২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৯ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার, ২৪ অগাস্ট ২০১৭ইংরেজী
বৃহস্পতিবার, 12 নভেম্বর 2015 01:24

বুদ্ধ শাসনে পুত্র দান : কেন করবেন এবং দানের সুফল কী?

লিখেছেনঃ ইলা মুৎসুদ্দী

বুদ্ধ শাসনে পুত্র দান কেন করবেন? পুত্র দানের সুফল কী কী?

স্বীয় ঔরস জাত পুত্রকে বুদ্ধশাসনের উপকার ও পুত্রের মুক্তির হেতু শ্রদ্ধার সহিত প্রব্রজিত করাইয়া দেওয়াকে পুত্রদান বলে। পুত্রদানের কিঞ্চিন্মাত্র হইলেও পুণ্য-ফল লাভের আশায় শাসন প্রতিরূপ দেশে সপ্তাহকালের জন্য হইলেও পুত্রকে প্রব্রজিত করাইয়া রাখে। এই প্রব্রজ্যা দ্বারা ভবিষ্যৎ জন্মে চির মুক্তির নিষ্ক্রমণের সংস্কার উৎপন্ন হয়। 

বলা হয়েছে যদি কোন চক্রবর্তী রাজ স্বীয় ঋদ্ধি প্রভাবে জম্বুদ্বীপ প্রমাণ বিহার নির্মাণ করিয়া, তাহাতে বহু ভিক্ষু-সংঘ বাস করান, সেই ভিক্ষু-সঙ্ঘের ভরণ-পোষণের নিমিত্ত পূর্ববিদেহ, অপরগোয়ান ও উত্তরকুরু এই ত্রিমহাদ্বীপ প্রমাণ স্থানে ফসলাদি উৎপাদন করিয়া দান করেন ও সুমেরু পর্বত প্রমাণরাশি করিয়া ভিক্ষু-সঙ্ঘের চীবরাদি নানা প্রয়োজনীয় বস্তু দান করেন, তথাপি একটি পুণ্যের ষোলভাগের একভাগ পুণ্যও হয় না।

মহারাজ অশোক পাটলীপুত্রের সিংহাসনে অভিষিক্ত হওয়ার ছয় বৎসর পরেই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। এই হইতে তিনি ভিক্ষুসঙ্ঘকে নানা প্রকারের পূজা সৎকার করিতে থাকেন। আশোকের পিতা বিম্বিসার অতিশয় ব্রাহ্মণ ভক্ত ছিলেন। তিনি প্রত্যহ ষাট হাজার ব্রাহ্মণকে আহার দান করিতেন। অশোক পিতার দান বন্ধ না করিয়া প্রত্যহ ব্রাহ্মণ ভোজন করাইতেন বটে, কিন্তু তাঁহারা অব্রহ্মচারী ও অসংযেতন্দ্রিয় ছিলেন। সুতরাং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সংযম দেখিয়াই তিনি অতিশয় প্রীতি হইয়া প্রথমে বত্রিশজন ভিক্ষুকে ভিক্ষান্ন প্রদান করেন। ক্রমান্বয়ে সংখ্যা বাড়াইতে বাড়াইতে প্রত্যহ ৬০ হাজার ভিক্ষুকে অন্নাদি আহার্য বস্তু দান করিতে লাগিলেন। তাঁহান রাজ্যের ৮৪ হাজার নগরে ৮৪ হাজার বিহার ও ধাতু চৈত্য স্থাপন করেন। পাটলিপুত্রে অশোকারাম নামে এক মহাবিহার স্থাপন করিয়া তাহাতে সহস্রাধিক ভিক্ষুকে বাস করাইতেন এবং তাঁহাদের আবশ্যকীয় যাবতীয় ভরণ-পোষণ নির্বাহ করিতেন। অন্যান্য নগরে স্থাপিত বিহার সমূহে যে সকল ভিক্ষু বাস করিতেন, তাঁহাদিগকেও চতুর্প্রত্যয় দান করিতেন। তাঁহার রাজ্যের সর্বত্র বুদ্ধের উপদেশ বাক্য সমূহ প্রস্তরে ও পর্বতগাত্রে খোদাইয়া সদ্ধর্ম প্রচার ও সর্বসাধারণকে শিক্ষা দিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। ধর্মমহামন্ত্রী নামক একজন মন্ত্রী নিযুক্ত করিয়া বহু কর্মচারী সহ তাঁহাকে প্রজাদের মধ্যে ধর্ম প্রচার ও প্রচারিত ধর্ম প্রতিপালিত হইতেই কিনা, তাহা অনুসন্ধানে ভার দেওয়া হয়। পাটলীপুত্র নগরে ভিক্ষুদের মহাসভা আহ্বান করাইয়া বুদ্ধ-শাসন পবিত্র করিবার সুযোগ, বিশুদ্ধ ধর্মবিনয় স্থাপন এবং লঙ্কা, বার্মা, শ্যাম, কাশ্মীর গান্ধার প্রভৃতি দেশে অরহতগণকে পাঠাইয়া বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করিয়াছিলেন। তাঁহাকে জম্বুদ্বীপের একচ্ছত্র রাজাধিরাজ বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। জম্বুদ্বীপের বাহিরেও তাহার রাজ্যে বি¯তৃত ছিল। তিনি এক সময় এক বড় রাজ্য বুদ্ধ-শাসনে দান করিয়া সাধারণ অবস্থায় বিহারে বাস করিতেন। ফল কথা-আমরা যে বৌদ্ধ ধর্মের এত বি¯তৃতি ও উন্নতির কথা শুনিতে পাই, ইহা কেবল মহারাজ ধর্মাশোকের ধর্মপ্রেরণারই একমাত্র নিদর্শন। সুতরাং, বুদ্ধ-শাসনের নিমিত্ত এত শ্রম, এত দান ও এত উদ্যোগ আর কেহ করেন নাই। পূর্বোক্ত ৮৪ হাজার চৈত্য, বিহার এবং অশোকারাম উৎসর্গ করিবার জন্য একটা দিন নির্দিষ্ট করিবেন।

