহ যেন এখনই আনিয়া পূজা করা হইয়াছে, ছড়ানো ফুল গুলিও যেন এই মুহুর্ত্তে আনিয়া ছড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। তখন রাজচক্রবর্ত্তী তথায় স্থাপিত স্বর্ণপাত খানা হস্তে লইয়া এইরূপ পড়িতে লাগিলেন; অনাগতে কুমার প্রিয়দর্শী রাজ্যাভিষিক্ত হইয়া অশোক নামে ধর্ম্ম-রাজা হইবেন। তিনিই এই বুদ্ধাস্থি সমূহ বিস্তারিত করিবেন। তখন তিনি পরম প্রীতি প্রফুল্ল হৃদয়ে করতালি দিয়া বলিয়া উঠিলেন অহো আমি আর্য্য মহাকশ্যপ স্থবির কর্ত্তৃক দৃষ্ট হইয়াছি। তখন তিনি পরিচায়কবুদ্ধাস্থি মাত্র তথায় রাখিয়া অবশিষ্ট সমস্ত বুদ্ধাস্থি গ্রহণ করতঃ ধাতু গৃহ পূর্ব্বের ন্যায় বন্ধ করিলেন এবং সমস্তই পূর্ব্ববৎ করাইয়া উপরে পাষাণ চৈত্য স্থাপন করাইলেন। তৎপর ৮৪ সহস্র বিহারে স্তুপ নিম্মার্ণ করাইয়া, বুদ্ধাস্থি সমূহ মহাসমারোহ সহকারে পূজা করতঃ প্রতিষ্ঠাপিত করিলেন। সকলের মংগল হোক।

সূত্র-মহাপরিনির্বাণ সূত্র

Additional Info

  • Image: Image