সেই উৎসর্গ উপলক্ষে রাজ্যের সর্বত্র এক সপ্তাহ ব্যাপী মহোৎসব করিবার জন্য তিনি আদেশ প্রচার করিলেন। সেই উৎসব রাত্রে সমগ্র রাজ্য উজ্জ্বল আলোকে স্বর্গপুরী সদৃশ অপূর্ব শ্রী ধারণ করিয়াছিল। ইহাতে তাঁহার অনুপমা প্রীতি উৎপন্ন হইয়াছিল। তিনি প্রীতিপূর্ণ হৃদয়ে তখন ভিক্ষু সঙ্ঘের অধিনায়ক মোগ্গলি পুত্র তিসস্ মহাস্থবিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “ভন্তে, দশবল বুদ্ধের শাসনে কে সর্বাপেক্ষা অধিক দান করিয়াছেন, কাহার দান সর্বাপেক্ষা অধিক? মহারাজ, বুদ্ধশাসনে প্রত্যয় দায়কদের মধ্যে আপনিই সর্বপ্রধান। আপনি যত দান করিয়াছেন। আর কেত এত দান করেন নাই। সুতরাং আপনিই প্রত্যয় দায়কগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। ভগবান বুদ্ধের জীবিতাবস্থায় ও এত বড় প্রত্যয়দায়ক কেহ ছিল না। এই কথা শুনিয়া মহারাজ ধর্মাশোক বলিলেন-আমি প্রত্যয় দানে বুদ্ধ-শাসন সজীব রাখিয়াছি। সুতরাং, আমার দানই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠরত। এই রূপ হইলেও আমি বুদ্ধ-শাসনের দায়াদ বা উত্তরাধিকারী হইলাম কিনা? অর্থাৎ আমি পিতৃরাজ্যের উত্তরাধিকার হইয়া যেমন সাসগরা জম্বুদ্বীপের উপর আধিপত্য ও সুখৈশ্বর্য্য ভোগ করিতেছি, সেইরূপ বুদ্ধ শাসনের বা ভগবানের ধর্ম রাজ্যের উত্তরাধিকারী হওয়ার আমি উপযুক্ত হইয়াছি কিনা? মোগলিপুত্র তিস্স মহাস্থবির বলিলেন- “মহারাজ আপনি প্রত্যয় দায়ক মাত্র। যদি পৃথিবী হইতে ব্রহ্মলোক পর্যন্তও উচ্চ রাশিকৃত দানীয় বস্তু সজ্জিত করিয়া মহাদান দেওয়া হয়, তথাপি সে প্রত্যয় দায়ক মাত্র। তবে যে কোন ধনী অথবা দরিদ্র ব্যাক্তি স্বীয় ঔরস জাত পুত্রকে বুদ্ধ-শাসনে প্রব্রজ্যা প্রদান করেন, উপসম্পদা দেন, তিনিই বুদ্ধ শাসনের প্রকৃত অধিকারী।

স্থবিরের এই কথা শুনিয়া মহারাজ অশোক ভাবিলেন-অহো, আমি এত দান করিয়াও বুদ্ধ-শাসনের উত্তরাধিকারী হইতে পারিলাম না। কিরূপে তাহা হইবে।এইরূপ ভাবিয়া উদ্ধিগ্ন চিত্তে এদিক ওদিক দেখিতে লাগিলেন। তখন তাঁহার প্রিয় পুত্র “মহেন্দ্র কুমার” সেই সভাতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পিতার মনোভাব জ্ঞাত হইয়া সোৎসাহে সভায় দাঁড়াইয়া আনন্দ গদগদ কণ্ঠে বলিলেন-আমি প্রব্রজা গ্রহণ করিব, আমাকে প্রব্রজ্যা দান করিয়া আপনি বুদ্ধ-শাসনের উত্তরাধিকারী হউন। রাজকুমার মহেন্দ্র খুল্লতাত তিস্স কুমারের ভিক্ষু হওয়ার দিন হইতে কুমার মহেন্দ্রের অন্তরে পোষণ করিয়া রাখিয়াছিলেন তিনিও ভিক্ষু হইবেন। তবে তিনি এতদিন পিতার আদেশের অপেক্ষায় ছিলেন। রাজকুমারী সঙ্ঘমিত্রার স্বামী অগ্নিব্রহ্মা কুমার তিস্স কুমারের সহিত ভিক্ষু হইয়াছিলেন। সেই হইতে সঙ্ঘমিত্রাও ভিক্ষুণী হইবার ইচ্ছা অন্তরে পোষণ করিয়া রাখিয়াছিরেন। অদ্যকার সভায় তিনিও এই দুর্লভ সুযোগ ছাড়িলেন না। মহেন্দ্রের কথার অবসানে কুমারী সঙ্ঘমিত্রাও দাঁড়াইয়া কহিলেন- পিতঃ আমিও ভিক্ষুণী ধর্ম গ্রহণ করিয়া আপানাকে বুদ্ধ-শাসনের উত্তরাধিকারী করিবার আমার একান্ত ইচ্ছা। পিতঃ আমাকে অনুমতি দান করুন।
মহারাজ অশোক পুত্র-কন্যার মনোভাব জ্ঞাত হইয়া সানন্দে সঙ্ঘনায়ককে অনুরোধ করিরেন-ভন্তে, আমার এই পুত্র-কন্যাকে প্রব্রজ্যা প্রদান করিয়া আমাকে শাসনের উত্তরাধিকারী করুণ। সেই শুভ-মুহূর্তে রাজকুমার ও রাজকুমারীকে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা প্রদান করা হইল। পরম সৌভাগ্যবান পুণ্যশ্লোক মহেন্দ্র ও পুণ্যশ্লোকা সঙ্ঘমিত্রা উপসম্পদা লাভের পর অরহত্ব পদে উন্নীত হইলেন। কালে তাঁহারা বুদ্ধ-শাসনের চিরস্থায়ী কামনায় প্রভূত কল্যাণকর কার্যের অনুষ্ঠানে ব্রতী হইয়াছিলেন। শাসনে পুত্রদানের ফল যে কত অপরীসম মহান, তাহা জ্ঞানীমাত্রেই সহজে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবেন। তাই আমাদের উচিত যে কোন বন্ধের সময়ে (ষ্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা চাকুরীরত যারা তাদের) যারা পুত্রকে বুদ্ধ শাসনে দান করেননি তারা অচিরেই কাজটি সুসম্পন্ন করার চেষ্টা করবেন।

সূত্র ঃ সদ্ধর্ম নীতি মঞ্জুরী

Additional Info

  • Image: Image